অন্তর্বর্তী সরকারের সময়কালেই নিত্যপণ্যের বাজারে চাপ বেড়েছে। সাম্প্রতিক পরিসংখ্যান বলছে, ছয়টি প্রধান ভোগ্যপণ্যের দাম গড়ে বেড়েছে সোয়া ১১ শতাংশের বেশি। এতে সাধারণ ভোক্তাদের ব্যয় আরও বাড়ছে।
সবচেয়ে বেশি বৃদ্ধি দেখা গেছে ভোজ্যতেলে। সয়াবিন তেলের দাম বেড়েছে ১৬ দশমিক ৬৭ শতাংশ। পাম অয়েলে বেড়েছে ১৭ দশমিক ৯৯ শতাংশ। খাদ্যতালিকার অপরিহার্য উপাদান হওয়ায় এ দুটি পণ্যের দাম বাড়া সরাসরি প্রভাব ফেলছে পরিবারগুলোর মাসিক বাজেটে। চালের বাজারেও ঊর্ধ্বগতি রয়েছে। মোটা চালের দাম বেড়েছে ৭ দশমিক ২৮ শতাংশ। সরু চালের ক্ষেত্রে বৃদ্ধি আরও বেশি, ১১ দশমিক ৬২ শতাংশ। একই সময়ে আটার দাম বেড়েছে ৯ দশমিক ৫৮ শতাংশ। মসুর ডালের দামও বেড়েছে ৪ দশমিক ৩৪ শতাংশ।
এই পরিস্থিতিতে সাধারণ মানুষের প্রত্যাশা, নতুন সরকার আসন্ন রমজানকে সামনে রেখে বাজার নিয়ন্ত্রণে কার্যকর উদ্যোগ নেবে। বিশেষ করে নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের সরবরাহ নিশ্চিত করা এবং অযৌক্তিক মূল্যবৃদ্ধি ঠেকাতে দৃশ্যমান পদক্ষেপ নেওয়ার দাবি জোরালো হচ্ছে। ভোক্তাদের মতে, রমজান মাসে চাহিদা বাড়ে। তাই আগেভাগে পরিকল্পনা না নিলে বাজারে আরও অস্থিরতা তৈরি হতে পারে। ফলে এখনই সমন্বিত পদক্ষেপ নেওয়া জরুরি বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।
অন্তর্বর্তী সরকারের সময় নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের মূল্য:
২০২৪ সালের ৮ আগস্ট দায়িত্ব নেয় অন্তর্বর্তী সরকার। দুই দিন পর, ১০ আগস্ট খুচরা বাজারের যে চিত্র তুলে ধরে ট্রেডিং করপোরেশন অব বাংলাদেশ (টিসিবি), তাতে নিত্যপণ্যের দাম ছিল তুলনামূলক স্থিতিশীল। টিসিবির তথ্য অনুযায়ী, সে সময় এক কেজি মোটা চাল বিক্রি হয় ৪৮ থেকে ৫২ টাকায়। সরু চাল ৬০ থেকে ৭৮ টাকা। আটা ৪০ থেকে ৪৫ টাকা। প্রতি লিটার সয়াবিন তেল ১৪৫ থেকে ১৫৫ টাকা। পাম অয়েল ১২৫ থেকে ১৩৫ টাকা। মসুর ডাল ১১৫ থেকে ১২০ টাকায় বিক্রি হয়।
তবে সরকারের মেয়াদের শেষ দিকে এসে চিত্র পাল্টায়। গত ১৪ ফেব্রুয়ারি পর্যন্ত টিসিবির তথ্য বলছে, এসব পণ্যের দাম ২ থেকে ৩০ টাকা পর্যন্ত বেড়েছে। মোটা চাল মানভেদে ২ থেকে ৮ টাকা বেড়ে কেজিতে ৫০ থেকে ৬০ টাকায় ওঠে। সরু চাল ৮ থেকে ১০ টাকা বেড়ে ৭০ থেকে ৮৫ টাকায় বিক্রি হয়। আটার দাম ৪ থেকে ৫ টাকা বেড়ে ৪৪ থেকে ৫০ টাকায় দাঁড়ায়। মসুর ডাল কেজিতে ৫ টাকা বেড়ে ১১০ থেকে ১২০ টাকায় বিক্রি হয়।
