সরকার অত্যাবশ্যকীয় ওষুধের তালিকা বাড়ানোর পাশাপাশি নতুন মূল্য নির্ধারণ নীতিমালা চালু করতে যাচ্ছে। নতুন নীতিমালা অনুযায়ী, ওষুধ উৎপাদনকারী প্রতিষ্ঠানগুলোর মোট বার্ষিক বিক্রির অন্তত ২৫ শতাংশ মূল্য সমপরিমাণ অত্যাবশ্যকীয় ওষুধ বাজারে সরবরাহ করতে হবে।
নতুন নিয়মের অধীনে যারা এই শর্ত পূরণে ব্যর্থ হবে, তারা নতুন কোনো ওষুধের অনুমোদনের জন্য আবেদন করতে পারবে না। অর্থাৎ কর্তৃপক্ষ তাদের নতুন ওষুধের আবেদন বিবেচনা করবে না। স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয় ইতিমধ্যেই এই নীতিমালা অনুমোদন করেছে। এখন এটি গেজেট আকারে প্রকাশের অপেক্ষায় রয়েছে।
গত ৮ জানুয়ারি সরকার জাতীয় অত্যাবশ্যকীয় ঔষধ তালিকা সম্প্রসারণের ঘোষণা দিয়েছে। নতুন ১৩৫টি ওষুধকে তালিকায় যুক্ত করে মোট সংখ্যা ২৯৫টিতে উন্নীত করা হয়েছে। সরকারের পক্ষ থেকে বলা হয়েছে, শীঘ্রই এসব ওষুধের দাম নির্ধারণ করা হবে। এছাড়া জাতীয় ওষুধ মূল্য নির্ধারণ নীতিমালা ২০২৫ চূড়ান্ত করা হয়েছে। সরকারি কর্মকর্তারা বলছেন, এই পদক্ষেপ সাধারণ মানুষের জন্য ওষুধ সহজলভ্য ও সাশ্রয়ী করার ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ।
তবে ওষুধ শিল্প মালিকেরা নতুন শর্তকে বাস্তবতা-বিরোধী ও বাজারবিরোধী বলে তীব্র সমালোচনা করেছেন। উৎপাদনকারীদের অভিযোগ, অত্যাবশ্যকীয় ওষুধের তালিকা সম্প্রসারণ বা মূল্য নির্ধারণের কাঠামো তৈরির সময় তাদের সঙ্গে কোনো আলোচনা করা হয়নি। শিল্প প্রতিনিধিরা বলেন, ওষুধ শিল্প সমিতির পক্ষ থেকে মূল্য নির্ধারণ কমিটিকে বক্তব্য ও কাগজপত্র জমা দিয়েও তা বিবেচনায় নেওয়া হয়নি। মূল নীতিমালা তৈরি করার সময়ে সরকার বা স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের কেউ তাদের সঙ্গে বসেননি।
উৎপাদনকারীরা কেন অত্যাবশ্যকীয় ওষুধ এড়িয়ে চলছে:
বাংলাদেশ ওষুধ শিল্প সমিতির (বিএপিআই) মহাসচিব ডা. মো. জাকির হোসেন বলেন, দেশের কোনো ওষুধ উৎপাদনকারী কোম্পানিই শতভাগ অত্যাবশ্যকীয় ওষুধ উৎপাদন করে না।
তিনি জানান, কেউ ৫ শতাংশ, কেউ ১০ শতাংশ পর্যন্ত উৎপাদন করে। অনেক নতুন কোম্পানি একেবারেই উৎপাদন করে না। ডা. জাকির বলছেন, “যদি কোম্পানিগুলোকে জোর করে ২৫ শতাংশ অত্যাবশ্যকীয় ওষুধ উৎপাদনে বাধ্য করা হয় অথচ দাম সংশোধন না করা হয়, তাহলে তারা লোকসান নিয়ে উৎপাদন করবে বা কোম্পানি বন্ধ করতে বাধ্য হবে।”
তিনি আরও জানান, ১১৭টি অত্যাবশ্যকীয় ওষুধের মূল্য অত্যন্ত পুরনো এবং বর্তমান বাস্তবতার সঙ্গে মিল নেই। গত ৩২-৩৩ বছরে মাত্র দুইবার এর দাম সংশোধন করা হয়েছে। “এই দামে উৎপাদন করলে অধিকাংশ ক্ষেত্রেই বড় অঙ্কের লোকসান হয়। তাই অনেক কোম্পানি উৎপাদনেই পিছিয়ে আছে,” বলেন তিনি।
