নির্বাচনে নিরঙ্কুশ বিজয়ের পর বিএনপি চেয়ারম্যান তারেক রহমান দেশের দায়িত্ব গ্রহণ করলেন এমন এক সময়ে, যখন দেশ বিভিন্ন অর্থনৈতিক ও সামাজিক চ্যালেঞ্জের মধ্যে রয়েছে। একদিকে পবিত্র রমজান ও ঈদের বাজার পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণ করা এবং অন্যদিকে চার মাসের মধ্যে নতুন বাজেট প্রণয়ন করা—এই দুই গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব সামনে রেখে সরকারকে দ্রুত সিদ্ধান্ত গ্রহণ করতে হবে।
বর্তমান প্রেক্ষাপটে দেশের অর্থনীতি বহুমাত্রিক চাপে রয়েছে। মূল্যস্ফীতি দীর্ঘস্থায়ী, ব্যাংকিং খাতে আস্থাহীনতা স্পষ্ট, বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ চাপের মুখে, স্বাস্থ্য ও শিক্ষা ব্যবস্থায় বৈষম্য প্রকট এবং প্রশাসনিক কাঠামোর কার্যকারিতা নিয়ে প্রশ্ন দেখা দিয়েছে। এই পরিস্থিতিতে নতুন সরকারের প্রথম ১২০ দিন বা চার মাস কেবল সময়কাল নয়—এটি রাষ্ট্র পরিচালনার দর্শন নির্ধারণ এবং ভবিষ্যৎ অর্থনীতির গতিপথ ঠিক করার এক গুরুত্বপূর্ণ সময়।
এই প্রাথমিক সময়টা হবে নীতিগত “রিসেটের” সুযোগ। জনগণের আস্থা পুনর্গঠন, কাঠামোগত সংস্কার এবং মন্থর অর্থনীতিকে সচল করা—এই চ্যালেঞ্জগুলো নতুন সরকারের জন্য এখন সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার হয়ে দাঁড়িয়েছে। দেশের অর্থনৈতিক দিকনির্দেশনা ও সামাজিক স্থিতিশীলতা নির্ভর করছে এই প্রথম ১২০ দিনের নীতিমূলক পদক্ষেপের উপর।
সম্প্রতি গণমাধ্যমের সঙ্গে কথা বলেছেন ইন্টারন্যাশনাল চেম্বার অব কমার্স বাংলাদেশের (আইসিসি বাংলাদেশ)-এর প্রেসিডেন্ট মাহবুবুর রহমান, অর্থনীতিবিদ (এফএসিএইচই, এফএলএময়াই) এবং ল্যাবএইড ক্যান্সার হাসপাতাল অ্যান্ড সুপার স্পেশালিটি সেন্টারের ম্যানেজিং ডিরেক্টর সাকিফ শামীম, এবং সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগ (সিপিডি)-এর সম্মাননীয় ফেলো ও অর্থনীতিবিদ ড. মোস্তাফিজুর রহমান।
তাঁদের মত, নতুন সরকারের জন্য ক্ষমতার পালাবদল নয়, বরং এটি একটি কঠিন ‘অর্থনৈতিক যুদ্ধ’। এই যুদ্ধে সফল হতে হলে রাজনৈতিক সদিচ্ছা এবং দক্ষ প্রশাসনিক কাঠামোর বিকল্প নেই।