সবচেয়ে বেশি বৃদ্ধি দেখা গেছে ভোজ্যতেলে। সয়াবিন তেলের লিটারপ্রতি দাম ৩০ টাকা বেড়ে ১৭৫ থেকে ১৮৫ টাকায় পৌঁছায়। পাম অয়েল ২৭ থেকে ৩০ টাকা বেড়ে ১৫৫ থেকে ১৬২ টাকায় বিক্রি হয়েছে। নগরের পূর্ব নাসিরাবাদ এলাকার বাসিন্দা মো. সালামত উল্লাহ বলেন, রমজান এলেই বাজারে দামের চাপ বাড়ে। তার ভাষ্য, এক মাসেই অনেক ব্যবসায়ী সারা বছরের মুনাফা তুলতে চান। বাজারে তদারকি না থাকায় যে যার মতো দাম বাড়ানোর সুযোগ পাচ্ছেন বলেও অভিযোগ করেন তিনি। নতুন সরকার যেন বিষয়টিতে কঠোর নজর দেয়, এমন প্রত্যাশা তার।
তবে সব পণ্যে ঊর্ধ্বগতি ছিল না। ১৪ ফেব্রুয়ারির টিসিবির তথ্য বলছে, অন্তর্বর্তী সরকারের শেষ সময়ে এসে কয়েকটি পণ্যের দাম কমতে শুরু করে। ছোলা, চিনি, আলু, পেঁয়াজ, রসুন, হলুদ, শুকনা মরিচ ও আদার দাম কেজিতে ২০ থেকে ৬০ টাকা পর্যন্ত কমে।
ছোলা ২৫ থেকে ৩০ টাকা কমে ৮০ থেকে ৯৫ টাকায় বিক্রি হয়েছে। চিনি একই হারে কমে ১০০ থেকে ১০৫ টাকায় নেমেছে। আলু ৩৬ থেকে ৪০ টাকা কমে মানভেদে ২০ থেকে ২৫ টাকায় বিক্রি হয়। দেশি ও ভারতীয় পেঁয়াজ ৫৫ থেকে ৬০ টাকা কমে ৪০ থেকে ৬০ টাকায় নেমে আসে। রসুন ৩০ টাকা কমে ২০০, হলুদ ২০ টাকা কমে ২৮০, শুকনা মরিচ ১০০ টাকা কমে ৪০০ এবং আদা ৬০ টাকা কমে ১৪০ টাকায় বিক্রি হয়েছে।
চট্টগ্রামের হামিদুল্লাহ মিয়া মার্কেট ব্যবসায়ী কল্যাণ সমিতির সাধারণ সম্পাদক মো. ইদ্রিস বলেন, বর্তমানে আদা, রসুন ও পেঁয়াজের সরবরাহ ভালো। দামও তুলনামূলক কম। তার আশা, রমজান মাসে এসব পণ্যের বাজার খুব বেশি অস্থির হবে না। চট্টগ্রামের খুচরা বাজারে কিছু পণ্যের দাম টিসিবির তথ্যের চেয়ে বেশি দেখা যাচ্ছে। ট্রেডিং করপোরেশন অব বাংলাদেশ (টিসিবি) যে দরের তথ্য দিয়েছে, তার চেয়ে চড়া দামে বিক্রি হচ্ছে ছোলা ও মসুর ডাল। বর্তমানে খুচরা বাজারে প্রতি কেজি ছোলা ৯০ থেকে ১০০ টাকায় বিক্রি হচ্ছে। মসুর ডালের কেজি ১৬০ টাকা পর্যন্ত উঠেছে। ফলে রমজান ঘিরে চাহিদা বাড়ার সময়ে এসব পণ্যে বাড়তি চাপ অনুভব করছেন ভোক্তারা।
