অর্থনীতিবিদরা সতর্ক করে বলছেন, নির্বাচনের আগে সরকারের শেষ সময়ে নেওয়া ব্যয়বহুল সিদ্ধান্তগুলো আগামী নির্বাচিত সরকারের জন্য বড় ধরনের আর্থিক চাপ সৃষ্টি করবে। এই সিদ্ধান্তগুলোর মধ্যে রয়েছে বেতন বৃদ্ধির প্রস্তাব, ভাতা সম্প্রসারণ এবং সামাজিক নিরাপত্তা কর্মসূচির আওতা বাড়ানো। ১২ ফেব্রুয়ারির নির্বাচনের পরে দায়িত্ব নেওয়ার কথা রয়েছে নতুন সরকারের।
ক্ষমতাচ্যুত আগের সরকারের রেখে যাওয়া রাজস্ব বোঝা কমাতে অন্তর্বর্তী সরকার ইতোমধ্যেই অপব্যয় কমানো এবং জনতুষ্টিমূলক কিছু উন্নয়ন প্রকল্প বাতিল করার মাধ্যমে গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ নিয়েছে। উন্নয়ন ব্যয়ে বড় ধরনের কাটছাঁটের ফলে এই লক্ষ্য আংশিকভাবে অর্জিত হয়েছে।
তবে যে ক্ষেত্রে অন্তর্বর্তী সরকার নিয়ন্ত্রণ রাখতে ব্যর্থ হয়েছে, তা হলো নিয়মিত বা পরিচালন ব্যয়। অর্থনীতিবিদদের মতে, উন্নয়ন ব্যয় কমলেও পরিচালন ব্যয় বৃদ্ধি পেয়েছে, সেইসঙ্গে রাজস্ব আহরণও দুর্বল থাকার কারণে আয়-ব্যয়ের ভারসাম্য আরও ঝুঁকিপূর্ণ হয়ে পড়েছে।
ফলে, নতুন সরকার রাজনৈতিক ও সামাজিকভাবে সংবেদনশীল নানা অঙ্গীকার বাস্তবায়নের চাপের মুখে পড়বে, অথচ সেই অঙ্গীকারগুলো পূরণের জন্য পর্যাপ্ত রাজস্ব সক্ষমতা হাতে থাকবে না। অর্থনীতিবিদরা মনে করছেন, এই পরিস্থিতি নির্বাচিত সরকারের অর্থনৈতিক চ্যালেঞ্জ আরও জটিল করে তুলবে।
বর্ধিত দায়বদ্ধতা, সীমিত রাজস্ব:
অর্থনীতিবিদদের মতে, পরবর্তী সরকারকে বেশ কিছু ব্যয়বহুল সিদ্ধান্ত বাস্তবায়নের চাপ মোকাবিলা করতে হবে। এর মধ্যে রয়েছে সরকারি কর্মচারীদের জন্য নতুন বেতন কাঠামো প্রবর্তন, ভাতা সম্প্রসারণ, সামাজিক নিরাপত্তা কর্মসূচির সুবিধাভোগীর সংখ্যা বৃদ্ধি, মৎস্য খাতে ২০ শতাংশ বিদ্যুৎ বিল ছাড় এবং সম্মিলিত ইসলামী ব্যাংকসহ কিছু নন-ব্যাংক আর্থিক প্রতিষ্ঠানের গ্রাহকদের পাওনা পরিশোধ।
তবে এসব অঙ্গীকার যদি রাজনৈতিকভাবে সুষ্ঠুভাবে সামাল দেওয়া না যায় বা ধাপে ধাপে বাস্তবায়ন সম্ভব না হয়, দেশের ইতিমধ্যেই দুর্বল রাজস্ব ভারসাম্য আরও নাজুক হয়ে পড়বে। অর্থনীতিবিদরা সতর্ক করেছেন, এতে প্রবৃদ্ধি, কর্মসংস্থান ও সামষ্টিক অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতার ওপর নেতিবাচক প্রভাব পড়তে পারে।
সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগের (সিপিডি) নির্বাহী পরিচালক ফাহমিদা খাতুন বলেন, “নতুন ঘোষিত ব্যয়ের উদ্যোগগুলো পুরোপুরি বাস্তবায়িত হলে নির্বাচিত সরকার ব্যাপক চাপের মুখে পড়বে। সম্পদ সংগ্রহ ও ব্যয় ব্যবস্থাপনায় নতুন চ্যালেঞ্জ তৈরি হবে।”
তিনি আরও বলেন, “রাজস্ব আদায় লক্ষ্যমাত্রার নিচে থেকে গেছে, অথচ পরিচালন ব্যয় বেড়েছে। অতিরিক্ত ব্যয় মেটানোর সুযোগ সীমিত। বেতন দেওয়ার জন্য কোনো সংস্থা ঋণ দেয় না, আর ব্যাংক থেকে সরকারের ঋণ ইতোমধ্যেই অনেক বেড়েছে। আরও ঋণ নিলে বেসরকারি খাতের ঋণ প্রবাহ বাধাগ্রস্ত হবে। ফলে এই অতিরিক্ত ব্যয় মেটানো খুবই কঠিন।”
বেতন বৃদ্ধি কি রাজস্ব সংকট বাড়াবে?
