বাংলাদেশের আকাশের নিচে, যেখানে গ্রামের প্রতিটি ঘরে সরু জানালা গলে ঢুকে পড়ে রোদের আলো—সেখানেই নীরবে চলতে থাকে এক অদৃশ্য যুদ্ধ। এই যুদ্ধের সৈনিকেরা নারী শ্রমিকরা। বিশেষ করে তৈরি পোশাকশিল্পের কারখানাগুলোতে প্রতিদিন হাজার হাজার নারী ভোরবেলা ঘুম ভেঙে নামেন এক যান্ত্রিক জীবনের চক্রে। তাঁদের ঘাম আর শ্রমে দেশের অর্থনীতিতে আসে বিপুল বৈদেশিক মুদ্রা, কিন্তু সেই অর্থপ্রবাহের আড়ালে চাপা পড়ে থাকে অসংখ্য মানুষের গল্প—কান্না, দীর্ঘশ্বাস, ক্লান্তি আর স্বপ্নের কথা।
২০২৪ সালের জুন পর্যন্ত হিসাব বলছে, তৈরি পোশাক খাতে মোট ৫০ লাখ ১৭ হাজার শ্রমিকের মধ্যে প্রায় ২৭ লাখ ৮৮ হাজারই নারী। এই সংখ্যাগুলো কেবল পরিসংখ্যান নয়। প্রতিটি সংখ্যা মানে একেকজন মা, যাঁর চোখে জমে থাকে আগুনের মতো কান্না; একেকজন মেয়ে, যার স্বপ্ন ভেঙে যায় বাস্তবতার চাপে; আর একেকটি পরিবার, যারা প্রতিদিন উৎকণ্ঠায় দিন কাটায়।
নারী শ্রমিকদের জীবন কেবল আয়ের গল্প নয়—এটা নিজের অস্তিত্বের দাবি জানানোর গল্প। গ্রামের ছোট ঘর থেকে উঠে এসে তাঁরা ঢুকে পড়েন শহরের বিশাল কারখানায়, যেখানে দীর্ঘ কর্মঘণ্টা, শারীরিক ক্লান্তি আর নিরাপত্তাহীনতাই নিত্যসঙ্গী। তাঁরা শুধু পরিবারের মুখে হাসি ফোটাতে চান না, প্রমাণ করতে চান—এই সমাজে তাঁদেরও জায়গা আছে।
এই নারীদের প্রেরণার গল্প বুঝতে হলে কাগজের সংখ্যার বাইরে তাকাতে হয়। দেখতে হয় সেই ছোট ছোট মুহূর্তগুলো—যেখানে এক মা দিনের সব ভয় আর হতাশা পেরিয়ে কেবল এই আশায় কাজ করেন যে, সন্ধ্যায় নিরাপদে ফিরে গিয়ে মেয়েটিকে বুকে জড়াতে পারবেন। কিংবা সেই নারী, যিনি অন্ধকার মেশিনের পাশে অবিশ্বাস্য ধৈর্য নিয়ে কাজ করে যান, মনে মনে লালন করেন একদিন স্বপ্ন পূরণের আশা।
তৈরি পোশাক খাতের নারী শ্রমিকরা শুধু আর্থিক স্বাধীনতাই অর্জন করেননি, তাঁদের শ্রম বদলে দিয়েছে সমাজ আর পরিবারের দৃষ্টিভঙ্গি। এক সময় যেখানে মেয়েদের পড়াশোনা গুরুত্ব পেত না, সেখানে এখন অনেক পরিবারই মেয়েদের স্কুল-কলেজে পাঠাচ্ছে। কেউ কেউ উচ্চশিক্ষার সুযোগও পাচ্ছে। নারীর আয়ে গ্রামের ছোট সংসারগুলো ধীরে ধীরে উন্নতির পথে হাঁটছে, দারিদ্র্যের ফাঁদ থেকে বেরিয়ে আসার লড়াইয়ে নারী শ্রমিকেরা হয়ে উঠছেন সমান সঙ্গী। তাঁদের আত্মবিশ্বাস বেড়েছে, সামাজিক মর্যাদা বেড়েছে। এতে প্রমাণ হয়েছে—একজন নারী শ্রমিকের হাতে করা সেলাই শুধু পোশাক গড়ে না, গড়ে তোলে দেশের স্বপ্ন আর গর্ব।
