থানা, পুলিশ ফাঁড়ি, ক্যাম্প, নৌ পুলিশ কেন্দ্র, রেলওয়ে পুলিশ থানা ও ট্যুরিস্ট পুলিশ—সবগুলোই দেশের আইনশৃঙ্খলা বজায় রাখতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে কিন্তু অধিকাংশ কেন্দ্রই এখনো ভাড়া বাড়ি বা পুরনো, ঝুঁকিপূর্ণ ভবনে সীমিতভাবে কার্যক্রম চালাচ্ছে।
এই পরিস্থিতি মোকাবিলায় অন্তর্বর্তী সরকার নতুন উদ্যোগ নিয়েছে। সম্প্রতি অনুমোদন দেওয়া হয়েছে ‘বিভিন্ন দেশের বিভিন্ন স্থানে পুলিশ ফাঁড়ি বা তদন্ত কেন্দ্র, ক্যাম্প, নৌ পুলিশ কেন্দ্র, রেলওয়ে পুলিশ থানা ও আউটপোস্ট, ট্যুরিস্ট পুলিশ সেন্টার এবং হাইওয়ে পুলিশের জন্য থানা ও আউটপোস্ট নির্মাণ’ নামের প্রকল্প। প্রকল্পে মোট ৭০৭ কোটি টাকা ব্যয় ধরা হয়েছে। এর মধ্যে ১৪০টি পুলিশ ফাঁড়ি অগ্রাধিকারভিত্তিতে নির্মাণ করা হবে। নতুন ভবনের জন্য ৬৮৬ কোটি টাকা খরচ হবে, আর ১৪ কোটি টাকার আসবাবপত্র কেনা হবে।
প্রকল্পটি বাস্তবায়ন করবে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের অধীনে বাংলাদেশ পুলিশ। পরিকল্পনা কমিশনের সূত্রে জানা গেছে, এই উদ্যোগ পুলিশের দাপ্তরিক কার্যক্রম এবং আবাসিক সুবিধা উভয়ই উন্নত করবে এবং আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি আরও শক্তিশালী করবে। পরিকল্পনা কমিশনের তথ্য অনুযায়ী, দেশের পুলিশ ফাঁড়ি, থানা, ক্যাম্প ও বিশেষায়িত ইউনিটগুলোর অবকাঠামো উন্নয়নে নতুন প্রকল্পের সব ব্যয় সরকার নিজেই বহন করবে। এই প্রকল্পের আওতায় দেশের আটটি বিভাগের ৪৮ জেলায় মোট ১৪০টি স্থানে পুলিশ সংক্রান্ত অবকাঠামো উন্নয়ন করা হবে।
স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় ২০২৫ সালের ১৩ জুলাই এই প্রস্তাব পরিকল্পনা কমিশনে পাঠায়। প্রস্তাবে মোট খরচ ধরা হয় ৭০৭ কোটি ৫৪ লাখ ৯৪ হাজার টাকা। প্রকল্পের বাস্তবায়নকাল নির্ধারণ করা হয়েছে ২০২৫ সালের অক্টোবর থেকে ২০২৮ সালের সেপ্টেম্বর পর্যন্ত। প্রস্তাব জমা দেওয়ার ২০ দিন পর, ৪ আগস্ট, প্রকল্প মূল্যায়ন কমিটি (পিইসি) সভা অনুষ্ঠিত হয়। সভায় কিছু বিষয় সংশোধনের পরামর্শ দেওয়া হয়। এর ভিত্তিতে সংশোধিত উন্নয়ন প্রকল্প প্রস্তাব (ডিপিপি) ২০২৫ সালের ২৯ অক্টোবর পরিকল্পনা কমিশনে পাঠানো হয়।
পরিকল্পনা কমিশনের ভৌত অবকাঠামো বিভাগের সদস্য (সচিব) এম এ আকমল হোসেন আজাদ জানান, “পিইসি সভায় প্রকল্প পর্যালোচনা করা হয়েছে। সভার সুপারিশ অনুযায়ী ডিপিপি পুনর্গঠন করা হয়েছে। প্রকল্প বাস্তবায়িত হলে পুলিশের বর্ধিত জনবলের জন্য দাপ্তরিক ও আবাসিক সুবিধা নিশ্চিত হবে। এর মাধ্যমে সারা দেশে দ্রুত আইনশৃঙ্খলা নিয়ন্ত্রণ, জননিরাপত্তা জোরদার এবং বিশেষায়িত ইউনিটগুলোর কার্যক্রম আরও কার্যকরী হবে। ৫০ কোটি টাকার বেশি হওয়ায় এটি একনেক সভায় অনুমোদনের জন্য প্রস্তাবিত।”
সূত্র জানায়, ২০২৪ সালের ৫ আগস্টের গণ-অভ্যুত্থানের পর সারা দেশে থানাসহ পুলিশের ৪৬০টি অবকাঠামো ক্ষতিগ্রস্ত হয়। অস্ত্র, গোলা-বারুদ ও অন্যান্য সরঞ্জাম লুট হয়। এর ফলে পুলিশের মনোবল ভেঙে পড়ে এবং আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি খারাপ হয়। পুলিশের মনোবল পুনরুদ্ধার ও আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি শক্ত করতে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় অবকাঠামো উন্নয়নের এই প্রকল্প নেওয়ার উদ্যোগ নেয়।
