অন্তর্বর্তী সরকার দায়িত্ব নেওয়ার পর গত ১৮ মাসে জাতীয় অর্থনৈতিক পরিষদের নির্বাহী কমিটির (একনেক) ২০টি সভা হয়েছে। এই সভাগুলোতে অনুমোদন পেয়েছে ১৫৩টি নতুন প্রকল্প। এসব উন্নয়ন প্রকল্পের জন্য বরাদ্দ রাখা হয়েছে প্রায় ২ লাখ ১২ হাজার ৫০০ কোটি টাকা।
বরাদ্দের প্রায় ৪২ শতাংশ অর্থই এসেছে চট্টগ্রাম বিভাগে। অন্যদিকে দারিদ্র্যপীড়িত রংপুর বিভাগের জন্য বরাদ্দ এসেছে মাত্র ২.৪৪ শতাংশ। রাজশাহী ও বরিশাল বিভাগের বরাদ্দ আরও কম। রাজশাহীতে বরাদ্দ আছে মাত্র ১.৩৮ শতাংশ, আর বরিশালে ০.৮৬ শতাংশ।
অর্থনৈতিকভাবে পিছিয়ে থাকা ময়মনসিংহ বিভাগের জন্য বরাদ্দ হয়েছে মাত্র ৩৭৬ কোটি টাকা, যা মোট বরাদ্দের ০.১৭ শতাংশ। বাংলাদেশ পরিকল্পনা কমিশনের নথিপত্রে এ বিষয়ে অঞ্চলভিত্তিক বৈষম্য স্পষ্টভাবে ফুটে উঠেছে। সংশ্লিষ্টদের মতে, অন্তর্বর্তী সরকারের কয়েকজন উপদেষ্টা চট্টগ্রাম জেলায় থাকায় এই বিভাগে বেশি বরাদ্দ পৌঁছেছে। বিভিন্ন সময়ে মোট ১৩ জন উপদেষ্টা চট্টগ্রাম থেকে ছিলেন। এ কারণে বরাদ্দে আঞ্চলিক প্রভাব পড়েছে কিনা তা নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে।
পরিকল্পনা কমিশনের সাবেক সচিব মো. মামুন আল রশিদ বলেন, ‘শুধু একটি অঞ্চলে বেশি বরাদ্দ দেওয়া বৈষম্য সৃষ্টি করে। বাংলাদেশের সংবিধানের ১৯ অনুচ্ছেদের ১ ও ২ ধারায় সম্পদের সমান সুযোগ এবং সুষম বণ্টনের কথা বলা হয়েছে। তা ব্যত্যয় হলে অসমতা ও বৈষম্য তৈরি হয়। বরাদ্দের ক্ষেত্রে সরকারের উচিত আঞ্চলিকতা নয়, প্রকৃত প্রয়োজন বিচার করা।’
পরিকল্পনা কমিশনের তথ্য অনুযায়ী, অন্তর্বর্তী সরকার দায়িত্ব নেওয়ার পর ২০টি একনেক সভায় সংশোধিতসহ মোট ২৫১টি প্রকল্প অনুমোদন দেওয়া হয়। এসব প্রকল্পের জন্য মোট বরাদ্দ রাখা হয়েছে ৩ লাখ ৭৮ হাজার ২৫৫ কোটি টাকা। তবে ৯৮টি প্রকল্প ক্ষমতাচ্যুত আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে নেওয়া হয়েছিল। এই প্রকল্পের মেয়াদ বৃদ্ধি ও পুনর্মূল্যায়নের কারণে ১ লাখ ৭০ হাজার ৫২৭ কোটি টাকার ব্যয় বেড়েছে। বাকি ১৫৩টি নতুন প্রকল্প অনুমোদিত হয়েছে অন্তর্বর্তী সরকারের প্রস্তাবে। এ প্রকল্পগুলোর জন্য বরাদ্দ রাখা হয়েছে ২ লাখ ১২ হাজার ৫৮৭ কোটি টাকা।