ডা. জাকির বলেন, বাধ্যতামূলক মূল্য নীতির কারণে ইতোমধ্যে বেশ কয়েকটি স্যালাইন উৎপাদনকারী প্রতিষ্ঠান বন্ধ হয়ে গেছে। এছাড়া অত্যাবশ্যকীয় ওষুধ তৈরির জন্য প্রয়োজনীয় কাঁচামাল আমদানিতে আমলাতান্ত্রিক জটিলতা রয়েছে। তিনি বলেন, “ওষুধের মূল্য নির্ধারণে এখনো সরকার কোম্পানিগুলোকে আনুষ্ঠানিকভাবে কিছু জানায়নি।”
রেনাটার প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা সৈয়দ এস কায়সার কবিরও এই নীতিকে বাস্তবতা-বিরোধী হিসেবে অভিহিত করেছেন। তিনি বলেন, “মোট উৎপাদনের অন্তত ২৫ শতাংশ অত্যাবশ্যকীয় ওষুধ উৎপাদনের বাধ্যবাধকতা ওষুধ শিল্পের সঙ্গে কোনো আলোচনা ছাড়াই নেওয়া হয়েছে। বর্তমান বাজার কাঠামোর সঙ্গে এর কোনো মিল নেই।”
তিনি আরও বলেন, “এ ধরনের সিদ্ধান্ত মূলত কমান্ড ইকোনমির প্রতিফলন। যদি সরকার বলে, এই দামে অত্যাবশ্যকীয় ওষুধ উৎপাদন করতে হবে, অথচ সেই দাম উৎপাদন খরচের চেয়েও কম হয়, তাহলে কোনো কোম্পানি সেটা উৎপাদন করবে না। এটা খুব সাধারণ অর্থনীতির কথা।”
চাহিদা সংক্রান্ত প্রশ্ন তুলে তিনি বলেন, “আমার মোট উৎপাদনের ২৫ শতাংশ অত্যাবশ্যকীয় ওষুধ হতে হবে, কিন্তু সেই চাহিদা কোথায়? আমি কি অতিরিক্ত উৎপাদন করে গুদামে রেখে দেব? বাজারের চাহিদা ছাড়া কোনো পণ্য উৎপাদন করা সম্ভব নয়।”
বিএপিআই সভাপতি আবদুল মুক্তাদির বলেন, স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয় মূল্য নির্ধারণ প্রক্রিয়ায় ওষুধ শিল্পের স্টেকহোল্ডারদের পুরোপুরি বাদ দিয়েছে। তিনি জানান, “পুরো প্রক্রিয়ায় আমাদের রাখা হয়নি। পলিসি ভালো কি মন্দ, তা নিয়েও এখনো কিছু জানি না।”
জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞদের সতর্কবার্তা:
ফার্মাসিস্ট ও বিশ্বব্যাংকের সাবেক পরামর্শক মো. আবু জাফর সাদেক অত্যাবশ্যকীয় ওষুধের তালিকা সম্প্রসারণকে স্বাগত জানিয়েছেন। তিনি বলেন, এটি জনস্বাস্থ্যের জন্য একটি ইতিবাচক পদক্ষেপ। তবে তিনি সতর্ক করেছেন, ওষুধের দামের ওপর কঠোর নিয়ন্ত্রণ গুণগত মান বজায় রাখতে বাধা সৃষ্টি করতে পারে, সরবরাহে বিঘ্ন ঘটাতে পারে এবং ভবিষ্যতে বিনিয়োগকে নিরুৎসাহিত করতে পারে।
ডা. জাফর বলেন, একতরফা মূল্য নির্ধারণের পরিবর্তে সহযোগিতামূলক পদ্ধতিতে দাম নির্ধারণ করলে রোগীরা বেশি উপকৃত হবেন। ২৫ শতাংশ উৎপাদন-সংক্রান্ত প্রস্তাবিত শর্ত নিয়ে তিনি বলেন, ব্যবসার সিদ্ধান্তগুলো বাজারের চাহিদার ভিত্তিতে পরিচালিত হলে সবচেয়ে ভালো ফল পাওয়া যায়।
