করোনার ধাক্কায় দেশে ফিরে আসা হাজার হাজার প্রবাসীকে কর্মসংস্থানে সাহায্য করতে শুরু হয়েছিল রিকভারি অ্যান্ড অ্যাডভান্সমেন্ট অব ইনফরমাল সেক্টর এমপ্লয়মেন্ট (রেইজ) প্রকল্প। লক্ষ্য ছিল কভিডে ক্ষতিগ্রস্ত ও বিদেশফেরত কর্মীদের পুনর্বাসন ও টেকসই আয় নিশ্চিত করা। তবে বাস্তবতা বলছে, প্রকল্পের প্রস্তাবিত সহায়তা ও ব্যয় কার্যকর হয়নি।
প্রকল্পের আওতায় প্রায় আড়াই লাখ পরিবারকে এককালীন ১৩ হাজার ৫০০ টাকা দেওয়া হয়েছিল। কিন্তু সিরাজগঞ্জের আঞ্জনা খাতুন জানালেন, “টাকাগুলো সংসারের দৈনন্দিন খরচেই শেষ হয়ে গেছে।” যশোরের সাজ্জাদুর রহমানও বলেন, “ছোট ব্যবসা শুরু করেছি কিন্তু এই অঙ্কে স্থায়ী আয় গড়ে তোলা সম্ভব হয়নি।”
ইআরডির মাঠ পর্যবেক্ষণেও দেখা গেছে, ২০ জেলার উপকারভোগীর সঙ্গে সরাসরি কথা বললে একই চিত্র—স্বল্পমেয়াদি স্বস্তি পাওয়া গেলেও স্থায়ী কর্মসংস্থান তৈরি হয়নি। পরামর্শক, কর্মশালা ও সেমিনারে কোটি কোটি টাকা ব্যয় করা হলেও কাঠামোগত পরিবর্তন মাঠ পর্যায়ে লক্ষ্য করা যায়নি।
পিকেএসএফের মাধ্যমে বিতরণ করা অর্থ সুদসহ ফেরত এসেছে, ফলে সরকার কিছুটা আর্থিক পুনরুদ্ধার পেয়েছে। তবে ওয়েজ আর্নার্স কল্যাণ বোর্ডের অনুদান ফেরতযোগ্য নয়। এই অবস্থায় বিদেশি ঋণ নিয়ে অনুদান বিতরণের যৌক্তিকতা নিয়েও প্রশ্ন তুলেছে বিশেষজ্ঞরা।
শুধু রেইজ নয়, স্থানীয় সরকার শক্তিশালী করার জন্য গত দুই দশকে একাধিক প্রকল্প বাস্তবায়িত হয়েছে। এলজিএসপি, ইউপিজিপি এবং জাইকার অর্থায়নে ইউজিডিপি-১ মিলিয়ে হাজার হাজার কোটি টাকা ব্যয় হয়েছে। বর্তমানে প্রস্তাবিত ইউজিডিপি-২ বাস্তবায়নের জন্য জাপানের জাইকা থেকে ১৮৮.৬৭ মিলিয়ন ডলার (প্রায় ২,৩১০ কোটি টাকা) ঋণ নেওয়ার পরিকল্পনা রয়েছে।
ইআরডির পর্যবেক্ষকরা সতর্ক করেছেন, ইউজিডিপি-১-এ সুদের হার ছিল মাত্র ০.০১ শতাংশ, কিন্তু ইউজিডিপি-২-এ তা বেড়ে ২.৩৫ শতাংশে। তাদের মতে, গভর্ন্যান্স ও সক্ষমতা বৃদ্ধির ক্ষেত্রে এই ধরনের উচ্চ সুদের ঋণ অর্থনৈতিকভাবে ব্যয়বহুল।
ড. মোহাম্মদ মিজানুর রহমান, অতিরিক্ত সচিব ও আমেরিকা-জাপান উইং চিফ বলেন, “উন্নয়নের প্রাথমিক পর্যায়ে সফল দেশগুলো গভর্ন্যান্স উন্নয়নে বৈদেশিক ঋণের ওপর নির্ভর করেনি। ঋণনির্ভরতা অব্যাহত থাকলে স্থানীয় সরকার স্বয়ংসম্পূর্ণ শাসনব্যবস্থা গড়ে তুলতে পারবে না।”
সাবেক বিশ্বব্যাংকের অর্থনীতিবিদ জাহিদ হোসেন মনে করেন, সামাজিক সহায়তা বা ক্যাপাসিটি বিল্ডিংয়ের ক্ষেত্রে সরাসরি আর্থিক রিটার্ন আসে না। “মানবিক কারণে ব্যয় করতে চাইলে তা ঋণ নয়, রাজস্ব থেকেই করা যুক্তিযুক্ত,” তিনি উল্লেখ করেন।
ইআরডির আশঙ্কা, নীতিমালার ঘাটতির কারণে স্থানীয়ভাবে বাস্তবায়নযোগ্য প্রকল্পও বিদেশি ঋণে নেওয়া হচ্ছে। ফলে ঋণের সুদ ও পরিশোধের চাপ ক্রমেই বেড়ে চলেছে। সংস্থাটি চায় এলজিএসপি, ইউপিজিপি ও ইউজিডিপি-১-এর সমন্বিত মূল্যায়ন প্রতিবেদন এবং ইউজিডিপি-২ প্রকল্পের সরকারি অর্থায়নে বাস্তবায়নের সম্ভাবনা যাচাই করা হোক।
ইআরডির কর্মকর্তারা অভিযোগ করেছেন, পরামর্শকনির্ভর উন্নয়ন মডেল কার্যকর প্রমাণিত হয়নি। গত দুই দশকে ব্যয় হয়েছে কর্মশালা, সেমিনার, প্রশিক্ষণ ও পরামর্শক নিয়োগে। কিন্তু মাঠ পর্যায়ে প্রশাসনিক সংস্কার, দক্ষ জনবল গঠন বা টেকসই সক্ষমতায় দৃশ্যমান অগ্রগতি নেই। তারা মনে করেন, সরকারি অর্থায়ন ও নীতিগত সংস্কারের মাধ্যমে একই লক্ষ্য আরও কার্যকরভাবে অর্জন করা যেত।

