দেশের অর্থনীতি বর্তমানে নাজুক সময় পার করছে। কর্মসংস্থানের সুযোগ কমে গেছে, বেকারত্ব বৃদ্ধি পাচ্ছে। বিনিয়োগ স্থবির, বেসরকারি ঋণপ্রবাহও গতিময় নয়। রপ্তানি আয়ে নেতিবাচক ধারা, মূল্যস্ফীতি কমছে না, আর রাজস্ব আদায়ে ঘাটতি বাড়ছে। সরকারের অর্থনৈতিক সংকটও কমছে না।
তবুও সরকারি উপদেষ্টাদের একাংশের বক্তব্য বলছে, দেশের অর্থনীতি ভালো অবস্থানে আছে। তারা আশা করছেন, নির্বাচিত সরকারের অধীনে নতুন পে-স্কেল কার্যকর হলে দেশের অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডে স্থিতিশীলতা আসবে। গত ছয় মাসে অনুমোদিত প্রায় ৯৫ হাজার কোটি টাকার প্রকল্প বাস্তবায়নেও কোনো বাধা হবে না বলে তারা মনে করছেন। উপদেষ্টাদের মতে, এই প্রক্রিয়ায় মোট দেশজ উৎপাদনের (জিডিপি) প্রবৃদ্ধিও বাড়তে পারে।
অর্থনীতির বিশ্লেষকরা এই ধরণের মন্তব্যকে সমালোচনা করেছেন। তারা বলছেন, সরকারের কণ্ঠস্বরে প্রদত্ত “অর্থনীতি ভালো আছে” বক্তব্য বাস্তবতার সঙ্গে পুরোপুরি খাপ খায় না। প্রবৃদ্ধি এবং প্রকল্প বাস্তবায়নের হিসাব নিয়ে বিশ্লেষকরা ভিন্ন মত প্রকাশ করেছেন। নির্বাচিত সরকার এলেও এ সংকট কাটিয়ে অর্থনীতিতে কবে সত্যিকার গতি আসবে, তা এখনও অনিশ্চিত।
সম্প্রতি অর্থ উপদেষ্টা ড. সালেহউদ্দিন আহমেদ গণমাধ্যমকে বলেছেন, “অর্থনীতি আগের চেয়ে ভালো অবস্থায় আছে। নির্বাচিত সরকার নতুন পে-স্কেল অনুযায়ী বেতন প্রদানের জন্য বরাদ্দ রেখেছে।” তবে বিশেষজ্ঞরা মনে করেন, বরাদ্দ থাকা সত্ত্বেও বাস্তবায়ন এবং প্রকল্প বাস্তবায়নের ফলাফল অর্থনীতিতে তাত্ক্ষণিক প্রভাব আনবে কি না, তা সময়ের সঙ্গে স্পষ্ট হবে।
বাংলাদেশ উন্নয়ন গবেষণা প্রতিষ্ঠান বিআইডিএসের সাবেক মহাপরিচালক ও অর্থনীতির বিশ্লেষক ড. মোস্তফা কে. মুজেরী বলেন, “দেশের অর্থনীতি বিপর্যস্ত। সরকারি হিসাব মেলানোর জন্য কিছু প্রাক্কলন করা হলেও তা বাস্তবতার সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ হবে না। নির্বাচিত সরকার এলেও রাতারাতি দেশে বিনিয়োগ বাড়বে না। শিল্প-কারখানা নির্মাণে সময় লাগবে। রাজস্ব আয় বাড়বে না। বর্তমান অর্থনৈতিক পরিস্থিতিতে সরকারি কর্মচারীদের বেতনের বাড়তি অর্থ জোগানো এবং প্রকল্প বাস্তবায়ন নতুন সরকারের জন্য কঠিন হবে। অর্থনীতির সংকট না কাটলে জিডিপির প্রবৃদ্ধি বাড়বে না।”
সাবেক তত্ত্বাবধায়ক সরকারের অর্থ উপদেষ্টা এ বি মির্জ্জা মোহাম্মদ আজিজুল ইসলামও মনে করেন, “অর্থনীতির প্রায় সব সূচকেই নেতিবাচক ধারা বিরাজ করছে। ক্ষত সারাতে বেসরকারি খাতে দেশি ও বিদেশি বিনিয়োগ বাড়ানো, বেকারত্ব দূর করা এবং মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণ করা জরুরি। ধাপে ধাপে অর্থনীতিতে গতি আনা সম্ভব, তবে কতদিনে সংকট দূর হবে, তা অনিশ্চিত। অর্থনীতিতে ইতিবাচক প্রভাব পড়লে জিডিপিতেও প্রবৃদ্ধি আসবে।”
