বাংলাদেশ বর্তমানে একটি তীব্র জ্বালানি ও বিদ্যুৎ সংকটের মুখোমুখি। আন্তর্জাতিক বাজারে জ্বালানির উচ্চমূল্য, ডলারের অভাব এবং অতিরিক্ত আমদানি নির্ভরতার কারণে দেশীয় শিল্প, কৃষি এবং সাধারণ মানুষের দৈনন্দিন জীবন ব্যাপকভাবে প্রভাবিত হচ্ছে। এটি কোনো ভবিষ্যতের আশঙ্কা নয়—বর্তমান বাস্তবতা।
দেশীয় গ্যাস উৎপাদন কমে যাওয়ায় এলএনজি আমদানির ওপর সম্পূর্ণ নির্ভরতা তৈরি হয়েছে। এর ফলে বিদ্যুৎ উৎপাদন, শিল্প খাত এবং গৃহস্থালিতে গ্যাস ও এলপিজি সরবরাহ ঘাটতির মুখে পড়েছে। সরকারের পরিসংখ্যান অনুযায়ী, দেশের বিদ্যুৎ উৎপাদনের সক্ষমতা প্রায় ২৮ হাজার মেগাওয়াট হলেও সর্বোচ্চ চাহিদার সময় গড়ে মাত্র ১৪–১৫ হাজার মেগাওয়াট বিদ্যুৎ সরবরাহ সম্ভব হচ্ছে।
এই বৈপরীত্য প্রকাশ করে দেশের জ্বালানি খাতের সমস্যার গভীরতা। প্রাকৃতিক গ্যাসের ঘাটতি সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ হিসেবে সামনে এসেছে। মোট বিদ্যুৎ উৎপাদনের প্রায় ৫৫–৬০ শতাংশ গ্যাসনির্ভর হলেও দৈনিক চাহিদা প্রায় ৪ হাজার মিলিয়ন ঘনফুট (এমএমসিএফডি), সরবরাহ নেমে এসেছে ২৭০০–২৮০০ এমএমসিএফডি-তে। অর্থাৎ প্রতিদিন প্রায় ১ হাজার এমএমসিএফডি গ্যাসের ঘাটতি দেখা দিচ্ছে, যা বিদ্যুৎকেন্দ্র, শিল্প প্রতিষ্ঠান এবং গৃহস্থালির ব্যবহারকে প্রভাবিত করছে।
এই সংকট দীর্ঘস্থায়ী হলে শিল্প উৎপাদন ক্ষতিগ্রস্ত হবে, কর্মসংস্থান হ্রাস পাবে এবং জনগণের দৈনন্দিন জীবন আরও ব্যাহত হবে। তদুপরি, কৃষি খাতেও জ্বালানির ঘাটতি সরাসরি প্রভাব ফেলছে, যা খাদ্য উৎপাদন ও বাজারমূল্যের ওপর চাপ সৃষ্টি করছে। সরকার একসময় বিদ্যুৎ উদ্বৃত্ত এবং জ্বালানি স্বনির্ভরতার গল্প শোনালেও বাস্তব চিত্র বিপরীত। এখন সময় এসেছে কার্যকর পদক্ষেপ নেওয়ার, যাতে কাগজে-কলমে বিদ্যুৎ সক্ষমতার সাথে বাস্তব সরবরাহের ফারাক দূর করা যায় এবং দেশের অর্থনীতি ও মানুষের জীবনযাত্রা সংরক্ষণ করা যায়।
বাংলাদেশে গ্যাসক্ষেত্রের উৎপাদন ক্রমেই কমছে। ২০১০ সালে যেখানে দৈনিক গ্যাস উৎপাদন ছিল প্রায় ২,৩০০ মিলিয়ন ঘনফুট (এমএমসিএফডি), বর্তমানে তা নেমে এসেছে প্রায় ১,৮০০ এমএমসিএফডির নিচে। নতুন গ্যাসক্ষেত্রের অনুসন্ধান ও উন্নয়নে দীর্ঘদিন কার্যকর উদ্যোগ না থাকায় এই পতন আরও ত্বরান্বিত হয়েছে।
স্থানীয় উৎপাদনের ঘাটতি মেটাতে বিকল্প হিসেবে এলএনজি আমদানির ওপর নির্ভরতা বাড়ানো হয়েছে। তবে এটি ব্যয়বহুল এবং বৈদেশিক মুদ্রার ওপর নির্ভরশীল। পরিসংখ্যান অনুযায়ী, বাংলাদেশ বছরে গড়ে ৮–৯ মিলিয়ন টন এলএনজি আমদানি করে, যার জন্য ব্যয় হয় ৫–৭ বিলিয়ন মার্কিন ডলার। আন্তর্জাতিক বাজারের দরের সঙ্গে ডলারের মূল্যবৃদ্ধি সরকারের জন্য চরম চাপ সৃষ্টি করেছে। অনেক সময় নির্ধারিত পরিমাণ এলএনজি আমদানিও সম্ভব হচ্ছে না, যার সরাসরি প্রভাব পড়ছে বিদ্যুৎ ও গ্যাস সরবরাহে।