সরকার নতুন নীতিমালাকে ‘যুগান্তকারী সিদ্ধান্ত’ বলছে:
গত ৮ জানুয়ারি অত্যাবশ্যকীয় ওষুধের হালনাগাদ তালিকা ঘোষণা করেন স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের প্রধান উপদেষ্টার বিশেষ সহকারী মো. সায়েদুর রহমান। তিনি বলেন, এই ওষুধই প্রায় ৮০ শতাংশ সাধারণ রোগের চিকিৎসার জন্য যথেষ্ট।
তিনি জানান, ওষুধগুলোর মূল্য নিয়ন্ত্রণ করলে সাধারণ মানুষের জন্য এগুলো কেনা সহজ হবে এবং প্রাপ্যতা নিশ্চিত হবে। এই উদ্যোগকে তিনি ‘যুগান্তকারী সিদ্ধান্ত’ বলে উল্লেখ করেন।
সায়েদুর রহমান বলেন, একটি টাস্কফোর্স গত ১৪ মাস ধরে উৎপাদনকারী, গবেষক, আন্তর্জাতিক সংস্থা ও অন্যান্য অংশীজনদের সঙ্গে মূল্য নির্ধারণের কাঠামো নিয়ে আলোচনা করেছে। তিনি বলেন, “সবাই হয়তো একমত হয়নি, সবার সঙ্গে একমত হওয়া কঠিন। কিন্তু সবার সঙ্গে আলোচনা করে এ অবস্থায় এসেছে। মূল্য নির্ধারণ নীতিমালারও অনুমোদন হয়েছে।” তিনি আরও জানান, নীতিমালা গেজেট আকারে প্রকাশিত হলে আর কোনো ওষুধই একদম নিয়ন্ত্রণ ছাড়া থাকবে না।
উভয় পক্ষের জন্য লাভজনক’, বলছেন টাস্কফোর্স সদস্য:
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের স্বাস্থ্য অর্থনীতি ইনস্টিটিউটের অধ্যাপক ও জাতীয় অত্যাবশ্যকীয় ওষুধ তালিকা বিষয়ক টাস্কফোর্সের সদস্য সৈয়দ আবদুল হামিদ বলেন, ১৯৯৪ সালের পর অত্যাবশ্যকীয় ওষুধের দাম তেমন সমন্বয় করা হয়নি। এর ফলে উৎপাদনকারীরা ধীরে ধীরে এই ওষুধ তৈরি করা বন্ধ করে দিয়েছিলেন।
তিনি জানান, “কোম্পানিগুলো যখন নির্দেশিত মূল্যের ওষুধের দিকে ঝুঁকে পড়ে, তখন চিকিৎসকরাও সেগুলো বেশি লিখতে শুরু করেন। এর ফলে রোগীরা তুলনামূলক দামি বিকল্প ওষুধ কিনতে বাধ্য হন।”
আবদুল হামিদ বলেন, নতুন ফর্মুলাভিত্তিক মূল্য নির্ধারণ পদ্ধতি বাজারে অত্যাবশ্যকীয় ওষুধের সহজলভ্যতা ও সাশ্রয়ী দাম নিশ্চিত করবে। উদাহরণ হিসেবে তিনি বলেন, যে ওষুধের দাম ২ টাকা হওয়া উচিত ছিল, সেটি বাজারে না থাকায় ভোক্তারা ১০ টাকা দিয়ে বিকল্প ওষুধ কিনতে বাধ্য হচ্ছিলেন। তিনি আরও বলেন, “কোম্পানিগুলো মুনাফা করবে ঠিকই, তবে তা হবে নিয়ন্ত্রিত মুনাফা। এই পদ্ধতি ওষুধের অতিরিক্ত প্রচারণা খরচও নিয়ন্ত্রণ করবে, কারণ অতিরিক্ত খরচ আর ভোক্তাদের ওপর চাপানো যাবে না।” সৈয়দ আবদুল হামিদ বলেন, “সঠিকভাবে বাস্তবায়ন করা হলে এই নীতি জনস্বাস্থ্য এবং ওষুধ শিল্প—উভয় পক্ষের জন্যই লাভজনক পরিস্থিতি তৈরি করবে।”
অত্যাবশ্যকীয় ওষুধের জন্য ‘কস্ট-প্লাস’ মূল্য নির্ধারণ:
