বিনিয়োগখরার প্রভাব বেসরকারি খাতের বৈদেশিক ঋণ ক্ষেত্রেও পড়েছে। ২০২৪-২৫ অর্থবছরে এই খাতে বৈদেশিক ঋণ অনুমোদিত হয়েছে মাত্র ৪৫ কোটি ৪৬ লাখ ডলার, যা ৪৩টি আবেদনের ভিত্তিতে দেওয়া হয়েছে। তুলনায়, আগের অর্থবছরে ৭৬টি আবেদনের বিপরীতে অনুমোদিত হয়েছিল ১৪১ কোটি ৫৮ লাখ ডলার। এর মানে, এক বছরের ব্যবধানে ঋণ অনুমোদন কমেছে প্রায় ৭৫ শতাংশ। এই তথ্য উঠে এসেছে বাংলাদেশ বিনিয়োগ উন্নয়ন কর্তৃপক্ষের (বিডা) বার্ষিক প্রতিবেদনে।
বিডার কর্মকর্তারা বলছেন, দেশে বিনিয়োগ কমে যাওয়ায় মূলধন যন্ত্রপাতি আমদানি কমেছে। ফলে বেসরকারি খাতে ঋণের চাহিদাও হ্রাস পেয়েছে। কয়েক বছর আগে বেসরকারি খাতের বৈদেশিক ঋণের চাহিদা প্রতি বছরে ৩০০–৪০০ কোটি ডলার ছিল। কিন্তু সাম্প্রতিক বছরগুলোতে ধারাবাহিকভাবে ঋণের চাহিদা কমছে।
বেসরকারি গবেষণা প্রতিষ্ঠান পলিসি এক্সচেঞ্জ অব বাংলাদেশের চেয়ারম্যান ও প্রধান নির্বাহী ড. এম মাসরুর রিয়াজ বলেন, “দেশীয় ঋণের চাহিদা সম্প্রতি মাত্র ৬.২০ শতাংশ বৃদ্ধি পেয়েছে, যা গত কয়েক দশকের মধ্যে সর্বনিম্ন। অভ্যন্তরীণ চাহিদা কমে যাওয়ায় বৈদেশিক ঋণের চাহিদাও হ্রাস পেয়েছে। অর্থনীতিতে মন্থর গতি দেখা দিয়েছে, আর অর্থনৈতিক আউটপুটও কমেছে। আশা করি, নির্বাচিত সরকার ক্ষমতায় এলে বিনিয়োগে পুনরায় গতি ফিরবে, তখন দেশীয় ও বৈদেশিক ঋণের চাহিদা বাড়বে।”
তিনি বৈদেশিক ঋণের প্রয়োজনীয়তা ব্যাখ্যা করে বলেন, “পণ্য আমদানির জন্য এলসি খুলতে ডলারের প্রয়োজন হয়। অনেক সময় দেশীয় ব্যাংক পর্যাপ্ত ডলার সরবরাহ করতে পারে না, তখন ব্যবসায়ীরা বিদেশ থেকে ঋণ নেন। ডলারে আয় করেন এমন আমদানিকারক বা রপ্তানিকারীরাও বিদেশি ঋণ নেন। সুদের হার কম থাকায় ব্যবসায় খরচ কমানোর জন্যও অনেকে বৈদেশিক ঋণ নেয়। তবে, ডলারে ঋণ আনা হলেও তা টাকায় পরিশোধ করতে হয়, যা রিজার্ভের ওপর চাপ সৃষ্টি করে। তাই বৈদেশিক ঋণ সীমিত রাখা উচিত।”
বিডার নির্বাহী সদস্য (বিনিয়োগ উন্নয়ন) নাহিয়ান রহমান রচি জানান, “২০২৪ সাল পর্যন্ত সব বিদেশি ঋণ অনুমোদন বিডার মাধ্যমে হতো। তবে ২০২৪ সালের চতুর্থ প্রান্তিকে বিনিয়োগ সংস্কার উদ্যোগের অংশ হিসেবে ঋণ অনুমোদনের প্রক্রিয়া সহজ করা হয়েছে। তিন বছরের মেয়াদ পর্যন্ত ঋণের জন্য কোম্পানিগুলো সরাসরি অনুমোদিত ব্যাংকের মাধ্যমে আবেদন করতে পারে। তাই ২০২৪-২৫ অর্থবছরের সংখ্যা শুধু তিন বছরের বেশি মেয়াদের ঋণকে অন্তর্ভুক্ত করেছে, সেজন্য সরাসরি তুলনা করা সমতুল্য নয়।”
তবে সংশ্লিষ্ট সূত্র জানায়, ঋণ অনুমোদন প্রক্রিয়ার পরিবর্তন ছাড়াও বেসরকারি খাতে ঋণের কম অনুমোদন প্রধানত উচ্চ সুদ ও ডলারের বিপরীতে টাকার পতনের কারণে হয়েছে। করোনার আগে বৈদেশিক ঋণের সুদের হার ছিল ৫–৬ শতাংশ, যা এখন বেড়ে ৮–৯ শতাংশে দাঁড়িয়েছে। পাশাপাশি ফেডারেল রিজার্ভ ব্যাংকের রেফারেন্স রেট ০.০৫ শতাংশ থেকে বেড়ে ৪–৫ শতাংশ হয়েছে। মার্জিন যোগ করলে ঋণের ব্যয় আগের তুলনায় অনেক বেড়ে গেছে।
ডলারের বিপরীতে টাকার মানও উল্লেখযোগ্যভাবে কমেছে। আগে এক ডলারের বিনিময় হার ছিল ৮০ টাকা, এখন তা বেড়ে ১২০ টাকায় দাঁড়িয়েছে। উদাহরণ হিসেবে, পাঁচ শতাংশ সুদে ১০০ ডলার ঋণ নিলে আগে খরচ হতো ৪০০ টাকা, এখন তা বেড়ে দাঁড়িয়েছে ৬০০ টাকায়।
সূত্র আরও জানায়, বিদেশি বিনিয়োগকারীরা বাংলাদেশে ঋণ নেওয়ার ক্ষেত্রে নানা সমস্যার মুখোমুখি হওয়ার কারণে তাদের নিজ দেশে ঋণ নেওয়া শুরু করেছে। ধীরে ধীরে দেশীয় উদ্যোকররাও বিদেশি ঋণে আগ্রহী হয়েছে। দেশে ব্যাংকের সুদের হার বেশি হওয়ায় এবং টাকার স্থিতিশীলতার কারণে বিদেশি ঋণের চাহিদা বাড়ছে। তবে বিদেশি ঋণ নেওয়ার ক্ষেত্রে বাছাই কমিটি অনুমোদন দেয় এবং বিডার মাধ্যমে আনুষ্ঠানিক আবেদন করতে হয়।

