রাজনৈতিক অনিশ্চয়তার প্রভাব সরাসরি পড়ছে দেশের অর্থনীতিতে। বিশেষ করে বেসরকারি খাতে ঋণ প্রবৃদ্ধি ক্রমেই ধীর হয়ে পড়ছে। কেন্দ্রীয় ব্যাংকের সর্বশেষ তথ্য বলছে, দুই দশকের মধ্যে সর্বনিম্ন পর্যায়ে নেমেছে এই প্রবৃদ্ধি। এতে নতুন বিনিয়োগ যেমন কমছে, তেমনি সংকুচিত হচ্ছে কর্মসংস্থানের সুযোগ।
গত ডিসেম্বর শেষে বেসরকারি খাতে ঋণ প্রবৃদ্ধি দাঁড়িয়েছে মাত্র ৬ দশমিক ১০ শতাংশে। বাংলাদেশ ব্যাংকের গত ২০ বছরের পরিসংখ্যান বিশ্লেষণে দেখা যায়, এর আগে এত কম প্রবৃদ্ধি আর কখনো হয়নি। সর্বনিম্ন প্রবৃদ্ধির আগের রেকর্ড ছিল গত বছরের অক্টোবরে, তখন হার ছিল ৬ দশমিক ২৩ শতাংশ। অর্থনীতিবিদদের মতে, এই ধারা অব্যাহত থাকলে উৎপাদন ও কর্মসংস্থানে আরও চাপ বাড়তে পারে।
ব্যাংকাররা বলছেন, বিনিয়োগকারীরা আপাতত অপেক্ষার কৌশল নিয়েছেন। নতুন রাজনৈতিক সরকারের ভবিষ্যৎ নীতি ও দিকনির্দেশনা স্পষ্ট না হওয়ায় উদ্যোক্তারা নতুন বিনিয়োগে যাচ্ছেন না। ফলে ঋণের চাহিদাও কমে গেছে।
বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্য অনুযায়ী, গত ডিসেম্বর শেষে বেসরকারি খাতে মোট ঋণস্থিতি দাঁড়িয়েছে ১৭ লাখ ৮৮ হাজার কোটি টাকায়। এক বছর আগে, ২০২৪ সালের ডিসেম্বরে এই অঙ্ক ছিল ১৬ লাখ ৮৫ হাজার ২৭১ কোটি টাকা। অর্থাৎ এক বছরে ঋণ বেড়েছে ১ লাখ ২ হাজার ৭৫৩ কোটি টাকা, যা শতাংশের হিসাবে ৬ দশমিক ১০। অথচ কেন্দ্রীয় ব্যাংকের মুদ্রানীতিতে ডিসেম্বর পর্যন্ত ঋণ প্রবৃদ্ধির লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়েছিল ৭ দশমিক ২ শতাংশ। নভেম্বর মাসেও প্রবৃদ্ধি ছিল তুলনামূলক বেশি, ৬ দশমিক ৫৮ শতাংশ। এমনকি ২০২০ সালে করোনা মহামারির চরম সংকটের সময়েও বেসরকারি খাতে ঋণ প্রবৃদ্ধি ছিল সাড়ে ৭ শতাংশের বেশি।
ব্যাংকার ও ব্যবসায়ীদের মতে, ঋণ প্রবৃদ্ধি কমে যাওয়ার পেছনে একাধিক কারণ কাজ করছে। আওয়ামী লীগ সরকারের পতনের পর বেনামি ঋণ কার্যত বন্ধ হয়ে যাওয়াকে একটি বড় কারণ হিসেবে দেখছেন তারা। পাশাপাশি আওয়ামী লীগ–সমর্থিত অনেক ব্যবসায়ী নতুন করে ঋণ পাচ্ছেন না। এর সঙ্গে যুক্ত হয়েছে পর্ষদ পরিবর্তনের মধ্য দিয়ে যাওয়া ১৪টি ব্যাংকের সতর্ক অবস্থান। এসব ব্যাংক নতুন ঋণ বিতরণ প্রায় স্থগিত রেখেছে।
রাজনৈতিক ও আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতিও বিনিয়োগ সিদ্ধান্তে প্রভাব ফেলছে। নির্বাচনকে ঘিরে আগে ও পরে অনেক ব্যবসায়ী নতুন প্রকল্পে যাওয়ার সিদ্ধান্ত পিছিয়ে দিচ্ছেন। আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি নিয়ে উদ্বেগ এখনো পুরোপুরি কাটেনি। এর পাশাপাশি মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণে বাংলাদেশ ব্যাংকের সংকোচনমূলক মুদ্রানীতির ফলে ঋণের সুদহার উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়েছে। এতে নতুন বিনিয়োগে আগ্রহ কমছে। গ্যাস ও বিদ্যুৎ সংকটের কারণে অনেক শিল্পকারখানা পূর্ণ সক্ষমতায় চলতে না পারায় বিনিয়োগ পরিবেশ আরও দুর্বল হয়ে পড়ছে।
খাতসংশ্লিষ্টরা বলছেন, মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণের পাশাপাশি বেসরকারি খাতকে সক্রিয় রাখা বাংলাদেশ ব্যাংকের অন্যতম দায়িত্ব। তবে বর্তমানে মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণে বেশি গুরুত্ব দেওয়ায় নীতি সুদহার বাড়ানো হয়েছে। এর ফলে ব্যাংক ঋণের সুদহার ১৪ থেকে ১৫ শতাংশে উঠে গেছে। চড়া সুদে ঋণ নিয়ে নতুন বিনিয়োগ বা ব্যবসা সম্প্রসারণে উদ্যোক্তারা আগ্রহ দেখাচ্ছেন না। উল্টো সুদহার বৃদ্ধির কারণে কিছু ভালো প্রতিষ্ঠানের ঋণও ঝুঁকিপূর্ণ হয়ে পড়ছে।
মিউচুয়াল ট্রাস্ট ব্যাংকের ব্যবস্থাপনা পরিচালক সৈয়দ মাহবুবুর রহমান বলেন, পরিবর্তিত রাজনৈতিক পরিস্থিতির কারণে বর্তমানে ঋণের চাহিদা খুবই কম। এ অবস্থায় অনেক ব্যাংক ট্রেজারি খাতে বিনিয়োগ করে মুনাফা ধরে রাখার চেষ্টা করছে। পাশাপাশি ভোক্তা ও ক্ষুদ্র ও মাঝারি খাতে ঋণের দিকে নজর বাড়ানো হচ্ছে।
তিনি আরও বলেন, একটি সুষ্ঠু ও গ্রহণযোগ্য নির্বাচনের মাধ্যমে রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা ফিরলে বিনিয়োগে আবার গতি আসতে পারে। তখন বেসরকারি খাতে নতুন ঋণের চাহিদাও বাড়বে। সে সময়ের জন্য ব্যাংকগুলোর এখন থেকেই প্রস্তুতি নেওয়া দরকার। বিশেষ করে আমানত বাড়ানোর দিকে মনোযোগ দেওয়া জরুরি।

