সাধারণত রমজানের অন্তত দেড় মাস আগে ভোগ্যপণ্যের বাজারে তদারকি শুরু হয়। তবে এবার নির্বাচনী পরিবেশে বাজার মনিটরিং কার্যক্রমে উল্লেখযোগ্য উদ্যোগ দেখা যায়নি। এর ফলে রমজানকে ঘিরে নিত্যপণ্যের পাইকারি বাজারের দাম বেড়েছে।
বিশ্ববাজারে দাম কমলেও এবং দেশে পর্যাপ্ত আমদানি হলেও এক মাস আগেই প্রধান ভোগ্যপণ্যের পাইকারি দাম বাড়তে শুরু করেছে। বাজার সংশ্লিষ্টরা আশঙ্কা করছেন, মধ্য ফেব্রুয়ারিতে শুরু হতে যাওয়া রমজানের খুচরা বাজারেও এর প্রভাব পড়বে।
বাণিজ্য মন্ত্রণালয় রমজানের বাজার তদারকি ও পর্যালোচনা নিয়ে ১৯ জানুয়ারি বৈঠক ডেকেছে। যদিও রমজান শুরু হতে পারে ১৭ ফেব্রুয়ারি। অর্থাৎ রমজান শুরুর এক মাসেরও কম সময় আগে বাজার তদারকি সভা হবে। এরপর জেলা ও বিভাগীয় পর্যায়ে নির্দেশনা দিয়ে মাঠ পর্যায়ে তদারকি শুরু করা হবে, যা আরও অন্তত এক সপ্তাহ সময় নেবে। ইতিমধ্যে পাইকারি বাজারে ভোগ্যপণ্যের দাম অস্থিতিশীল হয়ে উঠেছে।
দেশের সবচেয়ে বড় পাইকারি বাজার খাতুনগঞ্জ। চট্টগ্রাম বন্দর দিয়ে আমদানি হওয়া ভোগ্যপণ্যের ৫০ শতাংশের বেশি এখান থেকেই সারা দেশে সরবরাহ হয়। কয়েক মাস বাজার স্থিতিশীল থাকলেও সাম্প্রতিক এক সপ্তাহে দাম ঊর্ধ্বমুখী হয়েছে। বিশেষ করে ভোজ্যতেল, চিনি ও ডালের দাম বেড়েছে। গম ও চালের দামও উঠেছে।
বাজার সূত্র জানাচ্ছে, সম্প্রতি সরকার দেশের প্রায় সব স্থলবন্দর দিয়ে আমদানি হওয়া পণ্যের শুল্ক ৫ শতাংশ বাড়িয়েছে। এতে ভারতীয় পণ্যের দাম বাড়তে শুরু করেছে। চট্টগ্রামের চার্জ বৃদ্ধি এবং রোজার এক মাস আগে লাইটারেজ জাহাজ সংকট খালাস প্রক্রিয়া ব্যাহত করেছে। ফলে পাইকারি বাজারে চাহিদা বেড়ে দাম বাড়েছে। বিশেষ করে খোলা সয়াবিন তেল, চিনি ও ডালের দাম গত কয়েক দিনে উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়েছে।
বাজারে দেখা যাচ্ছে, এক সপ্তাহ আগেও প্রতি মণ সয়াবিন তেলের পাইকারি দাম ৬৬০০ টাকা ছিল। বৃহস্পতিবার লেনদেন হয়েছে মণপ্রতি ৬৮৫০ টাকায়। চিনির দাম প্রায় ১০০ টাকা বেড়ে ৩৪০০ টাকা হয়েছে। ছোলার দাম কেজিপ্রতি ৬৫–৭০ টাকা বেড়েছে। পেঁয়াজের দাম কমলেও আদা, রসুন ও মসলার দাম বাড়ছে। চাল দুই মাস ধরে স্থিতিশীল থাকলেও এখন বেড়ছে। গমের দাম মণপ্রতি ২০–৩০ টাকা বেড়ে খুচরা বাজারে আটা-ময়দার দামও বাড়াতে শুরু করেছে।
চট্টগ্রাম জেলা ভোক্তা অধিকার সংরক্ষণ অধিদপ্তরের সহকারী পরিচালক মো. আনিছুর রহমান বলেন, ‘খাতুনগঞ্জের ব্যবসায়ী নেতাদের সঙ্গে বৈঠক করেছি। তারা আশ্বস্ত করেছেন রমজানে বাজার স্থিতিশীল থাকবে। এলপি গ্যাস সংকটের কারণে তদারকি সীমিত ছিল। রমজান ঘনিয়ে আসায় ভোগ্যপণ্য তদারকি বাড়ানো হবে।’
