বাংলাদেশের ভূপ্রকৃতি কৃষিকাজের অনুকূল। যে কারণে সূচনালগ্ন থেকে এ দেশের মানুষের খাদ্যনিরাপত্তা ও অর্থনীতির অন্যতম ভিত্তি হিসেবে কৃষি খাত তাৎপর্যপূর্ণ অবদান রেখেছে। বিশেষ করে গ্রামীণ অর্থনীতিতে কৃষির অবদান এখনো তুলনামূলক বেশি। এর পরও তিন দশকের বেশি সময় ধরে উন্নয়ন আলোচনায় কৃষি খাত একপ্রকার উপেক্ষিত রয়ে গেছে।
ফলে ক্রমেই দেশের অর্থনীতিতে কৃষির অবদান কমেছে ও খাদ্য আমদানি বেড়েছে। চাষাবাদের জন্য প্রয়োজনীয় উপকরণ—যেমন বীজ, সার ইত্যাদি আমদানি এবং কৃষির উৎপাদন ব্যয় বেড়েছে। ব্যয় বাড়লেও কৃষকের আয়ে সে প্রভাব পড়েনি। আজও কৃষক তার ফসলের ন্যায্যমূল্য পান না। প্রতি বছর গণমাধ্যমের বিভিন্ন প্রতিবেদনে ন্যায্যমূল্য না পেয়ে সড়কে ফসল ফেলে কৃষকের প্রতিবাদের কথা উঠে আসে। অনেকেই গৃহপালিত পশুকে ফসল খাওয়ান। এর বাইরেও কৃষি খাতের বড় সংকট হয়ে উঠেছে আবাদযোগ্য জমির পরিমাণ দিন দিন কমে যাওয়া এবং কৃষিজমির পুষ্টিগুণ হ্রাস। এছাড়া ভূমি ব্যবস্থাপনাগত দুর্বলতা, জলবায়ু পরিবর্তজনিত প্রভাবেও কৃষির উৎপাদন ব্যাহত হচ্ছে। অন্যদিকে কৃষি শ্রমিকের সংকটও তৈরি হচ্ছে। আর এসব কারণে দেশের ক্রমবর্ধমান জনগণের খাদ্যনিরাপত্তা ঘিরে উদ্বেগ বেড়ে চলেছে।
কৃষি খাতের এসব নানামুখী সংকটের পেছনে মূলত রয়েছে সরকারি উদ্যোগের ঘাটতি। নানা সময়ে দেশের শাসন ক্ষমতায় থাকা সরকার ও নীতিনির্ধারকরা পর্যাপ্ত মনোযোগ দেয়নি এ খাতে। কৃষির সম্প্রসারণে ভূমিকা রাখবে এমন নীতি সেভাবে নেয়া হয়নি। অথচ বিশ্বের অনেক সীমিত কৃষিজমির দেশ কৃষি উৎপাদনে তালিকার শীর্ষে রয়েছে। এসব দেশ কৃষিবান্ধব নীতি, কৃষিতে আধুনিক প্রযুক্তির ব্যবহার, প্রিসিশন ফার্মিং, হাই-টেক গ্রিনহাউজ কৃষি ইত্যাদি উপায়ে কৃষির উৎপাদন কাঙ্ক্ষিত পর্যায়ে নিয়ে গেছে। এমনকি অনেক কৃষিপণ্য রফতানিতেও তুলনামূলক এগিয়ে গেছে। এসব ক্ষেত্রে জাপান, নেদারল্যান্ডস, দক্ষিণ কোরিয়া, ভিয়েতনামের কথা বলা যায়। আবার অনেক দেশ ভূমি সংস্কারের মাধ্যমে কৃষিকে এগিয়ে নিয়ে গেছে। মেক্সিকো, সোভিয়েত ইউনিয়ন, চীন, দক্ষিণ কোরিয়া, জাপানসহ বহু দেশে ভূমি সংস্কারের মাধ্যমে কৃষকের ভূমি মালিকানার অধিকার নিশ্চিত করা হয়েছে এবং কৃষি খাত দেশগুলোর অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির অন্যতম চালিকাশক্তি হয়ে উঠেছে। কিন্তু বাংলাদেশের কৃষি খাতে এর বিপরীত চিত্রই দেখা যায়।
অন্তর্বর্তী সরকারও দায়িত্ব নেয়ার পর কৃষিবান্ধব কোনো কার্যকর ব্যবস্থা গড়ে তুলতে পারেনি। এমনকি অনেক ক্ষেত্রে কৃষির উন্নয়নে দৃশ্যমান কোনো উদ্যোগও নেয়া হয়নি। এদিকে ত্রয়োদশ নির্বাচনের সময়সীমা ঘনিয়ে আসছে। এ সরকারের পক্ষে আর কোনো পদক্ষেপ নেয়া সম্ভব বলে প্রতীয়মান হয় না। তবে আগামীতে নির্বাচিত সরকারের অগ্রাধিকারে কৃষিকে রাখা সমীচীন হবে। কৃষিবান্ধব পরিবেশ তৈরি করা না গেলে অর্থনীতিতে চাপ আরো বাড়বে। খাদ্যনিরাপত্তার ঝুঁকি বেড়ে যাবে। আর এমন পরিস্থিতি তৈরি হলে দেশ পরিচালনা করা সরকারের জন্যই বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে উঠবে।
