২০২৪–২৫ অর্থবছরে বাংলাদেশের উৎপাদনমুখী খাতে বড় ধরনের পরিবর্তন দেখা গেছে। এই সময়ে আটটি বড় শিল্প গ্রুপ আমদানি–রপ্তানিতে এক বিলিয়ন মার্কিন ডলারের বা তারও বেশি লেনদেন করেছে।
বিলিয়ন ডলার ক্লাবে জায়গা নেওয়া শিল্প গুলোর মধ্যে রয়েছে মেঘনা গ্রুপ অব ইন্ডাস্ট্রিজ (এমজিআই), প্রাণ–আরএফএল গ্রুপ, আবুল খায়ের গ্রুপ, সিটি গ্রুপ, টি কে গ্রুপ, স্কয়ার গ্রুপ, বিএসআরএম গ্রুপ এবং দক্ষিণ কোরিয়ার ইয়াংওয়ান করপোরেশন। আগের অর্থবছরে এই তালিকায় থাকা বসুন্ধরা গ্রুপ এবার তালিকা থেকে ছিটকে গেছে।
এই তালিকা তৈরি হয়েছে সংশ্লিষ্ট শিল্প গ্রুপগুলোর আমদানি ব্যয় ও রপ্তানি আয় বিবেচনা করে। গণনার ক্ষেত্রে জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের (এনবিআর) প্রকৃত আমদানি–রপ্তানি তথ্য ব্যবহার করা হয়েছে। আমদানি হিসাব করা হয়েছে ঘোষিত মূল্যে, আর স্থানীয় লেনদেন বা রপ্তানিকে এ তালিকায় রাখা হয়নি। এবার তালিকায় দেশের শিল্প প্রতিষ্ঠান ছাড়াও বিদেশি শিল্প গোষ্ঠীও অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে। মেঘনা গ্রুপের চেয়ারম্যান মোস্তফা কামাল জানিয়েছেন, “নতুন কারখানা স্থাপনের কারণে কাঁচামাল আমদানিও বেড়েছে। তাই আমাদের আমদানি–রপ্তানিতে লেনদেন উল্লেখযোগ্যভাবে বৃদ্ধি পেয়েছে।

গত অর্থবছরে এই আটটি বিলিয়ন ডলার ক্লাবের শিল্প প্রতিষ্ঠান মিলিয়ে মোট ১ হাজার ২৫৪ কোটি মার্কিন ডলারের আমদানি–রপ্তানি করেছে। এটি দেশের মোট আমদানি–রপ্তানির প্রায় ১১ শতাংশ। একই সময়ে এসব প্রতিষ্ঠান সরকারের কাছে ১৭ হাজার ৮১৩ কোটি টাকা রাজস্ব দিয়েছে এবং ৫ লাখ ২৫ হাজার মানুষকে কর্মসংস্থানের সুযোগ দিয়েছে।
এনবিআরের তথ্য অনুযায়ী, বসুন্ধরা গ্রুপ ২০২৩–২৪ অর্থবছরে ১১২ কোটি ডলারের লেনদেন করে বিলিয়ন ডলার ক্লাবে জায়গা করেছিল। তবে ২০২৪–২৫ অর্থবছরে তাদের লেনদেন কমে ৫১ কোটি ডলারে নেমেছে। এর পেছনে মূল কারণ হিসেবে দেখা গেছে ভোগ্যপণ্য, ক্লিংকারসহ শিল্প কাঁচামাল আমদানি কমে যাওয়া। এছাড়া সরকার পরিবর্তনের পর গ্রুপটির বিরুদ্ধে দুদক, সিআইডি ও এনবিআরের মতো সংস্থা নানা অনুসন্ধান শুরু করেছে।
শীর্ষ লেনদেনকারী শিল্পগোষ্ঠী:
বিলিয়ন ডলার ক্লাবে জায়গা নেওয়া আটটি শিল্প গ্রুপের মধ্যে তিনটি প্রতিষ্ঠান দেশের রপ্তানিতে নেতৃত্ব দিচ্ছে। এই তিনটি হলো ইয়াংওয়ান করপোরেশন, প্রাণ–আরএফএল গ্রুপ এবং স্কয়ার গ্রুপ। গত অর্থবছরে এই তিন প্রতিষ্ঠানই আমদানি–রপ্তানিতে দুই অঙ্কের প্রবৃদ্ধি দেখিয়েছে।