সরকারি কর্মচারীদের বেতন পুনর্নির্ধারণে গঠিত জাতীয় বেতন কমিশনের সুপারিশ পরবর্তী সরকারের জন্য বড় ধরনের আর্থিক চাপ তৈরি করতে পারে। আনুমানিক হিসাব অনুযায়ী, শুধু মন্ত্রণালয়, বিভাগ, দপ্তর ও অধিদপ্তরের কর্মচারীদের বেতন কাঠামো বাস্তবায়নে প্রায় ১ লাখ ৬ হাজার কোটি টাকা প্রয়োজন হবে। যদি এতে সশস্ত্র বাহিনী, স্বায়ত্তশাসিত সংস্থা ও এমপিওভুক্ত শিক্ষকদের খরচও যোগ করা হয়, তবে ব্যয় আরও বাড়বে।
২৭ জানুয়ারি বিদ্যুৎ ও জ্বালানি উপদেষ্টা মুহাম্মদ ফাওজুল কবির খান জানিয়েছেন, অন্তর্বর্তী সরকার বেতন কমিশনের সুপারিশ কার্যকর করবে না এবং বিষয়টি পরবর্তী সরকারের ওপর ছেড়ে দেওয়া হবে। তবে অর্থনীতিবিদরা সতর্ক করেছেন, সিদ্ধান্ত স্থগিত রাখলেও আর্থিক চাপ কমবে না।
বিশ্বব্যাংকের ঢাকা কার্যালয়ের সাবেক প্রধান অর্থনীতিবিদ জাহিদ হোসেন বলেন, “এ ধরনের ব্যয় মেটানোর জন্য পর্যাপ্ত রাজস্ব জোগাড় করা অত্যন্ত কঠিন। ঋণ নিয়ে বা নতুন টাকা ছাপিয়ে ব্যয় মেটানোও সম্ভব নয়, কারণ এতে মূল্যস্ফীতি বেড়ে যাবে। একমাত্র বিকল্প হলো রাজস্ব বাড়ানো অথবা অন্য খাত থেকে ব্যয় কমানো।” তবে তাঁর মতে, এত বড় সাশ্রয় সরকারি ব্যয়ের অন্য খাত থেকে আসার সম্ভাবনা কম। “অতএব, রাজস্ব আদায় বাড়ানোই একমাত্র পথ, যা বেতন কাঠামো ঘোষণা দেওয়ার চেয়ে অনেক কঠিন।”
বর্তমানে বাংলাদেশের কর-জিডিপি অনুপাত প্রায় ৭ শতাংশ, যা বিশ্বে অন্যতম সর্বনিম্ন। সরকারের রাজস্ব সংগ্রহ পর্যাপ্ত নয়, ফলে পরিচালন ব্যয় মেটানোও কঠিন। আগামী বছরগুলোতে ঋণ পরিশোধ ব্যয়ও বাড়ার কারণে আর্থিক সীমাবদ্ধতা আরও সংকুচিত হবে।
অর্থনীতিবিদরা সতর্ক করেছেন, “পর্যাপ্ত রাজস্ব বৃদ্ধি ছাড়া নতুন বেতন কাঠামো চালু করলে উন্নয়ন ব্যয় মারাত্মকভাবে কমে যাবে। এতে বিনিয়োগ, প্রবৃদ্ধি ও কর্মসংস্থান সৃষ্টির প্রচেষ্টাগুলোও ব্যাহত হবে।”
বাজেটের আগেই সামাজিক নিরাপত্তা বেষ্টনীর সম্প্রসারণ:
বেতন-সংক্রান্ত চাপের পাশাপাশি অন্তর্বর্তী সরকার তার মেয়াদে একাধিক সামাজিক নিরাপত্তা কর্মসূচির পরিধি সম্প্রসারণ করেছে। বয়স্ক ভাতা, বিধবা ও প্রতিবন্ধী ভাতা, শিক্ষা উপবৃত্তি, স্বাস্থ্য সহায়তা এবং অন্যান্য কল্যাণমূলক কর্মসূচিতে সুবিধাভোগীর সংখ্যা ও ভাতার পরিমাণ উভয়ই বাড়ানো হয়েছে।
