বাংলাদেশের অর্থনীতি সচল রাখতে নতুন সরকারের জন্য সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ হলো দেশি ও বিদেশি বিনিয়োগ আকৃষ্ট করা। ব্যবসায়ী ও অর্থনীতির বিশ্লেষকরা মনে করছেন, এর প্রথম ধাপ হওয়া উচিত আইনশৃঙ্খলা নিশ্চিত করা। বেসরকারি খাতে আস্থা পুনরুদ্ধার, ব্যবসায়িক পরিবেশকে নিরাপদ করা এবং অর্থনৈতিক অপরাধ দমনে জিরো টলারেন্স নীতি গ্রহণ নতুন সরকারের অগ্রাধিকার হওয়া উচিত।
দেশের তিনজন শীর্ষ ব্যবসায়ী এবং তিনজন অর্থনীতির বিশ্লেষকরা এই বিষয় গুলোতে সবাই একমত পোষণ করেছেন। দেশের অর্থনীতিকে টানিয়ে রাখার জন্য রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা অপরিহার্য। বিশ্লেষকরা বলছেন, সব রাজনৈতিক দলকে একত্রিত করে দেশের উন্নয়নে কাজ করতে হবে। চাঁদাবাজি এবং বাজার সিন্ডিকেট বন্ধ করতে হবে। মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণে আনতে হবে। বেকারত্ব দূর করতে নতুন কর্মসংস্থান তৈরি করতে হবে এবং শিল্প খাতে বাজার সম্প্রসারণ করতে হবে।
এছাড়া, দেশের স্বল্পন্নোত দেশ হিসেবে অবস্থান থেকে বের হওয়ার প্রক্রিয়া দ্রুত করতে হবে। ব্যবসায়ের খরচ কমানো, বন্দরের কার্যক্রমে গতি আনা, অর্থ পাচার বন্ধ করা এবং ব্যাংকিং খাতের অস্থিরতা দূর করাও জরুরি। দেশের মোট জনশক্তির অর্ধেকই নারী, তাই অর্থনীতিতে নারীর অংশগ্রহণ বাড়ানো গেলে ব্যবসা, বাণিজ্য ও বিনিয়োগের পরিধি বাড়বে।
বিশ্লেষকরা মনে করাচ্ছেন, ব্যবসায়িক ও বিনিয়োগের পরিবেশ উন্নত হলে সরকারের রাজস্ব আদায়ও বৃদ্ধি পাবে। এছাড়া, আমলাতান্ত্রিক জটিলতা কমিয়ে, আন্তর্জাতিক সম্পর্ক নায্যতা ও সম্মানের সঙ্গে বজায় রাখা দেশের অর্থনৈতিক উন্নয়নের জন্য অপরিহার্য।
সুশাসন এবং নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে হবে:
বাংলাদেশ চেম্বার অব ইন্ডাস্ট্রিজের (বিসিআই) সভাপতি আনোয়ার-উল আলম চৌধুরী (পারভেজ) দেশের বর্তমান অর্থনৈতিক ও ব্যবসায়িক পরিস্থিতি নিয়ে বিস্তারিত আলোচনা করেছেন। তিনি বলেন, “২০২৪ সালের জুলাই-আগস্টে গণ-অভ্যুত্থানের পর ৮ আগস্ট অন্তর্বর্তী সরকার দায়িত্ব গ্রহণ করে। তখন থেকে আমরা বারবার জাতীয় নির্বাচনের দ্রুত আয়োজনের দাবি জানিয়েছি। অবশেষে ১২ ফেব্রুয়ারি দেশের জাতীয় সংসদ নির্বাচন শান্তিপূর্ণভাবে অনুষ্ঠিত হয়েছে। ভোটে বিএনপি একক সংখ্যাগরিষ্ঠতা অর্জন করেছে। এখন প্রত্যাশা, নতুন সরকার দেশের আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি দ্রুত উন্নত করবে এবং মব কালচার দূর করবে, যাতে মানুষের মধ্যে স্বস্তি ফিরে আসে।”
