আধুনিক বিশ্বায়িত অর্থনীতিতে এক রহস্যময় কিন্তু গুরুত্বপূর্ণ ধারণা হলো ‘ইকোনমিক হিটম্যান’। এটি এমন প্রভাবশালী পেশাদার বা মধ্যস্থতাকারীদের বোঝায়, যারা উন্নয়ন ঋণ, নীতি-পরামর্শ এবং করপোরেট চুক্তির আড়ালে উন্নয়নশীল দেশগুলোকে উচ্চ ঝুঁকির ঋণ, অসম চুক্তি এবং কৌশলগত বিনিয়োগে আবদ্ধ করে রাখে। এর ফলে ওই দেশের কৌশলগত সম্পদ, অর্থনৈতিক নীতি এবং সার্বভৌম সিদ্ধান্তগ্রহণের ক্ষমতার ওপর দীর্ঘমেয়াদী প্রভাব পড়ে।
শব্দটি প্রথম জনপ্রিয়তা পায় মার্কিন লেখক জন পারকিনসের ২০০৪ সালের বই ‘Confessions of an Economic Hitman’-এ। পারকিনস লেখেন, উন্নয়নশীল দেশগুলোকে ঋণের জাল, কৌশলগত চুক্তি এবং বিনিয়োগের মাধ্যমে নিয়ন্ত্রণ করাই ইকোনমিক হিটম্যানদের কাজ। এই প্রক্রিয়ায় দেশগুলো স্বায়ত্তশাসনের সীমারেখার বাইরে চলে যায়, আর কৌশলগত সম্পদ ও অর্থনৈতিক সিদ্ধান্ত নিয়ে তাদের স্বাধীনতা সংকুচিত হয়।
২০২৪ সালে বাংলাদেশে ছাত্র-জনতার গণ-অভ্যুত্থানের পর রাষ্ট্র সংস্কারের প্রেক্ষাপটে অন্তর্বর্তী সরকার দেশের বিদেশী ব্যাংকিং ও বিনিয়োগ খাতে অভিজ্ঞ দুই বাংলাদেশী পেশাদারকে গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্বে আনে। লুৎফে সিদ্দিকীকে ২০২৪ সালের ৪ সেপ্টেম্বর প্রধান উপদেষ্টার আন্তর্জাতিক বিষয়ক বিশেষ দূত হিসেবে নিয়োগ দেয়া হয়। তিনি মূলত আন্তর্জাতিক বিষয়াবলির ওপর কাজ করছেন। পাশাপাশি, আগের সরকারের সময়ে সংঘটিত অর্থনৈতিক অপরাধ এবং খেলাপি ঋণ (নন-পারফর্মিং লোন) তদন্তের জন্য একটি ‘ট্রুথ কমিশন’ গঠনের কথাও তিনি উল্লেখ করেছেন।
অন্যদিকে, ১২ সেপ্টেম্বর আশিক চৌধুরীকে বাংলাদেশ বিনিয়োগ উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ (বিডা)-এর নির্বাহী চেয়ারম্যান হিসেবে দায়িত্ব দেওয়া হয়। তার মূল লক্ষ্য ছিল বিনিয়োগ আনয়নে সংস্কার আনা এবং একটি বিনিয়োগবান্ধব কাঠামো তৈরি করা, যাতে দেশী-বিদেশী বিনিয়োগকারীর আস্থা ফিরিয়ে আনা যায়।
এই দুই পেশাদারের নিয়োগকে বিশ্লেষকরা দেশের অর্থনৈতিক পুনর্গঠনের ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ ধাপ হিসেবে দেখছেন। বিশেষ করে, তারা আশা করছেন যে, আন্তর্জাতিক ও দেশীয় বিনিয়োগের জন্য দৃঢ় ভিত্তি গড়ে ওঠার পাশাপাশি বাংলাদেশের কৌশলগত সম্পদ ও অর্থনীতিতে স্থিতিশীলতা ফিরবে।
