ভারত ও ইউরোপীয় ইউনিয়ন একটি মুক্ত বাণিজ্য চুক্তি স্বাক্ষর করেছে। দুই পক্ষই একে ‘মহাচুক্তি’ বা ‘মাদার অব অল ডিলস’ হিসেবে বর্ণনা করেছে। এই চুক্তিকে বৈশ্বিক বাণিজ্যে একটি বড় মোড় হিসেবে দেখা হচ্ছে।
গতকাল মঙ্গলবার চুক্তিটির ঘোষণা আসে। এটি প্রায় দুই দশক ধরে চলা ধারাবাহিক আলোচনার ফল। বিশেষ করে যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের বাণিজ্য যুদ্ধের প্রভাবে তৈরি ভূ-অর্থনৈতিক সংকটের মধ্যেই এই সমঝোতায় পৌঁছায় ভারত ও ইইউ। ভারত এবং ২৭ দেশের ইউরোপীয় ইউনিয়নের মধ্যে এই চুক্তির ফলে যুক্ত হচ্ছে প্রায় ২০০ কোটি মানুষের বাজার। এ বাজার বৈশ্বিক মোট দেশজ উৎপাদনের প্রায় ২৫ শতাংশ প্রতিনিধিত্ব করে। সম্মিলিত বাজারমূল্য ধরা হচ্ছে প্রায় ২৭ ট্রিলিয়ন মার্কিন ডলার।

এর আগে সোমবার ইউরোপীয় কমিশনের প্রেসিডেন্ট উরসুলা ফন ডার লিয়েন ও ইউরোপীয় কাউন্সিলের প্রেসিডেন্ট আন্তোনিও কস্তা নয়া দিল্লিতে ভারতের প্রজাতন্ত্র দিবসের কুচকাওয়াজে অংশ নেন। সেখানে তারা প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির সঙ্গে সম্মানিত অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন। ভারত-ইইউ সম্মেলনের আগে মঙ্গলবার একটি ভার্চ্যুয়াল জ্বালানি সম্মেলনে বক্তব্য দেন নরেন্দ্র মোদি। তিনি বলেন, এই চুক্তি ভারত ও ইউরোপের মানুষের জন্য বিশাল সুযোগ তৈরি করবে।
এদিকে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম এক্সে দেওয়া এক পোস্টে উরসুলা ফন ডার লিয়েন বলেন, ইউরোপ ও ভারত আজ ইতিহাস গড়েছে। তার ভাষায়, ২০০ কোটি মানুষের জন্য একটি মুক্ত বাণিজ্য অঞ্চল গড়ে তোলা হয়েছে, যা উভয় পক্ষকেই লাভবান করবে। পাশাপাশি কৌশলগত সম্পর্ক আরও শক্তিশালী হবে বলেও তিনি উল্লেখ করেন। এই চুক্তির ফলে ভারত ও ইউরোপীয় ইউনিয়নের মধ্যে বিদ্যমান শুল্ক উল্লেখযোগ্য হারে কমে আসবে বলে ধারণা করা হচ্ছে। এতে দুই অঞ্চলের বাণিজ্য ও বিনিয়োগ বাড়বে বলে আশা করা হচ্ছে। তবে চুক্তিটির বাস্তব প্রভাব নিয়ে নানা প্রশ্নও উঠছে। বিশেষ করে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প এই চুক্তিকে কীভাবে দেখবেন, তা নিয়ে কৌতূহল রয়েছে। রাশিয়ার কাছ থেকে তেল কেনা অব্যাহত রাখায় গত বছর ভারতের ওপর শাস্তিস্বরূপ ৫০ শতাংশ শুল্ক আরোপ করেছিলেন তিনি।
এই চুক্তি কত বিস্তৃত এবং এর গুরুত্ব কতটুকু?