পারভেজ আরও জানান, “বহির্বিশ্বের সঙ্গে আমাদের ট্যারিফ সংক্রান্ত সমস্যা এখনও রয়েছে। নতুন সরকারের প্রথম কাজ হওয়া উচিত এলডিসি গ্র্যাজুয়েশন পেছানোর জন্য উদ্যোগ নেওয়া। পাশাপাশি ‘কস্ট অব ডুয়িং বিজনেস’ কমানোর ওপরও কাজ করা প্রয়োজন। বাজেটে সাড়ে ৭ শতাংশ মূল্যস্ফীতির কথা বলা হয়েছিল, কিন্তু তা অর্জন সম্ভব হয়নি। আইএমএফের নির্দেশনা মেনে চলায় দেশের উন্নয়নে তেমন কোনো প্রভাব দেখা যায়নি। বিনিয়োগের প্রবাহ কমে গেছে। বিনিয়োগ বাড়ানো এখন জরুরি, তবে ব্যবসায়ীদের বাইরে রেখে কাঙ্ক্ষিত ফল পাওয়া যাবে না।”

তিনি উল্লেখ করেন, “অন্তর্বর্তী সরকার দায়িত্ব নেওয়ার পর দেশের অনেক কলকারখানা বন্ধ হয়ে গেছে এবং রপ্তানি আদেশও কমেছে। গার্মেন্ট খাতের কাস্টমারদের ওপর পর্যবেক্ষণ থেকে দেখা যাচ্ছে, তারা আশঙ্কা করছেন দেশে শান্তিপূর্ণ নির্বাচন হবে কি না। এছাড়া অন্তর্বর্তী সরকারের ট্রাম্প প্রশাসনের সঙ্গে করা সাম্প্রতিক চুক্তি দেশের জন্য ক্ষতিকর হতে পারে। নতুন সরকারকে ভিয়েতনামের মতো মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে সুবিধাজনক চুক্তি করতে হবে। এর জন্য ব্যবসায়ী ও অর্থনীতিবিদদের সঙ্গে আলোচনা অপরিহার্য।”
পারভেজ বলেন, “বিদ্যুৎ, গ্যাস ও বন্দরের অব্যবস্থা সমাধান করতে হবে। ব্যাংক ঋণের সুদের হার কমানো এবং ছোট ও মাঝারি শিল্প কারখানা পুনরায় চালু করা জরুরি। এসব পদক্ষেপের মাধ্যমে বিনিয়োগ এবং অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতা ফিরিয়ে আনা সম্ভব।”
দামের স্থিতিশীলতা নিশ্চিত করা জরুরি:
বাংলাদেশের ব্যাংকের সাবেক প্রধান অর্থনীতিবিদ ড. মুস্তফা কে মুজেরী, দেশের অর্থনীতিকে “ভঙ্গুর” হিসেবে বর্ণনা করেছেন। তিনি বলেন, “অর্থনীতির প্রতিটি খাতে নানা সমস্যা রয়েছে। তাই অগ্রাধিকার খাতগুলো আগে ঠিক করতে হবে। এর মধ্যে সবচেয়ে জরুরি কাজ হলো মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণ করা। প্রায় তিন বছর ধরে দেশের সাধারণ মানুষ উচ্চ মূল্যস্ফীতির চাপের মুখে রয়েছে। তাদের স্বস্তি ফিরিয়ে দিতে নতুন সরকারকে কঠোরভাবে বাজার নিয়ন্ত্রণে কাজ করতে হবে।

তিনি আরও বলেন, “তার আগে সামাজিক সুরক্ষার আওতা বাড়ানো প্রয়োজন। নির্বাচনের আগে বিএনপি সামাজিক সুরক্ষা হিসেবে ফ্যামিলি কার্ড, কৃষক কার্ড এবং কৃষকদের ১০ হাজার টাকা পর্যন্ত ঋণ মওকুফসহ বিভিন্ন কর্মসূচি ঘোষণা করেছে। এসব কর্মসূচি দ্রুত বাস্তবায়ন করতে হবে।”