মাহবুবুর রহমান উল্লেখ করেন, গত দেড় বছরে সরকার বেসরকারি খাত থেকে অনেকটা সরে গেছে। ফলে দেশের ব্যবসা-বাণিজ্য ও অর্থনীতি এখন একটি গুরুত্বপূর্ণ সন্ধিক্ষণে দাঁড়িয়ে। নতুন সরকারের দায়িত্ব হলো বেসরকারি খাতের সঙ্গে সমন্বয় করে কাজ করা এবং যৌথ উদ্যোগে অর্থনৈতিক চ্যালেঞ্জ মোকাবিলা করা।
তিনি বলেন, অর্থনৈতিক অনিশ্চয়তা কাটিয়ে টেকসই প্রবৃদ্ধি অর্জনের জন্য সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হলো স্বাধীন ও কার্যকর প্রতিষ্ঠান গড়ে তোলা। বিশেষ করে কেন্দ্রীয় ব্যাংক, আর্থিক নিয়ন্ত্রক সংস্থা এবং নীতিনির্ধারণী প্রতিষ্ঠানের পেশাদারিত্ব ও স্বচ্ছতা নিশ্চিত না হলে বিনিয়োগে আস্থা ফিরবে না। মাহবুবুর রহমান আরও যোগ করেন, রাজনৈতিক পরিবর্তন হলেও অর্থনৈতিক নীতির ধারাবাহিকতা বজায় রাখা অপরিহার্য।
অন্যদিকে সাকিফ শামীম বলেন, অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতা পুনঃপ্রতিষ্ঠা ছাড়া অন্য কোনো সংস্কার টেকসই হবে না। মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণে কেবল বাজার তদারকি বা ভ্রাম্যমাণ আদালত যথেষ্ট নয়। প্রয়োজন একটি সমন্বিত “ইকোনমিক স্ট্যাবিলাইজেশন ফ্রেমওয়ার্ক”, যেখানে অর্থ মন্ত্রণালয়, বাংলাদেশ ব্যাংক, বাণিজ্য মন্ত্রণালয় ও কৃষি খাতের মধ্যে কার্যকর সমন্বয় থাকবে। তিনি আরও বলেন, নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের সরবরাহ চেইনের দুর্বলতা—আমদানি পর্যায় থেকে খুচরা বাজার পর্যন্ত—ডেটাভিত্তিক বিশ্লেষণের মাধ্যমে চিহ্নিত করতে হবে।
ড. মোস্তাফিজুর রহমান জানান, নতুন সরকারের জন্য মূল্যস্ফীতি ৪–৫ শতাংশের মধ্যে নামিয়ে আনা একটি প্রাথমিক লক্ষ্য হতে হবে। এর জন্য বাজারে সরবরাহ বৃদ্ধি সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ। সরবরাহ বাড়াতে বিনিয়োগ বাড়ানো জরুরি, কিন্তু উচ্চ সুদের হার বিনিয়োগের পথে বড় বাধা হিসেবে দাঁড়ায়। তিনি মনে করিয়ে দেন, একদিনে সুদের হার কমানো সম্ভব নয়, তবে ‘কস্ট অব ডোয়িং বিজনেস’ কমানো, বন্দরগুলোর টার্নওভার টাইম হ্রাস, সিঙ্গেল উইন্ডো চালু এবং লজিস্টিক নীতিমালা বাস্তবায়নের মাধ্যমে দেশি-বিদেশি বিনিয়োগকারীর আস্থা তৈরি করা সম্ভব। এছাড়া সুশাসন, আইনশৃঙ্খলা উন্নয়ন, দুর্নীতি প্রতিরোধ ও প্রশাসনিক স্বচ্ছতা বৃদ্ধি অর্থনীতি পুনরুজ্জীবিত করার মূল চাবিকাঠি।