এই মুক্ত বাণিজ্য চুক্তির আওতা ব্যাপক এবং বহুমাত্রিক। ইউরোপীয় ইউনিয়নের কাস্টমস ইউনিয়নের অধীনে থাকা পণ্য, সেবা ও বিনিয়োগ—সবই এতে অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে। এটি ভারতের এ পর্যন্ত স্বাক্ষরিত সবচেয়ে বড় এবং সবচেয়ে বিস্তৃত বাণিজ্যিক চুক্তি হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে।
এর গুরুত্ব আরও বেড়েছে ২০২৩ সালের প্রেক্ষাপটে। সে বছর ইউরোপীয় ইউনিয়ন ভারতের জন্য জেনারেলাইজড স্কিম অব প্রেফারেন্স বা জিএসপি সুবিধা প্রত্যাহার করে নেয়। এতে ভারতীয় রপ্তানিকারকদের উচ্চ শুল্ক দিতে হয়। বিশ্লেষকদের মতে, নতুন এই চুক্তির ফলে বস্ত্র, ওষুধ, যন্ত্রপাতি, ইস্পাত, পেট্রোলিয়াম পণ্য এবং বৈদ্যুতিক সরঞ্জাম খাতে ভারত উল্লেখযোগ্য সুবিধা পেতে পারে।
চুক্তির আওতায় ইউরোপীয় ইউনিয়ন তাদের ১৪৪টি উপ-খাতে ভারতের প্রবেশের সুযোগ দিচ্ছে। এর বিপরীতে ভারতও ইইউ-এর জন্য আর্থিক সেবা, সমুদ্রবন্দর ও টেলিযোগাযোগসহ মোট ১০২টি উপ-খাত উন্মুক্ত করছে। ফলে দুই পক্ষের বাজারে প্রবেশ আরও সহজ হবে বলে ধারণা করা হচ্ছে।
মঙ্গলবার বস্ত্র এবং রত্ন ও অলঙ্কার শিল্পের শ্রমিক ও ব্যবসায়িক নেতাদের উদ্দেশে বক্তব্য দেন প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি। তিনি বলেন, এই চুক্তি সংশ্লিষ্ট খাতগুলোর জন্য অত্যন্ত সহায়ক হবে। তার মতে, এটি শুধু উৎপাদন খাতকে শক্তিশালী করবে না, সেবা খাতের সম্প্রসারণেও ভূমিকা রাখবে। নরেন্দ্র মোদি আরও বলেন, এই মুক্ত বাণিজ্য চুক্তি বিশ্বের ব্যবসায়ী ও বিনিয়োগকারীদের কাছে ভারতের প্রতি আস্থা আরও দৃঢ় করবে। তিনি জানান, ভারত সব খাতেই বৈশ্বিক অংশীদারত্ব জোরদারে সক্রিয়ভাবে কাজ করছে।
তবে চুক্তিটি এখনো চূড়ান্ত বাস্তবায়নের পর্যায়ে পৌঁছায়নি। একাধিক বাণিজ্য আলোচনায় যুক্ত অর্থনীতিবিদ বিশ্বজিৎ ধর বলেন, চুক্তির চূড়ান্ত খসড়া বর্তমানে ব্রাসেলস ও নয়াদিল্লিতে আইনি পর্যালোচনার মধ্যে রয়েছে। ফলে এটি আগামী বছরের আগে কার্যকর নাও হতে পারে। আঞ্চলিক বাণিজ্য জোট বিষয়ে অভিজ্ঞ সাবেক ভারতীয় কূটনীতিক অনিল ত্রিগুনায়েত এই চুক্তিকে ‘চমৎকার’ বলে অভিহিত করেছেন। তার ভাষায়, এটি ইউরোপীয় ইউনিয়নের আমলাতান্ত্রিক জটিলতা সামলে পেশাদারভাবে বাজারে প্রবেশের সুযোগ তৈরি করবে।
অনিল ত্রিগুনায়েত আরও বলেন, ২০ বছর আগের তুলনায় বর্তমানে ইউরোপীয়দের সঙ্গে কাজ করার ক্ষেত্রে ভারতের সক্ষমতা অনেক বেড়েছে। একই সঙ্গে ভারত তাদের জন্য একটি বড় বাজার। তার মতে, এই চুক্তি শুধু সস্তা ওয়াইন বা বিএমডব্লিউয়ের মধ্যেই সীমাবদ্ধ নয়, বরং বাণিজ্য ও বিনিয়োগসহ আরও বহু সম্ভাবনা এতে যুক্ত রয়েছে।
আল জাজিরাকে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে বিশ্বজিৎ ধর বলেন, ভারত ও ইউরোপীয় ইউনিয়ন—উভয় পক্ষের জন্যই এটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ একটি চুক্তি। তিনি মনে করেন, ভারতের সবচেয়ে বড় বাণিজ্য অংশীদারের সঙ্গে বাণিজ্যিক ও অর্থনৈতিক সম্পর্ক জোরদারে এটি একটি বড় পদক্ষেপ। তিনি আরও জানান, এই চুক্তির মাধ্যমে উভয় পক্ষই যুক্তরাষ্ট্রের ওপর নির্ভরশীলতা কমিয়ে নিজেদের বাজারকে আরও বহুমুখী করার সুযোগ পাবে।
ভারতের অটোমোবাইল খাত কি এখন উন্মুক্ত হতে যাচ্ছে?