পরিসংখ্যানও কিছুটা সতর্ক। বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরো (বিবিএস) জানিয়েছে, চলতি অর্থবছরের প্রথম প্রান্তিকে (জুলাই-সেপ্টেম্বর) জিডিপি প্রবৃদ্ধি ছিল ৪.৫ শতাংশ। অর্থাৎ, গত বছরের একই সময়ের তুলনায় দেশের অর্থনীতিতে সামান্য বৃদ্ধি হয়েছে। বিশ্বব্যাংকের ‘গ্লোবাল ইকোনমিক প্রসপেক্টাস’ জানুয়ারি সংস্করণে পূর্বাভাস দেওয়া হয়েছে, চলতি অর্থবছরে জিডিপি প্রবৃদ্ধি হতে পারে ৪.৬ শতাংশ এবং পরের অর্থবছরে ৬.১ শতাংশ পর্যন্ত।
বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন, সংক্ষিপ্তমেয়াদে এই প্রবৃদ্ধি সীমিত এবং দেশের অর্থনীতি এখনও ঝুঁকিপূর্ণ। মূল চ্যালেঞ্জ হিসেবে দাঁড়াচ্ছে বেসরকারি বিনিয়োগ বাড়ানো, বেকারত্ব কমানো এবং রাজস্ব আয় বৃদ্ধি করা, যা ব্যর্থ হলে জিডিপির ধারাবাহিক প্রবৃদ্ধি নিশ্চিত করা সম্ভব হবে না।
অর্থনীতির বিশ্লেষকরা জানান, একটি দেশের অভ্যন্তরে এক বছরে চূড়ান্তভাবে উৎপাদিত দ্রব্য ও সেবা বাজারের সামষ্টিক মূল্যই হচ্ছে জিডিপি। নির্দিষ্ট সময়ে দেশের অর্থনীতিতে পণ্য ও সেবার উৎপাদন বৃদ্ধিকেই জিডিপির প্রবৃদ্ধি বলা হয়। বাংলাদেশের জিডিপি হিসাব করা হয় প্রধান পাঁচটি খাত থেকে—উৎপাদন, পাইকারি ও খুচরা ব্যবসা, পরিবহন, নির্মাণ এবং কৃষি। তবে নতুন কিছু খাতও যুক্ত হয়েছে।
দেশের ব্যবসায়ীদের শীর্ষ সংগঠন এফবিসিসিআইয়ের সাবেক সভাপতি মীর নাসির হোসেন বলেন, “বিনিয়োগ নেই, কর্মসংস্থান নেই, ব্যবসা-বাণিজ্য হচ্ছে না। রাজস্ব আয় কীভাবে বাড়বে? সামষ্টিক অর্থনীতির সূচকগুলোর প্রায় সবই নিম্নমুখী। গত কয়েক বছর ধরে দেশের অর্থনীতি ধীরে ধীরে খারাপ হয়েছে। বর্তমানে এটি তলানিতে নেমেছে।”
এদিকে, বাংলাদেশ নিটওয়্যার ম্যানুফ্যাকচারার্স অ্যান্ড এক্সপোর্টার্স অ্যাসোসিয়েশনের (বিকেএমইএ) সভাপতি মোহাম্মদ হাতেম বলেন, “বিনিয়োগের অর্থ ফেরতের নিশ্চয়তা না থাকলে কেউ শিল্প বা ব্যবসা-বাণিজ্যে অর্থ ব্যয় করবে না। বর্তমানে বেশির ভাগ নীতি ব্যবসাবান্ধব নয়। ব্যবসায়ীদের পরামর্শ ছাড়াই শ্রম আইন সংশোধন করা হয়েছে। ব্যাংক ঋণের সুদ হারে কোনো ছাড় নেই। এলসি খোলাতেও কড়াকড়ি রয়েছে। রাজনৈতিক পরিস্থিতি অস্থিতিশীল। সম্প্রতি চট্টগ্রাম বন্দর অচল হয়ে পড়েছে, যা আন্তর্জাতিক গণমাধ্যমেও আলোচিত হয়েছে। এতে বিদেশি বিনিয়োগকারীরা বাংলাদেশে আসতে নিরুৎসাহিত হবেন।”
বিশ্লেষকরা মনে করছেন, নির্বাচিত সরকার দায়িত্ব গ্রহণ করলেও দেশের অর্থনীতির সংকট কাটিয়ে ওঠার জন্য সময় লাগবে। বিশ্বব্যাংক, এডিবি বা সরকার যেভাবে জিডিপির প্রবৃদ্ধি বাড়ার পূর্বাভাস দেয়, তা বাস্তবায়নে সীমাবদ্ধতা রয়ে গেছে। বর্তমানে দেশের অর্থনৈতিক পরিস্থিতিতে কোনোভাবেই জিডিপির প্রবৃদ্ধি উল্লেখযোগ্যভাবে বাড়বে না।