প্রকল্পের প্রধান কার্যক্রমের মধ্যে রয়েছে:
- পুলিশ ফাঁড়ি, ক্যাম্প, তদন্ত কেন্দ্র এবং বিশেষায়িত ইউনিটের স্থাপনা নির্মাণ ও পূর্তকাজ
- দাপ্তরিক অফিসের জন্য আসবাবপত্র ক্রয় (১৪ কোটি টাকা)
- নৌ পুলিশ, রেলওয়ে পুলিশ, ট্যুরিস্ট পুলিশ, হাইওয়ে পুলিশ ও ইমিগ্রেশন পুলিশকে প্রয়োজনীয় আসবাব ও প্রযুক্তিগত সরঞ্জাম সরবরাহ
- কম্পিউটার ও অন্যান্য প্রযুক্তিগত সরঞ্জাম ক্রয়
- বনায়ন ও ল্যান্ডস্কেপিং কার্যক্রম
- মাটি পরীক্ষা ও স্থাপনার পূর্তকাজের জন্য ৬৬৭ কোটি ৩৮ লাখ টাকা বরাদ্দ
- ওয়াসা, সিটি করপোরেশন, পল্লীবিদ্যুৎ ও অন্যান্য সার্ভিস চার্জের জন্য ৪ কোটি ২০ লাখ টাকা
এভাবে দেশের ৮টি বিভাগে ১৪০টি স্থানে দাপ্তরিক ও পুলিশ অবকাঠামো উন্নয়ন কার্যক্রম সম্পন্ন হবে, যা পুলিশের কর্মক্ষমতা ও আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি শক্তিশালী করবে।
প্রকল্প বাস্তবায়নের প্রাসঙ্গিকতা:
দেশের অধিকাংশ পুলিশ ক্যাম্প, ফাঁড়ি ও তদন্ত কেন্দ্র এখনও অস্থায়ী স্থাপনায়, ভাড়া বাড়ি বা পুরনো ভবনে পরিচালিত হচ্ছে। এর ফলে জরুরি আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি মোকাবিলা, দ্রুত সেবা প্রদান এবং পুলিশ সদস্যদের আবাসিক সুবিধা নিশ্চিত করা কঠিন হয়ে পড়েছে।
রেল পুলিশের ফাঁড়িগুলোও ঝুঁকিপূর্ণ এবং জরাজীর্ণ। সাম্প্রতিক বছরগুলোতে সড়ক দুর্ঘটনা, মহাসড়কে ছিনতাই ও ডাকাতি, ফিটনেসবিহীন যানবাহনের চলাচল বৃদ্ধি পাওয়ায় পরিস্থিতি আরও জটিল হয়ে উঠেছে। হাইওয়ে পুলিশের কার্যক্রম গুরুত্বপূর্ণ হলেও স্থায়ী চেকপোস্ট ও প্রয়োজনীয় অবকাঠামোর অভাবে তাদের সক্ষমতা পুরোপুরি কাজে লাগানো সম্ভব হচ্ছে না।
এছাড়া নৌপথে যাত্রী ও মালামালের নিরাপত্তা, অপরাধ দমন এবং অনিয়ন্ত্রিত নৌযান নিয়ন্ত্রণে নৌপুলিশের দায়িত্ব ক্রমে বাড়ছে। তবে পর্যাপ্ত অবকাঠামো না থাকায় কাঙ্ক্ষিত ফলাফল পাওয়া যাচ্ছে না। রেলপথেও নিরাপত্তা জোরদার করতে বিদ্যমান থানা ও ফাঁড়িগুলোর সংস্কার এবং নতুন স্থাপনা নির্মাণ জরুরি। পর্যটকের সংখ্যা বেড়ে যাওয়ায় ট্যুরিস্ট পুলিশও সীমিতভাবে কার্যক্রম চালাচ্ছে। পর্যাপ্ত আধুনিক সেন্টার না থাকায় সেবাদান ও নিরাপত্তা ব্যবস্থার কার্যকারিতা সীমিত।
বাংলাদেশ পুলিশের অনুমোদিত ৯১১টি ফাঁড়ি, তদন্ত কেন্দ্র ও ক্যাম্পের মধ্যে ৫৮৮টি নিজস্ব জমিতে অবস্থিত। এর মধ্যে মাত্র ১৭৪টিতে নতুন ভবন নির্মিত হয়েছে। বাকি ৪১৪টির মধ্যে অগ্রাধিকারের ভিত্তিতে ১৪০টিকে প্রকল্প এলাকা হিসেবে নির্বাচন করা হয়েছে। এই প্রকল্পের সম্ভাব্যতা সমীক্ষা (ফিজিবিলিটি স্টাডি) করা হয়েছে ডিসেন্ট কনসালটেন্সি অ্যান্ড ইঞ্জিনিয়ারিং প্রতিষ্ঠানের মাধ্যমে।
বাংলাদেশ পুলিশের এআইজি (মিডিয়া অ্যান্ড পাবলিক রিলেশনস) এ এইচ এম শাহাদাত হোসেনের সঙ্গে যোগাযোগ করা হলেও প্রকল্পের বিষয়ে মন্তব্য পাওয়া যায়নি। সূত্র: খবরের কাগজ