ড. মুজেরী বিনিয়োগ বৃদ্ধির প্রয়োজনীয়তার ওপরও জোর দিয়েছেন। তিনি বলেন, “বর্তমান স্থবিরতা কাটিয়ে উঠতে প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ নিতে হবে। বিনিয়োগ বাড়ানোর মূল চাবিকাঠি হলো ভালো ও স্থিতিশীল বিনিয়োগ পরিবেশ নিশ্চিত করা। অর্থনৈতিক সংস্কারগুলো দ্রুত শেষ করতে হবে, যাতে বিনিয়োগকারীরা আস্থা ফিরে পান এবং বিনিয়োগে এগিয়ে আসেন। নির্বাচনের মাধ্যমে রাজনৈতিক অনিশ্চয়তা অনেকটা কমেছে। এখন নতুন সরকারকে আইনশৃঙ্খলা এবং ব্যবসায়িক ক্ষেত্রে অবশিষ্ট বাধা দূর করতে হবে।”
তিনি সতর্ক করেছেন, “বেসরকারি খাতে ঋণের প্রবৃদ্ধি বর্তমানে তলানিতে রয়েছে। বিনিয়োগ বাড়াতে না পারলে অর্থনৈতিক চাকা সচল হবে না। ব্যাংকিং খাতসহ আর্থিক খাতে ব্যাপক সংস্কার দ্রুত নেওয়া অত্যন্ত জরুরি।”
জনগণের প্রত্যাশা বাস্তবায়ন করাই বড় দায়িত্ব:
বিশ্বব্যাংকের ঢাকা কার্যালয়ের সাবেক মুখ্য অর্থনীতিবিদ ড. জাহিদ হোসেন নতুন সরকারের সামনে অর্থনৈতিক চ্যালেঞ্জগুলো বিশ্লেষণ করেছেন। তিনি বলেন, “নতুন সরকারের সবচেয়ে বড় কাজ হবে মানুষের প্রত্যাশা বাস্তবসম্মতভাবে ম্যানেজ করা। রাতারাতি সব কিছু পরিবর্তন করা সম্ভব নয়। বিশেষ করে বাজেট প্রণয়নের ক্ষেত্রে আগের উচ্চাভিলাষী বাজেট, অর্জন অযোগ্য রাজস্ব লক্ষ্যমাত্রা এবং খরচের অদক্ষতা থেকে বেরিয়ে এসে একটি বাস্তবায়নযোগ্য বাজেট দেওয়া উচিত।”
ড. জাহিদ হোসেন আরো বলেন, “বাজেট ঘোষণার আগে মানুষকে মানসিকভাবে তৈরি করতে হবে যে সব প্রতিশ্রুতি এক বছরের মধ্যে পূরণ করা সম্ভব নয়। তারা আগেই ঘোষণা করেছেন, ঋণ-নির্ভরতা কমানো হবে। এজন্য বাজেট ঘাটতি কমাতে হবে এবং রাজস্ব আদায় বাড়াতে হবে। তবে করদাতাদের ওপর অতিরিক্ত চাপ না বাড়িয়ে কৌশল গ্রহণ করা জরুরি।

নতুন সরকারের আরেকটি বড় চ্যালেঞ্জ হলো সরকারি কর্মকর্তাদের বেতন বৃদ্ধি। তিনি বলেন, “বর্তমান প্রস্তাব বাস্তবায়ন করা অত্যন্ত কঠিন। পুরোটা করতে ১ লাখ কোটি টাকার বেশি প্রয়োজন এবং ধাপে ধাপে করলেও প্রায় ৩০–৪০ হাজার কোটি টাকার অতিরিক্ত ব্যয় হবে। তাই সরকারকে খরচের অগ্রাধিকার ঠিক করতে হবে—কোন কাজ আগে হবে, কোন কাজ পরে।”