এছাড়া খাদ্যবান্ধব কর্মসূচিতে পাঁচ লাখ পরিবার যুক্ত করা, মুক্তিযোদ্ধাদের ভাতা বৃদ্ধি, ভিজিএফ কর্মসূচি সম্প্রসারণ এবং প্রান্তিক মৎস্য, প্রাণিসম্পদ ও পোলট্রি খাতের জন্য ২০ শতাংশ বিদ্যুৎ বিল ছাড়ের সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে। এই উদ্যোগগুলোর জন্য প্রাথমিকভাবে প্রয়োজন হবে প্রায় ১০০ কোটি টাকার তহবিল।
অর্থনীতিবিদরা এসব উদ্যোগের সামাজিক গুরুত্ব স্বীকার করেছেন, তবে সতর্ক করেছেন যে, আগামী অর্থবছরে এগুলো সরকারের চলতি ব্যয়ে কয়েক হাজার কোটি টাকা যোগ করবে।
সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগের (সিপিডি) নির্বাহী পরিচালক ফাহমিদা খাতুন এসব সিদ্ধান্ত নেওয়ার সময়কে ‘নজিরবিহীন’ উল্লেখ করেছেন। তিনি বলেন, “এ ধরনের সিদ্ধান্ত সাধারণত নির্বাচিত সরকার বাজেট প্রণয়নের সময় নেয়। অন্তর্বর্তী সরকারের উচিত ছিল কেবল সুপারিশ পর্যন্ত সীমাবদ্ধ থাকা, আগাম ঘোষণা দিয়ে পরবর্তী সরকারের ওপর অদৃশ্য চাপ সৃষ্টি না করা।”
উন্নয়ন ব্যয় সীমিত, প্রবৃদ্ধি ঝুঁকির মুখে:
দুর্বল উন্নয়ন ব্যয়ও নতুন সরকারের আর্থিক চ্যালেঞ্জকে আরও জটিল করছে। ২০২৪-২৫ অর্থবছরে বার্ষিক উন্নয়ন কর্মসূচি (এডিপি) বাস্তবায়নের হার ছিল মাত্র ৬৭.৮৫ শতাংশ, যা দেড় দশকের মধ্যে সর্বনিম্ন। চলতি অর্থবছরে যদিও বরাদ্দ কমানো হয়েছে, প্রথম ছয় মাসে এডিপি বাস্তবায়ন মাত্র ১৭ শতাংশ হয়েছে—রেকর্ড সর্বনিম্ন।
অর্থনীতিবিদ ও পরিকল্পনাবিদরা বলছেন, প্রবৃদ্ধি, কর্মসংস্থান ও বেসরকারি বিনিয়োগ পুনরুজ্জীবিত করতে আগামী সরকারকে উন্নয়ন ব্যয় বাড়াতে বাধ্য হতে হবে। কিন্তু রাজস্ব আয় প্রায় পুরোপুরি পরিচালন ব্যয়ে খরচ হওয়ায় এর বাস্তবায়ন কঠিন হয়ে পড়েছে।
পরিকল্পনা উপদেষ্টা ওয়াহিদউদ্দিন মাহমুদ ২৮ জানুয়ারি সতর্ক করে বলেন, “যদি জিডিপির মাত্র ৭–৮ শতাংশ রাজস্ব আয় পর্যন্ত আটকে থাকে, তবে কোনো উন্নয়ন কৌশলই সফল হবে না।” তিনি জানান, চলতি অর্থবছরের সংশোধিত উন্নয়ন বাজেটও মূলত ঋণের ওপর নির্ভর করে বাস্তবায়ন করা হচ্ছে। তিনি আরও বলেন, “শিক্ষা, স্বাস্থ্য ও সামাজিক নিরাপত্তা খাতে ব্যয় করার জন্য ঋণের ওপর নির্ভর করে টেকসই উন্নয়ন অর্জন করেছে এমন কোনো দেশের উদাহরণ বিশ্বে নেই।” পরবর্তী বাজেট পেশ হতে এখনও পাঁচ মাস বাকি থাকলেও অন্তর্বর্তী সরকার বিভিন্ন সামাজিক নিরাপত্তা কর্মসূচিতে উপকারভোগীর সংখ্যা ও ভাতার পরিমাণ উভয়ই বাড়িয়েছে।
সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগের (সিপিডি) নির্বাহী পরিচালক ফাহমিদা খাতুন এই উদ্যোগকে ‘নজিরবিহীন’ উল্লেখ করেছেন। তিনি বলেন, “সাধারণত এ ধরনের সিদ্ধান্ত নির্বাচিত সরকার বাজেট প্রণয়নের সময় নেয়। অন্তর্বর্তী সরকারের উচিত ছিল পরবর্তী সরকারের জন্য সুপারিশ রেখে যাওয়া পর্যন্ত সীমাবদ্ধ থাকা।”
দায়িত্ব গ্রহণের পর থেকে বিভিন্ন পেশাজীবী গোষ্ঠী ও সরকারি কর্মচারীদের আন্দোলনের প্রেক্ষিতে অন্তর্বর্তী সরকার পরিচালন ব্যয়ও বৃদ্ধি করেছে। এর মধ্যে সবচেয়ে বড় সিদ্ধান্ত হলো বিপুলসংখ্যক এমপিওভুক্ত শিক্ষকের বেতন ও ভাতা বৃদ্ধি। এছাড়া বিদ্যুৎ খাতে ২০ হাজার কোটি টাকারও বেশি অপরিশোধিত বিল বকেয়া রয়েছে, যা অর্থনীতিবিদদের মতে শেষ পর্যন্ত পরবর্তী সরকারের ওপরই আর্থিক দায় হিসেবে চাপাবে।
বেতন বৃদ্ধি দিয়ে দুর্নীতি নিয়ন্ত্রণ সম্ভব কি?
সর্বশেষ সরকারি বেতন কাঠামো ঘোষণা করা হয়েছিল ২০১৫ সালে, যখন বেতন ৭০ থেকে ১০০ শতাংশ পর্যন্ত বাড়ানো হয়। এক দশক পর বর্তমান বেতন কমিশন আবারও একই ধরনের বৃদ্ধি প্রস্তাব করেছে। কমিশন আংশিকভাবে যুক্তি দিয়েছে, এতে দুর্নীতি কমবে এবং সেবার মান বাড়বে।
তবে ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশের (টিআইবি) নির্বাহী পরিচালক ইফতেখারুজ্জামান এই যুক্তি নাকচ করেন। তিনি বলেন, “২০১৫ সালের বেতন বৃদ্ধির পর দুর্নীতি কমেছে বা সেবার মান বেড়েছে—এমন কোনো প্রমাণ নেই। জবাবদিহির শক্ত কাঠামো ছাড়া শুধু বেতন বাড়িয়ে দুর্নীতি কমানো সম্ভব নয়।”
অর্থনীতিবিদ জাহিদ হোসেনও একই উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন। তার মতে, ‘স্বয়ংসম্পূর্ণ’ বেতন বৃদ্ধির ধারণা—যেখানে দুর্নীতি কমে রাজস্ব বাড়বে—বাংলাদেশের বাস্তবতা সেটিকে সমর্থন করে না। তিনি বলেন, “রাজস্ব আদায় ও জবাবদিহিতে কাঠামোগত সংস্কার ছাড়া এ ধরনের সুপারিশ বাস্তবায়ন আর্থিকভাবে প্রায় অসম্ভব।”
সব মিলিয়ে অর্থনীতিবিদরা সতর্ক করেছেন, অন্তর্বর্তী সরকারের মেয়াদ শেষে নেওয়া ব্যয় সিদ্ধান্তগুলো পরবর্তী সরকারের জন্য রাজস্ব ব্যবস্থাপনার পরিসর মারাত্মকভাবে সংকুচিত করেছে। তাই সরকারি অর্থায়নের গভীর সংকট এড়াতে রাজস্ব সংস্কার ও ব্যয় অগ্রাধিকার নির্ধারণ এখন জরুরি।

