জাতীয় সংসদ নির্বাচনের প্রস্তুতি ও রাজনৈতিক কর্মকাণ্ড দেশের অর্থনীতিকে চাঙা করেছে। নির্বাচনের কারণে সরকারি ব্যয় বেড়েছে। একই সঙ্গে প্রার্থী, তাদের ধনাঢ্য সমর্থক ও আত্মীয়স্বজনও প্রচুর খরচ করছেন। প্রবাসীরাও পছন্দের প্রার্থীর জন্য বাড়তি রেমিট্যান্স পাঠাচ্ছেন। এতে বাজারে নগদ অর্থের প্রবাহ বেড়েছে। তবে এই অর্থের বড় অংশ অনুৎপাদনশীল খাতে খরচ হচ্ছে। অর্থনীতিবিদরা আশঙ্কা করছেন, নির্বাচনি মাসে মূল্যস্ফীতির হার আরও বাড়তে পারে।
১২ ফেব্রুয়ারি সংসদ নির্বাচন ও সংস্কার ইস্যুতে গণভোট অনুষ্ঠিত হবে। নির্বাচনের প্রায় সব প্রস্তুতি সম্পন্ন। রোববার আপিল নিষ্পত্তি শেষ হবে। ২০ জানুয়ারি প্রার্থিতা প্রত্যাহারের শেষ দিন। ওই দিনই প্রার্থী তালিকা চূড়ান্ত হবে। ২১ জানুয়ারি প্রতীক বরাদ্দ করা হবে। এরপর আনুষ্ঠানিকভাবে শুরু হবে নির্বাচনি প্রচার।
এবারের নির্বাচনে গত বুধবার পর্যন্ত বৈধ প্রার্থীর সংখ্যা দাঁড়িয়েছে ২ হাজার ১২১ জন। মনোনয়নপত্র বাছাইয়ের পর বৈধ প্রার্থী ছিলেন ১ হাজার ৮৪২ জন। বাতিল হওয়া প্রার্থীদের মধ্যে ৬৪৫ জন আপিল করে ২৭৯ জন প্রার্থিতা ফিরে পেয়েছেন। রোববার আরও কিছু প্রার্থী হয়তো আপিলে জয়ী হয়ে নির্বাচনে ফিরতে পারবেন। ফলে প্রার্থীর সংখ্যা আড়াই হাজারের কাছাকাছি হতে পারে।
বাংলাদেশ উন্নয়ন গবেষণা প্রতিষ্ঠানের (বিআইডিএস) সাবেক মহাপরিচালক ও বাংলাদেশ ব্যাংকের সাবেক প্রধান অর্থনীতিবিদ ড. মুস্তফা কে মুজেরী বলেন, নির্বাচনের সময় সরকার, রাজনৈতিক দল, প্রার্থী ও সামাজিক সংগঠনসহ নানা অঙ্গন থেকে বাড়তি খরচ হয়। প্রবাসীর বাড়তি রেমিট্যান্সও এতে যুক্ত হয়। সব মিলিয়ে বাজারে টাকার প্রবাহ বেড়ে যায়। অনেক ক্ষেত্রে খণ্ডকালীন কর্মসংস্থান সৃষ্টি হয়। ফলে মানুষের আয় বাড়ে এবং খরচ অন্যান্য খাতে চলে যায়। এর ফলে অর্থনীতির প্রাতিষ্ঠানিক খাতও কিছুটা চাঙা হয়।
ড. মুজেরী বলেন, নির্বাচনি খরচ গ্রামের প্রত্যন্ত এলাকা পর্যন্ত ছড়িয়ে পড়ে। নির্বাচনের পরও ওই এলাকায় টাকার প্রবাহ কিছুটা থাকে। এতে স্থানীয়দের জীবনমান উন্নয়নে সহায়তা হয়। তবে তিনি সতর্ক করে বলেন, নির্বাচনি সময় টাকার প্রবাহ বেড়ে অনুৎপাদনশীল খাতে ব্যয় বাড়ে। চাহিদা বেড়ে গেলে পণ্যের দামও বেড়ে যায়, যা মূল্যস্ফীতি বাড়াতে পারে। গত দুই মাস ধরে এই হার সামান্য বেড়েছে এবং চলতি মাসেও বাড়ার সম্ভাবনা আছে। রোজা ও ঈদের খরচও এটি আরও বাড়াতে পারে।
বিশ্বব্যাংকের এক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, নির্বাচনের পর সরকার কাঠামোগত সংস্কার অব্যাহত রাখলে রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা ফিরে আসবে। তখন বিনিয়োগ ও সরকারি ব্যয় বাড়বে। শিল্প খাত চাঙা হবে এবং জিডিপি প্রবৃদ্ধির হারও বৃদ্ধি পাবে।
