চলতি ২০২৫-২৬ অর্থবছরে বার্ষিক উন্নয়ন কর্মসূচি (এডিপি) বাস্তবায়নে ধীরগতি আরও স্পষ্ট হয়েছে। সর্বশেষ হিসাবে দেখা গেছে, জানুয়ারি মাসে এডিপি খাতে ব্যয় হয়েছে ৮ হাজার ৬৪৯ কোটি ৪২ লাখ টাকা। এটি মোট বরাদ্দের মাত্র ৩ দশমিক ৬৪ শতাংশ।
শুধু জানুয়ারিই নয়, অর্থবছরের প্রথম সাত মাসেও গতি ছিল কম। জুলাই থেকে জানুয়ারি পর্যন্ত ব্যয় হয়েছে ৫০ হাজার ৫৫৬ কোটি টাকা। যা মোট বরাদ্দের ২১ দশমিক ১৮ শতাংশ। সাম্প্রতিক বছরগুলোর মধ্যে এটি সর্বনিম্ন বাস্তবায়ন হার। চলতি অর্থবছরে এডিপির মোট বরাদ্দ রাখা হয়েছে ২ লাখ ৩৮ হাজার ৬৯৫ কোটি ৬৪ লাখ টাকা।
এ তথ্য প্রকাশ করেছে পরিকল্পনা মন্ত্রণালয়ের বাস্তবায়ন, পরিবীক্ষণ ও মূল্যায়ন বিভাগ (আইএমইডি)। সংস্থাটির হালনাগাদ প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, গত নয় বছরের মধ্যে চলতি অর্থবছরের প্রথম সাত মাসে বাস্তবায়ন হার সবচেয়ে কম।
তুলনামূলক চিত্রে দেখা যায়, ২০২৪-২৫ অর্থবছরের একই সময়ে রাজনৈতিক পটপরিবর্তন, সরকার পতন, প্রশাসনিক স্থবিরতা ও অর্থনৈতিক অস্থিরতার মধ্যেও বাস্তবায়ন হার ছিল ২১ দশমিক ৫২ শতাংশ। তখন ব্যয় হয়েছিল ৫৯ হাজার ৮৭৬ কোটি ৮৭ লাখ টাকা।
এর আগের বছরগুলোতে অগ্রগতি ছিল তুলনামূলক ভালো। ২০২১-২২ অর্থবছরে সাত মাসে বাস্তবায়ন হয় ৭১ হাজার ৫৩৩ কোটি টাকা বা ৩০ দশমিক ২১ শতাংশ। ২০২২-২৩ অর্থবছরে ৭২ হাজার ৯০ কোটি টাকা বা ২৮ দশমিক ১৬ শতাংশ। ২০২৩-২৪ অর্থবছরে ৭৪ হাজার ৪৬৪ কোটি টাকা বা ২৭ দশমিক ১১ শতাংশ।
চলতি অর্থবছরে উন্নয়ন সহায়তা থোক বরাদ্দসহ মোট প্রকল্প রয়েছে ১ হাজার ১৯৮টি। এর মধ্যে স্বাস্থ্য খাত সবচেয়ে পিছিয়ে। সাত মাসে স্বাস্থ্য শিক্ষা ও পরিবার কল্যাণ বিভাগ ব্যয় করতে পেরেছে মাত্র ২ দশমিক ৯৮ শতাংশ। স্বাস্থ্যসেবা বিভাগ ব্যয় করেছে ৬ দশমিক ৫৯ শতাংশ। গুরুত্বপূর্ণ এই দুই বিভাগ সাম্প্রতিক বছরগুলোতেও বরাদ্দের অর্থ পুরোপুরি কাজে লাগাতে পারেনি।
আইএমইডির এক ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা নাম প্রকাশ না করার শর্তে বলেন, স্বাস্থ্য খাতে বরাদ্দ বেশি থাকলেও ব্যয় কম। এ বছরও দুটি বিভাগে ২৯টি প্রকল্প অনুমোদন পেয়েছে। প্রকল্প পরিচালকদের অবহেলা, দায়িত্বপ্রাপ্ত চিকিৎসকদের সরকারি কাজের চেয়ে ব্যক্তিগত চেম্বারে বেশি সময় দেওয়া এবং বিদেশি ঋণনির্ভর প্রকল্পে সময়মতো অর্থছাড় না হওয়া—এসব কারণে ব্যয় কম হচ্ছে। অনেক ক্ষেত্রে বরাদ্দ ফেরত যায় অথবা প্রকল্পের মেয়াদ বাড়াতে হয়।
স্বাস্থ্য ছাড়াও পিছিয়ে রয়েছে জননিরাপত্তা বিভাগ, যার বাস্তবায়ন হার ৩ দশমিক ১৪ শতাংশ। সুরক্ষা সেবা বিভাগের ৩ দশমিক ৭৯ শতাংশ। অভ্যন্তরীণ সম্পদ বিভাগের ৫ দশমিক ৪৭ শতাংশ।
অন্যদিকে খাদ্য মন্ত্রণালয় ব্যয়ে এগিয়ে। তারা বরাদ্দের তুলনায় ১৪৫ দশমিক ৯৮ শতাংশ ব্যয় করেছে। আইএমইডির বাস্তবায়ন হার ৭৪ দশমিক ৬৬ শতাংশ। মন্ত্রিপরিষদ বিভাগ ৫৮ দশমিক ৭১ শতাংশ। পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় ৪৮ দশমিক ৭৯ শতাংশ। মহিলা ও শিশু বিষয়ক মন্ত্রণালয় ৪৫ দশমিক ৮৩ শতাংশ। গত কয়েক বছরে রাজনৈতিক পরিবর্তন, আন্দোলন এবং সরকার বদলের প্রভাব সরকারি প্রকল্পে পড়েছে। এতে ঠিকাদারি কার্যক্রম ও প্রশাসনিক সিদ্ধান্তে ধীরগতি আসে।
পরিকল্পনা বিভাগের সাবেক সচিব মো. মামুন আল রশিদ বলেন, প্রকল্প বাস্তবায়নে ধীরগতি অর্থনীতিতে নেতিবাচক প্রভাব ফেলবে। তার মতে, বরাদ্দ ব্যয় কম হওয়ার পেছনে প্রশাসনিক দুর্বলতা ও স্পষ্ট নির্দেশনার অভাব রয়েছে। কর্মকর্তারা অনিশ্চয়তার মধ্যে ছিলেন। ফলে বাস্তবায়ন বাধাগ্রস্ত হয়েছে।
তিনি আরও বলেন, অর্থবছরের মাত্র সাড়ে চার মাস বাকি। এই সময়ে নতুন সরকারের ওপর বাড়তি চাপ তৈরি হবে। অগ্রগতির ঘাটতির কারণ খুঁজে নতুন পরিকল্পনা নিতে সময় লাগবে। তবে সঠিক কৌশল নিলে পরিস্থিতি সামাল দেওয়া সম্ভব।