বর্তমান চাহিদা-সাপ্লাই পরিস্থিতি উদ্বেগজনক। দেশে দৈনিক গ্যাসের চাহিদা প্রায় ৩৮০ কোটি ঘনফুট, কিন্তু সরবরাহ হচ্ছে মাত্র ২৫৮ কোটি ঘনফুট। ফলে প্রতিদিন গ্যাস ঘাটতি দাঁড়িয়েছে ১২২ কোটি ঘনফুটে। তুলনামূলকভাবে, গত বছরের একই সময়ে গ্রিডে গ্যাস সরবরাহ ছিল ২৭৫ কোটি ঘনফুট। গ্যাস উত্তোলনে নিয়োজিত পাঁচ কোম্পানির মধ্যে চারটির উৎপাদন গত এক বছরে হ্রাস পেয়েছে।
স্থানীয় উৎপাদনের ঘাটতি পূরণের জন্য বিপুল অর্থে এলএনজি আমদানি করা হচ্ছে। চলতি ২০২৫–২৬ অর্থবছরে জ্বালানি বিভাগ অন্তত ১১৫ কার্গো এলএনজি আমদানির উদ্যোগ নিয়েছে, যার ব্যয় সাড়ে ৫১ হাজার কোটি টাকা। তবে আন্তর্জাতিক সরবরাহ চেইন এবং বৈশ্বিক বাজারের অনিশ্চয়তা থাকায় প্রতিটি কার্গো নির্ধারিত সময়ে পৌঁছানো কঠিন। জ্বালানি বিশেষজ্ঞ এবং ব্যবসায়ীরা আশঙ্কা করছেন, বৈশ্বিক কৌশলগত চাপ বা বাজারে অস্থিরতা দেশে গভীর জ্বালানি সংকট সৃষ্টি করতে পারে।
এদিকে এলপিজি সংকটও নতুন সমস্যা হিসেবে দেখা দিয়েছে। বিশ্ববাজার থেকে এলপিজি আমদানি বিভিন্ন প্রতিষ্ঠান ও জাহাজে যুক্তরাষ্ট্রের স্যাংশনের প্রভাবের কারণে বিঘ্নিত হচ্ছে। এর ফলে গৃহস্থালি এবং শিল্প খাতে জ্বালানি সরবরাহ ব্যাহত হচ্ছে, যা দেশের অর্থনীতি ও সাধারণ মানুষের জীবনযাত্রায় চাপ বাড়াচ্ছে।
বাংলাদেশের জ্বালানি সংকট শুধু বিদ্যুৎ বিভ্রাট বা গ্যাস সরবরাহে সমস্যা সীমাবদ্ধ নয়। এটি সরাসরি আঘাত হানে দেশের অর্থনীতি, শিল্প উৎপাদন, কর্মসংস্থান, কৃষি খাত এবং সাধারণ মানুষের দৈনন্দিন জীবনযাত্রায়। উন্নয়নশীল দেশ হিসেবে শক্তি নিরাপত্তা রাষ্ট্রের সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার হওয়া উচিত হলেও, পরিকল্পনাহীনতা, আমদানি নির্ভরতা এবং দুর্বল শাসনব্যবস্থার কারণে জ্বালানি খাত আজ সংকটের কেন্দ্রবিন্দুতে পরিণত হয়েছে।
এই সংকটের সবচেয়ে প্রভাবশালী চিত্র দেখা গেছে এলপিজি বাজারে। হঠাৎ করেই বাজার থেকে ১২ কেজির এলপিজি সিলিন্ডার উধাও হয়ে যায়। সরকারি দামে যেখানে এটি প্রায় ১,২০০ টাকায় পাওয়া যেত, বাস্তব বাজারে বিক্রি হচ্ছে ২,২০০ থেকে ২,৫০০ টাকায়, কখনো কোথাও আরও বেশি। পাইপলাইনের গ্যাস সংকটকে সুযোগ হিসেবে ব্যবহার করে কিছু আমদানিকারক ও পরিবেশক দীর্ঘদিন ধরে এলপিজি বাজারে একচেটিয়া প্রভাব বিস্তার করছে।