অন্য পাঁচটি গ্রুপ মূলত দেশের আমদানি প্রতিস্থাপনকারী শিল্পের নেতৃত্ব দিচ্ছে। এদের উৎপাদনের কারণে দেশীয় উৎপাদন নির্ভর পণ্যের পরিমাণ বেড়েছে এবং আমদানির উপর নির্ভরশীলতা কমে এসেছে। কেউ কেউ সীমিত আকারে রপ্তানিও করছে।
প্রাণ–আরএফএল গ্রুপের চেয়ারম্যান আহসান খান চৌধুরী বলেন, “আমরা যেসব খাতে ব্যবসা করি, সেখানে ব্যাপক সম্ভাবনা রয়েছে। এসব খাতে আরও বিনিয়োগ নিশ্চিত করতে পারলে রপ্তানিতে আরও ভালো করতে পারব।”

লেনদেনে শীর্ষে এমজিআই:
দেশের উৎপাদনমুখী খাতে বহু বছর ধরে নেতৃত্ব ধরে রেখেছে মেঘনা গ্রুপ অব ইন্ডাস্ট্রিজ (এমজিআই)। ২০২৪–২৫ অর্থবছরে গ্রুপটি ২৩২ কোটি ডলারের পণ্য আমদানি করেছে। সরকারের কাছে রাজস্ব দিয়েছে ৫ হাজার ১৭৫ কোটি টাকা (প্রায় ৪৩ কোটি ডলার)। সব মিলিয়ে বিভিন্ন ধরনের পণ্য আমদানিতে গ্রুপের ব্যয় হয়েছে ২৭৫ কোটি ডলার। একই সময়ে রপ্তানি করেছে প্রায় ১৩ কোটি ডলারের পণ্য।
মোটামুটি হিসাব করলে গত অর্থবছরে মেঘনা গ্রুপের আমদানি–রপ্তানির লেনদেন দাঁড়িয়েছে ২৮৩ কোটি ডলারে। আগের অর্থবছরের তুলনায় এটি ৩ শতাংশ বৃদ্ধি। মেঘনা গ্রুপ নিয়মিত কারখানা সম্প্রসারণ ও নতুন খাতে বিনিয়োগ করছে। সম্প্রতি সমুদ্রগামী জাহাজ ও হেলিকপ্টারের বহর বাড়ানো হয়েছে। এছাড়া ইস্পাত রড ও কাচ উৎপাদনের কারখানায় বিনিয়োগ চালু করা হয়েছে।
প্রায় ৫০ বছর আগে উদ্যোক্তা মোস্তফা কামালের হাত ধরে যাত্রা শুরু করে এমজিআই। গ্রুপটির প্রধান ব্র্যান্ড ‘ফ্রেশ’। বর্তমানে এখানে স্থায়ীভাবে ৪৭ হাজার মানুষ কর্মসংস্থানের সুযোগ পেয়েছে। অস্থায়ী কর্মসংস্থান রয়েছে আরও ১৫–১৭ হাজার মানুষের। সব মিলিয়ে গ্রুপে ৬৫ হাজার মানুষ কাজ করছে।
এমজিআইয়ের চেয়ারম্যান মোস্তফা কামাল জানান, “নতুন কারখানা গড়ে তোলার কারণে কাঁচামাল আমদানিও বেড়েছে। ফলে আমদানি–রপ্তানিতে লেনদেন বৃদ্ধি পেয়েছে। ভবিষ্যতে নতুন কারখানায় উৎপাদন শুরু হলে কাঁচামাল আমদানি আরও বাড়বে এবং কর্মসংস্থানও সম্প্রসারিত হবে।”
দুই ধাপ এগিয়ে দ্বিতীয় প্রাণ–আরএফএল:
উৎপাদনমুখী শিল্প খাতে দ্রুতগতিতে এগোচ্ছে প্রাণ–আরএফএল গ্রুপ। গত এক বছরে দুই ধাপ এগিয়ে গ্রুপটি দ্বিতীয় অবস্থানে উন্নীত হয়েছে। জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের (এনবিআর) হিসাব অনুযায়ী, ২০২৩–২৪ অর্থবছরে ১৫৯ কোটি ডলারের লেনদেনের সঙ্গে চতুর্থ অবস্থানে ছিল গ্রুপটি। এক বছরের ব্যবধানে ২০ শতাংশ প্রবৃদ্ধি দেখিয়ে তাদের লেনদেন বেড়ে হয়েছে ১৯০ কোটি ডলার। গত অর্থবছরে আমদানিতে ব্যয় হয়েছে ১৪৫ কোটি ৬০ লাখ ডলার, আর রপ্তানি হয়েছে ৪৪ কোটি ৬১ লাখ ডলারের পণ্য। গ্রুপটিতে কর্মসংস্থান হয়েছে ১ লাখ ৬৭ হাজার মানুষের।