সাকিফ শামীম বলেন, জাতীয় নির্বাচনের পর জনগণের প্রত্যাশা কেবল ক্ষমতার পালাবদল নয়। তারা আশা করে শাসনব্যবস্থার চরিত্র, নীতির অগ্রাধিকার এবং রাষ্ট্র পরিচালনার দর্শনের দৃশ্যমান পরিবর্তন। বিশেষ করে বর্তমান প্রেক্ষাপটে, যখন অর্থনীতি বহুমাত্রিক চাপে, মূল্যস্ফীতি দীর্ঘস্থায়ী, ব্যাংকিং খাতে আস্থাহীনতা স্পষ্ট, বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ চাপের মুখে, স্বাস্থ্য ও শিক্ষা ব্যবস্থায় বৈষম্য প্রকট এবং প্রশাসনিক কাঠামোর কার্যকারিতা প্রশ্নবিদ্ধ—তখন প্রথম ১০০ দিন একটি নীতিগত রিসেটের সময় হিসেবে বিবেচিত। এই সময় সব সমস্যার সমাধান সম্ভব নয়; তবে এটি নির্দেশ করে সরকার কোন পথে হাঁটবে, কাদের স্বার্থকে অগ্রাধিকার দেবে এবং ভবিষ্যতের রাষ্ট্রদর্শন কতটা অন্তর্ভুক্তিমূলক ও দায়িত্বশীল হবে।
নতুন সরকার দায়িত্ব গ্রহণের পর দেশের অর্থনীতি ও সমাজের সামগ্রিক চিত্র বহুমাত্রিক চাপে পড়েছে। এটি কেবল ক্ষমতার পালাবদল নয়; বরং একটি জটিল ‘অর্থনৈতিক যুদ্ধ’ যেখানে সফল হতে হলে রাজনৈতিক সদিচ্ছা এবং দক্ষ প্রশাসনিক কাঠামো অপরিহার্য।
অর্থনীতিবিদ ও ল্যাবএইড ক্যান্সার হাসপাতাল অ্যান্ড সুপার স্পেশালিটি সেন্টারের ম্যানেজিং ডিরেক্টর সাকিফ শামীম জানান, সীমিত সময়ের জন্য শুল্ক-ভ্যাট সমন্বয়, কৃষি উৎপাদনে প্রণোদনা, সংরক্ষণ অবকাঠামো উন্নয়ন এবং লক্ষ্যভিত্তিক ভর্তুকি মূল্যস্ফীতি কমাতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে। একই সঙ্গে সংকোচনমূলক কিন্তু ভারসাম্যপূর্ণ মুদ্রানীতি বাজারে তারল্য শৃঙ্খলা ফিরিয়ে আনতে সহায়ক হবে। সুদের হার নীতিতে ভারসাম্য আনতে হবে—একদিকে মুদ্রাস্ফীতি নিয়ন্ত্রণ, অন্যদিকে বিনিয়োগ উৎসাহ দেওয়া। বিশেষ করে ক্ষুদ্র ও মাঝারি উদ্যোক্তাদের জন্য লক্ষ্যভিত্তিক সুদহ্রাস কর্মসূচি অর্থনীতিতে কর্মসংস্থান বাড়াতে সহায়ক হবে।
ব্যাংকিং ও আর্থিক খাতে আস্থা ফিরিয়ে আনা নতুন সরকারের অন্যতম বড় পরীক্ষা। সাকিফ শামীম বলেন, খেলাপি ঋণ, দুর্বল তদারকি এবং করপোরেট গভর্ন্যান্সের অভাব দীর্ঘদিন ধরে খাতকে ঝুঁকিপূর্ণ করেছে। তিনি বলেন, প্রথম ১২০ দিনে স্বাধীন ব্যাংকিং সংস্কার কমিশন গঠন, প্রকৃত খেলাপি ঋণের চিত্র প্রকাশ, রাজনৈতিক প্রভাবমুক্ত বোর্ড গঠন এবং ঝুঁকিভিত্তিক তদারকি জোরদার করা গেলে দেশি-বিদেশি বিনিয়োগকারীদের কাছে ইতিবাচক সংকেত পৌঁছাবে। একই সঙ্গে এসএমই ও স্টার্টআপ খাতের জন্য পুনঃঅর্থায়ন স্কিম চালু হলে কর্মসংস্থান ত্বরান্বিত হবে।