তবে এই সাফল্যের আড়ালেই লুকিয়ে আছে নির্মম বাস্তবতা। দীর্ঘ কর্মঘণ্টা, তুলনামূলক কম মজুরি, স্বাস্থ্যঝুঁকি আর নিরাপত্তাহীনতা—সবকিছুই তাঁদের নিত্যদিনের সঙ্গী। রানা প্লাজার স্মৃতি আজও দগদগে ক্ষত হয়ে আছে; গোটা বিশ্ব দেখেছে, কী ভয়ংকর পরিবেশে এই নারীরা কাজ করে চলেছেন। তবুও প্রতিদিন ভোরে তাঁরা উঠে দাঁড়ান, আগের দিনের ব্যথা ভুলে একটাই লক্ষ্য নিয়ে—পরিবারের মুখে হাসি ফোটানো। এই নীরব সংগ্রামের মধ্যেই লুকিয়ে আছে বাংলাদেশের পোশাকশিল্পের আসল শক্তি, যা প্রতিদিন দেশের অর্থনীতিকে এগিয়ে নিচ্ছে।
প্রতিটি নারী শ্রমিকের চোখে শুধু বর্তমানের কষ্ট নয়, আছে ভবিষ্যতের স্বপ্নও। কেউ চান সন্তানকে শিক্ষিত করে ভালো মানুষ বানাতে, কেউ চান নিজের পড়াশোনা শেষ করে স্বাবলম্বী হতে, কেউ আবার স্বপ্ন দেখেন একদিন কারখানার বাইরে নিজের ছোট ব্যবসা গড়ার। এই স্বপ্নগুলোই তাঁদের প্রতিদিন কাজে ফেরার শক্তি জোগায়। এই আশা-আকাঙ্ক্ষার দিকটি না বুঝলে তাঁদের সাহস আর ত্যাগের গভীরতা বোঝা অসম্ভব।
এই লড়াই শুধু শারীরিক নয়, মানসিকও। অক্সফামের তথ্য অনুযায়ী, প্রায় ৬১ শতাংশ নারী শ্রমিক কোনো না কোনো ধরনের হয়রানির শিকার হন। অনেক নারী বছরের পর বছর নিচু পদেই আটকে থাকেন, নেতৃত্বের সুযোগ পান না। অর্থনৈতিক, সামাজিক আর মানসিক—এই তিন ফ্রন্টে প্রতিদিন লড়াই করেও তাঁদের দৃঢ় মনোবল আর সাহস তাঁদের টিকিয়ে রাখে।
নারী শ্রমিকরা শুধু শ্রমিক নন; তাঁরা বাংলাদেশের অর্থনীতির নীরব নায়িকা। তাঁদের হাতে সেলাই করা পোশাক ‘মেড ইন বাংলাদেশ’ নামটিকে বিশ্ববাজারে গর্বের প্রতীক করেছে। কিন্তু প্রশ্ন হলো—আমরা কি তাঁদের প্রাপ্য সম্মান দিতে পেরেছি? নিরাপত্তা, স্বাস্থ্যসেবা, ন্যায্য মজুরি আর মানবিক কর্মপরিবেশ নিশ্চিত করাই এখন সময়ের সবচেয়ে জরুরি দাবি। তাঁদের অধিকার সুরক্ষিত না হলে এই অর্থনৈতিক অগ্রগতি কখনোই টেকসই হবে না।
এই নারীদের সংগ্রাম, ত্যাগ আর অটল সংকল্পই শুধু পোশাকশিল্প নয়, পুরো জাতির অগ্রগতির নেপথ্য শক্তি। সমাজ ও অর্থনীতির এই নীরব নায়িকাদের অবদান স্বীকার না করলে দেশের ভবিষ্যৎ কখনো পূর্ণতা পাবে না। তাঁদের সাহস, শ্রম আর স্বপ্ন থেকেই তৈরি হয় দেশের গর্ব—আর সেই গর্ব আমাদের একটাই সত্য শেখায়: নারীর শক্তিই জাতীয় অগ্রগতির আসল চালিকাশক্তি।