প্রাণ–আরএফএল শুধু তৈরি পোশাক নয়, বৈচিত্র্যময় পণ্য রপ্তানিতেও নেতৃত্ব দিচ্ছে। তাদের রপ্তানিঝুলিতে প্রায় দেড় হাজার পণ্য রয়েছে এবং এই পণ্য রপ্তানি করা হয় ১৪৮টি দেশে। দেশীয় বাজারেও গ্রুপটির সমান প্রভাব রয়েছে। প্রাণ–আরএফএল গ্রুপের চেয়ারম্যান আহসান খান চৌধুরী বলেন, “কাঁচামাল ও বিনিয়োগের যন্ত্রপাতি আমদানি এবং বহুমুখী পণ্য রপ্তানি বৃদ্ধির কারণে আমাদের লেনদেন বেড়েছে। তবে আমরা যে খাতে ব্যবসা করি, সেখানে আরও ব্যাপক সম্ভাবনা রয়েছে। আরও বিনিয়োগ নিশ্চিত করতে পারলে রপ্তানি আরও ভালো হবে। আমাদের দক্ষ মানবসম্পদ কাজে লাগিয়ে প্রত্যন্ত অঞ্চলে শিল্পকারখানা গড়ে তুলতে চাই, বিশেষ করে যেখানে কর্মসংস্থানের সুযোগ সীমিত—যেমন রাজশাহী, রংপুর, বগুড়া, খুলনা, যশোর ও ভোলা।”
অন্যদিকে ইয়াংওয়ান করপোরেশনের চেয়ারম্যান কিহাক সাং জানান, “বাংলাদেশ থেকে পণ্য রপ্তানির ক্ষেত্রে যদি লিড টাইম দুই থেকে তিন সপ্তাহ কমানো যায়, তাহলে রপ্তানি প্রবৃদ্ধি আরও বাড়বে। এজন্য দেশের অবকাঠামো খাতের উন্নয়ন জরুরি।”
ভারী শিল্পে নেতৃত্ব ধরে রাখল আবুল খায়ের:
দেশের ভারী শিল্প খাতে নেতৃত্ব ধরে রেখেছে আবুল খায়ের গ্রুপ। ২০২৪–২৫ অর্থবছরে গ্রুপটি উৎপাদনক্ষমতা সম্প্রসারণ করেছে। চট্টগ্রামের সীতাকুণ্ডে তাদের ইলেকট্রিক আর্ক ফার্নেস কারখানার রড উৎপাদনক্ষমতা ১৮ লাখ টন বাড়িয়ে ৩০ লাখ টনে উন্নীত করা হয়েছে। এতে রড উৎপাদনে গ্রুপটি দেশের শীর্ষে উঠে এসেছে। রডের পাশাপাশি সিমেন্ট ও ঢেউটিনে দেশীয় বাজারে প্রথম অবস্থান ধরে রেখেছে গ্রুপটি। গুঁড়া দুধে তারা শীর্ষে, চা ও টোব্যাকোতে দ্বিতীয় অবস্থানে। এছাড়া স্যানিটারি পণ্য এবং নিত্যব্যবহার্য পণ্যে গ্রুপের ব্যবসা উল্লেখযোগ্য।
গত অর্থবছরে সরকারকে শুধুমাত্র আমদানি পর্যায়ে রাজস্ব দিয়েছে ৩ হাজার ৯৫৮ কোটি টাকা (প্রায় ৩২ কোটি ৭৬ লাখ ডলার)। পণ্য আমদানিতে মোট ব্যয় হয়েছে ১৬০ কোটি ডলার। এক বছরের ব্যবধানে ৭৪ শতাংশ বৃদ্ধি পেয়ে গ্রুপটির রপ্তানি হয়েছে ৭ কোটি ৫৯ লাখ ডলার। রপ্তানি তালিকায় রয়েছে খাদ্যপণ্য, তামাক, সিমেন্ট, ব্যাগ ও চা। ২০২৪–২৫ অর্থবছরে আবুল খায়ের গ্রুপ বিলিয়ন ডলার ক্লাবে তৃতীয় অবস্থানে রয়েছে। তাদের মোট আমদানি–রপ্তানি লেনদেন প্রায় ১৬৮ কোটি ডলার।
