সরকার ঢাকার মন্ত্রিপাড়ায় তিনটি নতুন ভবন নির্মাণের পরিকল্পনা করেছে। এসব ভবনে মোট ৭২টি ফ্ল্যাট থাকবে। প্রতিটি ফ্ল্যাটের আয়তন হবে ৮ হাজার ৫০০ থেকে ৯ হাজার ৩০ বর্গফুট। প্রকল্পের খরচ ধরা হয়েছে ৭৮৬ কোটি টাকা।
মন্ত্রিপাড়া হিসেবে পরিচিত বেইলি রোড, মিন্টো রোড ও হেয়ার রোড। নতুন ভবনগুলো হবে বেইলি রোড ও মিন্টো রোডে। এই প্রকল্পে মন্ত্রী, প্রতিমন্ত্রী, উপমন্ত্রী ও সাংবিধানিক সংস্থার প্রধানসহ সরকারের গুরুত্বপূর্ণ কর্মকর্তাদের জন্য আবাসন নিশ্চিত করা হবে। বর্তমানে মন্ত্রিপাড়ায় ১৫টি বাংলোবাড়ি রয়েছে। বেইলি রোডে তিনটি মিনিস্টার্স অ্যাপার্টমেন্ট আছে। প্রতিটি ভবনে ১০ থেকে ৩০টি ফ্ল্যাট আছে। প্রতিটি ফ্ল্যাটের আয়তন সাড়ে ৫ হাজার বর্গফুট। এছাড়া গুলশান ও ধানমন্ডিতেও মন্ত্রিদের আবাসনের ব্যবস্থা আছে।
সরকারি আবাসন পরিদপ্তর জানিয়েছে, ঢাকায় মন্ত্রিদের জন্য মোট ৭১টি বাংলোবাড়ি ও ফ্ল্যাট চিহ্নিত রয়েছে। ফলে মন্ত্রিদের আবাসনের কোনো তেমন সংকট নেই। তবুও কেন নতুন ৭২টি ফ্ল্যাটের পরিকল্পনা করা হলো, জানতে চাইলে গণপূর্ত মন্ত্রণালয়ের অতিরিক্ত সচিব আব্দুল মতিন বলেন, ২০২৪ সালের ৫ আগস্টের পর অনেক বাংলো ও ফ্ল্যাট খালি ছিল। সেখানে সাংবিধানিক পদে থাকা ব্যক্তিরা থাকেন। তবে মন্ত্রিপাড়ায় তাদের থাকার অনুমতি দিয়েছে সরকার।
সুপ্রিম কোর্টের জ্যেষ্ঠ আইনজীবী শাহদীন মালিক বলেন, দেশের চার কোটি মানুষ দরিদ্র। সেই দেশের মন্ত্রিদের জন্য বিশাল ফ্ল্যাট নির্মাণ বেমানান। তিনি আরও বলেন, নির্বাহী বিভাগের নীতিনির্ধারক ও সাংবিধানিক সংস্থার কর্মকর্তাদের একই ভবনে থাকা প্রভাবের সুযোগ বাড়াতে পারে।
নতুন প্রকল্পে প্রতিটি ভবনে সুইমিংপুল, ব্যায়ামাগার ও কমিউনিটি স্পেস থাকবে। সুইমিংপুলের সরঞ্জাম কেনার জন্য প্রস্তাবিত বাজেট তিন কোটি টাকা। তবে ৮ জানুয়ারি সচিবালয়ে অনুষ্ঠিত সভায় এর পরিচালনা ও রক্ষণাবেক্ষণের খরচ নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে। এছাড়া আসবাব ও পর্দা কেনার জন্য ২০ কোটি টাকা বরাদ্দের প্রস্তাব করা হয়েছে।
প্রকল্পটি গণপূর্ত অধিদপ্তর বাস্তবায়ন করবে। পরিকল্পনা অনুযায়ী বেইলি রোডের দুটি ভবনে ৩৬টি ফ্ল্যাট থাকবে। প্রতিটি ফ্ল্যাটের আয়তন ৯ হাজার ৩০ বর্গফুট। মিন্টো রোডের ভবনে ৩৬টি ফ্ল্যাট হবে, প্রতিটির আয়তন সাড়ে ৮ হাজার বর্গফুট। বড় ফ্ল্যাটগুলো মন্ত্রিদের বরাদ্দ থাকবে, বাকিগুলোতে প্রতিমন্ত্রী, উপমন্ত্রী ও সাংবিধানিক পদে থাকা কর্মকর্তারা থাকবেন। কিছু ফ্ল্যাট অফিস হিসেবেও ব্যবহার করা যাবে।
রাজধানীর উচ্চমধ্যবিত্ত সাধারণত ১,৫০০–২,০০০ বর্গফুটের ফ্ল্যাটে থাকেন। মন্ত্রিদের ফ্ল্যাট এটির ছয়গুণ বড়। সরকারের নিম্নপদের কর্মচারীদের ফ্ল্যাট ৬৫০ বর্গফুট। ফলে মন্ত্রিদের ফ্ল্যাট তাদের বাসার প্রায় ১৪ গুণ। মন্ত্রিপাড়ার বর্তমান ফ্ল্যাটে চারটি শয়নকক্ষ, এক বসার ঘর, অফিস, লিভিং রুম, খাবার ঘর, রান্নাঘর ও ছয়টি শৌচাগার আছে। নিরাপত্তার জন্য পুলিশ ও আনসার সার্বক্ষণিক দায়িত্ব পালন করেন।
জুলাই গণ-অভ্যুত্থানের পর অনেক বাংলো ও ফ্ল্যাট খালি হয়েছিল। সেগুলোতে অন্তর্বর্তী সরকারের উপদেষ্টা ও অন্যান্য গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তিরা উঠেছেন। সরকারি আবাসন পরিদপ্তর জানিয়েছে, সাংবিধানিক পদে থাকা ব্যক্তিদের জন্য আলাদা আবাসনের ব্যবস্থা থাকলেও কেউ কেউ মন্ত্রিপাড়ায় থাকছেন।
টিআইবি নির্বাহী পরিচালক ইফতেখারুজ্জামান বলেন, একই ভবনে নির্বাহী, বিচার বিভাগ ও সাংবিধানিক সংস্থার কর্মকর্তাদের থাকার কোনো আইনগত বাধা নেই। তবে এটি স্বার্থের দ্বন্দ্বমুক্ত ও জবাবদিহিমূলক শাসনের পথে অন্তরায় হতে পারে। তিনি বলেন, নৈতিকতার দিক থেকে এই ব্যবস্থা এড়িয়ে চলাই ভালো।
অর্থনীতিবিদ জাহিদ হোসেন উল্লেখ করেছেন, দেশের অর্থনৈতিক পরিস্থিতি ভালো নয়। শুল্ক-কর আদায়ে ঘাটতি প্রায় ৪৬ হাজার কোটি টাকা। সরকারি কর্মচারীদের বেতন বৃদ্ধি ও বিলাসবহুল ভবন নির্মাণের মতো প্রকল্প নেওয়া সরকারের জন্য সময়ের দাবি নয়। তিনি বলেন, রাজস্ব আদায়ে সরকার অনেক পিছিয়ে। এমন অবস্থায় নতুন বিলাসবহুল ভবন নির্মাণের সিদ্ধান্ত দৃষ্টিকোণ থেকে বিতর্কিত।

