গবেষণা ও নীতি বিশ্লেষণের অভিজ্ঞতায় দেশের অর্থনীতিকে সুদক্ষ পরামর্শ দিচ্ছেন সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগ (সিপিডি)-এর নির্বাহী পরিচালক ড. ফাহমিদা খাতুন। যুক্তরাজ্যের ইউনিভার্সিটি কলেজ লন্ডন থেকে পিএইচডি এবং যুক্তরাষ্ট্রের কলম্বিয়া ইউনিভার্সিটি থেকে উচ্চতর ডিগ্রি অর্জন করা এই অর্থনীতিবিদ দীর্ঘ সময় ধরে অর্থনীতি ও নীতি-গবেষণায় নিয়োজিত। কর্মজীবনের বড় অংশ তিনি বাংলাদেশ ব্যাংক ও জাতিসংঘের মতো প্রতিষ্ঠানগুলোতে নীতি-পরামর্শক হিসেবে কাটিয়েছেন।
সম্প্রতি তিনি দেশের অর্থনৈতিক নানা চ্যালেঞ্জ নিয়ে বিশদ মন্তব্য করেছেন। তার মতে, দ্রব্যমূল্যে কারসাজি, বিনিয়োগে উচ্চ সুদের চাপ এবং কর-জিডিপি অনুপাতের দুরবস্থা এখনো দেশের অর্থনীতির জন্য বড় বাঁধা। নতুন সরকার ক্ষমতা গ্রহণের পর, এই চ্যালেঞ্জগুলো মোকাবিলাকে প্রথম অগ্রাধিকার হিসেবে দেখা উচিত বলে তিনি মনে করেন।
ড. ফাহমিদা খাতুনের অভিজ্ঞতা ও বিশ্লেষণ অর্থনীতিতে দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনার প্রয়োজনীয়তার ওপর গুরুত্বারোপ করছে। তিনি বলেন, নীতি নির্ধারণ ও বিনিয়োগ পরিবেশ তৈরি করা না হলে দেশের অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি দুর্বল থাকতে পারে।
প্রশ্ন : দেশের অর্থনীতি বর্তমানে এক ধরনের ভঙ্গুর অবস্থার মধ্য দিয়ে যাচ্ছে। এই পরিস্থিতিতে নির্বাচনের পর নতুন যে সরকার দায়িত্ব গ্রহণ করবে, তাদের সামনে সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ কী?
ড. ফাহমিদা খাতুন : নতুন সরকারের জন্য পথ চলাটা মোটেও মসৃণ হবে না। তারা উত্তরাধিকার সূত্রে একটি সংকটাপন্ন অর্থনীতি পেতে যাচ্ছে। আমি মনে করি, সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ হলো—সামষ্টিক অর্থনীতির স্থিতিশীলতা ফিরিয়ে আনা।
কয়েক বছর ধরে আমরা উচ্চ মূল্যস্ফীতি দেখছি, যা সাধারণ মানুষের ক্রয়ক্ষমতার ওপর প্রচণ্ড চাপ সৃষ্টি করেছে। কিন্তু মানুষের আয় বাড়েনি, মজুরি সূচক মূল্যস্ফীতির নিচে রয়েছে। ব্যাংকিং খাতে যে খেলাপি ঋণের পাহাড় জমেছে, তা আর্থিক খাতের দুর্বলতাকে প্রকট করেছে। এ ছাড়া রাজস্ব আদায়ে বড় ধরনের ঘাটতি রয়েছে। নতুন সরকারকে শুধু এসব সমস্যা মোকাবেলা করলেই হবে না, বরং বিগত সরকারের রেখে যাওয়া প্রাতিষ্ঠানিক দুর্বলতাগুলোও মেরামত করতে হবে।
প্রশ্ন : মানুষের প্রধান উদ্বেগ দ্রব্যমূল্য নিয়ে। মূল্যস্ফীতি কমাতে এবং একই সঙ্গে বেকারত্ব দূর করে কর্মসংস্থান বাড়াতে নতুন সরকারের কৌশল কী হওয়া উচিত?