অটোমোবাইল খাতে দীর্ঘদিনের সংরক্ষণবাদী নীতির কারণে অতীতে সমালোচনার মুখে পড়েছে ভারত। বিদেশি গাড়ির ওপর উচ্চ শুল্ক আরোপ নিয়ে আপত্তি তুলেছিলেন টেসলার মালিক ইলন মাস্কও। এতদিন ভারত বিদেশি গাড়ির ওপর সর্বোচ্চ ১১০ শতাংশ পর্যন্ত শুল্ক আরোপ করে আসছিল। এই নীতিই ২০১৩ সালে ভারত ও ইউরোপীয় ইউনিয়নের মধ্যে বাণিজ্য চুক্তি নিয়ে আলোচনা ভেস্তে যাওয়ার অন্যতম কারণ ছিল। সে সময় অটোমোবাইল খাত উন্মুক্ত করতে নয়াদিল্লির অনীহা বড় বাধা হয়ে দাঁড়ায়।
তবে পরিস্থিতি বদলেছে। মঙ্গলবার ঘোষিত নতুন চুক্তি অনুযায়ী, ভারত তাদের অভ্যন্তরীণ গাড়ির বাজার ইইউভুক্ত দেশগুলোর জন্য খুলে দিচ্ছে। ইউরোপীয় ইউনিয়ন থেকে আমদানিকৃত অধিকাংশ গাড়ির ওপর শুল্ক কমিয়ে ৩০ থেকে ৩৫ শতাংশে নামিয়ে আনার সিদ্ধান্ত হয়েছে। পরে কয়েক বছরের মধ্যে ধাপে ধাপে এই শুল্ক ১০ শতাংশে নামিয়ে আনার পরিকল্পনা রয়েছে।
চুক্তি অনুযায়ী, ১৫ হাজার ইউরোর কম মূল্যের ইউরোপীয় গাড়িগুলো এই সুবিধার বাইরে থাকছে। এসব গাড়ির ওপর আগের মতোই উচ্চ শুল্ক বহাল থাকবে। এর চেয়ে বেশি দামের গাড়িগুলোকে তিনটি আলাদা শ্রেণিতে ভাগ করা হবে। প্রতিটি শ্রেণির জন্য পৃথক কোটা ও শুল্কহার নির্ধারণ করা হয়েছে।

একই সঙ্গে দেশীয় বৈদ্যুতিক গাড়ি শিল্পের বিনিয়োগ সুরক্ষার বিষয়টিও গুরুত্ব পেয়েছে। এ কারণে প্রথম পাঁচ বছর ইউরোপীয় ইউনিয়ন থেকে আমদানিকৃত বৈদ্যুতিক গাড়ির ওপর শুল্ক কমানো হবে না। পরবর্তী সময়ে ইউরোপীয় ইউনিয়ন থেকে বছরে সর্বোচ্চ ১ লাখ ৬০ হাজার জ্বালানিচালিত ইঞ্জিনচালিত গাড়ি এবং ৯০ হাজার বৈদ্যুতিক গাড়ি আমদানির সুযোগ দেওয়া হবে। তবে এসব সুরক্ষামূলক ব্যবস্থার পরও বাজারে তাৎক্ষণিক প্রভাব পড়েছে। চুক্তি ঘোষণার পর ভারতের গাড়ি উৎপাদনকারী প্রতিষ্ঠানগুলোর শেয়ারের দাম গড়ে প্রায় ১ দশমিক ৬ শতাংশ কমে গেছে।
এই চুক্তিতে ইউরোপীয় ইউনিয়ন কীভাবে লাভবান হবে?
