দেশের প্রধান সমুদ্রবন্দর চট্টগ্রাম বন্দরে চলছে কর্মবিরতি। আসন্ন নির্বাচন ও রমজানকে সামনে রেখে গুরুত্বপূর্ণ সময়ে এই পরিস্থিতি ব্যবসায়ীদের জন্য চ্যালেঞ্জ তৈরি করেছে। কাঁচামাল বন্দরে পৌঁছে গেলেও তা সময়মতো খালাস করা সম্ভব হচ্ছে না। বিশেষ করে তৈরি পোশাক শিল্পের রপ্তানি কনটেইনার নিয়ে মালিকরা বিপাকে পড়েছেন।
বন্দর সূত্র জানিয়েছে, ২১টি বেসরকারি ডিপোতে বর্তমানে জমে রয়েছে ৮ হাজার ৯০০টি রপ্তানি কনটেইনার। স্বাভাবিক সময়ে ডিপো থেকে প্রতিদিন গড়ে ২ হাজার ৮০০ কনটেইনার বন্দরে পাঠানো হলেও বর্তমানে তা অর্ধেকেরও কম। পণ্যবাহী কনটেইনার খালাসের কার্যক্রমও ৭০ শতাংশ কমেছে। এর ফলে চট্টগ্রাম কাস্টম হাউসে গত তিন দিনে রাজস্ব প্রায় ১৫০ কোটি টাকারও বেশি কমেছে।
নির্বাচনের আগে আমদানিকারকরা রমজানের পণ্য আগেভাগে বন্দরে নিয়ে এসেছিলেন। তবে কর্মবিরতির কারণে খালাস পরিকল্পনা অনুযায়ী সম্পন্ন করা সম্ভব হচ্ছে না। কর্মবিরতি শুরুর আগে, ৩০ জানুয়ারি, চট্টগ্রাম বন্দর থেকে ৪ হাজার ৯৯টি কনটেইনার খালাস করা হয়। কিন্তু ৩১ জানুয়ারি প্রথম দিনে তা কমে দাঁড়ায় ১ হাজার ৭৫০টিতে। পরের দুই দিনে খালাস সংখ্যা আরও নেমে আসে ১ হাজার ৬৮৪ ও ১ হাজার ২৩৫টিতে। অর্থাৎ গত তিন দিনে খালাস হয়েছে মাত্র ৪ হাজার ৬৭৪টি কনটেইনার, স্বাভাবিক গড় ৫ হাজার কনটেইনারের তুলনায়। এর প্রভাব পড়েছে কাস্টম হাউসেও। প্রতিদিন গড়ে ১৭০ কোটি টাকা রাজস্ব আদায় করা প্রতিষ্ঠানটির আয় কমেছে প্রায় ৪০ শতাংশ।
চট্টগ্রাম কাস্টম হাউসের কমিশনার মোহাম্মদ শফিউদ্দিন বলেন, “দেশের সবচেয়ে বড় রাজস্ব আদায়কারী প্রতিষ্ঠান চট্টগ্রাম কাস্টম হাউস। বন্দরে আসা পণ্য শুল্কায়ন করে আমরা রাজস্ব সংগ্রহ করি। টানা কর্মবিরতির কারণে খালাস কার্যক্রম কমে যাওয়ায় এর প্রভাব কাস্টম হাউসে পড়েছে।”
চট্টগ্রাম বন্দরের পরিচালক (প্রশাসন) মোহাম্মদ ওমর ফারুক যোগ করেন, “কর্মবিরতির মাঝেও বন্দরে কাজ চলছে, তবে স্বাভাবিকের তুলনায় অনেক কম। আগে যে পরিমাণ কনটেইনার খালাস হতো, তা অনেকটা কমে গেছে। সামনে নির্বাচন ও রমজানকে সামনে রেখে আন্দোলনকারীদের এই বিষয়টি মাথায় রাখা উচিত।
বন্দর ডিপোতে আটকা রয়েছে ৮ হাজার ৯০০টি রপ্তানি কনটেইনার:
চট্টগ্রাম বন্দরে চলমান কর্মবিরতির কারণে রপ্তানি কনটেইনারে সমস্যার সৃষ্টি হয়েছে। বন্দর সূত্রে জানা গেছে, ২১টি বেসরকারি ডিপোতে জমে রয়েছে মোট ৮ হাজার ৯০০টি ২০ ফুট এককের রপ্তানি কনটেইনার।
কর্মবিরতির আগে, ৩০ জানুয়ারি, এই ডিপোগুলো থেকে ২ হাজার ৯৪৭টি কনটেইনার চট্টগ্রাম বন্দরে পাঠানো হয়। তবে কর্মবিরতির প্রথম দিনে এটি কমে দাঁড়ায় ১ হাজার ৬১০টিতে এবং দ্বিতীয় দিনে আরও কমে ১ হাজার ৪৭২টিতে। অর্থাৎ স্বাভাবিকের তুলনায় রপ্তানি কনটেইনারের পরিমাণ অর্ধেকে নেমে এসেছে।
বেসরকারি ডিপোতে শুল্কায়ন প্রক্রিয়া সম্পন্ন করে কনটেইনারগুলো চট্টগ্রাম বন্দরে পাঠানো হয়। বন্দরের মাধ্যমে প্রতিদিন যে পরিমাণ কনটেইনার রপ্তানি হয়, তার পুরো অংশই ডিপো হয়ে যায়। তবে টানা কর্মবিরতির কারণে ডিপোগুলোতে এখন কনটেইনারের জট সৃষ্টি হয়েছে। গতকাল পর্যন্ত এই ডিপোগুলোতে জমে রয়েছে ৮ হাজার ৯০০টি রপ্তানি কনটেইনার।