কর ব্যবস্থায় সংস্কারও জরুরি। বিলাসদ্রব্যে কর বাড়িয়ে নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যে করছাড়, কর প্রশাসনের পূর্ণ ডিজিটালাইজেশন এবং করজালের পরিধি বাড়ানো হলে রাজস্ব আহরণ বৃদ্ধি পাবে এবং করদাতার হয়রানি কমবে। বন্দর ব্যবস্থাপনায় অটোমেশন ও ২৪/৭ অপারেশন নিশ্চিত করলে বৈশ্বিক সরবরাহ শৃঙ্খলে বাংলাদেশের অবস্থান শক্তিশালী হবে এবং রপ্তানি প্রতিযোগিতা বাড়বে। উৎপাদনমুখী শিল্পে স্বল্পসুদে পুনঃঅর্থায়ন স্কিম এবং সহজ লজিস্টিক সাপোর্ট শিল্পায়নকে ত্বরান্বিত করবে।
দেশের বাণিজ্য ও শিল্পখাতের মাদার সংগঠন Federation of Bangladesh Chambers of Commerce and Industry (এফবিসিসিআই) দীর্ঘদিন ধরে নীতিনির্ধারণে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখছে। তবে ব্যবসায়ী সমাজ যদি মনে করে তাদের প্রতিনিধিত্ব প্রশ্নবিদ্ধ বা গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়া দুর্বল, তাহলে সামগ্রিক অর্থনীতিতেও আস্থার সংকট তৈরি হয়। নতুন সরকারের উচিত প্রথম ১২০ দিনের মধ্যে এফবিসিসিআইসহ সকল জাতীয় ও আঞ্চলিক বাণিজ্য সংগঠনের নির্বাচন সুষ্ঠু, স্বচ্ছ ও প্রতিযোগিতামূলকভাবে সম্পন্ন করা। এটি শুধু সাংগঠনিক নয়—এটি অর্থনৈতিক বার্তা। নির্বাচিত ও যোগ্য ব্যবসায়ী নেতৃত্ব নীতিনির্ধারণে বাস্তব অভিজ্ঞতা প্রতিফলিত করে এবং সরকারের সঙ্গে বেসরকারি খাতের অংশীদারিত্ব জোরদার করে।

স্বাস্থ্য খাতেও বৈষম্য মোকাবিলা জরুরি। শহরভিত্তিক বিশেষায়িত সেবা বাড়লেও গ্রামীণ জনগোষ্ঠী এখনও মানসম্মত চিকিৎসা থেকে বঞ্চিত। প্রথম ১২০ দিনে উপজেলা পর্যায়ে টেলিমেডিসিন সংযোগ বাধ্যতামূলক করা, সরকারি হাসপাতালের ওষুধ সরবরাহ ডিজিটাল ট্র্যাকিংয়ে আনা এবং একটি জাতীয় স্বাস্থ্য বীমা কাঠামোর খসড়া প্রকাশ করা যেতে পারে। এতে স্বাস্থ্য ব্যয়ের বড় অংশ পরিবারের ওপর চাপ কমবে।
