দেশের ব্যাংকিং খাত বর্তমানে তীব্র কাঠামোগত চাপে রয়েছে এবং এই খাতের অর্থবহ সংস্কার স্বল্প সময়ের মধ্যে সম্পন্ন করা বাস্তবসম্মত নয় বলে মন্তব্য করেছেন অর্থ উপদেষ্টা ড. সালেহউদ্দিন আহমেদ। তিনি বলেন, দীর্ঘদিন ধরে জমে ওঠা জটিল সমস্যাগুলোর সমাধান কয়েক মাসে সম্ভব নয়।
বৃহস্পতিবার (২২ জানুয়ারি) রাজধানীর একটি হোটেলে মিউচুয়াল ট্রাস্ট ব্যাংক (এমটিবি) ও ফিন্যান্সিয়াল এক্সপ্রেসের যৌথ উদ্যোগে আয়োজিত ‘ব্যাংকিং খাতের সংস্কার’ শীর্ষক গোলটেবিল বৈঠকে তিনি এসব কথা বলেন।
অর্থ উপদেষ্টা জানান, ব্যাংকিং খাত এখন নিঃসন্দেহে চ্যালেঞ্জিং অবস্থার মধ্য দিয়ে যাচ্ছে। অনেক ব্যাংক দুর্বল হয়ে পড়েছে। আইন ও বিধি প্রায়ই উপেক্ষিত হচ্ছে। বহু ক্ষেত্রে ব্যাংকের মালিকপক্ষ নিজেরাই নিয়ম-নীতির তোয়াক্কা না করে ব্যবস্থাপনা নিয়ন্ত্রণ করছে। এতে খাতটির ভেতরে শৃঙ্খলা ভেঙে পড়ছে।
তিনি বলেন, গত ১৫ বছরে যেসব সমস্যা তৈরি হয়েছে, সেগুলো মাত্র ১৪ থেকে ১৬ মাসে সমাধান করা সম্ভব নয়। সংকটগুলো গভীর এবং একে অপরের সঙ্গে জড়িত।
বাংলাদেশ ব্যাংকের স্বায়ত্তশাসন প্রসঙ্গে ড. সালেহউদ্দিন বলেন, কেন্দ্রীয় ব্যাংকের কার্যক্রম পরিচালনায় স্বাধীনতা প্রয়োজন। তবে জবাবদিহিতা ছাড়া পূর্ণ স্বাধীনতা বাস্তবসম্মত নয়। কোনো কেন্দ্রীয় ব্যাংক রাষ্ট্রের সার্বভৌমত্বের ঊর্ধ্বে কাজ করতে পারে না। স্বায়ত্তশাসনের সঙ্গে অবশ্যই জবাবদিহিতা থাকতে হবে।
আন্তর্জাতিক মূল্যায়নের কথা তুলে ধরে তিনি জানান, সাম্প্রতিক বৈশ্বিক প্রতিবেদনগুলোতে অবৈধ অর্থ পাচার, বাণিজ্য-সংশ্লিষ্ট অপরাধ এবং উচ্চ মূল্যস্ফীতিকে বাংলাদেশের মতো দেশের জন্য বড় ঝুঁকি হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে। এসব বিষয় সরাসরি ব্যাংকিং ব্যবস্থার স্থিতিশীলতায় প্রভাব ফেলে। এ কারণে অর্থ মন্ত্রণালয়ের সহায়তায় কেন্দ্রীয় ব্যাংককে এসব সমস্যা মোকাবিলায় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা নিতে হবে।
অডিট ব্যবস্থার দুর্বলতার কথাও তুলে ধরেন অর্থ উপদেষ্টা। তিনি বলেন, অনেক চার্টার্ড অ্যাকাউন্টিং ফার্ম যথাযথ যাচাই-বাছাই ছাড়াই অডিট রিপোর্টে সই করেছে। কেউ কেউ আগের তারিখ দিয়ে বা প্রশ্নবিদ্ধ প্রতিবেদনে স্বাক্ষর করেছেন। এতে আর্থিক শৃঙ্খলা মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। ইতোমধ্যে কয়েকটি অডিট ফার্মকে কালো তালিকাভুক্ত করা হয়েছে বলেও জানান তিনি।
তিনি বলেন, অনিয়ম শুধু ব্যাংকিং খাতে সীমাবদ্ধ নয়। উচ্চশিক্ষাসহ আরও কিছু খাতের বড় অঙ্কের আর্থিক কার্যক্রমও দীর্ঘদিন ধরে যথাযথ অডিটের বাইরে থেকে যাচ্ছে।
আইনি সংস্কার প্রসঙ্গে ড. সালেহউদ্দিন জানান, সরকার সম্প্রতি নেগোশিয়েবল ইন্সট্রুমেন্টস অ্যাক্ট এবং হাউজ বিল্ডিং ফাইন্যান্স কর্পোরেশন অ্যাক্ট সংশোধন করেছে। পাশাপাশি মানি লন্ডারিং প্রতিরোধ আইন ও অর্থ ঋণ আদালত আইন সংশোধনের কাজ চলছে। তবে সময়ের স্বল্পতা বড় বাধা হয়ে দাঁড়িয়েছে বলে তিনি স্বীকার করেন।
তিনি বলেন, সময় খুবই কম। তারপরও যতটুকু সম্ভব কাজ শেষ করার চেষ্টা করা হচ্ছে।
বাংলাদেশ ব্যাংকে অতিরিক্ত সংখ্যক ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তার বিষয়েও তিনি কথা বলেন। ব্যাংকের কাঠামোকে আরও যৌক্তিক করতে ইতোমধ্যে প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ নেওয়া হয়েছে বলে জানান তিনি।
এতসব সংকটের মধ্যেও আন্তর্জাতিক অঙ্গনে বাংলাদেশের ভাবমূর্তি এখনো পুরোপুরি নষ্ট হয়নি বলে মন্তব্য করেন অর্থ উপদেষ্টা। তিনি বলেন, বিদেশি অংশীদারদের দৃষ্টিতে বাংলাদেশ ভেঙে পড়ছে—এমন ধারণা নেই। তবে উন্নয়ন সহযোগীরা বর্তমান পরিস্থিতিকে কঠিন বলে মনে করছেন।
ব্যাংকিং খাতের সংস্কারকে অর্থনীতির জন্য অপরিহার্য উল্লেখ করে ড. সালেহউদ্দিন বলেন, এই সুযোগ নষ্ট করা উচিত হবে না। এখন সব সংস্কার শেষ করা না গেলে পরবর্তী সরকারকে তা এগিয়ে নিতে হবে। ব্যাংকিং খাতের গুরুত্ব বিবেচনায় এই সংস্কারে বিলম্বের কোনো সুযোগ নেই।
গোলটেবিল বৈঠকে বিশেষ অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন বাংলাদেশ ব্যাংকের গভর্নর ড. আহসান এইচ মনসুর। অনুষ্ঠানে মূল প্রবন্ধ উপস্থাপন করেন বাংলাদেশ ইনস্টিটিউট অব ব্যাংক ম্যানেজমেন্টের অধ্যাপক ড. শাহ মো. আহসান হাবিব।