গত বছরের ডিসেম্বরে খেজুর আমদানিতে শুল্ক ২৫ শতাংশ থেকে কমিয়ে ১৫ শতাংশ করা হয়। শুল্ক কমানোর এই সিদ্ধান্তের পর বাজারে দামে স্বস্তি আসার আশা ছিল। কিন্তু বাস্তবে উল্টো চিত্র দেখা গেছে। খুচরা বাজারে মাত্র এক সপ্তাহের ব্যবধানে আট ধরনের খেজুরের দাম কেজিতে ৫০ থেকে ১০০ টাকা পর্যন্ত বেড়েছে। বর্তমানে প্রতি কেজি বস্তা খেজুর ২২০ টাকা, জাহিদি ২৮০ টাকা, দাবাস ৫৭০ টাকা, কালমি ৭০০ টাকা, সুক্কারি ৮০০ টাকা, মাবরুম ৮৫০ টাকা দরে বিক্রি হচ্ছে। মরিয়ম খেজুর ১ হাজার ১০০ থেকে ১ হাজার ৪০০ টাকা এবং মেডজুল ১ হাজার ২০০ থেকে ১ হাজার ৫০০ টাকায় বিক্রি হচ্ছে। ব্যবসায়ীদের দাবি, শুল্ক কমার প্রত্যাশায় আমদানিকারকেরা কিছু সময় খেজুর আমদানি থেকে বিরত ছিলেন। এতে চাহিদা অনুযায়ী সরবরাহ নিশ্চিত করা যায়নি। সেই ঘাটতির প্রভাবই এখন দামে পড়েছে বলে তারা মনে করছেন।
চট্টগ্রামের বাজারে চাল ও নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের দাম নিয়ন্ত্রণ ও সরবরাহ নিয়ে ব্যবসায়ী ও ভোক্তাদের নানা মন্তব্য এসেছে। পাহাড়তলী বণিক সমিতির সাবেক সাধারণ সম্পাদক মো. নিজাম উদ্দীন সংবাদমাধ্যমকে বলেন, অন্তর্বর্তী সরকারের আমলে কিছু অসাধু মিলার ও কর্পোরেট গ্রুপের হাতে চালের বাজার জিম্মি ছিল। তাদের নিয়ন্ত্রণের কারণে দাম বেড়ে গিয়েছিল। তবে সরকার দাম বাড়তে থাকলে নতুন চাল আমদানি অনুমতি দিত। বর্তমানে ক্রমান্বয়ে চালের দাম কমতে শুরু করেছে। তিনি মনে করান, নতুন চাল বাজারে আসার সঙ্গে দাম আরও কমবে। এছাড়া তিনি বলেন, নতুন সরকারের উচিত দেশের সব ব্যবসায়ীকে ফুড গ্রেইন লাইসেন্স লাইসেন্সের আওতায় নিয়ে আসা, যাতে কেউ অন্যায়ভাবে পণ্য মজুত করে দামের নিয়ন্ত্রণ বিঘ্নিত করতে না পারে।
চাক্তাই-খাতুনগঞ্জ আড়তদার সাধারণ ব্যবসায়ী কল্যাণ সমিতির সাধারণ সম্পাদক মোহাম্মদ মহিউদ্দিন জানান, রমজানকে সামনে রেখে ভোগ্যপণ্যের আমদানি যথাযথভাবে হয়েছে। তবে চট্টগ্রাম বন্দরে আগে ধর্মঘটের কারণে কিছু পণ্য আটকা পড়েছিল। বর্তমানে বন্দরের কার্যক্রম স্বাভাবিক, ডেলিভারি সচল। তিনি আশা প্রকাশ করেন, রমজানে সাধারণ মানুষ ন্যায্য দামে পণ্য কিনতে পারবেন।
অপরদিকে, কনজ্যুমারস অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশ কেন্দ্রীয় কমিটির ভাইস প্রেসিডেন্ট এস এম নাজের হোসাইন বলেন, রমজান শুরু হয়ে গেছে। কিন্তু প্রশাসনের উচিত বাজার তদারকি জোরদার করা ও অসাধু ব্যবসায়ীদের আইনের আওতায় আনা। তিনি সতর্ক করেন, প্রশাসন নীরব থাকলে ব্যবসায়ীরা পণ্যের দাম বাড়ানোর সুযোগ পাবে এবং সাধারণ মানুষের ভোগান্তি কমবে না।

