সঞ্চয়পত্রে পাঁচ লাখ টাকা পর্যন্ত বিনিয়োগকারীদের মুনাফার ওপর নিয়মের বাইরে বাড়তি উৎসে কর কেটে নেওয়ার ঘটনা সামনে এসেছে। গত ডিসেম্বর ও জানুয়ারি মাসে ৫ শতাংশের পরিবর্তে ১০ শতাংশ হারে কর কেটে নেওয়া হয়। বিষয়টি নিয়ে বিনিয়োগকারীদের মধ্যে ক্ষোভ তৈরি হলে অতিরিক্ত কাটা অর্থ ফেরত দেওয়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছে সরকার।
চলমান নিয়ম অনুযায়ী, পাঁচ লাখ টাকা পর্যন্ত পুঞ্জীভূত বিনিয়োগের বিপরীতে সঞ্চয়পত্রের মুনাফায় উৎসে কর ৫ শতাংশ। পেনশনার সঞ্চয়পত্রে এই সীমার নিচে বিনিয়োগ হলে কোনো উৎসে করই প্রযোজ্য নয়। পাঁচ লাখ টাকার বেশি বিনিয়োগ হলে সব ক্ষেত্রেই ১০ শতাংশ উৎসে কর কাটা হয়। এসব হার নির্ধারণ করে অর্থ মন্ত্রণালয়ের অভ্যন্তরীণ সম্পদ বিভাগ (আইআরডি) ২০১৯ সালের ২৮ আগস্ট একটি প্রজ্ঞাপন জারি করে, যা এখনো কার্যকর রয়েছে।
তবে কোনো নতুন ঘোষণা বা প্রজ্ঞাপন ছাড়াই গত ডিসেম্বর থেকে পাঁচ লাখ টাকা পর্যন্ত বিনিয়োগের মুনাফার ওপর ১০ শতাংশ হারে উৎসে কর কাটা শুরু হয়। বিষয়টি প্রথম টের পান বিনিয়োগকারীরা ব্যাংক থেকে মুনাফা তুলতে গিয়ে। নভেম্বরের তুলনায় ডিসেম্বর মাসে তাঁরা ১০০ থেকে ১৫০ টাকা পর্যন্ত কম মুনাফা পান!
আইআরডি সূত্র জানায়, পাঁচ লাখ টাকার কম বিনিয়োগ রয়েছে এমন গ্রাহক অন্তত ১৪ লাখ ৫০ হাজার। পেনশনার সঞ্চয়পত্রের গ্রাহকদের বাদ দিয়ে যদি ১০ লাখ বিনিয়োগকারী ধরা হয় এবং গড়ে মাসে ১২৫ টাকা করে অতিরিক্ত কর কাটা হয়ে থাকে, তাহলে দুই মাসে প্রায় ২৫ কোটি টাকা বেশি কেটে নেওয়া হয়েছে।
অতিরিক্ত কর কর্তনের অভিযোগ ওঠার পর গত সোমবার এনবিআর চেয়ারম্যান মো. আবদুর রহমান খানের সঙ্গে যোগাযোগ করা হয়। তিনি জানান, সমস্যার সমাধানে উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে এবং পাঁচ লাখ টাকার কম বিনিয়োগকারীদের ক্ষেত্রে আগের মতোই ৫ শতাংশ উৎসে কর কার্যকর থাকবে।