নতুন মুক্ত বাণিজ্য চুক্তির আওতায় ইউরোপীয় ইউনিয়ন থেকে আমদানিকৃত পণ্যের বড় অংশে শুল্ক ছাড় দিচ্ছে ভারত। চুক্তি কার্যকর হলে ইইউ থেকে আসা মোট পণ্যের প্রায় ৩০ শতাংশের ওপর থেকে তাৎক্ষণিকভাবে শুল্ক প্রত্যাহার করা হবে।
ইইউ কর্মকর্তাদের মতে, ভারতে রপ্তানি করা ইউরোপীয় পণ্যের ৯৬ দশমিক ৬ শতাংশের ক্ষেত্রে শুল্ক হয় পুরোপুরি তুলে নেওয়া হবে, নয়তো উল্লেখযোগ্যভাবে কমানো হবে। এর ফলে ইউরোপীয় রপ্তানিকারকদের বছরে প্রায় ৪০০ কোটি ইউরো বা প্রায় ৪৭৪ কোটি ডলার শুল্ক সাশ্রয় হবে বলে ধারণা করা হচ্ছে।
গাড়ি আমদানিতে শুল্ক ছাড়ের পাশাপাশি অন্যান্য খাতেও বড় ধরনের সুবিধা দিচ্ছে ভারত। বর্তমানে যন্ত্রপাতির ওপর সর্বোচ্চ ৪৪ শতাংশ, রাসায়নিক পণ্যের ওপর ২২ শতাংশ এবং ওষুধের ওপর ১১ শতাংশ পর্যন্ত যে শুল্ক রয়েছে, তার প্রায় পুরোটা বাতিল করার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে।
এছাড়া ইউরোপীয় উড়োজাহাজ ও মহাকাশযান সংশ্লিষ্ট প্রায় সব পণ্যের ওপর থেকেও শুল্ক তুলে নেওয়া হচ্ছে। একই সঙ্গে অপটিক্যাল, মেডিকেল ও সার্জিক্যাল যন্ত্রপাতির প্রায় ৯০ শতাংশ পণ্যের ক্ষেত্রে আর কোনো শুল্ক আরোপ করা হবে না। অন্যদিকে, ইউরোপ থেকে আমদানিকৃত স্পিরিট ও ওয়াইনের ওপর বর্তমানে ১৫০ শতাংশ শুল্ক আরোপ রয়েছে। নতুন চুক্তি অনুযায়ী, ওয়াইনের শুল্ক কমিয়ে ২০ থেকে ৩০ শতাংশ নির্ধারণ করা হয়েছে। স্পিরিটের ক্ষেত্রে শুল্ক ধরা হয়েছে ৪০ শতাংশ এবং বিয়ারের ক্ষেত্রে ৫০ শতাংশ।
চুক্তির অংশ হিসেবে ভারত আর্থিক ও সামুদ্রিক পরিষেবা খাতে ইউরোপীয় ইউনিয়নভুক্ত প্রতিষ্ঠানগুলোর জন্য আরও সহজ সুযোগ তৈরি করবে। একই সঙ্গে উভয় পক্ষ কাস্টমস সংক্রান্ত বিধি সহজীকরণ এবং মেধা সম্পদের সুরক্ষা জোরদারে একমত হয়েছে।
এই চুক্তিতে ভারত কীভাবে লাভবান হবে?
মুক্ত বাণিজ্য চুক্তির আওতায় ইউরোপীয় ইউনিয়ন ভারতের অধিকাংশ পণ্যের ওপর থেকে শুল্ক তুলে নেওয়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছে। চুক্তি কার্যকর হলে ভারত থেকে রপ্তানি হওয়া প্রায় ৯০ শতাংশ পণ্যের ক্ষেত্রে সব ধরনের শুল্ক বাতিল করবে ইইউ। আগামী সাত বছরের মধ্যে এই সুবিধা আরও বিস্তৃত হয়ে ভারতের ৯৩ শতাংশ পণ্যের ক্ষেত্রে প্রযোজ্য হবে।