শীতকালে চাহিদা বেড়ে যাওয়াকে দ্বিগুণ দামে বিক্রি করার যুক্তি কোনোভাবেই গ্রহণযোগ্য নয়। এটি স্পষ্ট করে দেয় নিয়ন্ত্রণহীন বাজার ও দুর্বল নজরদারির বাস্তবতা। এর ফলে মধ্যবিত্ত ও নিম্নআয়ের পরিবারগুলো সবচেয়ে বেশি ভোগান্তিতে পড়েছে। মৌলিক প্রয়োজন যেমন রান্নার জন্যও তারা অতিরিক্ত খরচ করতে বাধ্য হচ্ছে। সরকারের কঠোর নজরদারির ফলাফল শতভাগ কার্যকর হয়নি, ফলে সাধারণ মানুষের জীবনে সংকট এখনো অব্যাহত।
জ্বালানি বিশেষজ্ঞরা সতর্ক করেছেন, চলতি অবস্থায় এ সংকট দীর্ঘস্থায়ী হলে শিল্প উৎপাদন, কৃষি, ব্যবসা এবং দৈনন্দিন জীবন আরও ক্ষতিগ্রস্ত হবে। এ পরিস্থিতি মোকাবিলায় কার্যকর নীতি, স্থানীয় উৎপাদন বৃদ্ধি এবং বাজারে স্বচ্ছতা আনাই একমাত্র সমাধান হিসেবে চিহ্নিত করা হচ্ছে।
বাংলাদেশে জ্বালানি সংকট কেবল বিদ্যুৎ বা গ্যাসের ঘাটতি নয়; এটি রাষ্ট্র পরিচালনার দক্ষতা, দূরদর্শিতা এবং জাতীয় নীতি পরীক্ষা করার বিষয়। আজ যে সংকট দেখা দিচ্ছে, তা উপেক্ষা করলে আগামীতে পরিস্থিতি আরও ভয়াবহ হতে পারে। বিশেষজ্ঞরা মনে করাচ্ছেন, যদি বাংলাদেশ সত্যিকার অর্থে টেকসই উন্নয়নের পথে এগোতে চায়, তবে জ্বালানি নিরাপত্তাকে রাজনৈতিক স্লোগান নয়, জাতীয় অগ্রাধিকার হিসেবে নিতে হবে।
এক দশক আগে বাংলাদেশ বিদ্যুৎ উৎপাদনে স্বয়ংসম্পূর্ণতার গল্প শোনাত। ‘লোডশেডিংমুক্ত দেশ’ এই স্লোগান তখন রাজনৈতিক প্রচারণার অংশ হিসেবে জনপ্রিয় হয়ে ওঠে। কিন্তু বাস্তব চিত্র ভিন্ন ছিল। বিদ্যুৎ উৎপাদন ক্ষমতা বাড়লেও জ্বালানি সরবরাহের টেকসই ব্যবস্থা তৈরি হয়নি। গ্যাস অনুসন্ধান স্থবির, কয়লা উত্তোলন রাজনৈতিক বিতর্কে আটকা, নবায়নযোগ্য জ্বালানিতে বিনিয়োগ নামমাত্র।
ফলে বিদ্যুৎকেন্দ্র থাকলেও জ্বালানি সংকটে কেন্দ্রগুলো চালানো যায় না। গ্যাসচালিত বিদ্যুৎকেন্দ্র প্রয়োজনীয় জ্বালানি পাচ্ছে না, আর তরল জ্বালানিনির্ভর কেন্দ্রগুলো চালাতে সরকারকে বিপুল ভর্তুকি দিতে হচ্ছে। আন্তর্জাতিক বাজারে এলএনজি ও তেলের দাম বাড়লে আমদানিনির্ভর দেশের জ্বালানি নিরাপত্তা কতটা নাজুক, তা সাম্প্রতিক বছরগুলোতে বারবার প্রমাণিত হয়েছে।
সংকটের সবচেয়ে বড় প্রভাব পড়েছে শিল্পখাতে। তৈরি পোশাক শিল্প, যা দেশের মোট রপ্তানি আয়ের প্রায় ৮৪ শতাংশ যোগান দেয়, সেখানে গ্যাস ও বিদ্যুৎ সংকট উৎপাদন ব্যাহত করছে। বিভিন্ন শিল্প সংগঠনের তথ্য অনুযায়ী, গ্যাসের স্বল্পতার কারণে অনেক কারখানা ৩০–৪০ শতাংশ সক্ষমতায় চলছে। উৎপাদন খরচ বেড়ে যাচ্ছে, সময়মতো রপ্তানি আদেশ পূরণ করা কঠিন হয়ে পড়ছে। আন্তর্জাতিক বাজারে বাংলাদেশের প্রতিযোগিতা সক্ষমতা কমছে। অনেক কারখানা অর্ধেক সক্ষমতায় চলছে, কোথাও কোথাও সম্পূর্ণ উৎপাদন বন্ধ। এর প্রভাব পড়ছে রপ্তানি আয় ও কর্মসংস্থানের ওপর। শ্রমিক ছাঁটাই, ওভারটাইম বাতিল, উৎপাদন খরচ বৃদ্ধি—সব মিলিয়ে শিল্প খাত আজ চরম অনিশ্চয়তায়।