লুৎফে সিদ্দিকী ও আশিক চৌধুরীর সক্রিয় ও আগাম উদ্যোগী ভূমিকা রাষ্ট্র সংস্কারের ক্ষেত্রে নজর কাড়লেও, তাদের কিছু কর্মকাণ্ড নিয়ে ভিন্নমতও প্রকাশ হয়েছে। অনেক বিশ্লেষকের মতে, তারা সংস্কারের অগ্রভাগে থাকলেও মূল লক্ষ্য—নীতিগত সংস্কার ও ব্যবসায় পরিবেশের উন্নয়ন—এর চেয়ে বেশি গুরুত্ব পেয়েছে রাষ্ট্রীয় কেনাকাটা, বন্দর ও বড় অবকাঠামো চুক্তি মতো ‘হাই-ভ্যালু ডিল’। এ ধরনের উদ্যোগ দীর্ঘমেয়াদে রাষ্ট্রের সিদ্ধান্তগ্রহণ ক্ষমতা ও কৌশলগত সম্পদের নিয়ন্ত্রণের প্রশ্ন তোলে।
সাবেক শ্বেতপত্র প্রণয়ন কমিটির সদস্য এবং সাউথ এশিয়ান নেটওয়ার্ক ফর ইকোনমিক মডেলিংয়ের নির্বাহী পরিচালক ড. সেলিম রায়হান বলেন, “আন্তর্জাতিক সম্পর্ক এবং বিনিয়োগ পরিবেশে কার্যকর কোনো ভূমিকা তারা রাখতে পারেননি, তা দৃশ্যমান। তবে উদ্যোগ ও কর্মস্পৃহা ছিল। কিন্তু একা কোনো কিছু সম্ভব নয়। তাদের কার্যক্রমের পাশাপাশি সমন্বিত উদ্যোগও প্রয়োজন ছিল।”
লুৎফে সিদ্দিকী আন্তর্জাতিক ক্ষেত্রে অভিজ্ঞ। ‘আন্তর্জাতিক বিষয়ক বিশেষ দূত’ হিসেবে নিয়োগের আগে তিনি ইউবিএস, বার্কলেসের মতো বহুজাতিক ব্যাংকে কাজ করেছেন। জন্মসূত্রে বাংলাদেশী হলেও দীর্ঘদিন প্রবাসে ছিলেন এবং যুক্তরাজ্য ও সিঙ্গাপুরে অধ্যাপনার অভিজ্ঞতাও আছে। বৈবাহিক সূত্রে সিঙ্গাপুরে স্থায়ী ও অবাধ বিচরণও রয়েছে।
নিয়োগের এক সপ্তাহের মধ্যেই তিনি আইএমএফের অতিরিক্ত ঋণ এবং শর্ত বাস্তবায়নে সমন্বয়কের ভূমিকা নেন। লক্ষ্য ছিল ৪.৭ বিলিয়ন ডলারের কর্মসূচির সঙ্গে আরও ৩ বিলিয়ন ডলার সহায়তা নিশ্চিত করা। একই সঙ্গে তিনি আন্তর্জাতিক শ্রম সংস্থা (আইএলও) রোডম্যাপ অনুযায়ী শ্রম আইন সংশোধন এবং চট্টগ্রাম বন্দরের পতেঙ্গা কনটেইনার টার্মিনাল (পিসিটি) ও বে-টার্মিনালে বিদেশী অপারেটর নিয়োগ চুক্তি নিয়ে সক্রিয়ভাবে কাজ করেন।
চট্টগ্রাম বন্দরের উন্নয়ন ও বিদেশী বিনিয়োগের ক্ষেত্রে সক্রিয় ভূমিকা নেন বিডা-বেজার চেয়ারম্যান চৌধুরী আশিক মাহমুদ বিন হারুন। স্কাইডাইভিংয়ে খ্যাতি থাকা এই পেশাদার আগে মূলত অর্থায়ন খাতে কাজ করেছেন। দায়িত্ব গ্রহণের পর তার কার্যক্রমের বড় অংশ গঠিত হয় চট্টগ্রাম বন্দরের ব্যবস্থাপনায় বিদেশী কোম্পানি যুক্ত করার প্রক্রিয়া এগিয়ে নেওয়ার দিকে। পতেঙ্গা ও নিউমুরিং টার্মিনালে বিদেশী অপারেটর নিয়োগে তিনি সরাসরি ভূমিকা রাখেন। অতিরিক্তভাবে, আশিক মহেশখালী-মাতারবাড়ী অঞ্চলে ‘মিডা’ গঠনের পরিকল্পনা, প্রায় ৬৫ বিলিয়ন ডলারের বিনিয়োগ লক্ষ্য এবং গভীর সমুদ্রবন্দর ও শিল্পাঞ্চলের জন্য বিশ্বব্যাংক, জাইকা ও এডিবির ঋণ প্রস্তাব নিয়ে কাজ করছেন।