যেসব পণ্য অবিলম্বে শূন্য শুল্ক সুবিধা পাবে, তার মধ্যে রয়েছে সামুদ্রিক ও মৎস্যজাত পণ্য। এর মধ্যে চিংড়ি ও হিমায়িত মাছ উল্লেখযোগ্য, যেগুলোর ওপর বর্তমানে সর্বোচ্চ ২৬ শতাংশ পর্যন্ত শুল্ক রয়েছে। পাশাপাশি রাসায়নিক পণ্য, প্লাস্টিক ও রাবার, চামড়া ও পাদুকা, বস্ত্র, তৈরি পোশাক, সাধারণ ধাতু এবং রত্ন ও অলঙ্কার খাতের পণ্যও এই সুবিধার আওতায় আসছে। এসব পণ্যে বিদ্যমান শুল্কহার ৪ থেকে ১৭ শতাংশ পর্যন্ত ছিল।

ভারতের প্রায় ৬ শতাংশ পণ্যের ক্ষেত্রে আংশিক শুল্ক ছাড় এবং কোটা সুবিধা দেওয়া হবে। এর ফলে ইউরোপীয় ইউনিয়নে ভারতের পণ্যের ওপর গড় শুল্কের হার বর্তমান ৩ দশমিক ৮ শতাংশ থেকে কমে দাঁড়াবে মাত্র শূন্য দশমিক ১ শতাংশে। সামগ্রিকভাবে, দুই পক্ষের দ্বিপক্ষীয় বাণিজ্যের প্রায় ৯৯ দশমিক ৫ শতাংশ পণ্য কোনো না কোনোভাবে শুল্ক ছাড়ের সুবিধা পাবে বলে চুক্তিতে উল্লেখ করা হয়েছে।
তবে ইস্পাত খাতে ভারতের চেষ্টা এখনো অব্যাহত রয়েছে। শুল্কমুক্ত ইস্পাত রপ্তানির কোটা বাড়াতে ইইউর সঙ্গে আলোচনা চালাচ্ছে নয়াদিল্লি। আগামী ১ জুলাই থেকে ইউরোপীয় ইউনিয়নের নতুন নিয়ম কার্যকর হওয়ার কথা রয়েছে। সে কারণে ৩০ জুনের মধ্যেই এ বিষয়ে আলোচনার ফল আসতে পারে বলে ধারণা করা হচ্ছে। বর্তমান চুক্তি অনুযায়ী, ভারত বছরে সর্বোচ্চ ১৬ লাখ টন ইস্পাত ইইউ দেশগুলোতে শুল্কমুক্তভাবে রপ্তানি করতে পারবে। তবে এটি ভারতের বর্তমান বার্ষিক ইস্পাত রপ্তানির তুলনায় প্রায় অর্ধেক।
এদিকে ইউরোপীয় ইউনিয়নের কার্বন বর্ডার অ্যাডজাস্টমেন্ট মেকানিজম বা সিবিএএমের ক্ষেত্রে ভারত কোনো ছাড় পায়নি। এই ব্যবস্থার আওতায় ইস্পাত, সিমেন্ট, সার ও বিদ্যুতের মতো কার্বন-নিবিড় পণ্যের ওপর অতিরিক্ত কর আরোপ করা হয়। এসব পণ্যের উৎপাদনে বেশি জ্বালানি ব্যবহার হয়।
ইইউর সঙ্গে যুক্ত নরওয়ে, আইসল্যান্ড, লিচেনস্টাইন ও সুইজারল্যান্ড এই কর থেকে অব্যাহতি পায়। কারণ এসব দেশ ইউরোপীয় ইউনিয়নের এমিশন ট্রেডিং সিস্টেম বা সংশ্লিষ্ট চুক্তির সঙ্গে যুক্ত। সুইজারল্যান্ডের মতো যেসব দেশের এমিশন ট্রেডিং সিস্টেম সরাসরি ইইউ-এর সঙ্গে সংযুক্ত, তারাও একই সুবিধা পেয়ে থাকে। তবে ভবিষ্যতে ইউরোপীয় ইউনিয়ন যদি অন্য কোনো দেশের ক্ষেত্রে এই ব্যবস্থায় শিথিলতা দেখায়, তাহলে ভারতও সে বিষয়ে আলোচনার সুযোগ পাবে বলে জানানো হয়েছে।
ভারত ও ইইউ-এর বাণিজ্য পরিস্থিতি কতটা তাৎপর্যপূর্ণ?