নির্বাচন কমিশন এবারের প্রচারে আচরণবিধি কঠোর করেছে। প্রার্থীরা বড় পোস্টার, রঙিন ব্যানার, লিফলেট বা হ্যান্ডবিল ছাপাতে পারবে না। বিলাসবহুল গেট বা তোরণ নির্মাণ এবং পরিবহণ ভাড়া করে শোভাযাত্রাও বন্ধ। তবুও দেশের বিভিন্ন এলাকায় সরকারের ও প্রার্থীর সমর্থকদের ব্যয় বাড়ছে। এর ফলে বাণিজ্যিক ও সামাজিক কর্মকাণ্ডও বৃদ্ধি পাচ্ছে।
চলতি অর্থবছরে নির্বাচন কমিশনের জন্য বরাদ্দ করা হয়েছে ২ হাজার ৯৫৬ কোটি টাকা। এর মধ্যে ২ হাজার ৭২৭ কোটি টাকা পরিচালন ব্যয় এবং ২২৯ কোটি টাকা উন্নয়ন ব্যয়। গণভোটের আয়োজনের কারণে খরচ প্রায় ২০ শতাংশ বাড়তে পারে। ফলে নির্বাচনের জন্য সরকারের খরচ দাঁড়াবে প্রায় ৩ হাজার কোটি টাকা। ২০২৪ সালের ৭ জানুয়ারির নির্বাচনে খরচ হয়েছিল ৪ হাজার কোটি টাকা। তবে এবার ইভিএম ব্যবহার হচ্ছে না।
নির্বাচনী প্রচার এখনও আনুষ্ঠানিকভাবে শুরু হয়নি, তবুও প্রার্থীরা ইতোমধ্যেই দেশব্যাপী পোস্টার, ব্যানার ও তোরণে ব্যয় করছেন। ডিজিটাল প্রচারণাও জোরেশোরে চলছে। এতে খণ্ডকালীন কর্মসংস্থান বাড়ছে এবং অপ্রাতিষ্ঠানিক খাত চাঙা হচ্ছে। খরচের একটি অংশ প্রাতিষ্ঠানিক খাতে প্রবেশ করছে, যা শিল্প ও ব্যবসাবাণিজ্যকে প্রভাবিত করছে।
২২ জানুয়ারি থেকে আনুষ্ঠানিক প্রচারণা শুরু হবে। নির্বাচনের দিন পর্যন্ত খরচ আরও বাড়বে। এবারের নির্বাচনে প্রার্থী ভোটারপ্রতি সর্বোচ্চ ১০ টাকা বা সর্বোচ্চ ২৫ লাখ টাকা খরচ করতে পারবেন। মোট ভোটার প্রায় ১৩ কোটি। এর হিসাব অনুযায়ী প্রার্থীর আনুমানিক খরচ ৪৩ লাখ ৩৩ হাজার টাকা হতে পারে। মোট ২ হাজার ৫০০ প্রার্থী হলে মোট খরচ দাঁড়াবে ১ হাজার ৮৩ কোটি টাকা। তবে বাস্তবে খরচ আরও কয়েকগুণ বেশি হবে, যার বড় অংশই কালোটাকা থেকে হবে।
জানুয়ারির প্রথম ১১ দিনে প্রবাসীদের পাঠানো রেমিট্যান্স এসেছে ১৩৩ কোটি ৬০ লাখ ডলার, যা গত বছরের তুলনায় ৮১ শতাংশ বেশি। ডিসেম্বরে রেমিট্যান্স এসেছে ৩০০ কোটি ডলারের বেশি। নির্বাচনী খরচের জন্য প্রতিটি প্রার্থীকে ব্যাংকে হিসাব খোলার বাধ্যবাধকতা রয়েছে। এতে কিছু অর্থ পুনরায় ব্যাংকে প্রবেশ করবে এবং লেনদেন বৃদ্ধি পাবে।
নির্বাচনী খরচের কারণে বাজারে টাকার প্রবাহ বেড়েছে। জানুয়ারির ১২ দিনে কেন্দ্রীয় ব্যাংক রেমিট্যান্স কিনেছে ৭০ কোটি ডলার। বিপরীতে বাজারে ছাড় হয়েছে ৮ হাজার ৫৬১ কোটি টাকা। বাণিজ্যিক ব্যাংকও নগদ চাহিদা মেটাতে কেন্দ্রীয় ব্যাংক থেকে টাকা তুলছে। এর ফলে মূল্যস্ফীতি বেড়েছে। অক্টোবরেই হার ছিল ৮.১৭ শতাংশ। নভেম্বর ৮.২৯ শতাংশ, ডিসেম্বর ৮.৪৯ শতাংশ। নির্বাচনের কারণে জানুয়ারি এবং ফেব্রুয়ারি মাসে আরও বাড়ার সম্ভাবনা রয়েছে।