ড. ফাহমিদা খাতুন : মূল্যস্ফীতি বা দ্রব্যমূল্য বৃদ্ধি নিয়ন্ত্রণের জন্য কেবল মুদ্রানীতির ওপর নির্ভর করলে চলবে না। বাংলাদেশ ব্যাংক সুদের হার বাড়িয়েছে টাকা সরবরাহ কমাতে। এটি তাত্ত্বিকভাবে সঠিক হলেও বাস্তব বাজারে এর প্রতিফলন ঘটছে না।
কারণ, বাজার এখন সিন্ডিকেটের দখলে। কয়েকজন ব্যবসায়ী মিলে বাজার নিয়ন্ত্রণ করেন। নতুন সরকারকে সরবরাহ চেইনের প্রতিটি স্তরে স্বচ্ছতা আনতে হবে। মধ্যস্বত্বভোগীদের দৌরাত্ম্য কমাতে হবে এবং প্রতিযোগিতামূলক বাজার নিশ্চিত করতে হবে। অন্যদিকে কর্মসংস্থান বাড়াতে হলে আমাদের প্রবৃদ্ধির ধরন বদলাতে হবে। আমরা বিগত বছরগুলোতে দেখেছি, জিডিপি বেডেছে কিন্তু সেই হারে কর্মসংস্থান তৈরি হয়নি। কারণ বিনিয়োগ বাড়েনি। শ্রমঘন শিল্পে বিনিয়োগ করতে হবে।
প্রশ্ন : অনেকেই বলছেন সুদের হার না কমালে বিনিয়োগ আসবে না। কিন্তু বর্তমান অবস্থায় সুদের হার কমানো যাচ্ছে না কেন? আর বেসরকারি খাতে ঋণ বাড়াতে সরকারের ভূমিকা কী হওয়া উচিত?
ড. ফাহমিদা খাতুন: সুদের হার কমানোর দাবি ব্যবসায়ীদের পক্ষ থেকে আসা স্বাভাবিক। কিন্তু আমাদের বুঝতে হবে, কেন এটি বাড়ানো হয়েছে। মূল্যস্ফীতি যখন ঊর্ধ্বমুখী থাকে, তখন সুদের হার কম রাখা হলে বাজারে টাকার প্রবাহ বেড়ে যায়। তাই মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণে না আসা পর্যন্ত সুদের হার কমানোটা সঠিক পদক্ষেপ নয়। তবে ঋণের সুদের হারের বাইরেও অনেক কাঠামোগত সমস্যার কারণে ব্যবসার খরচ বাংলাদেশে বেশি।
এগুলোর মধ্যে রয়েছে অবকাঠামোগত দুর্বলতা, প্রযুক্তির ব্যবহার কম, আমলাতান্ত্রিক জটিলতা, দুর্নীতি ইত্যাদি। নতুন সরকারকে এগুলো দূর করতে হবে। তা ছাড়া নতুন সরকারকে অবশ্যই অপ্রয়োজনীয় ব্যয় কমিয়ে ব্যাংক থেকে ঋণ নেওয়া কমাতে হবে। এ ছাড়া ব্যাংকগুলোতে সুশাসন প্রতিষ্ঠা করতে হবে, যাতে বড় ঋণখেলাপিরা সব টাকা আটকে না রাখেন এবং প্রকৃত উদ্যোক্তারা ঋণ পান।
প্রশ্ন : অন্তর্বর্তী সরকারের কর্মকাণ্ডে আপনি কী ধরনের ত্রুটি দেখছেন এবং নতুন সরকারকে সেসব থেকে কী শিক্ষা নেওয়া উচিত?
ড. ফাহমিদা খাতুন: অন্তর্বর্তী সরকার একটি বিশেষ পরিস্থিতিতে দায়িত্ব নিয়েছে এবং তারা বেশ কিছু সংস্কার কমিশন গঠন করেছে, যা ইতিবাচক। তবে তাদের কিছু সীমাবদ্ধতা ও দুর্বলতা আমরা দেখেছি। প্রধান সমস্যা ছিল বাজার নিয়ন্ত্রণে তাদের পদক্ষেপগুলো খুব একটা কার্যকর হয়নি। ভোগ্যপণ্যের আমদানি শুল্ক কমানোর পরও বাজারে তার প্রভাব পুরোপুরি পড়েনি। তার কারণ হলো—মাঠ পর্যায়ে প্রশাসনিক তদারকির অভাব। এ ছাড়া আইন-শৃঙ্খলা পরিস্থিতির পুরোপুরি উন্নতি না হওয়ায় শিল্পাঞ্চলে বিশেষ করে তৈরি পোশাক খাতে উৎপাদন ব্যাহত হয়েছে। এতে বিনিয়োগকারীদের মধ্যে এক ধরনের অস্থিরতা তৈরি হয়েছে। নতুন সরকারকে মনে রাখতে হবে, সংস্কারের জন্য শুধু কমিশন করলেই হয় না, সেগুলোর কার্যকরী বাস্তবায়ন প্রয়োজন। আমলাতান্ত্রিক জটিলতা দূর করে সিদ্ধান্ত প্রহণের প্রক্রিয়া দ্রুত করতে হবে। দুর্নীতির মূলোৎপাটনই হবে নতুন সরকারের প্রথম অগ্রাধিকার।
প্রশ্ন : বিনিয়োগ বাড়াতে এবং সামগ্রিক অর্থনৈতিক সংকট কাটাতে আপনার মূল পরামর্শ কী হবে?