লুৎফে সিদ্দিকীও প্রধান উপদেষ্টার আন্তর্জাতিক বিষয়ক বিশেষ দূতের দায়িত্ব নেয়ার পর চট্টগ্রাম বন্দরকে ‘হাই প্রায়োরিটি’ হিসেবে রাখেন। তিনি বন্দরের পতেঙ্গা কনটেইনার টার্মিনাল (পিসিটি) এবং বে-টার্মিনালে বিদেশী অপারেটর নিয়োগ নিয়ে সক্রিয় ছিলেন। বিশেষ করে সিঙ্গাপুরভিত্তিক পোর্ট অপারেটর পিএসএ ইন্টারন্যাশনালের সঙ্গে আলোচনায় তার দীর্ঘদিনের সিঙ্গাপুর প্রবাসের পেশাগত সম্পর্কের প্রভাব পড়েছে বলে অভিযোগ রয়েছে।
পর্যালোচনায় দেখা যায়, লুৎফে সিদ্দিকী সরাসরি বন্দর কর্তৃপক্ষের সঙ্গে এবং পরোক্ষভাবে নীতিনির্ধারণী পর্যায়ে একাধিক সভায় অংশ নেন। চট্টগ্রাম বন্দর কর্তৃপক্ষের সঙ্গে তিনি কমপক্ষে চারটি বড় সভায় সক্রিয়ভাবে যুক্ত ছিলেন।
তাঁর চট্টগ্রামকেন্দ্রিক কর্মসূচি শুরু হয় ২০২৪ সালের ১ ডিসেম্বর। ওই সফরে বন্দরের সক্ষমতা বৃদ্ধি এবং বিদেশী বিনিয়োগের প্রস্তুতি নিয়ে বৈঠক হয়। পিসিটি পরিচালনায় পিএসএ ইন্টারন্যাশনালকে যুক্ত করার কারিগরি আলোচনা হয়। এছাড়া বে-টার্মিনাল প্রকল্পের ভূমি পরিদর্শন ও জেলা প্রশাসনের সঙ্গে সমন্বয়, এবং বন্দরের পেপারলেস ট্রেডিং/ডিজিটাল সিস্টেমে পণ্য খালাস প্রক্রিয়া চালুর নির্দেশনাও দেন।
পরবর্তী কর্মসূচিতে ২০২৫ সালের ১৩ মে তিনি চট্টগ্রাম ইপিজেড এলাকায় পরিবেশবান্ধব ‘গ্রিন ফ্যাক্টরি’ পরিদর্শন করেন। উৎপাদন প্রক্রিয়া আন্তর্জাতিক বিনিয়োগকারীদের সামনে উপস্থাপনের জন্য ভিডিও ও স্থিরচিত্র ধারণের ব্যবস্থা করা হয় এবং রফতানিকারকদের সঙ্গে বৈঠকে ‘গ্রিন চ্যানেল’ লজিস্টিক সুবিধার আশ্বাস দেন। ২৩ আগস্ট মিরসরাই শিল্প নগরে বিডা-বেজার অধীন অর্থনৈতিক অঞ্চলের গ্যাস ও বিদ্যুৎ সরবরাহ এবং অবকাঠামোর প্রস্তুতি পর্যালোচনা করেন। এ সময় সম্ভাব্য ‘এনক্লেভ’ জোন নিয়েও নির্দেশ দেন। ১২ ডিসেম্বর চট্টগ্রামের র্যাডিসন ব্লুতে অনুষ্ঠিত আন্তর্জাতিক লজিস্টিকস সম্মেলনে তিনি দুর্নীতি ও আমলাতান্ত্রিক দীর্ঘসূত্রতাকে এফডিআইয়ের বড় বাধা হিসেবে তুলে ধরেন এবং সিঙ্গাপুর ও ইউএই বিনিয়োগকারীদের সঙ্গে একান্ত বৈঠকে বিনিয়োগ আহ্বান জানান।
সরকারি কেনাকাটায় বিশেষ কিছু সিঙ্গাপুরভিত্তিক বিক্রেতা বা ট্রেডিং হাউজ নির্ধারণের ক্ষেত্রে লুৎফে সিদ্দিকীর নেপথ্য ভূমিকা ছিল বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্ট মহল। সরকারি ক্রয়ে গৃহীত নীতির মাধ্যমে খাদ্য, জ্বালানি ও কারিগরি প্রকিউরমেন্টের ক্ষেত্রে যে পরিবর্তন এসেছে, সেখানে কিছু সিঙ্গাপুরভিত্তিক কোম্পানির প্রতি তার বিশেষ আনুকূল্যের অভিযোগও উঠেছে।