ড. জাহিদ হোসেন ব্যাংকিং, বিদ্যুৎ, জ্বালানি এবং বাণিজ্য খাতের কাঠামোগত সংস্কারের বিষয়ে বলেন, “অন্তর্বর্তী সরকার কিছু কাজ শুরু করেছে, তবে কিছু বিতর্কিত সিদ্ধান্তও আছে। বিদ্যুৎ ও জ্বালানি খাতের চুক্তি অতিমূল্যায়িত এবং পাওয়ার ডেভেলপমেন্ট বোর্ড বড় ধরনের লোকসান ভোগ করছে। এই লোকসান কমাতে হলে হয় বিদ্যুতের দাম বাড়াতে হবে, নয়তো খরচ কমানোর সুসংগঠিত কৌশল গ্রহণ করতে হবে।”
তিনি বন্দর ও এনবিআর সংস্কারের প্রসঙ্গেও সতর্ক করেছেন। “চট্টগ্রাম বন্দরের ব্যবস্থাপনা এবং এনবিআরের সংস্কার বিষয়ক ঝুলন্ত সিদ্ধান্তগুলো বাজেট ঘোষণার আগে চূড়ান্ত করা প্রয়োজন। এতে নতুন সরকার দ্রুত এবং কার্যকরী পদক্ষেপ নিতে পারবে।”
বৈশ্বিক বাণিজ্য সম্পর্ক ভারসাম্যপূর্ণ রাখতে হবে:
ফরেন ইনভেস্টর চেম্বার অব কমার্স অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রির (ফিকি) সভাপতি রূপালী হক চৌধুরী বলেন, “নির্বাচন-পরবর্তী নতুন সরকারের প্রধান কাজ হলো শিল্প ও বাণিজ্য খাতে স্থিতিশীলতা ফিরিয়ে আনা এবং বিনিয়োগবান্ধব পরিবেশ নিশ্চিত করা। আন্তর্জাতিক বাণিজ্যিক সম্পর্ক ভারসাম্যপূর্ণ ও স্বার্থসংরক্ষণমূলক হতে হবে।”
তিনি উল্লেখ করেন, “উচ্চ মূল্যস্ফীতি, ডলার সংকট, আমদানি ব্যয় বৃদ্ধি এবং ব্যাংক ঋণের সুদের হার বৃদ্ধির ফলে শিল্প ও বাণিজ্য খাত মারাত্মক চাপের মুখে পড়েছে। উৎপাদন ব্যয় ও রক্ষণাবেক্ষণ খরচ কমাতে হবে। কিছু গুরুত্বপূর্ণ রপ্তানি খাতে বিদেশি অর্ডার উল্লেখযোগ্যভাবে হ্রাস পেয়েছে। বিক্রি বাড়াতে শিল্পের বাজার সম্প্রসারণ করতে হবে। নতুন সরকারের প্রধান অগ্রাধিকার হওয়া উচিত সামষ্টিক অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতা ফিরিয়ে আনা। জ্বালানি ও কাঁচামালের সরবরাহ নিরবচ্ছিন্ন রাখতে হবে।”
রূপালী হক চৌধুরী বলেন, “কর ও শুল্কনীতিতে ঘন ঘন পরিবর্তনের কারণে ব্যবসায়ীদের মধ্যে অনিশ্চয়তা তৈরি হয়েছে। তাই ব্যবসাবান্ধব রাজস্ব নীতি প্রণয়ন এবং ভ্যাট ও শুল্ক কাঠামো সহজীকরণ জরুরি। ক্ষুদ্র ও মাঝারি উদ্যোক্তাদের জন্য বিশেষ প্রণোদনা এবং বৃহৎ শিল্পের জন্য দীর্ঘমেয়াদি ব্যাংকঋণের সহজ শর্তে ব্যবস্থা নেওয়া প্রয়োজন।”

তিনি আন্তর্জাতিক বাণিজ্যিক চ্যালেঞ্জের দিকে ইঙ্গিত দিয়ে বলেন, “বাংলাদেশের বাণিজ্য ঘাটতির প্রধান কারণ হলো ট্যারিফ ও নন-ট্যারিফ ব্যারিয়ার। আমদানির তুলনায় রপ্তানি কম হওয়ায় বড় অঙ্কের ঘাটতি তৈরি হচ্ছে। অশুল্ক বাধা দূর করতে হবে, সীমান্ত বাণিজ্য সহজ করতে হবে এবং বাংলাদেশের পণ্যের জন্য স্বল্প শুল্কে কার্যকর প্রবেশাধিকার নিশ্চিত করতে কূটনৈতিক তৎপরতা বাড়াতে হবে। প্রতিবেশী দেশ—ভারত, নেপাল, ভুটান ও চীনের সঙ্গে যৌথ বিনিয়োগ, শিল্প পার্ক এবং ট্রান্সশিপমেন্ট সুবিধা সম্প্রসারণ করতে হবে।”