ড. ফাহমিদা খাতুন: বিনিয়োগ বাড়াতে হলে সবার আগে প্রয়োজন আস্থার পরিবেশ তৈরি করা। বিনিয়োগকারীরা শুধু ট্যাক্স হলিডে চান না, তাঁরা চান রাজনৈতিক নিশ্চয়তা, নিরবচ্ছিন্ন গ্যাস-বিদ্যুৎ এবং দুর্নীতিমুক্ত প্রশাসন। বিনিয়োগ বাড়ানোর জন্য ব্যাবসায়িক পরিবেশের আমূল সংস্কার করতে হবে। এ ছাড়া বৈদেশিক বিনিয়োগ আকর্ষণের জন্য আমাদের ডলারের বিনিময় হারকে বাজারভিত্তিক এবং স্থিতিশীল রাখতে হবে। অগ্রাধিকারের তালিকায় থাকা উচিত ব্যাংকিং খাতের সংস্কার কার্যক্রম চালিয়ে যাওয়া, রাজস্ব ব্যবস্থাপনার সংস্কার করে কর-জিডিপি অনুপাত বাড়ানো এবং শিক্ষা ও স্বাস্থ্য খাতে বরাদ্দ বৃদ্ধি করা।
প্রশ্ন: আপনি ব্যাংকিং খাতের সংকটকে অর্থনীতির সবচেয়ে বড় ক্ষত বলছেন। এই খাতের আমূল পরিবর্তন আনতে হলে নতুন সরকারকে ঠিক কোন জায়গা থেকে শুরু করতে হবে?
ড. ফাহমিদা খাতুন: ব্যাংকিং খাতের সংস্কারের শুরুটা হতে হবে ‘রাজনৈতিক সদিচ্ছা’ থেকে। গত দেড় দশকে এই খাতে সবচেয়ে বড় সমস্যা ছিল রাজনৈতিক প্রভাব এবং কেন্দ্রীয় ব্যাংকের দুর্বল তদারকি। নতুন সরকারকে ব্যাংকিং খাতের প্রস্তাবিত ও সংশোধিত নীতিমালাগুলো অনুমোদন করতে হবে দুর্বল ব্যাংকগুলোর প্রকৃত চিত্র বোঝার জন্য ‘অ্যাসেট কোয়ালিটি রিভিউ’ চালিয়ে যেতে হবে। নতুন ব্যাংকের লাইসেন্স দেওয়া যাবে না। এ ছাড়া কেন্দ্রীয় ব্যাংকের স্বাধীনতা সমুন্নত রাখতে হবে, যাতে মন্ত্রী বা রাজনৈতিকভাবে প্রভাবশালী ব্যক্তিরা প্রভাব খাটাতে না পারেন। কেন্দ্রীয় ব্যাংকে এমন ব্যক্তিদের বসাতে হবে, যাঁরা কোনো গোষ্ঠীর স্বার্থ না দেখে দেশের স্বার্থ দেখবেন। যদি কেন্দ্রীয় ব্যাংক স্বাধীনভাবে কাজ করতে না পারে এবং অনিয়ম করা ব্যাংকগুলোর বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা নিতে না পারে, তবে ব্যাংকিং খাতের দুর্বলতা কাটবে না।
প্রশ্ন : খেলাপি ঋণ বাংলাদেশের অর্থনীতির জন্য একটি স্থায়ী মাথাব্যথা হয়ে দাঁড়িয়েছে। এটি আদায়ের ক্ষেত্রে আপনার নির্দিষ্ট কোনো ফর্মুলা আছে কি?