নতুন সরকারের প্রথম ১২০ দিন দেশের অর্থনীতি, ব্যবসা-বাণিজ্য এবং সামাজিক স্থিতিশীলতার জন্য সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ সময়কাল। এই সময়ের সিদ্ধান্তই নির্ধারণ করবে দেশের নীতি ধারাবাহিকতা, বিনিয়োগকারীর আস্থা এবং দীর্ঘমেয়াদি স্থিতিশীলতা। নতুন সরকার দায়িত্ব গ্রহণের পর দেশের স্বাস্থ্য, প্রযুক্তি ও ডিজিটাল খাতের চ্যালেঞ্জও সামনে এসেছে। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, স্বাস্থ্য খাত শুধু সামাজিক সেবা নয়; এটি দেশের উৎপাদনশীলতার ভিত্তি।
মাতৃ ও শিশু স্বাস্থ্যসেবায় মোবাইল মেডিকেল ইউনিট চালু করলে দ্রুত ফল পাওয়া সম্ভব। উপজেলা পর্যায়ে টেলিমেডিসিন সংযোগ বাধ্যতামূলক করা, সরকারি হাসপাতালের ওষুধ সরবরাহ ডিজিটাল ট্র্যাকিংয়ে আনা এবং একটি জাতীয় স্বাস্থ্য বীমা কাঠামোর খসড়া প্রকাশ করা যেতে পারে। এতে স্বাস্থ্য ব্যয়ের বড় অংশ পরিবারের ওপর চাপ কমবে এবং সামাজিক স্থিতিশীলতা বজায় থাকবে।
ডিজিটাল রূপান্তরেও গুরুত্ব দেওয়া প্রয়োজন। “ডিজিটাল পাবলিক সার্ভিস ফাস্ট ট্র্যাক” চালু করে জন্মনিবন্ধন, ভূমি রেকর্ড, স্বাস্থ্য ও শিক্ষাগত সনদ একক ডিজিটাল আইডির মাধ্যমে সংযুক্ত করা গেলে প্রশাসনিক খরচ ও সময় কমবে। তবে ডিজিটাল নিরাপত্তা নিশ্চিত করা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। বিশেষজ্ঞরা জাতীয় সাইবার রেসপন্স টাস্কফোর্স গঠন, গুরুত্বপূর্ণ অবকাঠামোর সাইবার অডিট এবং তথ্য সুরক্ষা আইন শক্তিশালী করার পরামর্শ দিচ্ছেন। ব্যাংকিং, স্বাস্থ্য ও সরকারি ডেটাবেসে বহুপদ নিরাপত্তা কাঠামো চালু করা প্রয়োজন।
একই সঙ্গে, নতুন সরকারকে দেশকে শুধু প্রযুক্তি ব্যবহারকারী নয়, প্রযুক্তি নির্মাতা রাষ্ট্রে পরিণত করার পরিকল্পনা নিতে হবে। এআই ডিপ্লোমেসি এখন অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ, কারণ উন্নত দেশগুলোর সঙ্গে সহযোগিতা কেবল সফটওয়্যার বা সেবা পর্যায়ে সীমাবদ্ধ নয়; এটি সেমিকন্ডাক্টর, ডেটা আর্কিটেকচার এবং কৌশলগত প্রযুক্তি সক্ষমতার সঙ্গে সরাসরি যুক্ত। যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে যৌথ গবেষণা, প্রযুক্তি ট্রান্সফার এবং দক্ষতা উন্নয়নের মাধ্যমে ধাপে ধাপে ডোমেস্টিক সেমিকন্ডাক্টর ও চিপ তৈরির সক্ষমতা গড়ে তুলতে হবে।