ভারত ও ইউরোপীয় ইউনিয়ন—উভয় পক্ষের জন্যই এখনো সবচেয়ে বড় বাণিজ্যিক অংশীদার হিসেবে যুক্তরাষ্ট্র নিজের অবস্থান ধরে রেখেছে। তবে সাম্প্রতিক বছরগুলোতে ভারত ও ইইউ-এর পারস্পরিক বাণিজ্য দ্রুতগতিতে বেড়েছে। গত এক দশকে দুই পক্ষের পণ্য বাণিজ্যে উল্লেখযোগ্য প্রবৃদ্ধি দেখা গেছে। ২০২০ সালে ভারত ও ইউরোপীয় ইউনিয়নের মধ্যে পণ্য বাণিজ্যের পরিমাণ ছিল প্রায় ৭ হাজার ৪০০ কোটি ডলার। ২০২৪-২৫ অর্থবছরে তা বেড়ে দাঁড়ায় প্রায় ১৩ হাজার ৬০০ কোটি ডলারে। এর ফলে পণ্য বাণিজ্যের ক্ষেত্রে ইউরোপীয় ইউনিয়ন এখন ভারতের বৃহত্তম অংশীদার হয়ে উঠেছে।
বাণিজ্যের ভারসাম্যের দিক থেকেও সুবিধাজনক অবস্থানে রয়েছে ভারত। ইইউ দেশগুলোতে ভারতের রপ্তানি যেখানে ৭ হাজার ৫৮৫ কোটি ডলার, সেখানে আমদানির পরিমাণ ৬ হাজার ৬৮ কোটি ডলার। এতে ইউরোপীয় ইউনিয়নের সঙ্গে ভারতের বাণিজ্য উদ্বৃত্ত দাঁড়িয়েছে ১ হাজার ৫০০ কোটি ডলারেরও বেশি।
ইউরোপীয় ইউনিয়ন থেকে ভারতে যে পণ্যগুলো রপ্তানি হয়, তার বড় অংশজুড়ে রয়েছে যন্ত্রপাতি, পরিবহন সরঞ্জাম ও রাসায়নিক পণ্য। বিপরীতে ভারত ইইউ দেশগুলোতে মূলত রাসায়নিক, সাধারণ ধাতু, খনিজ পণ্য এবং বস্ত্র রপ্তানি করে থাকে। দুই পক্ষই আশা করছে, ২০৩০ সালের মধ্যে ভারত ও ইউরোপীয় ইউনিয়নের দ্বিপক্ষীয় বাণিজ্যের পরিমাণ ২০০ বিলিয়ন ডলারে পৌঁছাবে।
পণ্য বাণিজ্যের পাশাপাশি সেবা খাতেও প্রবৃদ্ধি লক্ষ্য করা গেছে। ২০১৯ থেকে ২০২৪ সালের মধ্যে ভারত ও ইইউ-এর সেবা বাণিজ্য উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়েছে। এ সময়ে ভারতের সেবা রপ্তানি ২২ দশমিক ৫ বিলিয়ন ডলার থেকে বেড়ে ৪৪ বিলিয়ন ডলারে দাঁড়িয়েছে। একই সময়ে ইউরোপীয় ইউনিয়নের সেবা রপ্তানি প্রায় ১৭ বিলিয়ন থেকে বেড়ে ৩৪ বিলিয়ন ডলারে পৌঁছেছে। দুই পক্ষের মধ্যে বিজনেস কনসালটেন্সি ও আইটি সেবা খাতে বাণিজ্য সবচেয়ে বেশি।
বর্তমানে ভারত ইউরোপীয় ইউনিয়নের নবম বৃহত্তম বাণিজ্যিক অংশীদার। ইইউ-এর মোট বাণিজ্যের ২ দশমিক ৪ শতাংশ হয় ভারতের সঙ্গে। তুলনামূলকভাবে যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে ইইউ-এর বাণিজ্য ১৭ দশমিক ৩ শতাংশ এবং চীনের সঙ্গে ১৪ দশমিক ৬ শতাংশ।
ভারত সরকারের তথ্য অনুযায়ী, ২০২৪ সাল পর্যন্ত ইউরোপীয় ইউনিয়নের বিভিন্ন দেশে বসবাস করছেন ৯ লাখ ৩১ হাজার ৬০৭ জন ভারতীয় নাগরিক। তবে ভারতে বসবাসরত ইউরোপীয় নাগরিকদের বিষয়ে কোনো তুলনামূলক তথ্য পাওয়া যায়নি। ইউরোপীয় ইউনিয়নের ভাষ্যমতে, বর্তমানে প্রায় ৬ হাজার ইউরোপীয় কোম্পানি ভারতে তাদের কার্যক্রম পরিচালনা করছে। অন্যদিকে ইউরোপীয় ইউনিয়নের দেশগুলোতে ভারতের প্রায় ১ হাজার ৫০০ কোম্পানির উপস্থিতি রয়েছে।
দুই দেশের ক্ষেত্রেই যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে সম্পর্ক উত্তেজনাপূর্ণ:
বিভিন্ন ইস্যুতে যুক্তরাষ্ট্র, ভারত ও ইউরোপীয় ইউনিয়নের মধ্যে উত্তেজনা এখনো বিরাজমান। এসব উত্তেজনার প্রেক্ষাপটেই নতুন করে বৈশ্বিক বাণিজ্যের সমীকরণ বদলাতে শুরু করেছে।
মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের সঙ্গে ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির ব্যক্তিগত সম্পর্ক ভালো হলেও বাস্তবতায় দুই দেশের বাণিজ্যিক সম্পর্ক চাপের মুখে রয়েছে। ট্রাম্পের বাণিজ্য যুদ্ধের ফলে যুক্তরাষ্ট্রের কাছ থেকে সবচেয়ে বেশি শুল্ক আরোপের শিকার দেশগুলোর তালিকায় ভারত অন্যতম। বর্তমানে ভারতীয় পণ্যের ওপর যুক্তরাষ্ট্র ৫০ শতাংশ শুল্ক আরোপ করেছে। এর অর্ধেক আরোপ করা হয়েছে রাশিয়া থেকে ভারতের অপরিশোধিত তেল আমদানি অব্যাহত রাখার কারণে। হোয়াইট হাউসের কর্মকর্তাদের দাবি, এই তেল বিক্রির অর্থ দিয়েই ইউক্রেন যুদ্ধে অর্থ জোগাচ্ছে ক্রেমলিন।
একই সময়ে ট্রাম্প প্রশাসনের সঙ্গে ইউরোপীয় ইউনিয়নের উত্তেজনাও বাড়ছে। বিশেষ করে ডেনমার্কের স্বায়ত্তশাসিত অঞ্চল গ্রিনল্যান্ড কিনতে ট্রাম্পের আগ্রহ এই উত্তেজনার মূল কারণ হয়ে উঠেছে।
এই মাসে গ্রিনল্যান্ড কেনার প্রস্তাবের বিরোধিতা করায় ইউরোপের আটটি দেশের ওপর অতিরিক্ত ১০ শতাংশ শুল্ক আরোপের হুমকি দেন ট্রাম্প। সেই শুল্ক আগামী জুনে ২৫ শতাংশে পৌঁছাতে পারে বলেও তিনি ইঙ্গিত দেন। তবে গ্রিনল্যান্ড ও ডেনমার্ক একাধিকবার স্পষ্ট করেছে, ভৌগোলিকভাবে উত্তর আমেরিকায় অবস্থান করলেও রাজনৈতিকভাবে গ্রিনল্যান্ড ইউরোপের অংশ এবং এটি বিক্রির প্রশ্নই ওঠে না।
গত সপ্তাহে সুইজারল্যান্ডের দাভোসে ওয়ার্ল্ড ইকোনমিক ফোরাম চলাকালে ট্রাম্প তার আগের হুমকি থেকে সরে আসেন। তিনি জানান, শুল্ক আরোপের পরিবর্তে গঠনমূলক আলোচনার মাধ্যমে গ্রিনল্যান্ড ইস্যুতে একটি সমঝোতার ভিত্তি তৈরি হয়েছে। তবে চাপ পুরোপুরি কাটেনি। গত বছর স্বাক্ষরিত ইইউ-ইউএস বাণিজ্য চুক্তির আওতায় ইউরোপীয় ইউনিয়নকে এখনো যুক্তরাষ্ট্রে রপ্তানির ক্ষেত্রে সর্বোচ্চ ১৫ শতাংশ পর্যন্ত শুল্ক দিতে হচ্ছে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, এই ক্রমবর্ধমান চাপ ও অনিশ্চয়তার প্রতিক্রিয়াতেই ভারত ও ইউরোপীয় ইউনিয়নের মধ্যে মুক্ত বাণিজ্য চুক্তিটি দ্রুত চূড়ান্ত করা হয়েছে। অর্থনীতিবিদ বিশ্বজিৎ ধর বলেন, বৈশ্বিক বাণিজ্যে অস্থিরতা এখন স্বাভাবিক বাস্তবতায় পরিণত হয়েছে। তার মতে, ব্যবসা ও বাণিজ্যে স্থিতিশীলতা ফেরাতে ভারত ও ইইউ—উভয় পক্ষের জন্যই একটি নিশ্চয়তা তৈরি করা জরুরি হয়ে পড়েছে। তিনি বলেন, যুক্তরাষ্ট্র বর্তমানে অনিশ্চয়তার মধ্যে রয়েছে এবং সেখানে আগামী দিনে কী ঘটবে, তা কেউ নিশ্চিতভাবে বলতে পারছে না।
যুক্তরাষ্ট্র কীভাবে দেখছে এই চুক্তিকে?
