দেশের অর্থনীতি এখন কঠিন সংকটের মধ্যে আছে। শিল্প ও বাণিজ্য খাত ক্ষয়ে পড়ছে, বিনিয়োগ ঠেকেছে, বেসরকারি ঋণ প্রবাহ স্থবির। এই পরিস্থিতিতে ব্যবসায়ী নেতারা নির্বাচিত সরকারের কাছে দ্রুত কার্যকর পদক্ষেপ নেওয়ার দাবি জানিয়েছেন।
বিনিয়োগ ও শিল্প সম্প্রসারণে উদ্যোগের আহ্বান:
বাংলাদেশ চেম্বার অব ইন্ডাস্ট্রিজের (বিসিআই) সভাপতি আনোয়ার-উল আলম চৌধুরী জানান, “শিল্প খাতে ধস নেমেছে। নতুন শিল্প গড়ে উঠছে না। বেসরকারি খাতের ঋণ প্রবাহ মাত্র ৬ শতাংশে আটকে আছে। ব্যবসায়ীরা আয় না করতে পারলে রাজস্ব কীভাবে আদায় হবে? ফলে সরকারি রাজস্ব ঘাটতি বৃদ্ধি পাচ্ছে। মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণে আসছে না, পুঁজিবাজারে বিনিয়োগকারীদের আস্থা ফিরছে না।” তিনি নির্বাচিত সরকারের কাছে এসব সমস্যা দ্রুত সমাধানের আহ্বান জানিয়েছেন।
নীতি প্রণয়ন: জোর নয়, আলোচনা হতে হবে:
ব্যবসায়ীরা মনে করেন, বিনিয়োগ ও বাণিজ্যসংক্রান্ত নীতি চূড়ান্ত করার আগে তাদের সঙ্গে আলোচনা করা জরুরি। পাশাপাশি প্রতিবেশী দেশগুলোর সঙ্গে সমন্বিত বাণিজ্য, অর্থ পাচার নিয়ন্ত্রণ এবং বন্দরগুলোতে কার্যক্রমের দ্রুততা বাড়ানো সরকারের অগ্রাধিকার হওয়া উচিত।
অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতার জন্য পদক্ষেপ:
ঢাকা চেম্বার অব কমার্স অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রির (ডিসিসিআই) সভাপতি তাসকীন আহমেদ বলেন, “বেসরকারি খাতে আস্থা ফেরাতে প্রথমে আইনশৃঙ্খলা নিশ্চিত করতে হবে। এরপর ব্যবসা সহজীকরণ, সরবরাহ চেইন উন্নয়ন, জ্বালানি সরবরাহের স্থিতিশীলতা এবং ব্যাংকিং খাতের সংস্কার করতে হবে। এই মৌলিক ক্ষেত্রগুলোতে স্বচ্ছতা থাকলে উদ্যোক্তারা দীর্ঘমেয়াদি বিনিয়োগে আগ্রহী হবেন।”
ফরেন ইনভেস্টর চেম্বার অব কমার্স অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রির (ফিকি) সভাপতি রুপালী হক চৌধুরী বলেন, “স্থির রাজনৈতিক পরিবেশ বিনিয়োগ বাড়ানোর মূল চাবিকাঠি। নির্বাচিত সরকারের উচিত সব রাজনৈতিক দলকে নিয়ে সমন্বয় করা এবং ব্যবসায়ীদের সঙ্গে পরামর্শ করে অর্থনীতির সমস্যা চিহ্নিত করা।”
নারী উদ্যোক্তাদের অগ্রাধিকার:
উইমেন্স এন্টারপ্রেনার্স অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশের (ওয়েব) সভাপতি নাসরিন আউয়াল মিন্টু বলেন, “দেশের মোট জনসংখ্যার অর্ধেক নারী। তাদের পিছিয়ে রাখলে অর্থনীতি এগোবে না। নারী উদ্যোক্তাদের জন্য নিরাপদ পরিবেশ, প্রশিক্ষণ এবং সমান সুযোগ নিশ্চিত করতে হবে। রাজস্ব মওকুফ ও ফ্যামিলি কার্ড সহজলভ্য করা অত্যন্ত জরুরি।”
কর ও শুল্কনীতি:
উদ্যোক্তারা জানান, বারবার পরিবর্তিত কর ও শুল্কনীতির কারণে ব্যবসায়ীদের মধ্যে অনিশ্চয়তা সৃষ্টি হয়েছে। দীর্ঘসূত্রতা ও প্রশাসনিক জটিলতা বিনিয়োগে ধীরগতি ঘটাচ্ছে। তাই বাস্তবভিত্তিক কর সংস্কার, ভ্যাট ও শুল্ক কাঠামো সহজীকরণ এবং বিশেষ প্রণোদনা দেওয়া প্রয়োজন।
শ্রম, রপ্তানি ও বাজার সম্প্রসারণের চ্যালেঞ্জ:
নিট পোশাকশিল্প মালিকদের সংগঠন বিকেএমইএর সভাপতি মোহাম্মদ হাতেম বলেন, “বেকারত্ব মোকাবেলায় নতুন কর্মসংস্থান সৃষ্টির সঙ্গে বিনিয়োগ বাড়ানো প্রয়োজন। শিল্পকলকাঠামো গড়ে তোলা ও নতুন বাজার সম্প্রসারণ জরুরি। শ্রম আইন সংশোধনে ব্যবসায়ীদের মতামত নেওয়া উচিত।”
বাংলাদেশ ঔষধ শিল্প সমিতির মহাসচিব ডা. মো. জাকির হোসেন সতর্ক করেছেন, “ওষুধ খাতে ব্যবসায়ীদের অগ্রাহ্য করে নীতি প্রণয়ন করা হলে খাতটি ক্ষতিগ্রস্ত হবে। সংশোধন না করলে শিল্পের স্থিতিশীলতা হারাবে।”
বাংলাদেশ ব্যাংকের সাবেক অর্থনীতিবিদ মুস্তফা কে মুজেরী বলেন, “নতুন সরকার দ্রুত শিল্প ও বাণিজ্য খাতের সমস্যা চিহ্নিত করে ব্যবসায়ীদের সঙ্গে পরামর্শ করে নীতি গ্রহণ করলে বিনিয়োগ ও কর্মসংস্থান বৃদ্ধি পাবে। একই সঙ্গে রাজস্ব আদায় বাড়ানো এবং ব্যয়ের দক্ষতা নিশ্চিত করা জরুরি। কর ব্যবস্থাকে স্বচ্ছ ও ন্যায্য করা, সামাজিক সুরক্ষা ও উৎপাদনমুখী খাতে বরাদ্দ বৃদ্ধি করা সরকারের গুরুত্বপূর্ণ কাজ।”
দেশের অর্থনীতি সংকটাপন্ন। ব্যবসায়ী নেতারা নতুন সরকারের কাছে শিল্প ও বাণিজ্য খাতে স্থিতিশীলতা, বিনিয়োগবান্ধব পরিবেশ, নারী উদ্যোক্তাদের সমর্থন, কর-শুল্ক সংস্কার ও রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা নিশ্চিত করার জন্য পদক্ষেপ গ্রহণের আহ্বান জানিয়েছেন।