বণিক বার্তার প্রতিবেদন থেকে জানা যায়, তিন দশকের বেশি সময় ধরে কৃষি খাতে কোনো সমন্বিত সংস্কার বা পূর্ণাঙ্গ পর্যালোচনা হয়নি। সর্বশেষ ১৯৮৮ ও ১৯৯০ সালে কৃষি খাতে বড় ধরনের পর্যালোচনা করা হয়েছিল। কিন্তু এরপর থেকে বিশ্ব কৃষি ব্যবস্থায় আমূল পরিবর্তন এসেছে। প্রযুক্তিনির্ভর চাষাবাদ, ডিজিটাল কৃষি, ভ্যালু চেইন উন্নয়ন—এসব ক্ষেত্রে দক্ষিণ ও দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার বহু দেশ সাফল্য অর্জন করেছে। যদিও বাংলাদেশ এখনো অনেক ক্ষেত্রে পুরনো কৃষি কাঠামোয় আটকে আছে। ফলে জনসংখ্যার অনুপাতে খাদ্যশস্যের উৎপাদন সেভাবে বাড়ছে না। যুক্তরাষ্ট্রের কৃষি বিভাগের তথ্য অনুযায়ী, ২০১৪-১৫ অর্থবছরে দেশে ধানের আবাদ হয়েছিল ১ কোটি ১৭ লাখ ৯০ হাজার হেক্টর জমিতে।
২০২০-২১ অর্থবছরে তা কমে দাঁড়ায় ১ কোটি ১৫ লাখ হেক্টরে। আর সর্বশেষ ২০২৪-২৫ অর্থবছরে আবাদকৃত জমি ১ কোটি ১৪ লাখ হেক্টরে নেমে আসে। অর্থাৎ সর্বশেষ পাঁচ বছরে আবাদকৃত জমির পরিমাণ কমেছে প্রায় ২ শতাংশ। এর বিপরীতে পাঁচ বছরে হেক্টরপ্রতি ফলন বেড়েছে কেবল ৪ শতাংশ। আর চাল উৎপাদন মাত্র ২ শতাংশ বেড়েছে। যদিও দেশের জনগণের প্রধান খাদ্যশস্য ধান তথা চাল। আর বর্তমানে জনসংখ্যা ১৭ কোটির বেশি। এমন পরিস্থিতি জানান দিচ্ছে যে খাদ্যনিরাপত্তা কতটা ঝুঁকিতে রয়েছে। শুধু তাই নয়, পর্যাপ্ত উৎপাদনের অভাবে সরবরাহ শৃঙ্খলেও বিঘ্ন ঘটেছে। যার ফলে নানা সময়ে চালসহ নিত্যপণ্যের বাজারে অস্থিরতা দেখা দিয়েছে। এর প্রভাবে মূল্যস্ফীতিও ঊর্ধ্বমুখী হয়েছে, যা জনজীবন ও অর্থনীতিতে নানামুখী চাপ বাড়িয়েছে।
এমন পরিস্থিতিতে কৃষকের ঝুঁকিও বেড়েছে। বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর (বিবিএস) এক প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছিল, দেশে কৃষির ওপর নির্ভরশীল প্রায় ২৬ দশমিক ৫ শতাংশ পরিবার খাদ্যনিরাপত্তাহীনতায় ভুগছে। এ কারণে বর্তমানে সবচেয়ে ঝুঁকিপূর্ণ পেশা হিসেবে কৃষি খাতকে চিহ্নিত করা হয়। বিবিএসের শ্রমশক্তি জরিপে দেখা গেছে, ২০২৩ সালের জানুয়ারি থেকে ডিসেম্বর পর্যন্ত সময়ে কৃষিকাজ ছেড়েছেন ১৫ লাখ ৮০ হাজার মানুষ। কৃষকদের দুর্দশা যদি লাঘব না করা যায় তবে আশঙ্কা রয়েছে, সামনে আরো কৃষক কৃষিকাজ ছেড়ে অন্য পেশায় নিজেকে নিয়োজন করবেন।
অন্যদিকে খাদ্যশস্য, বিশেষত ধান ও গমের মতো প্রধান খাদ্যসশ্যের আমদানিও বেড়েছে। ২০২৩-২৪-এর তুলনায় গত অর্থবছরে দেশে খাদ্যশস্য আমদানি বেড়েছে। বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্যমতে, ২০২৩-২৪ অর্থবছরে চাল ও গম আমদানিতে ব্যয় হয় ২০৬ কোটি ডলার। পরের অর্থবছরে তা ১২ দশমিক ১ শতাংশ বেড়ে দাঁড়িয়েছে ২৩০ কোটি ৬০ লাখ ডলারে।
এমন পরিস্থিতি থেকে কৃষি ও কৃষকের সুরক্ষায় ও জনগণের খাদ্যনিরাপত্তায় রাষ্ট্রকে দায়িত্ব নিতে হবে। সরকারকে আন্তরিক হতে হবে। কীভাবে আমদানি প্রবণতা কমিয়ে কৃষি উৎপাদন বাড়ানো যায় সেই কৌশল নেয়া প্রয়োজন। এক্ষেত্রে একটি পূর্ণাঙ্গ কৃষি সংস্কার কমিশন গঠন করা যেতে পারে। এ কমিশনের কাজ হবে মাঠপর্যায় থেকে জাতীয় পর্যায় পর্যন্ত কৃষি খাতের কাঠামোগত সমস্যা চিহ্নিত করা এবং সময়োপযোগী সুপারিশ দেয়া। এছাড়া কৃষিতে বিনিয়োগ ও গবেষণা বাড়াতে হবে। এজন্য কৃষি গবেষণা প্রতিষ্ঠানগুলোকে আরো কার্যকর করে তোলা প্রয়োজন। কীভাবে কৃষি উপকরণে দেশীয় সক্ষমতা বাড়ানো যায়, গবেষণায় সেদিকে গুরুত্ব দিতে হবে। এগুলো ছাড়া কৃষির উৎপাদন কাঙ্ক্ষিত মাত্রায় বাড়ানো কঠিন হয়ে উঠবে। সূত্র: বণিক বার্তা