দেশের অভ্যন্তরীণ প্রযুক্তি সক্ষমতা বাড়াতে একটি এআই ইনফ্রাস্ট্রাকচার পলিসি কমিটি গঠন প্রয়োজন। এই কমিটি জাতীয় ডেটা সেন্টার, ক্লাউড গভর্ন্যান্স, হাই-পারফরম্যান্স কম্পিউটিং, সরকারি ডেটা স্ট্যান্ডার্ড এবং সাইবার সিকিউরিটি আর্কিটেকচারের নীতিমালা নির্ধারণ করবে। একটি সমন্বিত ন্যাশনাল এআই ইনফ্রাস্ট্রাকচার রোডম্যাপ তৈরি করে সরকারি ও বেসরকারি খাতে ডেটা শেয়ারিং, নিরাপত্তা এবং স্কেলযোগ্য কম্পিউটিং সুবিধা নিশ্চিত করা হলে স্টার্টআপ, গবেষণা প্রতিষ্ঠান এবং শিল্পখাত দ্রুত নতুন সমাধান তৈরি করতে পারবে।
বিশেষজ্ঞরা আরও বলেন, স্বাস্থ্য, কৃষি, আর্থিক খাত এবং স্মার্ট ম্যানুফ্যাকচারিংয়ে এআই ব্যবহার বাড়াতে রাষ্ট্রীয় পর্যায়ে অবকাঠামোগত ভিত্তি শক্তিশালী করা অপরিহার্য। চতুর্থ শিল্প বিপ্লবের বাস্তব প্রস্তুতির জন্য একটি পূর্ণাঙ্গ ফোর্থ ইন্ডাস্ট্রিয়াল রিভোলিউশন ন্যাশনাল পলিসি প্রণয়ন করা যেতে পারে, যেখানে উদ্ভাবন, গবেষণা, স্টার্টআপ ইকোসিস্টেম এবং দক্ষতা উন্নয়ন একত্রিত হবে। এই নীতির অধীনে নতুন প্রযুক্তিনির্ভর সেবা ও প্ল্যাটফর্ম তৈরি উৎসাহিত করতে একটি ইমার্জিং টেকনোলজি অ্যাপলিকেশন ডেভেলপমেন্ট ফান্ড গঠন করা যেতে পারে। এছাড়া শিল্প, শিক্ষা ও প্রযুক্তি খাতের সমন্বয়ে একটি বিশেষ চতুর্থ শিল্প বিপ্লব বাস্তবায়ন টাস্কফোর্স গঠন করলে নতুন প্রযুক্তির বাস্তব প্রয়োগ দ্রুত বাড়বে।
শিল্প অটোমেশন, রোবোটিক্স, বায়োটেক, এআই অ্যাপ্লিকেশন এবং স্মার্ট গভর্ন্যান্স সলিউশন বাস্তবায়নের জন্য একটি বিশেষ টাস্কফোর্স গঠন করা যেতে পারে। এটি নতুন কর্মসংস্থান সৃষ্টি করবে এবং বাংলাদেশকে আঞ্চলিক প্রযুক্তি উদ্ভাবন কেন্দ্র হিসেবে পরিচিতি দেবে।
খাদ্য নিরাপত্তা কেবল উৎপাদনের প্রশ্ন নয়; এটি সংরক্ষণ, পরিবহন এবং ন্যায্য বাজার ব্যবস্থার সঙ্গে যুক্ত। জেলা পর্যায়ে আধুনিক কোল্ড স্টোরেজ নেটওয়ার্ক, কৃষিপণ্য প্রক্রিয়াজাতকরণ শিল্প এবং কৃষকদের সরাসরি ডিজিটাল মার্কেটপ্লেসে সংযুক্ত করা হলে অপচয় কমবে। জলবায়ু সহনশীল বীজ এবং স্মার্ট সেচ প্রযুক্তিতে ভর্তুকি দিলে উৎপাদন স্থিতিশীল থাকবে। খাদ্য নিরাপত্তা নিশ্চিত হলে সামাজিক স্থিতিশীলতা বাড়ে, মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণ সহজ হয় এবং দরিদ্র জনগোষ্ঠীর জীবনমান উন্নত হয়।