রূপালী হক চৌধুরী আরও বলেন, “রাজনৈতিক প্রতিবন্ধকতা দূর করা জরুরি। রাজনৈতিক অস্থিরতা, সহিংসতা ও নীতিগত অনিশ্চয়তা বিনিয়োগের প্রধান অন্তরায়। সরকারকে রাজনৈতিক দলগুলোর মধ্যে সুসম্পর্ক বজায় রাখতে ভূমিকা রাখতে হবে। শিল্প খাতকে দলীয় বিবেচনার বাইরে রেখে জাতীয় স্বার্থে ঐকমত্য প্রতিষ্ঠা করতে হবে। পাশাপাশি ব্যবসায়ী সার্টিফিকেশন, আমদানি-রপ্তানির জটিলতা নিরসন, দুর্নীতি হ্রাস, আইনশৃঙ্খলা স্বাভাবিক রাখা এবং প্রশাসনিক জটিলতা দূর করে ব্যবসাবান্ধব পরিবেশ নিশ্চিত করতে হবে।”
অর্থনৈতিক ঘাটতি মোকাবিলায় রাজস্ব বৃদ্ধি জরুরি:
এনবিআরের সাবেক চেয়ারম্যান ড. মোহাম্মদ আবদুল মজিদ দেশের অর্থনৈতিক পরিস্থিতি নিয়ে সতর্ক করেছেন। তিনি বলেন, “অনেক দিন থেকেই সরকার আর্থিক সংকটে রয়েছে। অনেক প্রকল্প থেমে আছে বা ধীরগতি অনুসরণ করছে। নির্বাচিত সরকারকে আয় বাড়াতে বিশেষ গুরুত্ব দিতে হবে।”
ড. মজিদ মনে করান, “জাতীয় রাজস্ব বোর্ড (এনবিআর) এবং এর বাইরে সব ধরনের রাজস্ব আয় বাড়াতে হবে। ব্যবসায়ীরা আয় করতে পারবে না, রাজস্বও দিতে পারবে না। তাই দেশের বিনিয়োগ বাড়ানো এখন অতি জরুরি। দীর্ঘদিন ধরে বিনিয়োগে খরা দেখা দিয়েছে। দেশি-বিদেশি উদ্যোক্তারা বিনিয়োগে আগ্রহী নন। এর কারণ চিহ্নিত করতে হবে এবং বিনিয়োগবান্ধব নীতি প্রণয়ন করতে হবে। বিনিয়োগ, শিল্প ও ব্যবসায়িক সিদ্ধান্ত নেওয়ার আগে উদ্যোক্তাদের সঙ্গে আলোচনা অপরিহার্য। বিশেষ করে সংশোধিত শ্রম আইন নিয়ে ব্যবসায়ীদের মতামত শুনতে হবে। সরকার ও ব্যবসায়ীরা প্রতিযোগী নয়, সহযোগী।”

ড. মজিদ আরও বলেন, “এনবিআরকে দুর্নীতিমুক্ত করতে হবে। প্রযুক্তি ব্যবহার করে রাজস্ব আদায় করতে হবে। করদাতা ও এনবিআরের কর্মকর্তা-কর্মচারীর মধ্যে আন্তরিক সম্পর্ক তৈরি করতে হবে। একজন করদাতা এনবিআরের সহযোগিতা ছাড়া কর ফাঁকি দিতে পারবে না। কঠোর নজরদারি থাকলে দুর্নীতি আর করা সম্ভব হবে না। নির্বাচিত সরকারকে এমন ব্যবস্থা করতে হবে, যাতে কোনো মতিউর তৈরি হওয়ার সুযোগ না থাকে।”
তিনি রাজস্ব আদায়ের তিনটি প্রধান খাত উল্লেখ করেছেন—আয়কর, ভ্যাট ও শুল্ক। “সরকার ভ্যাটকে সরবকার নিরাপদ হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার করে। কিন্তু ভ্যাট আদায়ের লক্ষ্যমাত্রা বাড়ালে সাধারণ মানুষের ওপর চাপ সৃষ্টি হয়। ১৭–১৮ কোটি মানুষের দেশে আয়কর আদায়ের লক্ষ্যমাত্রাও বাড়ানো প্রয়োজন। নির্বাচিত সরকারকে এসব বিষয়ে বিশেষ নজর দিতে হবে।”