ক্ষুদ্র ও মাঝারি শিল্পখাতের অবস্থা সবচেয়ে শোচনীয়। নিয়মিত লোডশেডিং ও গ্যাস সংকটে উৎপাদন বন্ধ রাখতে বাধ্য হওয়ায় লাখ লাখ শ্রমিক আংশিক বা সম্পূর্ণভাবে কর্মহীনতার ঝুঁকিতে। কৃষি খাতও অক্ষুণ্ণ নয়। সেচের জন্য বিদ্যুৎ ও ডিজেলের ওপর নির্ভরতা বেড়েছে, জ্বালানির দাম বাড়ায় কৃষকের উৎপাদন খরচ বেড়ে গেছে। এর প্রভাব বাজারে খাদ্যের মূল্যে পড়ছে। জ্বালানি সংকট মূল্যস্ফীতি ত্বরান্বিত করছে, যার বোঝা শেষ পর্যন্ত সাধারণ মানুষের কাঁধে পড়ে।
সাম্প্রতিক পরিস্থিতি প্রমাণ করে, জ্বালানি সংকট এখন কেবল খাতভিত্তিক সমস্যা নয়। এটি দেশের অর্থনীতি, কর্মসংস্থান এবং মানুষের দৈনন্দিন জীবনযাত্রাকে সরাসরি প্রভাবিত করছে। তাই সময়োপযোগী পদক্ষেপ, স্থানীয় উৎপাদন বৃদ্ধি এবং বাজারে স্বচ্ছতা আনা ছাড়া এই সংকট মোকাবিলা করা কঠিন।
সাম্প্রতিক সময়ে নগর জীবনে বিদ্যুৎ বিভ্রাট নিত্যদিনের ঘটনা হয়ে উঠেছে। বিশেষ করে গ্রীষ্মকালে দীর্ঘ লোডশেডিং জনজীবনকে অসহনীয় করে তোলে। শিশু, বৃদ্ধ ও অসুস্থরা সবচেয়ে বেশি কষ্ট ভোগ করছে। শিক্ষা, স্বাস্থ্য ও তথ্যপ্রযুক্তি—সব খাতেই বিদ্যুতের ওপর নির্ভরতা বেড়েছে। অথচ নিরবচ্ছিন্ন বিদ্যুৎ সরবরাহ নিশ্চিত করা যাচ্ছে না। গ্রামাঞ্চলেও অবস্থা ভিন্ন নয়; বিদ্যুৎ থাকলেও ভোল্টেজ ওঠানামা কৃষি ও গৃহস্থালি কাজে বড় বাধা হয়ে দাঁড়াচ্ছে।
বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর তথ্য অনুযায়ী, সাম্প্রতিক সময়ে খাদ্য মূল্যস্ফীতি প্রায় ১০ শতাংশে দাঁড়িয়েছে। এর পেছনে অন্যতম কারণ জ্বালানি ব্যয় বৃদ্ধি। পরিবহন ও সংরক্ষণ খরচ বেড়ে যাওয়ায় সাধারণ মানুষের জীবনযাত্রার ব্যয় উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়েছে।
তবে এই সংকট হঠাৎ করে এসেছে বলে ধরে নেওয়া যাবে না। এটি দীর্ঘদিনের ভুল নীতি, পরিকল্পনার অভাব এবং অবহেলার ফল। দেশীয় গ্যাস অনুসন্ধানে বিনিয়োগ না বাড়িয়ে আমদানিনির্ভর এলএনজির ওপর নির্ভর হওয়া ছিল ঝুঁকিপূর্ণ সিদ্ধান্ত। কয়লা উত্তোলনের বিষয়ে সুস্পষ্ট ও সাহসী পদক্ষেপ না নেওয়াও সংকটকে ঘনীভূত করেছে। নবায়নযোগ্য জ্বালানি—বিশেষ করে সৌর ও বায়ু শক্তি—এখনও জাতীয় গ্রিডে উল্লেখযোগ্য অবদান রাখতে পারেনি।