অন্তর্বর্তী সরকার দায়িত্ব নেয়ার পর বড় ধরনের সরকারি কেনাকাটার—বিশেষ করে জ্বালানি, গম ও চাল আমদানির—নেপথ্যে লুৎফে সিদ্দিকী গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করছেন। উৎপাদক দেশ না হলেও অনেক পণ্য সরাসরি সিঙ্গাপুরের সরবরাহকারীর কাছ থেকে কেনা হচ্ছে। এমনকি ভারত থেকে চাল কেনা হলেও সরবরাহকারী প্রতিষ্ঠান সিঙ্গাপুরভিত্তিক। পাশাপাশি উপদেষ্টা পদমর্যাদার বিশেষ দূত হলেও তার কর্মসময়ের উল্লেখযোগ্য অংশ সিঙ্গাপুরে অবস্থান করার অভিযোগ রয়েছে।
লুৎফে সিদ্দিকী আন্তর্জাতিক বিষয়ক বিশেষ দূত হিসেবে দায়িত্ব নেয়ার পর বাংলাদেশের রফতানিমুখী খাতের জন্য সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ হিসেবে দেখা দেন আন্তর্জাতিক শ্রম সংস্থা (আইএলও)-র রোডম্যাপ অনুযায়ী শ্রম আইন সংশোধন। দায়িত্ব গ্রহণের পর তিনি জেনেভায় আইএলওর গভর্নিং বডির সভায় একাধিকবার বাংলাদেশের প্রতিনিধিত্ব করেছেন। লক্ষ্য ছিল ২০২৬ সালের মধ্যে শ্রম আইনকে আন্তর্জাতিক মানে উন্নীত করা। তবে এই ভূমিকা নিয়েও সংশ্লিষ্ট মহলে প্রশ্ন উঠেছে।
লুৎফে সিদ্দিকীর উদ্যোগগুলোর মধ্যে অন্যতম ছিল ট্রেড ইউনিয়ন গঠন সহজীকরণ। শ্রমিকদের ট্রেড ইউনিয়ন করার জন্য প্রয়োজনীয় সদস্য সংখ্যার হার ২০ শতাংশ থেকে কমিয়ে ১৫ শতাংশ বা তার নিচে নামানোর প্রস্তাব ছিল, যা আইএলওর চাপে সরকার মেনে নেয়। তৈরি পোশাক শিল্পের স্থানীয় উদ্যোক্তারা এটি স্বাগত জানালেও কিছু গুরুতর উদ্বেগ প্রকাশ করেন। তাদের মতে, হঠাৎ ট্রেড ইউনিয়ন গঠন সহজ করলে বাইরের রাজনৈতিক বা ভেস্টেড গ্রুপের অনুপ্রবেশ ঘটতে পারে, যা কারখানার উৎপাদনশীলতা ও শৃঙ্খলা নষ্ট করবে। এছাড়া হয়রানিমূলক কনভেনশনের মাধ্যমে উৎপাদন ব্যয় বৃদ্ধির আশঙ্কাও রয়েছে।
শ্রম আইন সংশোধন বিষয়ে যুক্ত ছিলেন বাংলাদেশ চেম্বার অব ইন্ডাস্ট্রিজের সভাপতি আনোয়ার উল আলম চৌধুরী পারভেজ। তিনি বলেন, “শ্রম উপদেষ্টা নিজে নিশ্চিত করেছিলেন যে কিছু বিষয় শ্রম আইনের অন্তর্ভুক্ত করা হবে না। উদাহরণস্বরূপ, শ্রমিকের সংজ্ঞার আওতায় কর্মচারী আসবে না। সরকারের পক্ষ থেকে প্রতিশ্রুতি দেওয়া হয়েছিল। কিন্তু দুই সপ্তাহের মধ্যে দেখা গেল শ্রম আইন আগের অবস্থায় ফিরে গেছে।”
চট্টগ্রাম বন্দর সম্পর্কিত নীতিনির্ধারণের ক্ষেত্রেও উদ্বেগ রয়েছে। আনোয়ার উল আলম চৌধুরী বলেন, “বন্দর নিয়ে আমাদের সঙ্গে কথা বলার কথা ছিল, কিন্তু তা হয়নি। সিদ্ধান্ত একচেটিয়াভাবে নেওয়া হয়েছে। যদি তিন বছর ধরে মুনাফা হয়, তাহলে চার্জ বাড়ানোর প্রয়োজন কেন? বন্দর পরিচালনায় উন্মুক্ত দরপত্র পদ্ধতি কেন অনুসরণ করা হলো না, তা বোধগোম্য নয়।”