ড. ফাহমিদা খাতুন : খেলাপি ঋণ আদায়ের ক্ষেত্রে আমাদের দেশে ‘পুরস্কার ও দণ্ড’ এই দুটি নীতিরই অভাব রয়েছে। যাঁরা বছরের পর বছর ঋণের টাকা ফেরত দিচ্ছেন না, তাঁদের আইনগতভাবে শাস্তির আওতায় আনতে হবে। বর্তমান আইনে অনেক ফাঁকফোকর আছে, যার সুযোগ নিয়ে বড় ঋণখেলাপিরা বারবার ঋণ পুনঃ তফসিল করার সুযোগ পান। নতুন সরকারকে এই আইন সংশোধন করতে হবে। ইচ্ছাকৃত খেলাপিদের দেশত্যাগে নিষেধাজ্ঞা এবং তাঁদের ব্যাবসায়িক লাইসেন্স বাতিলের মতো কঠোর পদক্ষেপ নিতে হবে। একই সঙ্গে একটি ‘স্পেশাল ট্রাইব্যুনাল’ গঠন করে নির্দিষ্ট সময়ের মধ্যে এসব মামলার নিষ্পত্তি করতে হবে। আমরা দেখেছি, বড় ঋণখেলাপিদের ছাড় দিয়ে ছোটদের ধরা হয়েছে, যা আমাদের সমাজব্যবস্থার অসামঞ্জস্যতা ও বৈষম্য তুলে ধরে।
প্রশ্ন : শুল্ক ও রাজস্বনীতির ক্ষেত্রে আমাদের দেশে সাধারণ মানুষের ওপর পরোক্ষ করের বোঝা অনেক বেশি। এই বৈষম্য কমানোর উপায় কী?
ড. ফাহমিদা খাতুন : আমাদের রাজস্ব কাঠামো এখন উল্টো হয়ে আছে। উন্নত বিশ্বে প্রত্যক্ষ কর থেকে বেশি আয় হয়, আর আমাদের দেশে সরকার সহজ রাস্তা হিসেবে পরোক্ষ কর, যেমন—ভ্যাটের ওপর নির্ভর করে। এতে সাধারণ গরিব মানুষ ক্ষতিগ্রস্ত হয়। নতুন সরকারের অগ্রাধিকার হওয়া উচিত করের জাল বিস্তৃত করা। যাঁরা কর দেওয়ার যোগ্য, কিন্তু দিচ্ছেন না, তাঁদের চিহ্নিত করতে ডিজিটাল ব্যবস্থা গড়ে তুলতে হবে। প্রত্যক্ষ কর বা আয়কর থেকে রাজস্ব বাড়াতে পারলে সরকার ভ্যাটের হার কমিয়ে আনতে পারবে। এ ছাড়া কর আদায় নিয়ে যে দুর্নীতি এবং হয়রানির অভিযোগ আছে, তা বন্ধ করতে হবে। করদাতারা যেন হয়রানি ছাড়াই কর দিতে পারেন, সেই পরিবেশ তৈরি করতে পারলে রাজস্ব আদায় এমনিতেই বাড়বে।
প্রশ্ন : পরিশেষে ব্যাংক ও রাজস্ব খাতের সংস্কারগুলো বেসরকারি বিনিয়োগের ওপর কী প্রভাব ফেলবে?
ড. ফাহমিদা খাতুন : যদি ব্যাংকিং খাতে সুশাসন ফেরে এবং রাজস্ব আদায় বাড়ে, তবে ব্যাংকগুলো সরকারকে ঋণ দেওয়ার পরিবর্তে বেসরকারি খাতকে বেশি ঋণ দিতে পারবে। এতে ঋণের সুদের হার স্থিতিশীল হবে। একজন বিনিয়োগকারী যখন দেখবেন যে করব্যবস্থা স্বচ্ছ এবং ব্যাংক থেকে ঋণ পাওয়া সহজ, তখনই তিনি দীর্ঘমেয়াদি বিনিয়োগে উৎসাহিত হবেন। আর বিনিয়োগ বাড়লেই নতুন কর্মসংস্থান তৈরি হবে, যা শেষ পর্যন্ত সাধারণ মানুষের জীবনযাত্রার মান উন্নত করবে। তাই নতুন সরকারের উচিত হবে প্রথম দিন থেকেই এই কাঠামোগত সংস্কারগুলোতে হাত দেওয়া।
সূত্র: কালের কন্ঠ