নতুন নিয়ম অনুযায়ী, অত্যাবশ্যকীয় ওষুধের জন্য ভ্যাট বাদে সর্বোচ্চ খুচরা মূল্য (এমআরপি) নির্ধারণে ‘কস্ট-প্লাস বেঞ্চমার্কিং’ পদ্ধতি ব্যবহার করা হবে। এই মূল্য নির্ধারণ করবে সরকার মনোনীত কমিটি বা ঔষধ প্রশাসন অধিদপ্তর (ডিজিডিএ)। এতে ওষুধের কাঁচামাল—অ্যাক্টিভ ফার্মাসিউটিক্যাল ইনগ্রেডিয়েন্টস (এপিআই) ও এক্সিপিয়েন্ট—প্রাথমিক প্যাকেজিং ব্যয় এবং শ্রেণিভিত্তিক মার্কআপ যোগ করে বেঞ্চমার্ক মূল্য নির্ধারণ করা হবে।
প্রাইমারি প্যাকেজিং সরাসরি ওষুধের সংস্পর্শে থাকার কারণে মার্কআপ কাঠামোর মধ্যে থাকবে। তবে ওষুধের দাম অপ্রয়োজনীয়ভাবে বেড়ে না যাওয়ায় সেকেন্ডারি ও টারশিয়ারি প্যাকেজিংয়ের খরচ মার্কআপের বাইরে রাখা হয়েছে।
অন্যান্য ওষুধের জন্য রেফারেন্স প্রাইসিং:
অত্যাবশ্যকীয় তালিকার বাইরে থাকা ওষুধের ক্ষেত্রে উৎপাদনকারীরা নিজস্বভাবে খুচরা মূল্যের প্রস্তাব দেবে। এটি অনুমোদন করবে ঔষধ প্রশাসন অধিদপ্তর। যদি কোনো ওষুধ সাত বা ততোধিক কোম্পানি উৎপাদন করে, তাহলে অভ্যন্তরীণ রেফারেন্স প্রাইসিং (আইআরপি) পদ্ধতিতে বাজারে প্রচলিত দামের মধ্যম মানকে বেঞ্চমার্ক হিসেবে নেওয়া হবে। আর যদি সাতটির কম কোম্পানি সেই ওষুধ তৈরি করে, তবে অভ্যন্তরীণ বা আন্তর্জাতিক বাজারমূল্যের মধ্যে যেটি কম, সেটিই কার্যকর হবে।
সব ক্ষেত্রেই অনুমোদিত খুচরা মূল্য নির্ধারিত বেঞ্চমার্ক দামের ১৫ শতাংশের মধ্যে থাকতে হবে। আমদানিকৃত ওষুধের ক্ষেত্রে সিএন্ডএফ ভ্যালু, বর্তমান বিনিময় হার এবং পূর্বনির্ধারিত মার্কআপের ভিত্তিতেই দাম নির্ধারণ করা হবে।
নতুন জেনেরিক, বায়োলজিক ও এপিআই আমদানির নিয়ম:
বাংলাদেশে আগে বাজারজাত করা হয়নি এমন পেটেন্টমুক্ত নতুন জেনেরিক ওষুধের দাম নির্ধারণের ক্ষেত্রে কাঁচামাল, প্রাইমারি প্যাকেজিং ব্যয়, অপরিহার্য ওষুধের জন্য নির্ধারিত ১.৩০ মার্কআপ এবং সেকেন্ডারি ও টারশিয়ারি প্যাকেজিং ব্যয় যোগ করে বেঞ্চমার্ক মূল্য নির্ধারণ করা হবে। ভ্যাকসিন, ইনসুলিন ইনজেকশন ও জিন থেরাপির মতো বায়োলজিকসের দাম নির্ধারিত হবে উৎপাদন খরচের বস্তুনিষ্ঠ মূল্যায়ন এবং নিয়ন্ত্রিত সেক্টর-প্রায়োরিটির ভিত্তিতে।
দেশীয় এপিআই উৎপাদন সক্ষমতা বৃদ্ধির জন্য আমদানিকারকদের এপিআই আমদানির আগে ঔষধ প্রশাসন অধিদপ্তর থেকে অনাপত্তিপত্র গ্রহণ বাধ্যতামূলক হবে। অনাপত্তিপত্র পেতে আমদানিকারককে দুইটি শর্ত পূরণ করতে হবে। যদি কোনো এপিআই দেশে পর্যাপ্ত পরিমাণে উৎপাদিত না হয় অথবা দেশীয়ভাবে উৎপাদিত এপিআইয়ের বাজারমূল্য আন্তর্জাতিক মূল্যের চেয়ে ২০ শতাংশ বেশি হয়, তবেই অনাপত্তিপত্র দেওয়া হবে। অধিদপ্তরকে আবেদন প্রাপ্তির সাত কার্যদিবসের মধ্যে অনাপত্তিপত্র প্রদানের প্রক্রিয়া সম্পন্ন করতে হবে।