গ্রুপের যাত্রা শুরু হয় শিল্পোদ্যোক্তা আবুল খায়েরের হাত ধরে। ১৯৫৩ সালে শুরু হওয়া এই প্রতিষ্ঠানকে শীর্ষে পৌঁছে দিয়েছেন আবুল খায়েরের সন্তানেরা। বর্তমানে ইস্পাত ছাড়াও সিমেন্ট, শিপিং, সিরামিকসহ ৪০টি শিল্পপ্রতিষ্ঠান রয়েছে। গ্রুপে স্থায়ী ও অস্থায়ী মিলিয়ে ৫৫ হাজার মানুষ কর্মসংস্থানের সুযোগ পাচ্ছেন।
বিদেশি প্রতিষ্ঠান ইয়াংওয়ানও বিলিয়ন ডলারে:
উৎপাদনমুখী খাতে বিলিয়ন ডলার ক্লাবে জায়গা করা একমাত্র বিদেশি শিল্প গ্রুপ হলো ইয়াংওয়ান করপোরেশন। দক্ষিণ কোরিয়ার ব্যবসায়ী কিহাক সাংয়ের মালিকানাধীন এই প্রতিষ্ঠান শতভাগ রপ্তানিনির্ভর পণ্য উৎপাদন করে। গত অর্থবছরে ইয়াংওয়ান ৫৫ কোটি ডলারের কাঁচামাল আমদানি করেছে এবং ৯৭ কোটি ডলারের পণ্য রপ্তানি করেছে। এছাড়া গ্রুপটির প্রচ্ছন্ন রপ্তানিও রয়েছে।
ইয়াংওয়ানের যাত্রা শুরু হয়েছে প্রায় ৪৫ বছর আগে চট্টগ্রাম থেকে। চট্টগ্রামের আনোয়ারায় অবস্থিত বাংলাদেশের প্রথম বেসরকারি রপ্তানি প্রক্রিয়াকরণ অঞ্চল (ইপিজেড) ইয়াংওয়ানের হাত ধরে চালু হয়। বর্তমানে চট্টগ্রাম ও ঢাকায় ইয়াংওয়ানের কারখানায় ৭৩ হাজারের বেশি মানুষ কর্মরত।
ইয়াংওয়ানের চেয়ারম্যান কিহাক সাং বলেন, “বর্তমানে বৈশ্বিক ব্যবসায়িক পরিবেশ কিছুটা অবনতি ঘটাচ্ছে। ফলে বাংলাদেশের পণ্য রপ্তানি প্রবৃদ্ধির সামগ্রিক পূর্বাভাস খুব আশাব্যঞ্জক নয়। তবে বাংলাদেশ থেকে পণ্য রপ্তানি দ্রুত করতে লিড টাইম দুই থেকে তিন সপ্তাহ কমানো গেলে রপ্তানি আরও বাড়বে। এজন্য বন্দরের কার্যক্রম, শুল্কপ্রক্রিয়া এবং শিপিংসহ অবকাঠামো খাতের উন্নয়ন জরুরি।” এদিকে স্কয়ার গ্রুপের ব্যবস্থাপনা পরিচালক তপন চৌধুরী জানান, “আগামী দিনগুলোয় স্কয়ার গ্রুপের আমদানি–রপ্তানি আরও বাড়বে। তবে রাজনৈতিক পরিস্থিতি কীভাবে থাকবে, তার ওপর অনেক কিছু নির্ভর করছে।”
বৈচিত্র্যময় শিল্প বিনিয়োগে সিটি গ্রুপ:
ভোগ্যপণ্য শিল্পে দীর্ঘদিন ধরে নেতৃত্ব দেয়া সিটি গ্রুপের আমদানি–রপ্তানি লেনদেন ২০২৪–২৫ অর্থবছরে কমেছে। ২০২৩–২৪ অর্থবছরের তুলনায় লেনদেন ২২ শতাংশ হ্রাস পেয়ে গ্রুপটি তৃতীয় অবস্থান থেকে নেমে বিলিয়ন ডলার ক্লাবে পঞ্চম অবস্থানে রয়েছে। গ্রুপটি ভোগ্যপণ্য খাতের বাইরে বৈচিত্র্য আনতে একসঙ্গে বহুমুখী খাতে বিনিয়োগ শুরু করেছিল। এর মধ্যে রয়েছে কাগজ, তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাস (এলপিজি), সিমেন্ট, কাজুবাদাম ও চা–বাগান। তবে এই নতুন খাতে প্রবৃদ্ধি আগের মতো চোখে পড়ার মতো হয়নি।