চৌধুরী আশিক মাহমুদ বিন হারুনের কর্মকাণ্ড নিয়েও সমালোচনা রয়েছে। তার কর্মপদ্ধতি, নীতিনির্ধারণী ক্ষমতা এবং কৌশলগত খাতে বিদেশী করপোরেটদের সম্পৃক্ততা নিয়ে কিছু পর্যবেক্ষক প্রশ্ন তুলেছেন। বিনিয়োগ সংক্রান্ত সূত্রগুলো বলছে, বিতর্কের সূচনা হয় লুইজিয়ানাভিত্তিক জ্বালানি প্রতিষ্ঠান আর্জেন্ট এলএনজির ২০২৫ সালের ২৪ জানুয়ারির এক বিবৃতির পর। এতে বলা হয়, যুক্তরাষ্ট্রে বছরে ২ কোটি ৫০ লাখ টন সক্ষমতার এলএনজি টার্মিনাল স্থাপনের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে এবং বাংলাদেশ সরকারের সঙ্গে একটি অ-বাধ্যতামূলক (নন-বাইন্ডিং) চুক্তি হয়েছে, যার আওতায় বাংলাদেশ বছরে সর্বোচ্চ ৫০ লাখ টন এলএনজি কিনতে পারবে। তবে প্রকল্পটি গ্রিনফিল্ড হওয়ায় ২০৩০ সালের আগে গ্যাস সরবরাহের সম্ভাবনা নেই। এই চুক্তিতে বাংলাদেশের পক্ষে আশিক চৌধুরী স্বাক্ষর করেন। এ সময় বিডার নির্বাহী চেয়ারম্যান হিসেবে তার স্বাক্ষর নিয়েও সংশ্লিষ্ট মহলে প্রশ্ন ও আলোচনা ওঠে।
আশিক চৌধুরীকে নিয়ে সমালোচনা কম নয়। তার বিডা, বেজা, পিপিপি ও মিডার শীর্ষপদে থাকার কারণে দেশের ইতিহাসে এমন একচ্ছত্র নিয়ন্ত্রণ আগে কখনও হয়নি। একাধিক গুরুত্বপূর্ণ সংস্থায় একই ব্যক্তির নেতৃত্ব থাকার ফলে ক্ষমতার কেন্দ্রীকরণ তৈরি হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।
পিসিটি এবং বে-টার্মিনাল প্রকল্প ত্বরান্বিত করার নামে আশিক চৌধুরী সিঙ্গাপুরভিত্তিক পিএসএ এর সঙ্গে নিবিড় যোগাযোগ গড়ে তুলেছেন। এমনকি বন্দরের আইনি জটিলতা নিরসনে বিচার বিভাগের উচ্চপর্যায়ের ব্যক্তিদের সঙ্গেও তার যোগাযোগ থাকার অভিযোগ উঠেছে।
বিদেশী বিনিয়োগের নামে অসম সুযোগ সৃষ্টিরও অভিযোগ রয়েছে। সংশ্লিষ্টদের মতে, বিডা ও বেজার নেতৃত্বে বিদেশী কোম্পানিকে অতিরিক্ত সুবিধা দিলে স্থানীয় উদ্যোক্তারা প্রতিযোগিতায় পিছিয়ে যেতে পারেন। বিশ্লেষকদের ধারণা, এ নীতির কারণে ধীরে ধীরে দেশীয় শিল্পমালিকদের হাত থেকে অর্থনীতি ছিটকে গিয়ে বহুজাতিক করপোরেটের নিয়ন্ত্রণে চলে যেতে পারে। বিশেষ করে বন্দরের মতো কৌশলগত রাষ্ট্রীয় সম্পদে বিদেশী করপোরেটদের সম্পৃক্ততা অর্থনৈতিক সার্বভৌমত্ব ও নিয়ন্ত্রণের প্রশ্ন তুলেছে।