বাজার সংশ্লিষ্টরা স্মরণ করিয়ে দিচ্ছেন, ২০২৫ সালের সেপ্টেম্বরে রমজানের ভোগ্যপণ্য আমদানি ও সরবরাহকারী ২০টি কোম্পানির সঙ্গে বৈঠক করেছিলেন বাংলাদেশ ব্যাংকের গভর্নর। বছরের শেষার্ধে ব্যবসায়ীদের সঙ্গে একাধিক বৈঠক হয়েছে। টাস্কফোর্স গঠন ও জেলায় স্টেকহোল্ডার বৈঠকের মাধ্যমে বাজার স্থিতিশীল রাখা হয়েছিল। তবে এবার বাজার মনিটরিং দেরিতে হওয়ায় পাইকারি দাম ইতিমধ্যেই বেড়েছে।
রমজানের আগে সবচেয়ে বড় সমস্যা হয়েছে বন্দর থেকে পণ্য খালাসে ব্যাঘাত। লাইটারেজ জাহাজ সংকটে অনেক পণ্য খালাস হয়নি। চট্টগ্রাম বন্দরের বহির্নোঙর ও কুতুবদিয়া চ্যানেলে ১০৮টি কার্গো জাহাজে ৪৫ লাখ টনের বেশি পণ্য খালাসের অপেক্ষায় আছে। এর মধ্যে সাধারণ পণ্য, রমজানের খাদ্যপণ্য, গম, ভুট্টা, সয়াবিন, ছোলা, ডাল ও ভোজ্যতেল রয়েছে। চিনি, সার ও সিমেন্ট ক্লিঙ্কারও অপেক্ষা করছে। প্রতিদিন প্রায় ৩০০টি লাইটারেজ জাহাজ প্রয়োজন, তবে অর্ধেকও পাওয়া যায়নি। ফলে দেশে সরবরাহ থাকা সত্ত্বেও রোজার আগে দাম বেড়েছে।
চট্টগ্রামের জেলা প্রশাসক মোহাম্মদ জাহিদুল ইসলাম মিঞা বলেন, ‘নির্বাচনকেন্দ্রিক কার্যক্রমের পাশাপাশি রমজান সামনে রেখে বাজার মনিটরিং শুরু হয়েছে। বৃহৎ পরিসরে মাঠ পর্যায়ে অভিযান পরিচালনা করার নির্দেশ দেয়া হবে।’
নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক একাধিক ব্যবসায়ী জানান, নির্বাচনকে কেন্দ্র করে প্রশাসনের কার্যক্রম সরে গেছে। রমজানের বাজার মনিটরিং এ বছর কম গুরুত্ব পেয়েছে। রোজার দুই–তিন মাস আগে ব্যবসায়ীরা প্রধান পাইকারি বাজার থেকে পণ্য সংগ্রহ শুরু করেন। কয়েক হাত ঘুরে পণ্যের কাগুজে দাম ইতিমধ্যেই বেড়েছে। গুদাম ও বন্দর থেকে খালাস পর্যায়ে দাম আরও বেড়ে যাচ্ছে।
কনজিউমার অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশের কেন্দ্রীয় ভাইস প্রেসিডেন্ট এসএম নাজের হোসাইন বলেন, ‘প্রতি বছর রোজার অনেক আগেই বাজার মনিটরিং শুরু হয়। এবার রমজান শুরুর এক মাসেরও কম সময়ে তদারকি শুরু হচ্ছে। নির্বাচনী ব্যস্ততায় সাধারণ মানুষের জন্য গুরুত্বপূর্ণ বাজার মনিটরিং পর্যাপ্ত হয়নি। দাম অস্থিরতা দেখা দিতে পারে।’
বিশ্বব্যাংকের কমোডিটি পিঙ্কশিট জানাচ্ছে, বিশ্ববাজারে সয়াবিন, চিনি, পাম অয়েল ও গমের দাম কমছে। অক্টোবর–ডিসেম্বরে পাম অয়েলের দাম ১০৩৮ ডলার থেকে কমে ৯৮১ ডলারে নেমেছে। সয়াবিনের দাম অক্টোবর–ডিসেম্বরে ১১৩২ ডলার থেকে ১,১১৯ ডলার হয়েছে। গমের দাম অক্টোবর–ডিসেম্বরে ২০৯.৩ ডলার থেকে ২২৩.২ ডলার হয়েছে। চিনির দাম তিন মাস ধরে ৩৮ সেন্ট প্রতি কেজি। জানুয়ারিতেও বিশ্ববাজারে ভোগ্যপণ্যের ফিউচার মার্কেট নিম্নমুখী।

