টানা চার বছর ধরে সংকোচনমুখী মুদ্রানীতি চালু রেখেও প্রত্যাশিত মাত্রায় মূল্যস্ফীতি কমাতে পারেনি বাংলাদেশ। কিছু সময় কমলেও সাম্প্রতিক মাসগুলোতে তা আবার ঊর্ধ্বমুখী হয়েছে।
সামনে জাতীয় নির্বাচন, রোজা ও ঈদের বাড়তি চাহিদার কারণে মূল্যস্ফীতির চাপ আরও বাড়তে পারে বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে। এই অবস্থায় মূল্যস্ফীতি ৬ শতাংশের মধ্যে না নামায় নীতি সুদের হার কমাতে পারছে না কেন্দ্রীয় ব্যাংক। ফলে অর্থনৈতিক পুনরুদ্ধার, বিনিয়োগ ও কর্মসংস্থানের গতি ব্যাহত হচ্ছে। এমন বাস্তবতায় মাসের শেষ দিকে নতুন মুদ্রানীতি ঘোষণা করতে যাচ্ছে কেন্দ্রীয় ব্যাংক। তবে এবারের মুদ্রানীতিতে নীতি সুদের হার কমানো হবে কি না, সে বিষয়ে এখনো চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত হয়নি।
সংশ্লিষ্ট সূত্রগুলো জানায়, ২০২০ সালে করোনার পর হঠাৎ চাহিদা বেড়ে যাওয়ায় মূল্যস্ফীতি বাড়তে শুরু করে। এরপর ২০২২ সালের ফেব্রুয়ারিতে রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধ শুরু হলে বৈশ্বিক মন্দা দেখা দেয়। এর প্রভাব পড়ে বাংলাদেশের অর্থনীতিতেও। অনেক দেশ মন্দা কাটিয়ে মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণে আনতে পারলেও বাংলাদেশ এখনো সেই চক্র থেকে বেরোতে পারেনি। উল্টো সাম্প্রতিক সময়ে মূল্যস্ফীতির নিম্নমুখী প্রবণতা আবার ঊর্ধ্বমুখী হয়েছে।
২০২৪ সালের ৫ আগস্ট ক্ষমতাচ্যুত আওয়ামী লীগ সরকারের শেষ সময়ে, অর্থাৎ ওই বছরের জুলাইয়ে মূল্যস্ফীতির হার বেড়ে দাঁড়ায় ১১ দশমিক ৬৬ শতাংশে। পরে অন্তর্বর্তী সরকার বিভিন্ন পদক্ষেপ নিয়ে পরিস্থিতি কিছুটা সামাল দেয়। গত অক্টোবরে মূল্যস্ফীতি নেমে আসে ৮ দশমিক ১৭ শতাংশে। তবে এরপর পণ্যমূল্য বাড়তে থাকায় নভেম্বরেই তা বেড়ে হয় ৮ দশমিক ২৯ শতাংশ। ডিসেম্বরে আরও বেড়ে দাঁড়ায় ৮ দশমিক ৪৯ শতাংশে। নির্বাচনী ব্যয় ও অনুপাদনশীল খাতে টাকার প্রবাহ বাড়ায় চলতি জানুয়ারিতে এই হার আরও বাড়তে পারে। ফেব্রুয়ারির নির্বাচন, রোজা ও ঈদের অতিরিক্ত চাহিদাও মূল্যস্ফীতির ওপর নতুন চাপ তৈরি করতে পারে।
মূল্যস্ফীতির লাগাম টানতে ২০২২-২৩ অর্থবছরের শুরু থেকে সরকার ও কেন্দ্রীয় ব্যাংক সংকোচনমুখী মুদ্রানীতি অনুসরণ করে আসছে। একই সময় বৈশ্বিক মন্দার ধাক্কা সামাল দিতে তৎকালীন সরকার আইএমএফ থেকে ৪৭০ কোটি ডলারের ঋণ নেয়। ওই ঋণের শর্ত অনুযায়ী মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণে সুদের হার বাড়ানো ও টাকার প্রবাহ কমানোর ওপর জোর দেওয়া হয়। আইএমএফের শর্ত ছিল, মূল্যস্ফীতি ৫ শতাংশের মধ্যে না নামা পর্যন্ত কঠোর মুদ্রানীতি বজায় রাখতে হবে। পাশাপাশি জ্বালানি তেল, গ্যাস ও বিদ্যুতের দাম বাড়ানো এবং ডলারের বিপরীতে টাকার অবমূল্যায়নও শর্তের মধ্যে ছিল।