আর্থিক অপরাধ প্রতিরোধে শূন্য সহনশীলতা নীতি প্রয়োজন:
ঢাকা চেম্বার অব কমার্স অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রির (ডিসিসিআই) সভাপতি তাসকীন আহমেদ বলেছেন, “১২ ফেব্রুয়ারি শান্তিপূর্ণ জাতীয় নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়েছে। বিএনপি একক সংখ্যাগরিষ্ঠতা অর্জন করে নতুন সরকার গঠন করতে যাচ্ছে। তাদের প্রতি প্রত্যাশা, দেশের অর্থনীতি সচল রাখতে দেশীয় ও বিদেশি বিনিয়োগ আকৃষ্ট করতে বেসরকারি খাতে আস্থা ফেরানো সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার দেওয়া উচিত। এর প্রথম ও সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ কাজ হলো আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি সুশাসন নিশ্চিত করা। ব্যবসায়িক আস্থা পুনরুদ্ধার এবং অর্থনৈতিক অপরাধ দমনে জিরো টলারেন্স নীতি গ্রহণ জরুরি।”
তিনি সতর্ক করেছেন, “অন্তর্বর্তী সরকারের আমলে চাঁদাবাজি বন্ধ হয়নি। বর্তমানে বেসরকারি খাতের সবচেয়ে বড় ভয় হলো চাঁদাবাজি। শুধু সড়কপথে পণ্য পরিবহন নয়, শিল্প-কারখানা স্থাপন এবং ব্যবসার নিয়মিত কার্যক্রমেও নানা স্তরে চাঁদাবাজির ঘটনা ঘটছে। এসব কার্যক্রম বিনিয়োগকারীদের মনোবল ভেঙে দেয়। তাই নতুন সরকারকে প্রশাসনিকভাবে কঠোর পদক্ষেপ নিয়ে চাঁদাবাজি বন্ধের স্পষ্ট বার্তা দিতে হবে।”

দ্বিতীয় গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ হিসেবে তিনি এনবিআরের কাঠামো ও কার্যক্রম সংস্কার করার আহ্বান জানান। তিনি বলেন, “বর্তমানে করদাতা ও এনবিআরের মধ্যে আস্থার সংকট রয়েছে। কর ব্যবস্থাপনাকে সহজ, জটিলতামুক্ত এবং হয়রানিমুক্ত করতে হবে। এনবিআরের রাজস্ব নীতি বিভাগ ও রাজস্ব ব্যবস্থাপনা বিভাগের মধ্যে সমন্বয় বাড়ানো জরুরি। ব্যবসা সহজীকরণ ব্যবস্থার আমূল সংস্কার করতে হবে।”
তাসকীন আহমেদ উল্লেখ করেন, “সরকারের প্রথম ১০০ দিনের মধ্যে একটি সুনির্দিষ্ট রোডম্যাপ ঘোষণা করা উচিত। যেখানে কর জটিলতা নিরসন, ডিজিটালাইজেশনের মাধ্যমে স্বচ্ছতা বৃদ্ধি এবং অটোমেশনের মাধ্যমে কর অফিসারের সঙ্গে সরাসরি সাক্ষাতের প্রয়োজন কমানো থাকবে। পাশাপাশি নতুন বিনিয়োগে কর অবকাশ বা প্রণোদনার সুযোগ দিলে তা বিনিয়োগকারীদের জন্য সহজলভ্য করতে হবে এবং কোনো ধরনের দুর্ভোগ পোহাতে হবে না।