এর পরদিন এনবিআর জাতীয় সঞ্চয় অধিদপ্তরের মহাপরিচালক রওশন আরা বেগমকে চিঠি দেয়। চিঠিতে স্পষ্ট করে বলা হয়, পাঁচ লাখ টাকা পর্যন্ত পেনশনার সঞ্চয়পত্রে মুনাফার ওপর কোনো উৎসে কর কাটা যাবে না। একই সঙ্গে ২০১৯ সালের প্রজ্ঞাপন অনুযায়ী পাঁচ লাখ টাকা পর্যন্ত বিনিয়োগে উৎসে কর ৫ শতাংশই বহাল থাকবে। তবে আয়কর আইন ২০২৩-এর ধারা ১০৫ অনুযায়ী, কোনো ব্যক্তির সব ধরনের সঞ্চয়পত্রে মোট বিনিয়োগ পাঁচ লাখ টাকা ছাড়ালে মুনাফার ওপর ১০ শতাংশ উৎসে কর প্রযোজ্য হবে।
এই নির্দেশনা কার্যকরে সঞ্চয় অধিদপ্তর একই দিনে অর্থ বিভাগের আওতাধীন স্ট্রেনদেনিং পাবলিক ফাইন্যান্সিয়াল ম্যানেজমেন্ট প্রোগ্রাম টু এনাবল সার্ভিস ডেলিভারির (এসপিএফএমএস) জাতীয় কর্মসূচি পরিচালক জিয়াউল আবেদীনকে চিঠি পাঠায়।
এই জটিলতার সূত্রপাত হয় ২০২৫ সালের ১৭ আগস্ট। ওই দিন সঞ্চয় অধিদপ্তরের মহাপরিচালক এনবিআর চেয়ারম্যানকে চিঠি দিয়ে জানান, ব্যক্তিশ্রেণির বিনিয়োগের বিপরীতে মুনাফায় উৎসে কর কর্তনের বিষয়ে আয়কর আইনে অস্পষ্টতা রয়েছে। তিনি এ বিষয়ে ব্যাখ্যা চাইলেও এনবিআর তখন কোনো জবাব দেয়নি।
পরবর্তীতে একটি নির্দিষ্ট ঘটনার প্রেক্ষিতে বিষয়টি নতুন করে সামনে আসে। সোনালী ব্যাংকের ঢাকার রমনা শাখা থেকে ২০২৪ সালের ২৭ মার্চ মো. শাহজাহান পাঁচ লাখ টাকার তিন মাস অন্তর মুনাফাভিত্তিক সঞ্চয়পত্র কেনেন। এরপর ২০২৫ সালের ৩ ফেব্রুয়ারি তিনি ১৫ লাখ টাকার পেনশনার সঞ্চয়পত্র কেনেন। তাঁর ছেলে মো. নাজমুল হোসেন সঞ্চয় অধিদপ্তরে আবেদন করে জানান, উৎসে কর সঠিকভাবে কাটা হচ্ছে না বা কম কাটা হচ্ছে। এ ঘটনার সূত্র ধরে সঞ্চয় অধিদপ্তর আয়কর আইন ২০২৩-এর ধারা ১০৫ অনুযায়ী ১০ শতাংশ কর কাটার ব্যবস্থা নিতে এসপিএফএমএসকে নির্দেশ দেয়। এরপর সফটওয়্যারে ১০ শতাংশ হার যুক্ত করে তা ব্যাংকগুলোকে জানানো হয়। এ বিষয়ে সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের বক্তব্য জানতে চাওয়া হলেও তাঁরা কোনো মন্তব্য করেননি।
এনবিআর সূত্র নিশ্চিত করেছে, যেহেতু ২০১৯ সালের প্রজ্ঞাপন এখনো বহাল রয়েছে, তাই পাঁচ লাখ টাকার কম বিনিয়োগকারীদের কাছ থেকে যে অতিরিক্ত কর কাটা হয়েছে, তা ফেরত দেওয়া হবে। এ জন্য প্রমাণপত্র সংযুক্ত করে অনলাইনে আবেদন করার সুযোগ রাখা হবে। এনবিআর চেয়ারম্যান জানান, আগের প্রজ্ঞাপন বাতিল না হওয়া পর্যন্ত এই নিয়মই কার্যকর থাকবে এবং বিনিয়োগকারীরা তাঁদের কাটা টাকা ফেরত পাবেন।