নথিপত্র বিশ্লেষণে দেখা যায়, অন্তর্বর্তী সরকারের ১৮ মাসে চট্টগ্রাম বিভাগকে কেন্দ্র করে প্রায় ৪০টি প্রকল্প অনুমোদিত হয়েছে। এর মধ্যে ২৯টি নতুন প্রকল্প এবং বাকি সংশোধিত প্রকল্প। নতুন প্রকল্পগুলোর মধ্যে ১১টি শুধুমাত্র চট্টগ্রাম নগরীতে বাস্তবায়ন হবে। এসব প্রকল্পে নিজস্ব অর্থায়নের পাশাপাশি বিদেশি ঋণ নেওয়া হবে।
নতুন প্রকল্পগুলোর মধ্যে অন্যতম হলো ইস্টার্ন রিফাইনারি লিমিটেডের আধুনিকায়ন ও সম্প্রসারণ (ইআরএল-২)। চট্টগ্রামের পতেঙ্গায় তেল পরিশোধন ক্ষমতা বাড়াতে নেওয়া এই প্রকল্পটি বিদেশি ঋণ ছাড়া নিজস্ব অর্থায়নে প্রায় ৩৬ হাজার কোটি টাকায় বাস্তবায়ন করা হবে।
চট্টগ্রাম নগরীর পয়োনিষ্কাশন ব্যবস্থা উন্নয়নে নেওয়া হয়েছে ৫ হাজার ১৫২ কোটি টাকার প্রকল্প। এর মধ্যে জাপান আন্তর্জাতিক সহযোগিতা সংস্থা (জাইকা) ৪ হাজার ১৪৪ কোটি টাকার ঋণ দেবে। কালুরঘাট এলাকায় পয়ঃশোধনাগার নির্মাণের জন্য ভূমি অধিগ্রহণ প্রকল্পে ব্যয় ধরা হয়েছে ২ হাজার ১৫৪ কোটি টাকা। চট্টগ্রাম নগরীর পয়োনিষ্কাশন ব্যবস্থাপনা (প্রথম পর্যায়) প্রকল্পের জন্য ৫ হাজার ২১৯ কোটি টাকা এবং ‘চট্টগ্রাম পানি সরবরাহ উন্নয়ন’ প্রকল্পে ৩ হাজার ৯২১ কোটি টাকা বরাদ্দ রাখা হয়েছে। বিশ্বব্যাংক ৩ হাজার ২৬৮ কোটি টাকা ঋণ দেবে এই প্রকল্পে।
চট্টগ্রাম বিভাগে সরকারি কর্মকর্তাদের আবাসন সুবিধার জন্যও প্রকল্প অনুমোদন দেওয়া হয়েছে। ৩৬টি পরিত্যক্ত বাড়িতে সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারীদের জন্য আবাসিক ফ্ল্যাট নির্মাণ (প্রথম সংশোধিত) প্রকল্প অনুমোদিত হয়েছে। দুটি প্রকল্পের ব্যয় যথাক্রমে ১ হাজার ১৩২ কোটি ও ৩৯৪ কোটি টাকা।
প্রকল্প বরাদ্দে অঞ্চলভিত্তিক বড় ব্যবধান নিয়ে প্রশ্ন করা হলে বাংলাদেশ পরিকল্পনা কমিশনের সচিব এসএম শাকিল আখতার জানান, অন্তর্বর্তী সরকারের প্রকল্পগুলো কোনো অঞ্চল বা ব্যক্তিগত স্বার্থে নেওয়া হয়নি। সব প্রকল্প গ্রহণ করা হয়েছে জাতীয় স্বার্থে।
তিনি বলেন, ‘চট্টগ্রাম শহর দেশের ব্যবসা-বাণিজ্যের বড় হাব। চট্টগ্রাম বন্দরের কারণে নগরীটি অর্থনীতির জন্য গুরুত্বপূর্ণ। তাই অর্থনৈতিক স্বার্থে চট্টগ্রাম, কক্সবাজার ও পার্বত্য অঞ্চলকেন্দ্রিক কিছু প্রকল্প নেওয়া হয়েছে। এর মধ্যে সবচেয়ে বড় প্রকল্প হলো চট্টগ্রামে ইস্টার্ন রিফাইনারির আধুনিকায়ন ও সম্প্রসারণ। বিগত