শিক্ষা ও দক্ষতা উন্নয়ন দীর্ঘমেয়াদি প্রবৃদ্ধির মূল হাতিয়ার। “লার্নিং রিকভারি প্রোগ্রাম” চালু করে গণিত, বিজ্ঞান ও ভাষায় শিক্ষার্থীদের দক্ষতা মূল্যায়ন এবং দুর্বল অঞ্চলে বিশেষ সহায়তা দেওয়া যেতে পারে। কারিগরি ও ভোকেশনাল শিক্ষাকে শিল্পখাতের সঙ্গে যুক্ত করে কারিকুলাম হালনাগাদ করলে তরুণদের কর্মসংস্থান সম্ভাবনা বাড়বে। ডেমোগ্রাফিক ডিভিডেন্ডকে কাজে লাগাতে দক্ষতা উন্নয়ন অপরিহার্য।
জ্বালানি খাতেও স্বচ্ছতা ও নবায়নযোগ্য জ্বালানিতে বিনিয়োগ বাড়ানো জরুরি। দীর্ঘমেয়াদি জ্বালানি নিরাপত্তা পরিকল্পনা হালনাগাদ না করলে অর্থনীতি অস্থির থাকবে। স্বচ্ছতা বিনিয়োগকারীর আস্থা বৃদ্ধি করবে।
আন্তর্জাতিক অঙ্গনে ভারসাম্যপূর্ণ কূটনীতি, রপ্তানি বাজার বৈচিত্র্যকরণ এবং প্রবাসী আয়ের প্রণোদনা কাঠামো উন্নত করলে বৈদেশিক মুদ্রার চাপ কমবে। বিদেশি বিনিয়োগ আকর্ষণে কার্যকর ওয়ান-স্টপ সার্ভিস চালু করা সময়ের দাবি। বিশেষ করে Association of Southeast Asian Nations (আসিয়ান) দেশগুলো দ্রুত বর্ধনশীল বাজার, যেখানে রপ্তানি বাড়াতে শুল্ক সুবিধা, মান নিয়ন্ত্রণ সনদ ও লজিস্টিক সহযোগিতা জোরদার করা যেতে পারে। তৈরি পোশাক, ওষুধ, আইটি সেবা ও কৃষিপণ্য খাতগুলোতে প্রতিযোগিতামূলক সুবিধা তৈরি সম্ভব।
বাংলাদেশ মুসলিম সংখ্যাগরিষ্ঠ দেশ হিসেবে হালাল খাদ্য উৎপাদনে স্বাভাবিক সুবিধা রাখে। বৈশ্বিক হালাল অর্থনীতি ইতিমধ্যে ট্রিলিয়ন ডলারের বাজারে পরিণত হয়েছে। হালাল সার্টিফিকেশন কর্তৃপক্ষ শক্তিশালী করা, আন্তর্জাতিক মান অনুযায়ী প্রক্রিয়াজাত শিল্প গড়ে তোলা এবং মধ্যপ্রাচ্য ও দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ায় বাজার সম্প্রসারণ করলে বৈদেশিক মুদ্রা অর্জন উল্লেখযোগ্যভাবে বৃদ্ধি পাবে। হালাল কসমেটিকস, ফার্মাসিউটিক্যালস এবং পর্যটনও এই অর্থনীতির অংশ হতে পারে।
প্রশাসনিক সংস্কার ছাড়া এসব উদ্যোগ টেকসই হবে না। প্রতিটি মন্ত্রণালয়ের জন্য নির্দিষ্ট সময়সীমাভিত্তিক কর্মপরিকল্পনা প্রকাশ, কর্মদক্ষতা মূল্যায়ন এবং পদোন্নতিতে মেধাভিত্তিক নীতি অনুসরণ আস্থা বাড়াবে। দুর্নীতি দমন কমিশন ও নিয়ন্ত্রক সংস্থাগুলোর স্বাধীনতা নিশ্চিত করতে স্পষ্ট বার্তা দেওয়া প্রয়োজন। আইনশৃঙ্খলা ও বিচারব্যবস্থায় মামলার জট কমাতে বিশেষ টাস্কফোর্স গঠন এবং মানবাধিকার সুরক্ষায় কার্যকর পদক্ষেপ রাষ্ট্রের ভিত্তি মজবুত করবে।
