নতুন নির্বাচিত সরকার আর্থিক স্বস্তির সঙ্গে ক্ষমতায় আসছে না। বরং এটি এক ভঙ্গুর, চ্যালেঞ্জিং এবং অস্বস্তিদায়ক অর্থনীতি, যেখানে প্রতিটি সিদ্ধান্ত নিতে হবে আন্তর্জাতিক তহবিলের চাপের মধ্য দিয়ে। বিশেষত আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিল (আইএমএফ) ও বিশ্বব্যাংকের পরামর্শ এড়িয়ে চলাও নতুন সরকারের জন্য সহজ হবে না। বাংলাদেশ ব্যাংক, আইএমএফ ও বিশ্বব্যাংকের পৃথক প্রতিবেদনে এই অর্থনীতির সমস্যার চিত্র এবং সম্ভাব্য সমাধানের দিকনির্দেশনা তুলে ধরা হয়েছে। তবে এগুলো বাস্তবায়ন করা সরকারের জন্য কঠিন।
বাংলাদেশ ব্যাংকের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, নির্বাচনের মাধ্যমে ক্ষমতায় আসা নতুন সরকার যদি রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা ফিরিয়ে আনতে পারে, তবে বিনিয়োগকারীদের আস্থা ফিরে আসতে পারে। রাজনৈতিক অনিশ্চয়তা না কমলে অর্থনীতিতে অস্থিরতা বজায় থাকবে। বিনিয়োগ আকর্ষণ করতে সরকারকে নিশ্চিত করতে হবে গ্যাস ও বিদ্যুতের অবিরাম সরবরাহ, আমলাতান্ত্রিক জটিলতা হ্রাস ও ঋণের সুদের হার নিয়ন্ত্রণে রাখা।
নতুন সরকারের ওপর রাজনৈতিক ব্যয় বাড়ানোর চাপ থাকবে। সরকারি কর্মচারীদের জন্য নতুন বেতন স্কেল বাস্তবায়ন হলেও রাজস্ব আয় বৃদ্ধি না করলে ঋণনির্ভরতা বেড়ে যাবে। বেসরকারি খাতে ঋণের প্রবাহ সংকুচিত হবে, ঋণের সুদের হার বাড়বে এবং বিনিয়োগ বাধাগ্রস্ত হবে। ব্যবসায়ীরা ইতোমধ্যেই ঋণের সুদের হার কমানোর দাবি জানাচ্ছে, কিন্তু কেন্দ্রীয় ব্যাংক ও আইএমএফ মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণের কারণে নীতি সুদের হার অপরিবর্তিত রেখেছে। বর্তমানে মূল্যস্ফীতি ৮.৫৮ শতাংশ, যা ৭ শতাংশের লক্ষ্যপথের ওপরে। তাই ঋণের সুদের হার কমানো আপাতত সম্ভব নয়।
বাংলাদেশ উন্নয়ন গবেষণা প্রতিষ্ঠান (বিআইডিএস)-এর সাবেক মহাপরিচালক ড. মোস্তফা কে মুজেরী বলেন, দীর্ঘমেয়াদি মন্দা ও অন্তর্বর্তী সরকারের সময়ে অর্থনৈতিক ক্ষয় রাজস্ব আয়ের ওপর চাপ দিয়েছে। আয় কম, ব্যয় বেড়ে গেছে, তাই ঘাটতি পূরণে সরকার ব্যাংক ঋণ নিতে বাধ্য। এছাড়া রাজনৈতিক ব্যয়ও বেড়ে গেছে। তিনি জানান, নতুন সরকার দ্রুত রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা ফিরিয়ে আস্থা সৃষ্টি করলে বিনিয়োগ বাড়বে, বিদেশি বিনিয়োগ ও রেমিট্যান্স প্রবাহ বৃদ্ধি পাবে এবং রাজস্ব আয় বাড়বে।
কেন্দ্রীয় ব্যাংক উল্লেখ করেছে, নির্বাচন, রোজা ও বেতন স্কেল বাস্তবায়ন বাজারে টাকার প্রবাহ বাড়াবে। এতে চাহিদা বৃদ্ধি পাবে এবং মূল্যস্ফীতি আরও বাড়তে পারে। আইএমএফের সঙ্গে সমন্বয় না করলে টাকার বিনিময় হার বাজারভিত্তিক করা হলে মূল্যস্ফীতি বৃদ্ধি পাবে, তবে রিজার্ভে সহায়ক প্রভাব পড়বে।
অর্থনৈতিক মন্দা এবং ঋণনির্ভরতার কারণে নতুন সরকারের জন্য রাজস্ব আয় বৃদ্ধি করা কঠিন। রাজনৈতিক প্রতিশ্রুতি অনুযায়ী খরচ বাড়ালে আর্থিক সংকট আরও গভীর হবে। সংশ্লিষ্টরা মনে করেন, আস্থা ফিরিয়ে ব্যবসায়িক কার্যক্রম পুনঃপ্রচলন করতে কমপক্ষে দুই বছরের সময় লাগতে পারে।
শিল্পে গ্যাস ও বিদ্যুৎ সরবরাহ করা সম্ভব হলেও আইনশৃঙ্খলা, চাঁদাবাজি এবং আমলাতান্ত্রিক জটিলতা নিরসন করা হবে বড় চ্যালেঞ্জ। ব্যাংক খাতে সংস্কার উদ্যোগের বিরোধিতা রাজনৈতিকভাবে সুনিশ্চিত হওয়ায় ঋণের যোগান দিতে সমস্যা রয়েছে। লুটপাটের কারণে ব্যাংকগুলো দুর্বল অবস্থায়, যা নতুন সরকারের জন্য আরও চাপ তৈরি করছে।
নির্বাচনের পর নতুন সরকারকে দায়িত্ব নিলে চলমান কাঠামোগত সংস্কার এগিয়ে নিতে হবে এবং অর্থনৈতিক ব্যবস্থাপনায় স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতা নিশ্চিত করতে হবে। প্রধান চ্যালেঞ্জগুলো হলো:
- বিনিয়োগ বাড়ানো ও কর্মসংস্থান সৃষ্টি
- রাজস্ব ব্যবস্থায় সংস্কার করে আয় বৃদ্ধি
- ডলারের বিপরীতে টাকার বিনিময় হারের নতুন কাঠামো বাস্তবায়ন
- উচ্চ মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণ
- অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি পুনরুদ্ধার
তবে রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা ও স্বচ্ছতা না থাকলে এগুলো কার্যকর করা কঠিন। আইএমএফের পরামর্শ অনুযায়ী ভর্তুকি কমানো হলে পণ্যের দাম বাড়বে, যা জনঅসন্তোষের কারণ হতে পারে। বিশ্ব ব্যাংকের মতে, নির্বাচনের পর চাহিদা বৃদ্ধির সঙ্গে বিনিয়োগ বাড়বে, সরকারি খরচ বাড়বে এবং অবকাঠামোর উন্নয়ন হবে। এজন্য সরকারকে সংস্কার বজায় রাখতে হবে ও রাজস্ব আয় বৃদ্ধি করতে হবে।
বর্তমান সরকার ইতোমধ্যেই অর্থনীতির ক্ষত চিহ্নিত করে লুটপাট বন্ধ করেছে, টাকা পাচার সীমিত করেছে, হুন্ডির প্রভাব কমিয়েছে ও রেমিট্যান্স বাড়িয়েছে। তবে নতুন সরকারকে আরও কঠোর পদক্ষেপ নিতে হবে এবং আর্থিক স্থিতিশীলতা, বিনিয়োগ ও রাজস্ব আয় নিশ্চিত করতে হবে।