সরকার চট্টগ্রামে ১৪ হাজার কোটি টাকা খরচ করে একটি টানেল নির্মাণ করেছে। কিন্তু সেই টানেল দিয়ে গাড়ি চলাচলে পরিচালন ব্যয়ই ওঠে না। তাই আমরা টানেলটির যথাযথ ব্যবহার নিশ্চিত করতে কক্সবাজার রোডের সঙ্গে সংযুক্ত করে একটি রাস্তা নির্মাণের উদ্যোগ নিয়েছি। চট্টগ্রাম কেন্দ্রিক সব প্রকল্পই জাতীয় স্বার্থে নেওয়া হয়েছে। ব্যক্তির পছন্দ-অপছন্দের কারণে কোনো প্রকল্প গ্রহণ করা হয়নি।’
তিনি আরও জানান, আগের সরকারের কয়েকটি প্রকল্পে সংশোধন আনা হয়েছে। প্রয়োজন বা অর্থনৈতিক উপযোগিতা না থাকা প্রকল্প বাদ দেওয়া হয়েছে। উদাহরণ হিসেবে রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎ কেন্দ্র নির্মাণের রাশিয়ার সঙ্গে চুক্তি দেখান। চুক্তির সময় ডলারের বিনিময় হার ৮৫ টাকা ছিল। বর্তমানে ডলারের মূল্য ১২২ টাকা হওয়ায় পুনর্মূল্যায়নের পর প্রকল্পের ব্যয় ২৬ হাজার কোটি টাকা বেড়ে গেছে। এই কারণে সংশোধিত প্রকল্পের ব্যয় বেড়েছে।
পরিকল্পনা কমিশনের তথ্য অনুযায়ী, অন্তর্বর্তী সরকারের ১৮ মাসে অনুমোদিত নতুন ২ লাখ ১২ হাজার ৫৮৭ কোটি টাকার প্রকল্পের ৮৯ হাজার ২৯৭ কোটি টাকা চট্টগ্রাম বিভাগের জন্য বরাদ্দ হয়েছে। এটি মোট বরাদ্দের ৪২ শতাংশ। দ্বিতীয় স্থানে রয়েছে ঢাকা বিভাগ, যা পেয়েছে ১৯ হাজার ৭১৭ কোটি টাকা বা মোট বরাদ্দের ৯.২৭ শতাংশ। খুলনা বিভাগের প্রকল্পে বরাদ্দ হয়েছে ১৩ হাজার ১২৮ কোটি টাকা বা ৬.১৭ শতাংশ। চতুর্থ স্থানে রয়েছে সিলেট বিভাগ, যার জন্য বরাদ্দ ৫ হাজার ৩৫৪ কোটি টাকা বা ২.৫১ শতাংশ। পঞ্চম স্থানে রংপুর, যেখানে বরাদ্দ হয়েছে ৫ হাজার ১৯০ কোটি টাকা বা ২.৪৪ শতাংশ।
সবচেয়ে পিছিয়ে রয়েছে রাজশাহী, বরিশাল ও ময়মনসিংহ বিভাগ। রাজশাহীর জন্য বরাদ্দ আছে ২ হাজার ৯৩৭ কোটি টাকা বা ১.৩৮ শতাংশ। বরিশাল পেয়েছে ১ হাজার ৮৩৮ কোটি টাকা বা ০.৮৬ শতাংশ। সবচেয়ে কম বরাদ্দ পেয়েছে ময়মনসিংহ বিভাগ, মাত্র ৩৭৬ কোটি টাকা। সর্বমোট, সমগ্র দেশের জন্য নেওয়া প্রকল্পে ৭৪ হাজার ৭৪৯ কোটি টাকা ব্যয় হবে।
বেসরকারি গবেষণা প্রতিষ্ঠান সিপিডির (সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগ) নির্বাহী পরিচালক ড. ফাহমিদা খাতুন বলেন, ‘সরকারের উচিত সব অঞ্চলকে সমান সুযোগ দেওয়া। চট্টগ্রাম দেশের ব্যবসা-বাণিজ্যের প্রধান কেন্দ্র। তাই উন্নয়ন প্রকল্পে বরাদ্দের ক্ষেত্রে চট্টগ্রাম গুরুত্ব পেতে পারে। হয়তো এই কারণেই অন্তর্বর্তী সরকার বরাদ্দ বেশি দিয়েছে।’
