সুশাসন, তদারকি ও গ্রাহক আস্থা বৃদ্ধি পেলে দেশের ব্যাংকের সুদহার কমে আসবে। এজন্য খেলাপি ঋণ কমানো জরুরি, তখন মূল্যস্ফীতিও নিয়ন্ত্রণে আসবে। এমন মন্তব্য করেছেন বাংলাদেশ ব্যাংকের গভর্নর ড. আহসান এইচ মনসুর।
রাজধানীর বনানীর হোটেল শেরাটনে গতকাল এক গোলটেবিল বৈঠকে প্রধান অতিথির বক্তব্যে তিনি এসব কথা বলেন। ‘স্বল্পোন্নত দেশ (এলডিসি) থেকে বাংলাদেশের উত্তরণ ব্যাংক খাতে কী প্রভাব ফেলতে পারে’ শীর্ষক এই বৈঠকের আয়োজন করে ইন্টারন্যাশনাল চেম্বার অব কমার্স, বাংলাদেশ (আইসিসিবি)। অনুষ্ঠানটি সঞ্চালনা করেন সংগঠনের সভাপতি মাহবুবুর রহমান।
বৈঠকে উপস্থিত ছিলেন আইসিসিবির সহসভাপতি ও হা-মীম গ্রুপের ব্যবস্থাপনা পরিচালক এ কে আজাদ, ট্রান্সকমের গ্রুপ চিফ এক্সিকিউটিভ অফিসার ও এসকেএফ ফার্মাসিউটিক্যালসের ব্যবস্থাপনা পরিচালক সিমিন রহমান, প্লামি ফ্যাশনসের ব্যবস্থাপনা পরিচালক মো. ফজলুল হক, মিউচুয়াল ট্রাস্ট ব্যাংকের ব্যবস্থাপনা পরিচালক সৈয়দ মাহবুবুর রহমান, প্রাইম ব্যাংকের ব্যবস্থাপনা পরিচালক হাসান ও. রশিদ, পিকার্ড বাংলাদেশের উপব্যবস্থাপনা পরিচালক অমৃতা মাকিন ইসলাম এবং বাংলাদেশ অ্যাসোসিয়েশন অব ব্যাংকসের (বিএবি) চেয়ারম্যান আবদুল হাই সরকার। বৈঠকে মূল প্রবন্ধ উপস্থাপন করেন বাংলাদেশ ইনস্টিটিউট অব ব্যাংক ম্যানেজমেন্টের (বিআইবিএম) অধ্যাপক ড. শাহ মো. আহসান হাবিব।
গভর্নর আহসান এইচ মনসুর বলেন, “বর্তমান সরকারের অর্জনগুলো ভবিষ্যতে ধরে রাখার জন্য বিভিন্ন চুক্তি করার চেষ্টা করছে, এতে কোনো ভুল নেই। তবে অনেক সময় ব্যবসায়ী সংগঠনগুলো সঠিক ভূমিকা পালন করতে ব্যর্থ হয়েছে। সরকার যখন সুদের হার ৬ থেকে ৯ শতাংশ নির্ধারণ করেছিল, তখন তারা প্রতিবাদ না করে প্রশংসা করেছে। ফলস্বরূপ পুরো ব্যবস্থাটি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে।”
তিনি স্বীকার করেন, দেশে সুদহার বেশি। “দেশ থেকে ২০ বিলিয়ন ডলার পাচার হয়েছে। এর ফলে খেলাপি ঋণ বেড়েছে। আমানতের প্রবৃদ্ধি কমে ৬ শতাংশে নেমেছিল, যা এখন ১১ শতাংশে উঠেছে। এর প্রভাব পড়েছে সুদের হারে।” গভর্নর আরও বলেন, “এলডিসি থেকে উত্তরণ আজ বা কাল ঘটবেই। তাই বাংলাদেশকে সোমালিয়া, দক্ষিণ সুদান বা আফগানিস্তানের সঙ্গে তুলনা করা ঠিক নয়। জিডিপি সহ উন্নয়নের সব সূচকে আমরা অনেক এগিয়ে আছি।”
তিনি মনে করেন, এলডিসি উত্তরণের জন্য কোনো আলাদা নীতিমালা প্রয়োজন নেই। দেশব্যাপী উন্নয়ন, মানুষের জীবনযাত্রার মান বৃদ্ধি এবং আর্থিক খাত শক্তিশালী করা, এ সবই উত্তরণের মূল হাতিয়ার। সঙ্গে যোগ করতে হবে রফতানি পণ্যের বহুমুখীকরণ। “এ সবের জন্য প্রথম ও প্রধান শর্ত হলো সামষ্টিক অর্থনীতির স্থিতিশীলতা বজায় রাখা। মূল্যস্ফীতি ১২ শতাংশ থেকে কমে ৮ শতাংশ হয়েছে। সময় দিলে এটিকে ৩–৪ শতাংশে নামানো সম্ভব,” জানান গভর্নর। বৈঠকে বক্তারা জানান, এলডিসি উত্তরণের পর দেশের ব্যাংক খাত বড় চ্যালেঞ্জের মুখে পড়বে। ব্যবসায়ী নেতারা উত্তরণ পিছিয়ে দেওয়ার পক্ষে বিভিন্ন যুক্তি তুলে ধরেন।
আইসিসিবির সহসভাপতি ও হা-মীম গ্রুপের চেয়ারম্যান এ কে আজাদ বলেন, “শুধু মুদ্রানীতি কঠোর করলেই মূল্যস্ফীতি কমে না। এর সঙ্গে রাজস্ব আহরণের বিষয়ও জড়িত।” তিনি বলেন, “মুদ্রানীতি কঠোর করার ফলে ইতিমধ্যে ১২ লাখ মানুষ চাকরি হারিয়েছে। চলমান পরিস্থিতি থাকলে আগামী ছয় মাসে আরও ১২ লাখ মানুষ কাজ হারাতে পারে। বর্তমানে ব্যাংক থেকে বেসরকারি খাতের ঋণের হার মাত্র ৬ শতাংশ, যেখানে সরকার নিজেই ২৭ শতাংশ ঋণ নিয়েছে। আগামী ছয় মাসে এটি ৩২ শতাংশে পৌঁছতে পারে। নতুন বিনিয়োগ হচ্ছে না, রাজস্ব আহরণও পর্যাপ্ত নয়। শুধু মুদ্রানীতি কঠোর করে সংকট মোকাবেলা সম্ভব নয়।”
আইসিসিবির সভাপতি মাহবুবুর রহমান বলেন, “এলডিসি উত্তরণ শুধু উদযাপনের বিষয় নয়, এটি একটি কাঠামোগত পরিবর্তন। এতে বাংলাদেশ ধীরে ধীরে শুল্কমুক্ত বাজার, সহজ ঋণ ও নীতিগত ছাড়ের সুবিধা হারাবে। বিশেষ করে আর্থিক খাতে নতুন চাপ তৈরি হবে।” আইসিসিবির চেয়ারম্যান মুহাম্মদ এ (রুমী) আলী বলেন, “ব্যাংক খাতে এলডিসি উত্তরণের ঝুঁকি নিয়ে এখনও পর্যাপ্ত আগাম আলোচনা ও প্রস্তুতি দেখা যাচ্ছে না।”