এই শর্তগুলো বাস্তবায়নের পর ২০২২ সালের আগস্টে মূল্যস্ফীতি ৯ শতাংশ ছাড়িয়ে যায়। মাঝখানে এক-দু’মাস কিছুটা কমলেও পরে আবার তা বাড়তে থাকে। কারণ একদিকে সরকার ডলার, জ্বালানি ও বিদ্যুতের দাম বাড়িয়েছে এবং বাজারে ছাপানো টাকা ছেড়েছে। অন্যদিকে সুদের হার বাড়িয়ে ও টাকার প্রবাহ কমিয়ে মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণের চেষ্টা করেছে। এই বিপরীতমুখী নীতির কারণে মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণে আসেনি। বরং চাপ আরও বেড়েছে।
বর্তমান সরকার দায়িত্ব নেওয়ার পর মূল্যস্ফীতি কমাতে কিছু পদক্ষেপ নেয়। এর মধ্যে টাকা পাচার বন্ধ হওয়া, ডলারের বিনিময় হারে স্থিতিশীলতা ফিরে আসা এবং বাজারে নতুন করে ছাপানো টাকা না ছাড়ার বিষয়টি উল্লেখযোগ্য। সুদের হার আরও বাড়ানো হয়। এতে মূল্যস্ফীতি কিছুটা কমলেও বাজার ব্যবস্থাপনার দুর্বলতার কারণে পণ্যের দাম আবার বাড়তে থাকে। ফলে মূল্যস্ফীতির চাপ পুরোপুরি কমেনি।
গত জুলাইয়ে চলতি অর্থবছরের মুদ্রানীতি ঘোষণার সময় কেন্দ্রীয় ব্যাংক আশা করেছিল, সেপ্টেম্বরের মধ্যেই মূল্যস্ফীতি ৬ শতাংশে নেমে আসবে। তখন নীতি সুদের হার কমানো হবে। কিন্তু বাস্তবে তা হয়নি। পরে জানুয়ারিতে নতুন মুদ্রানীতিতে সুদ কমানোর ইঙ্গিত দেওয়া হলেও ডিসেম্বরেও মূল্যস্ফীতি কমেনি। বরং বেড়েছে। সামনে আরও বাড়ার আশঙ্কা থাকায় নীতি সুদের হার কমানো নিয়ে কেন্দ্রীয় ব্যাংক এখনো সিদ্ধান্তে পৌঁছাতে পারেনি।
এদিকে সাম্প্রতিক এক বৈঠকে ব্যবসায়ীরা সুদের হার কমানোর দাবি জানিয়েছেন। তাদের বক্তব্য, চড়া সুদে ঋণ নিয়ে ব্যবসা টিকিয়ে রাখা কঠিন হয়ে পড়েছে। বিনিয়োগ থমকে যাচ্ছে। কর্মসংস্থানও কমছে।
কেন্দ্রীয় ব্যাংকের বিভিন্ন প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, মূল্যস্ফীতির বড় কারণ বাজার ব্যবস্থাপনার ত্রুটি। পণ্যের উৎপাদন, আমদানি ও সরবরাহ পর্যাপ্ত থাকার পরও দাম বাড়ছে। আন্তর্জাতিক বাজারে দাম কমলেও এবং আমদানি শুল্ক কমানোর পরও দেশীয় বাজারে তার প্রভাব পড়ছে না। ফলে শুধু মুদ্রানীতির কড়াকড়ি দিয়ে মূল্যস্ফীতি আর কমানো সম্ভব নয়। বাজার ব্যবস্থাপনায় সরকারের কার্যকর হস্তক্ষেপ জরুরি।
চার বছর ধরে সুদের হার বাড়িয়ে টাকার প্রবাহ কমানোর ফলে বিনিয়োগে ধস নেমেছে। কর্মসংস্থান কমেছে। সামগ্রিকভাবে অর্থনীতি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। যদিও আইএমএফের দাবি, অনেক দেশ মুদ্রানীতির মাধ্যমেই মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণে এনেছে এবং বাংলাদেশেও তা সম্ভব।
কেন্দ্রীয় ব্যাংক মনে করছে, দেশের বাজার কাঠামো জটিল। সিন্ডিকেট ও কারসাজির কারণে এখানে অর্থনীতির স্বাভাবিক নিয়ম কাজ করে না। এ কারণেই মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণে আনা কঠিন হয়ে পড়েছে। অন্যদিকে আইএমএফ নতুন নির্বাচিত সরকারের সঙ্গে আলোচনা করে ঋণের কিস্তি ছাড় করবে। তবে তারা নতুন সরকারকেও মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণে কঠোর মুদ্রানীতি অনুসরণের পরামর্শ দেবে।