আমদানি পণ্যের প্রবাহও বাধাগ্রস্ত হচ্ছে:
চট্টগ্রাম বন্দরে কার্যক্রম সাধারণত তিন শিফটে পরিচালিত হয়, প্রতিটি শিফট আট ঘণ্টার। তবে চলমান কর্মবিরতির কারণে গত তিন দিন ধরে সকাল ৮টা থেকে বিকেল ৪টার শিফটে কার্যক্রম পুরোপুরি অচল হয়ে গেছে। শ্রমিকরা কাজে যোগ না দেওয়ায় কার্যক্রম পরিচালনার জন্য প্রয়োজনীয় গ্যাং তৈরি হচ্ছে না। যন্ত্রপাতি পরিচালনার দায়িত্বে থাকা অপারেটররাও কর্তৃপক্ষকে সহযোগিতা করেননি। ফলে গ্যান্ট্রি ক্রেন, স্ট্যাডল ক্যারিয়ার ও রাবার টায়ার্ড গ্যান্ট্রি ক্রেনের মতো অত্যাধুনিক যন্ত্রপাতি আট ঘণ্টা ধরে অলস বসে থাকে।
ডিপো মালিক সমিতি বিকডারের মহাসচিব রুহুল আমিন শিকদার বিপ্লব বলেন, “গত তিন দিনের কর্মবিরতি শেষে কিছুটা কাজ শুরু করতে পেরেছি। তবে টানা ২৪ ঘণ্টার কর্মবিরতি হলে সংকট আরও বাড়বে। সময়মতো রপ্তানি কনটেইনার পাঠাতে না পারলে জাহাজগুলো বন্দর ত্যাগ করবে। এটি তৈরি পোশাক শিল্পের জন্য বড় ধরনের সমস্যা সৃষ্টি করবে।”
চট্টগ্রাম বন্দরে পণ্য খালাসের অপেক্ষায় এখন ৯৮টি জাহাজ নোঙর করেছে। এর মধ্যে ১২টি কনটেইনার জাহাজ, ২৯টি জেনারেল কার্গো জাহাজ, ২২টি খাদ্যপণ্য বোঝাই জাহাজ, ৫টি চিনি বোঝাই জাহাজ এবং ২টি লবণ বোঝাই জাহাজ। বাকিগুলো পাথর বা অন্যান্য সামগ্রী বোঝাই।
বন্দর সূত্র জানায়, আগামী এক সপ্তাহে আরও এক ডজনের বেশি জাহাজ নোঙর করার সম্ভাবনা রয়েছে। চলমান কর্মবিরতি ও আন্দোলন কর্মসূচি অব্যাহত থাকলে রমজানের আগে জাহাজ জট আরও তীব্র হবে। এই পরিস্থিতি রপ্তানি কার্যক্রমে বড় ধরনের প্রভাব ফেলতে পারে।
চট্টগ্রাম বন্দরে মঙ্গলবার থেকে ২৪ ঘণ্টার কর্মবিরতি শুরু হয়েছে। এর আগে ৩১ জানুয়ারি থেকে ২ ফেব্রুয়ারি পর্যন্ত প্রতিদিন আট ঘণ্টার কর্মবিরতি চলছিল। বন্দর রক্ষা সংগ্রাম পরিষদের সমন্বয়ক হুমায়ুন কবির বলেন, “ডিপি ওয়ার্ল্ডের সঙ্গে চুক্তির যে প্রক্রিয়া চলছে, সেটি বাতিল করার কোনো উদ্যোগ সরকার নেয়নি। বিডার নির্বাহী পরিচালক আশিক চৌধুরী, বন্দরের চেয়ারম্যান এস এম মনিরুজ্জামান ও পরিচালক (প্রশাসন) ওমর ফারুক উল্টো আন্দোলন দমন করার চেষ্টা করছেন। গণহারে বদলি করা হচ্ছে। তাদের অপসারণ করে আইনের আওতায় আনা উচিত। অন্যথায় আন্দোলন আরও কঠোর হবে।”
চট্টগ্রাম বন্দর ও ২১টি বেসরকারি ডিপোতে অচলাবস্থা তৈরি হলেও ব্যবসায়ীরা অভিযোগ করেছেন, সরকারের পক্ষ থেকে কার্যকর কোনো পদক্ষেপ নেওয়া হয়নি। টানা তিন দিন ধরে চলা কর্মসূচি তাদের ব্যবসায়িক ক্ষতির মুখে ফেলেছে। আসন্ন নির্বাচনকে ঘিরে চার দিনের ছুটি ঘোষণা করা হয়েছে। এ অবস্থায়, রমজানকে সামনে রেখে পণ্য খালাসে সংকট আরও বাড়ছে।
বিজিএমইএর সাবেক প্রথম সহসভাপতি নাসির উদ্দিন চৌধুরী বলেন, “দেশের অর্থনীতি বন্দরের অচলাবস্থায় ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে। সামনে নির্বাচনের ছুটি। এ সময়ে ২৪ ঘণ্টার অবরোধের কর্মসূচি এসেছে। যদি অবস্থা এভাবে চলতে থাকে, রপ্তানি কনটেইনার রেখে অনেক বড় জাহাজ বন্দর ত্যাগ করবে। তখন অপূরণীয় ক্ষতির মুখোমুখি হতে হবে। এ ব্যাপারে দায়িত্বশীলদের জরুরি পদক্ষেপ নেওয়া উচিত।