লুৎফে সিদ্দিকীর নিয়োগ ও কার্যপরিধি নিয়েও সংশ্লিষ্টদের মধ্যে বিভ্রান্তি দেখা দিয়েছে। আন্তর্জাতিক বিষয় বলতে দেশের ভেতরের অর্থনীতি ও ব্যবসা-বাণিজ্যের কোন অংশগুলো কভার হবে—এ বিষয়ে স্পষ্ট নির্দেশনা ছিল না। সাধারণভাবে কোনো দেশের সঙ্গে ট্যারিফ নেগোসিয়েশন বা আইএমএফের সঙ্গে আলোচনার কাজ স্পেশাল এনভয়ের দায়িত্বের মধ্যে পড়ে না; এটি সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়—যেমন অর্থ, বাণিজ্য বা নৌ-পরিবহন—এর দায়িত্বের মধ্যে। তবে লুৎফে সিদ্দিকী এসব জায়গায় ভূমিকা রেখেছেন।
অন্যদিকে, আশিক চৌধুরীকে পূর্ববর্তী চেয়ারম্যানদের তুলনায় বেশি সক্রিয় দেখা গেলেও বিনিয়োগ পরিবেশ সংস্কারে কাঠামোগত অগ্রগতি প্রত্যাশিত মাত্রায় হয়নি। নীতিগত সংস্কারের চেয়ে উদ্যোগগুলোর চমকপ্রদ উপস্থাপনাকে বেশি গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে। উদাহরণস্বরূপ, যুক্তরাষ্ট্রের আর্জেন্ট এলএনজির সঙ্গে চুক্তি এবং ইনভেস্টমেন্ট সামিট আয়োজন বিতর্কের সৃষ্টি করেছে। সামিটে বিদেশী বিনিয়োগকারীদের অংশগ্রহণ সেই সময়ে ঘটে যখন দেশে মব সহিংসতা বেড়ে চলছিল। এমনকি কিছু দাবি—যেমন নাসা ও স্টারলিংকের বিনিয়োগ—বিশ্লেষকদের কাছে শুধু লোক দেখানো কর্মকাণ্ড মনে হয়েছে।
গত ১৬ মাসে অর্থনৈতিক সুশাসন ও প্রবৃদ্ধির চাকা বেগবান করার পাশাপাশি ব্যাপক অর্থনৈতিক সংস্কারের সুযোগ তৈরি হয়েছিল বলে মনে করেন পলিসি এক্সচেঞ্জ বাংলাদেশের চেয়ারম্যান ড. এম মাশরুর রিয়াজ। তিনি বলেন, “অন্তর্বর্তী সরকারের প্রতিশ্রুতিগুলোও সেদিকেই ছিল। শুরুতে কিছু ভালো পদক্ষেপও নেওয়া হয়েছিল। কিন্তু পরে বেশির ভাগ উদ্যোগকে আর ‘নেক্সট লেভেল’-এ নেওয়া হয়নি। এতে বড় গ্যাপ তৈরি হয়েছে। তবে ওই সময় সামগ্রিকভাবে অর্থনৈতিক সংস্কারের জন্য সহায়ক পরিবেশ ছিল। আমলাতন্ত্রের সহযোগিতা চাইলে পাওয়া যেত। দেশী-বিদেশী বেসরকারি খাত সরকারের পক্ষে শক্ত অবস্থানে ছিল। তার পরও অর্থনৈতিক সংস্কার খুবই সামান্য এবং ধীরগতিতে হয়েছে। দেড় বছরে সবকিছু শেষ করা সম্ভব নয়, কিন্তু অন্তত সংস্কারের কর্মসূচি চালু করা যেত।”
বিনিয়োগ পরিবেশ সংস্কারের প্রয়োজনীয়তা নিয়ে তিনি বলেন, “দেশী-বিদেশী বিনিয়োগ গত দুই বছরে নিচের দিকে নেমেছে। এলডিসি গ্র্যাজুয়েশন, বাণিজ্য কাঠামো ও দক্ষতাবিষয়ক পুঞ্জীভূত সমস্যার সমাধানের জন্য কোনো সমন্বিত কর্মসূচি শুরু হয়নি। উল্টো, বেসরকারি খাতের সঙ্গে সরকারের দূরত্ব বেড়েছে। বিশেষ করে দেশের অর্থনীতির মূল চালিকাশক্তি—দেশীয় বেসরকারি খাত—কে দূরে রাখা হয়েছে। সংলাপের ঘাটতি বিনিয়োগকারীদের আস্থা কমিয়েছে এবং অর্থনৈতিক সংস্কারগুলোকে ব্যাহত করেছে। বিনিয়োগ, বৈদেশিক বাণিজ্য ও আন্তর্জাতিক সম্পর্কের ক্ষেত্রে অনেক আশা থাকলেও তা পূরণ হয়নি। সূত্র: বণিক বার্তা