২০২৪–২৫ অর্থবছরে সিটি গ্রুপ ১২৯ কোটি ডলারের পণ্য আমদানি করেছে। সরকারের কাছে রাজস্ব দিয়েছে ১ হাজার ৮০০ কোটি টাকা বা প্রায় ১৫ কোটি ডলার। রপ্তানি হয়েছে ১ কোটি ডলারের পণ্য। রপ্তানির তালিকায় রয়েছে খাদ্যপণ্য, চা, ভোজ্যতেল ও প্রাণিখাদ্য। শিল্পোদ্যোক্তা ফজলুর রহমানের হাত ধরে ১৯৭২ সালে যাত্রা শুরু করা এই গ্রুপ গত দুই দশকে নতুন শিল্পপ্রতিষ্ঠান যুক্ত করেছে। গ্রুপের প্রধান ব্র্যান্ড হলো ‘তীর’।
ব্যবসা বাড়ছে স্কয়ার গ্রুপের :
স্কয়ার গ্রুপের ব্যবসা গত এক বছরে উল্লেখযোগ্যভাবে বৃদ্ধি পেয়েছে। আমদানি–রপ্তানি খাতে লেনদেন ১২ শতাংশ বেড়ে গ্রুপটি তালিকায় দুই ধাপ এগিয়ে ষষ্ঠ অবস্থানে উন্নীত হয়েছে। গত অর্থবছরে শিল্পের কাঁচামাল ও যন্ত্রপাতি আমদানিতে গ্রুপের ব্যয় হয়েছে প্রায় ৭৭ কোটি ডলার। দেশীয় বাজারের পাশাপাশি রপ্তানি করেছে ৪৩ কোটি ডলারের পণ্য। রপ্তানির তালিকায় মূলত তৈরি পোশাক, এছাড়া ওষুধ, প্রসাধন ও খাদ্যপণ্য রয়েছে। দেশীয় বাজারেও গ্রুপটি ওষুধ ও নিত্যব্যবহার্য পণ্য বাজারজাত করছে। গ্রুপটিতে কর্মসংস্থান হয়েছে ৮০ হাজারের বেশি মানুষের।

স্কয়ার টেক্সটাইলের চেয়ারম্যান ও স্কয়ার ফার্মার ব্যবস্থাপনা পরিচালক (এমডি) তপন চৌধুরী বলেন, “আমরা আশাবাদী সামনের দিনগুলোয় স্কয়ার গ্রুপের আমদানি–রপ্তানি আরও বাড়বে। তবে রাজনৈতিক পরিস্থিতির ওপর অনেক কিছু নির্ভর করছে। বিলিয়ন ডলারের কোম্পানি হওয়ার পেছনে স্কয়ার গ্রুপের সবার সম্মিলিত প্রচেষ্টা রয়েছে। আমরা একটি দল হিসেবে কাজ করি এবং প্রতিষ্ঠানের স্থিতিশীলতার জন্য সদস্যদের মধ্যে সুন্দর সম্পর্ক বজায় রাখা গুরুত্বপূর্ণ। আমরা একসঙ্গে বেড়ে উঠেছি এবং সামনের দিনেও সেভাবেই এগোতে চাই।”
অন্যদিকে, টি কে গ্রুপের পরিচালক মোহাম্মাদ মুস্তাফা হায়দার বলেন, “অর্থনীতিতে যে প্রবৃদ্ধি দরকার, তা ঠিক রাখতে আইনের শাসনসহ বর্তমান চ্যালেঞ্জগুলো দূর করা প্রয়োজন। শেয়ারবাজারকেও কার্যকর করা দরকার।”
দুই অঙ্কের বৃদ্ধিতে এগিয়ে টি কে গ্রুপ:
গত অর্থবছরে টি কে গ্রুপের আমদানি–রপ্তানি খাতে ১২ শতাংশ প্রবৃদ্ধি হয়েছে। এ নিয়ে টানা দু’বার গ্রুপটি বিলিয়ন ডলার ক্লাবে নিজেদের অবস্থান ধরে রাখতে সক্ষম হয়েছে। ২০২৪–২৫ অর্থবছরে গ্রুপটি ১১৪ কোটি ৭৪ লাখ ডলারের পণ্য আমদানি করেছে। আমদানির তালিকায় রয়েছে ভোগ্যপণ্য, বিশেষ করে ভোজ্যতেল, ঢেউটিনের কাঁচামাল ইত্যাদি। রপ্তানি হয়েছে ৪৫ লাখ ডলারের পণ্য। রপ্তানি তালিকায় রয়েছে খাদ্যপণ্য, জুতা, সুতা ও রাসায়নিক।
