অর্থনীতির চাপ এবং রাজস্ব ব্যবস্থার দুর্বলতার কারণে সরকারি খরচ চালাতে আয়ের বড় অংশে টান পড়েছে। এর প্রভাব স্পষ্ট হয়ে উঠেছে রাজস্ব আদায়ে। চলতি অর্থবছরের মাঝপথে জাতীয় রাজস্ব বোর্ড (এনবিআর) বড় ঘাটতির মুখে পড়েছে।
২০২৫-২৬ অর্থবছরের প্রথম ছয় মাসে (জুলাই-ডিসেম্বর) লক্ষ্যমাত্রার তুলনায় রাজস্ব আদায় কমেছে প্রায় ৪৬ হাজার কোটি টাকা। এনবিআরের ঊর্ধ্বতন এক কর্মকর্তা জানান, সামগ্রিক অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডের ধীরগতি রাজস্ব আদায়ের কম হওয়ার মূল কারণ। তবে বছরের শেষ দিকে আমদানি ও কর পরিশোধের চাপ বাড়ে। তাই আয় বাড়াতে করের আওতা সম্প্রসারণ, কর পরিপালন বাড়ানো এবং অটোমেশন জোরদারের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।
এনবিআরের হিসাব অনুযায়ী, ছয় মাসে মোট রাজস্ব আদায় হয়েছে ১ লাখ ৮৫ হাজার ২২৫ কোটি টাকা। একই সময়ে লক্ষ্যমাত্রা ছিল ২ লাখ ৩১ হাজার ২০৫ কোটি ৩৭ লাখ টাকা। ফলে ঘাটতি দাঁড়িয়েছে ৪৫ হাজার ৯৮০ কোটি ৩৭ লাখ টাকায়, যা লক্ষ্যের প্রায় ১৯.৮৮ শতাংশ কম। তবে পুরো চিত্র স্থবির নয়। আগের অর্থবছরের একই সময়ের তুলনায় রাজস্ব আদায়ে কিছুটা বৃদ্ধি দেখা গেছে। ২০২৪-২৫ অর্থবছরের জুলাই-ডিসেম্বর সময়ে আদায় হয়েছিল ১ লাখ ৬২ হাজার ২০৯ কোটি ১২ লাখ টাকা। অর্থাৎ ছয় মাসে প্রবৃদ্ধি হয়েছে ১৪.১৯ শতাংশ।
অর্থনীতিবিদরা মনে করছেন, এই প্রবৃদ্ধি থাকলেও তা লক্ষ্যমাত্রা পূরণে যথেষ্ট নয়। ধীরগতির অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ড, সীমিত করজাল এবং রাজস্ব প্রশাসনের কাঠামোগত দুর্বলতা কারণে প্রত্যাশিত রাজস্ব আদায় হচ্ছে না। এছাড়া অর্থবছরের মাঝপথে লক্ষ্যমাত্রা হঠাৎ বাড়িয়ে দেয়ায় বাস্তবতার সঙ্গে ব্যবধান আরও স্পষ্ট। তবে সংশ্লিষ্টরা মনে করেন, নির্বাচনের পর বিনিয়োগ ও ব্যবসায়িক তৎপরতা বাড়লে রাজস্ব আহরণে কিছুটা গতি আসতে পারে।
চলতি অর্থবছরের শুরুতে এনবিআরের রাজস্ব লক্ষ্যমাত্রা ছিল ৪ লাখ ৯৯ হাজার কোটি টাকা। পরে ১০ নভেম্বর বাজেট মনিটরিং ও সম্পদ কমিটি তা ৫ লাখ ৫৪ হাজার কোটি টাকায় বৃদ্ধি করে। এই বাড়তি লক্ষ্যমাত্রা পূরণ করাই এখন এনবিআরের বড় চ্যালেঞ্জ।
রাজস্ব ঘাটতি প্রধান তিন খাতে স্পষ্ট। ছয় মাসে ভ্যাট থেকে আদায় হয়েছে ৭০ হাজার ৪৯১ কোটি ২৪ লাখ টাকা, যেখানে লক্ষ্যমাত্রা ছিল ৮০ হাজার ৭৯৯ কোটি টাকা। ফলে ঘাটতি ১০ হাজার ৩০৭ কোটি ৭৬ লাখ টাকা। আয়কর খাতে আদায় হয়েছে ৬১ হাজার ৮৭৩ কোটি ২০ লাখ টাকা, লক্ষ্যমাত্রার তুলনায় ঘাটতি ২৩ হাজার ৫৩২ কোটি ৩২ লাখ টাকা। শুল্ক বা কাস্টমস খাতে আদায় হয়েছে ৫২ হাজার ৮৬০ কোটি ৫৬ লাখ টাকা, যেখানে লক্ষ্যমাত্রা ছিল ৬৫ হাজার কোটি ৮৫ লাখ টাকা। ঘাটতি হয়েছে ১২ হাজার ১৪০ কোটি ২৯ লাখ টাকা।
বেসরকারি গবেষণাপ্রতিষ্ঠান সিপিডির নির্বাহী পরিচালক ড. ফাহমিদা খাতুন বলেন, রাজস্ব ব্যবস্থায় দীর্ঘদিন ধরে কাঠামোগত সমস্যা রয়েছে। করযোগ্য জনগোষ্ঠীর তুলনায় কার্যকর করদাতার সংখ্যা কম, প্রশাসনিক দক্ষতা ও প্রযুক্তিগত সক্ষমতাও সীমিত। ব্যবসা-বাণিজ্যের ব্যয় বেড়ে যাওয়ায় এবং বিনিয়োগ কমে যাওয়ায় কর সংগ্রহে প্রভাব পড়েছে। রাজস্ব বাড়াতে স্বল্পমেয়াদি উদ্যোগ নয়, বরং এনবিআরের প্রাতিষ্ঠানিক সংস্কার, অটোমেশন জোরদার এবং কর ফাঁকি রোধে কার্যকর পদক্ষেপ প্রয়োজন।