প্রবাসী শ্রমিকদের দক্ষতা উন্নয়নও নতুন সরকারের অগ্রাধিকার হওয়া উচিত। বর্তমানে দেশের অনেক প্রবাসী নিম্ন বা মধ্য-দক্ষতার কাজে নিয়োজিত, যার ফলে রেমিট্যান্সের গুণগত মান সীমিত। প্রথম ১২০ দিনে একটি ন্যাশনাল স্কিলড মাইগ্রেশন রোডম্যাপ তৈরি করা যেতে পারে, যেখানে আন্তর্জাতিক শ্রমবাজারভিত্তিক স্কিল ম্যাপিং, দেশভিত্তিক স্কিল স্ট্যান্ডার্ড এবং গ্লোবাল সার্টিফিকেশন ইন্টিগ্রেশন নিশ্চিত করা হবে। এর মাধ্যমে বৈদেশিক মুদ্রার প্রবাহ ও কর্মসংস্থান উন্নত হবে।
সরকার যদি টেকনিক্যাল ট্রেনিং ইনস্টিটিউট, মেডিকেল টেকনিক্যাল স্কিল সেন্টার, আইটি স্কিল একাডেমি এবং ইন্ডাস্ট্রি-লিঙ্কড ভোকেশনাল সিস্টেম একীভূত করে “এক্সপোর্ট-ওরিয়েন্টেড স্কিল পাইপলাইন” তৈরি করে, তাহলে প্রতিটি প্রবাসী কর্মীর আয় উল্লেখযোগ্যভাবে বৃদ্ধি পেতে পারে।
দ্বিপাক্ষিক শ্রম চুক্তিতে শুধুমাত্র কর্মসংস্থান নয়, স্কিল রিকগনিশন, সোশ্যাল সিকিউরিটি এবং ক্যারিয়ার প্রগ্রেশন অন্তর্ভুক্ত করলে প্রবাসীরা কেবল রেমিট্যান্স প্রেরণকারী নয়, বরং গ্লোবাল স্কিল ইকোসিস্টেমের অংশ হিসেবে প্রতিষ্ঠিত হবে। স্কিলড মাইগ্রেশনকে জাতীয় অর্থনৈতিক কৌশলের অংশ করা গেলে রেমিট্যান্স প্রবাহ কেবল পরিমাণে নয়, মানেও বৃদ্ধি পাবে এবং বৈদেশিক মুদ্রা স্থিতিশীলতার নির্ভরযোগ্য স্তম্ভ হিসেবে কাজ করবে।
রাজনৈতিক ও সামাজিক সম্প্রীতি নিশ্চিত করা জরুরি। প্রথম ১২০ দিনেই একটি অন্তর্ভুক্তিমূলক জাতীয় সংলাপ আয়োজন করা যেতে পারে, যেখানে রাজনৈতিক দল, ব্যবসায়ী সমাজ, নাগরিক সমাজ ও তরুণ প্রতিনিধিরা অংশ নেবে। বিভাজন নয়, সমঝোতা—এই বার্তাই নতুন সরকারের সবচেয়ে বড় শক্তি হবে।
প্রথম ১২০ দিনের গুরুত্ব:
সাকিফ শামীমের মতে, প্রথম ১২০ দিন কোনো জাদুকরি সমাধানের সময় নয়; বরং এটি শক্ত ভিত নির্মাণের সুযোগ। এই সময়টিকে স্বচ্ছতা, জবাবদিহিতা, প্রাতিষ্ঠানিক গণতন্ত্র, প্রযুক্তিনির্ভর রূপান্তর এবং কাঠামোগত সংস্কারের সূচনা হিসেবে ব্যবহার করলে জনগণের আস্থা পুনর্গঠিত হবে।
সঠিক দিকনির্দেশনা ও দৃঢ় বাস্তবায়নের মাধ্যমে এই ১২০ দিনই হতে পারে দায়িত্বশীল, অন্তর্ভুক্তিমূলক ও টেকসই রাষ্ট্র নির্মাণের নতুন যাত্রাপথের সূচনা। বাংলাদেশ আজ সম্ভাবনা ও চ্যালেঞ্জের সন্ধিক্ষণে দাঁড়িয়ে, যেখানে প্রথম ১২০ দিনের সিদ্ধান্ত দেশটির ভবিষ্যত গড়ার ক্ষেত্রে মুখ্য ভূমিকা রাখবে।