অর্ধশত বছরের পুরনো এই শিল্প গ্রুপের যাত্রা শুরু হয় মোহাম্মদ আবু তৈয়ব ও মোহাম্মদ আবুল কালাম—দুই ভাইয়ের হাত ধরে। বাংলাদেশে অনেক খাতের প্রথম কারখানা স্থাপনের কৃতিত্ব তাদের। বর্তমানে গ্রুপে কর্মসংস্থান হয়েছে ৫০ হাজার মানুষের।
টি কে গ্রুপের পরিচালক মোহাম্মাদ মুস্তাফা হায়দার বলেন, “ব্যবসায় প্রবৃদ্ধি স্বাভাবিক। গত অর্থবছরে ডলারের দাম স্থিতিশীল থাকায় ধারাবাহিক আমদানি সম্ভব হয়েছে। তবে দেশের অর্থনীতিতে প্রয়োজনীয় প্রবৃদ্ধি ধরে রাখতে আইনের শাসনসহ বর্তমান চ্যালেঞ্জগুলো মোকাবিলা করতে হবে। শেয়ারবাজারও কার্যকর করা দরকার। এতে ভবিষ্যতে প্রবৃদ্ধি আরও বাড়বে।”
একক খাতে শীর্ষ লেনদেনকারী বিএসআরএম:
লৌহ ও ইস্পাত খাতের ব্যবসা দিয়ে বিলিয়ন ডলার ক্লাবে জায়গা করে নিয়েছে বিএসআরএম গ্রুপ। রড ও ওয়্যার রডের বিভিন্ন পণ্য বাজারজাত করে আসছে গ্রুপটি। নিয়মিত ব্যবসা সম্প্রসারণেও গ্রুপের পদক্ষেপ দৃঢ়। গত অর্থবছরে গ্রুপটি ১০২ কোটি ডলারের পণ্য আমদানি করেছে, যার অধিকাংশই লোহার কাঁচামাল। তবে গ্রুপের কোনো রপ্তানি নেই। কিছুটা অনিয়মিতভাবে ভারতে রড রপ্তানি হলেও বাজারে মন্দার কারণে ২০২৪–২৫ অর্থবছরে বিএসআরএমের আমদানি–রপ্তানিতে লেনদেন ১১ শতাংশ কমে ১০২ কোটি ডলারে নেমেছে। ২০২৩–২৪ অর্থবছরে লেনদেন ছিল ১১৪ কোটি ডলার।
১৯৫২ সালে যাত্রা শুরু করা বিএসআরএম গ্রুপের নেতৃত্ব এখন তৃতীয় প্রজন্মের হাতে। গ্রুপের ব্যবস্থাপনা পরিচালক আমের আলিহুসাইন বলেন, “বিএসআরএম মূলত ইস্পাতপণ্য তৈরির কাঁচামাল আমদানি করে। ২০২৪–২৫ অর্থবছরে বিশ্ববাজারে কাঁচামালের দাম আগের তুলনায় কমে যাওয়ায় আমদানির লেনদেনও কমেছে।”
গবেষণা সংস্থা সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগের (সিপিডি) সম্মাননীয় ফেলো মোস্তাফিজুর রহমান বলেন, “শিল্পায়নের বড় ভিত্তি হলো অভ্যন্তরীণ চাহিদা। বিপুল জনসংখ্যার দেশে উদ্যোক্তারা ভোক্তার চাহিদার ওপর নির্ভর করে আমদানি প্রতিস্থাপক কারখানা গড়ে তুলেছেন, যাদের লেনদেন বিলিয়ন ডলার ছাড়িয়েছে।”
তিনি বলেন, “দেশীয় চাহিদা পূরণের মাধ্যমে এই উদ্যোক্তারা প্রতিযোগিতা সক্ষমতা অর্জন করছেন এবং ধীরে ধীরে আন্তর্জাতিক বাজারেও প্রবেশ করছেন। উৎপাদনমুখী খাতের উদ্যোক্তারা যাতে উন্নত বন্দর ব্যবস্থাপনা এবং নিরবচ্ছিন্ন বিদ্যুৎ ও জ্বালানি সরবরাহ পান, তা নিশ্চিত করা খুবই জরুরি।”