জ্বালানি খাতে স্বচ্ছতা ও জবাবদিহির অভাবও সমস্যা বাড়িয়েছে। বিদ্যুৎকেন্দ্র স্থাপনের পর অতিরিক্ত সক্ষমতা থাকলেও তা যথাযথভাবে ব্যবহার করা হয়নি। ক্যাপাসিটি চার্জের নামে বিপুল অর্থ পরিশোধ করতে হয়েছে, যা রাষ্ট্রীয় কোষাগারের ওপর চাপ সৃষ্টি করেছে। এই অর্থ যদি দেশীয় গ্যাস অনুসন্ধান বা নবায়নযোগ্য খাতে বিনিয়োগ হতো, তবে আজকের পরিস্থিতি ভিন্ন হতে পারত। বৃহত্তর অর্থনৈতিক ও সামাজিক প্রভাব স্পষ্ট। বিদ্যুৎ বিভ্রাট ও জ্বালানি সংকট শুধু শিল্প বা নগর জীবনকে নয়, কৃষি, ব্যবসা এবং সাধারণ মানুষের দৈনন্দিন জীবনকে সরাসরি প্রভাবিত করছে।
বাংলাদেশের জ্বালানি সংকট কেবল বিদ্যুৎ বা গ্যাসের ঘাটতি নয়। এটি দেশের অর্থনীতি, শিল্প, কৃষি, নাগরিক জীবন এবং বৈদেশিক মুদ্রার ওপর সরাসরি চাপ সৃষ্টি করছে। এলএনজি, তেল ও কয়লা আমদানিতে বিপুল বৈদেশিক মুদ্রা ব্যয় হচ্ছে। ডলারের অভাবে এই ব্যয় সামাল দেওয়া আরও কঠিন হয়ে উঠেছে। এর ফলে সরকারকে জ্বালানি আমদানি সীমিত করতে হচ্ছে, অন্যদিকে বিদ্যুৎ ও গ্যাসের দাম বাড়াতে হচ্ছে। এই মূল্যবৃদ্ধি আবার সামগ্রিক অর্থনীতিতে মূল্যস্ফীতির চাপ আরও বাড়াচ্ছে।
সংকট যতই গভীর হোক, এটি কাটিয়ে ওঠার পথ আছে—যদি রাজনৈতিক সদিচ্ছা ও দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা থাকে। প্রথমত, দেশীয় গ্যাস ও কয়লা অনুসন্ধান ও উত্তোলনে জোর দিতে হবে। আধুনিক প্রযুক্তি ব্যবহার করে পরিবেশগত ঝুঁকি কমিয়ে এই সম্পদ কাজে লাগানো সম্ভব।
দ্বিতীয়ত, নবায়নযোগ্য জ্বালানিতে বড় পরিসরে বিনিয়োগ বাড়াতে হবে। ছাদভিত্তিক সৌর বিদ্যুৎ, ভাসমান সৌর প্রকল্প, উপকূলীয় বায়ু বিদ্যুৎ—এসব সম্ভাবনা কাজে লাগাতে হলে নীতিগত সহায়তা ও প্রণোদনা প্রয়োজন।
তৃতীয়ত, জ্বালানি ব্যবহারে দক্ষতা বাড়ানো জরুরি। শিল্প, পরিবহন ও গৃহস্থালি পর্যায়ে শক্তি সাশ্রয়ী প্রযুক্তি ব্যবহারকে উৎসাহ দিতে হবে। গণপরিবহন উন্নত করে ব্যক্তিগত যানবাহনের জ্বালানি ব্যবহার কমানোও গুরুত্বপূর্ণ। একই সঙ্গে বিদ্যুৎ ও গ্যাস খাতে দুর্নীতি ও অপচয় রোধে কঠোর ব্যবস্থা নিতে হবে।
জ্বালানি সংকট কেবল একটি খাতের সমস্যা নয়; এটি রাষ্ট্র পরিচালনার দক্ষতা ও দূরদর্শিতার পরীক্ষা। আজ যে সংকট দেখা দিচ্ছে, তা উপেক্ষা করলে আগামী দিনে পরিস্থিতি আরও ভয়াবহ হতে পারে। বাংলাদেশের টেকসই উন্নয়নের জন্য জ্বালানি নিরাপত্তাকে রাজনৈতিক স্লোগান নয়, জাতীয় অগ্রাধিকার হিসেবে বিবেচনা করা আবশ্যক। সময় এখনই সিদ্ধান্ত নেওয়ার, নইলে গভীর সংকটে পড়বে দেশ—অন্ধকার আরও দীর্ঘ হতে পারে।