গত ১৮ মাসে অন্তর্বর্তী সরকার নেওয়া নতুন প্রকল্পের মধ্যে সবচেয়ে বড় বরাদ্দ রাখা হয়েছে চট্টগ্রামের ইস্টার্ন রিফাইনারি লিমিটেডের আধুনিকায়ন ও সম্প্রসারণ (ইআরএল-২) প্রকল্পে। এ প্রকল্পের ব্যয় ধরা হয়েছে ৩৫ হাজার ৪৬৫ কোটি টাকা। বিদেশী ঋণ নেওয়ার চেষ্টা ব্যর্থ হওয়ায় সম্পূর্ণ সরকারি অর্থায়নে এটি বাস্তবায়ন হবে। প্রকল্পটি চট্টগ্রামের পতেঙ্গায় ইস্টার্ন রিফাইনারি লিমিটেডের পাশেই স্থাপিত হবে। তবে সংশ্লিষ্টরা প্রশ্ন তুলেছেন, একই সক্ষমতার তেল পরিশোধনাগারের খরচ আফ্রিকার জাম্বিয়া ও অ্যাঙ্গোলা সরকারের প্রকল্পের তুলনায় অনেক বেশি।
অন্তর্বর্তী সরকার বাস্তবায়নের জন্য বিশ্বব্যাংক, এডিবি, আইডিবি, জাইকা, ইউনিসেফের মতো দাতা সংস্থা থেকে ঋণ নিচ্ছে। চট্টগ্রামে অনুমোদিত একটি বড় প্রকল্প হলো ‘বে টার্মিনাল মেরিন ইনফ্রাস্ট্রাকচার ডেভেলপমেন্ট প্রজেক্ট (বিটিএমআইডিপি)’। প্রকল্পটির ব্যয় ধরা হয়েছে ১৩ হাজার ৫২৫ কোটি ৫৭ লাখ টাকা, যা পুরোপুরি বিশ্বব্যাংকের ঋণ থেকে অর্থায়ন হবে।
পরিকল্পনা উপদেষ্টা ড. ওয়াহিদউদ্দিন মাহমুদ বলেন, ‘ঋণ নেয়ার আগে নিজেদের অর্থায়নে প্রকল্প করা উচিত। যদি তা সম্ভব না হয়, তখন ঋণ নেওয়া যেতে পারে। যে প্রকল্প বিনিয়োগ এবং কর্মসংস্থান সৃষ্টি করবে, সেগুলোই নেওয়া উচিত। ঋণনির্ভরতা কমানোই লক্ষ্য। পরবর্তী সরকারও যেন নিজস্ব অর্থায়নে প্রকল্প নেয়।’
চট্টগ্রামের কালুরঘাটে কর্ণফুলী নদীর ওপর একটি রেল-কাম-রোড সেতু নির্মাণের জন্য ১১ হাজার ৫৬০ কোটি টাকার প্রকল্প অনুমোদন হয়েছে। এর মধ্যে ৭ হাজার ১২৫ কোটি টাকা ঋণ দিচ্ছে দক্ষিণ কোরিয়া। প্রকল্পটি ২০১৮ সালে ১ হাজার ১৬৩ কোটি টাকায় অনুমোদিত হয়েছিল। অর্থাৎ বর্তমান অনুমোদন পূর্বের চেয়ে প্রায় ১০ গুণ বেশি।
অন্তর্বর্তী সরকারের সর্বশেষ একনেকে চট্টগ্রাম বিভাগের কুমিল্লা জেলার গুরুত্বপূর্ণ গ্রামীণ অবকাঠামো উন্নয়ন প্রকল্প অনুমোদন পেয়েছে। প্রকল্পটির ব্যয় ধরা হয়েছে ১ হাজার ৫০০ কোটি টাকা। জানা গেছে, এটি সাবেক একজন উপদেষ্টার দায়িত্বকালে নেয়া হয়েছিল, যার বাড়ি সংশ্লিষ্ট জেলায়।