জাতীয় রাজস্ব বোর্ড (এনবিআর)-এর সর্বশেষ হিসাব অনুযায়ী, গত জানুয়ারি পর্যন্ত রাজস্ব ঘাটতি ৫০ হাজার কোটি টাকা ছাড়িয়েছে। পরিসংখ্যানেও দেখা যায়, কোভিডের বছর বাদ দিলে গত ২৫ বছরের মধ্যে সর্বনিম্ন জিডিপি প্রবৃদ্ধি হয়েছে ৩.৬৯ শতাংশ। অর্থনীতির বিশ্লেষকরা মন্তব্য করেছেন, গত এবং চলতি অর্থবছরের সামষ্টিক অর্থনীতির সূচকগুলো প্রায় একই রকম। চলতি অর্থবছরে জিডিপির সামান্য বৃদ্ধি অর্থনীতিতে তাত্ক্ষণিক প্রভাব ফেলতে পারবে না।
বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর (বিবিএস) তথ্য অনুযায়ী, এক দশক ধরেই দেশে বেকারের সংখ্যা ২৫ থেকে ২৭ লাখের মধ্যে। তবে গত কয়েক বছরে বাণিজ্য চক্রজনিত বেকারত্ব বৃদ্ধি পাচ্ছে।
হা-মীম গ্রুপের চেয়ারম্যান ও ব্যবস্থাপনা পরিচালক এ কে আজাদ জানান, “দেশের ব্যাংকিং খাতের বর্তমান অবস্থা অত্যন্ত সংকটজনক। প্রতিবছর অন্তত ৩০ লাখ মানুষ নতুনভাবে শ্রমবাজারে প্রবেশ করছে। গত কয়েক বছরে ১৪ লাখ মানুষ বেকার হয়েছে। আগের বেকারের সঙ্গে নতুন বেকারদের সংযোজন অর্থনীতির ভারসাম্য নষ্ট করছে। জিডিপি প্রবৃদ্ধি এক বছর থেকে দেড় বছর পর ৬ শতাংশে আসতে হলে যে প্রস্তুতি প্রয়োজন, তা বর্তমান সরকারের পক্ষে করা কঠিন।”
ঢাকা চেম্বার অব কমার্স অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রির (ডিসিসিআই) সভাপতি ও ইফাদ গ্রুপের ভাইস চেয়ারম্যান তাসকীন আহমেদ বলেন, “দেশের শিল্প খাতে মোটাদাগে উৎপাদন ব্যয় ও ব্যবসায়িক খরচ বেড়েছে। সংশোধিত শ্রম আইনের কারণে ব্যবসায়িক পরিবেশ দুর্বল হয়েছে। বেসরকারি খাতে ঋণপ্রবাহ মাত্র ৬ শতাংশে আটকে আছে। বর্তমান সরকার ব্যবসায়ীদের পরামর্শ না নিয়ে অর্থনৈতিক সিদ্ধান্ত নিচ্ছে। সরকারের সঙ্গে ব্যবসায়ীদের দূরত্ব বাড়েছে। এই পরিস্থিতি থেকে বের হতে সময় লাগবে।”
বিশ্বব্যাংকের পূর্বাভাস অনুযায়ী, “জাতীয় নির্বাচন অনুষ্ঠিত হলে রাজনৈতিক অনিশ্চয়তা কমবে। নতুন সরকার কাঠামোগত সংস্কার বাস্তবায়ন করলে শিল্প খাত শক্তিশালী হবে এবং অর্থনীতিতে নতুন গতি আসবে। এতে জিডিপির প্রবৃদ্ধি বাড়তে পারে। তবে ঝুঁকি রয়ে গেছে—মূল্যস্ফীতি লক্ষ্যমাত্রার চেয়ে বেশি। মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণে মুদ্রানীতি কঠোর হওয়ায় ঋণের প্রবাহ কমেছে, যা ব্যবসা ও বিনিয়োগে নেতিবাচক প্রভাব ফেলছে।”
বিশ্লেষকরা মনে করছেন, দেশের অর্থনৈতিক সংকট দূর না হওয়া পর্যন্ত জিডিপি প্রবৃদ্ধি ও বিনিয়োগে উল্লেখযোগ্য প্রভাব আশা করা যাবে না। রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা, বেসরকারি বিনিয়োগ, ঋণপ্রবাহ বৃদ্ধি এবং ব্যবসায়িক পরিবেশ উন্নয়নই একমাত্র সম্ভাব্য পথ।