ভারত ও ইউরোপীয় ইউনিয়নের মুক্ত বাণিজ্য চুক্তি নিয়ে অসন্তোষ প্রকাশ করেছে হোয়াইট হাউস। এই চুক্তিকে ঘিরে ওয়াশিংটনের সমালোচনা এখন প্রকাশ্য পর্যায়ে পৌঁছেছে।
নয়াদিল্লির সঙ্গে ইউরোপীয় ইউনিয়নের চুক্তি নিয়ে ক্ষোভ ঝাড়েন মার্কিন ট্রেজারি সেক্রেটারি স্কট বেসেন্ট। গত রবিবার এবিসি নিউজকে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে তিনি বলেন, রাশিয়া থেকে তেল কেনার কারণে যুক্তরাষ্ট্র ভারতের ওপর ২৫ শতাংশ শুল্ক আরোপ করেছে। অথচ এর মধ্যেই ইউরোপীয় ইউনিয়ন ভারতের সঙ্গে বাণিজ্য চুক্তি স্বাক্ষর করেছে।
স্কট বেসেন্টের ভাষায়, ইউরোপীয় দেশগুলো কার্যত নিজেদের বিরুদ্ধেই যুদ্ধের অর্থায়ন করছে। তার এই মন্তব্যে স্পষ্টভাবে ইঙ্গিত মিলেছে, ইউক্রেন যুদ্ধের প্রেক্ষাপটে রাশিয়ার জ্বালানি রপ্তানি নিয়ে যুক্তরাষ্ট্রের অবস্থান থেকে ইউরোপ সরে যাচ্ছে বলে ওয়াশিংটন মনে করছে।
গত বছর ট্রাম্প বাণিজ্য যুদ্ধ ঘোষণা করার পর ইউরোপীয় ইউনিয়ন দ্রুত যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে একটি বাণিজ্য চুক্তিতে পৌঁছালেও ভারত এখনো ওয়াশিংটনের সঙ্গে সমঝোতার চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছে। একই সঙ্গে নয়াদিল্লি বিশ্বের অন্যান্য অঞ্চলের সঙ্গে বাণিজ্যিক সম্পর্ক বহুমুখীকরণের কৌশল নিচ্ছে।
সাবেক কূটনীতিক অনিল ত্রিগুনায়েত বলেন, ট্রাম্পের বাণিজ্য যুদ্ধ মোকাবিলায় ভারত ‘কৌশলগত ধৈর্য’ নীতিতে এগোচ্ছে। তার মতে, ইউরোপীয় ইউনিয়নের সঙ্গে এই চুক্তি সেই বৃহত্তর কৌশলেরই অংশ, যার লক্ষ্য সম্ভাব্য চাপ সামাল দেওয়া এবং নতুন বাণিজ্যিক অংশীদার খুঁজে বের করা।
নয়া দিল্লিভিত্তিক থিংক ট্যাংক অবজারভার রিসার্চ ফাউন্ডেশনের ভাইস প্রেসিডেন্ট হর্ষ পান্ত আল জাজিরাকে বলেন, দুইটি বড় অর্থনৈতিক শক্তির এই ঘনিষ্ঠতা যুক্তরাষ্ট্রের জন্য একটি স্পষ্ট বার্তা। তার ভাষায়, ভারত ও ইউরোপীয় ইউনিয়ন নিজেদের এজেন্ডা নিয়ে এগিয়ে যেতে প্রস্তুত।
হর্ষ পান্ত আরও বলেন, ভারত ও ইইউ-এর মধ্যে একটি বড় ধরনের ভূ-রাজনৈতিক পুনর্গঠন ঘটছে। তার মতে, ‘ট্রাম্পের প্রভাব’ এই দুই শক্তির একসঙ্গে আসার প্রক্রিয়াকে ত্বরান্বিত করেছে। ভবিষ্যতে তাদের মধ্যে আরও গভীর কৌশলগত সহযোগিতা দেখা যেতে পারে।
সূত্র : আলজাজিরা।

