বাংলাদেশের উন্নয়ন বাজেটের ইতিহাস প্রমাণ করে, উচ্চাভিলাষী সংখ্যা আর প্রকৃত বাস্তবায়নের মধ্যে বড় ফারাক রয়েছে। অর্থবছর শুরু হয় বিশাল বরাদ্দ ঘোষণা দিয়ে। সংখ্যা পড়ার সঙ্গে সঙ্গে আশা জন্মায়—অগ্রগতির, নতুন প্রকল্পের, দেশের উন্নয়নের। কিন্তু বছর এগোতে থাকে, বাস্তবতা ধীরে ধীরে প্রকাশ পায়। মাঝপথে আসে বরাদ্দ সংশোধন, কাটছাঁট করা হয় লক্ষ্য। বছরের শেষে হিসাব মিলিয়ে দেখা যায়, বরাদ্দের বড় অংশ অব্যবহৃত থেকে গেছে।
গত কয়েক বছর ধরে বার্ষিক উন্নয়ন কর্মসূচি (এডিপি) একই পুনরাবৃত্তি দেখিয়েছে। ঘোষণা সবসময় জোরালো, বাস্তবায়নের গতি তুলনায় কম। লক্ষ্য বড়, অর্জন ছোট। এই ব্যবধান এখন দেশের উন্নয়ন বাজেট আলোচনার প্রধান বিষয়।
এ অভিজ্ঞতা মাথায় রেখেই অন্তর্বর্তী সরকার ২০২৬–২৭ অর্থবছরের জন্য এডিপি বরাদ্দকে সংযমী পরিসরে নেমে ১ লাখ ৮৬ হাজার কোটি টাকায় নির্ধারণের সুপারিশ দিয়েছে। এবার শুধু সংখ্যা নয়, বাস্তবতার সঙ্গে তাল মিলানোই অগ্রাধিকার। সরকারের অভিমত—বড় লক্ষ্য থাকলেই উন্নয়ন ত্বরান্বিত হয় না; কার্যকর বাস্তবায়নই মূল মাপকাঠি।
বাস্তবায়নের চিত্র: পরিসংখ্যানও একই ধারা দেখাচ্ছে:
- ২০২১–২২ অর্থবছরে বরাদ্দ ২ লাখ ৩৬ হাজার কোটি, বাস্তবায়ন ২ লাখ ৩ হাজার কোটি।
- ২০২২–২৩ বরাদ্দ ২ লাখ ৫৬ হাজার কোটি, বাস্তবায়ন মাত্র ২ লাখ ১ হাজার কোটি।
- ২০২৩–২৪ বরাদ্দ ২ লাখ ৭৪ হাজার কোটি, বাস্তবায়ন ২ লাখ ৫ হাজার কোটি।
- ২০২৪–২৫ বরাদ্দ ২ লাখ ৭৮ হাজার কোটি, বাস্তবায়ন নেমে আসে ১ লাখ ৫৪ হাজার কোটি।
চলতি ২০২৫–২৬ অর্থবছরের শুরুতে এডিপি ছিল ২ লাখ ৩৮ হাজার কোটি। পরে সংশোধন করে নামানো হয় ২ লাখ কোটি। বছরের প্রথম সাত মাসে (জুলাই–জানুয়ারি) ব্যয় হয়েছে ৫০ হাজার ৫৫৬ কোটি ২৯ লাখ টাকা। অর্থাৎ বরাদ্দ ও বাস্তব ব্যয়ের ব্যবধান এখনও বড়। এই ধারাবাহিকতা সামনে রেখেই ২০২৬–২৭ অর্থবছরের বাজেটে সংযমী বরাদ্দ প্রস্তাব করা হয়েছে।
সদ্য সাবেক পরিকল্পনা উপদেষ্টা ড. ওয়াহিদউদ্দিন মাহমুদ বলেন, “বাস্তবায়নের সক্ষমতা ও প্রকৃত প্রয়োজন বিবেচনা করেই ২০২৬–২৭ অর্থবছরের এডিপি নির্ধারণ করা হয়েছে। এবার কাগুজে উচ্চাভিলাষ নয়, বাস্তবসম্মত পরিসরই অগ্রাধিকার পাবে।” এক সচিব (নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক) জানান, অতীতে বড় বরাদ্দ থাকলেও প্রকল্পের বাস্তবায়নের সঙ্গে তা মেলেনি। অনেক প্রকল্প সময়মতো শেষ হয়নি, বরাদ্দের বড় অংশ অব্যবহৃত থেকে গেছে। এ অভিজ্ঞতাই সংযমী লক্ষ্য নির্ধারণে প্রভাব ফেলেছে।
বেসরকারি গবেষণা প্রতিষ্ঠান সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগের (সিপিডি) নির্বাহী পরিচালক ড. ফাহমিদা খাতুন বলেন, “উন্নয়ন বাজেটের আকার মূলত সরকারের দক্ষতা ও বাস্তবায়ন সক্ষমতার ওপর নির্ভর করে। জনগণের চাহিদা অনুযায়ী বরাদ্দ প্রায়ই পর্যাপ্ত নয়, আবার বরাদ্দ থাকলেও পুরোটা ব্যবহার হয় না। বাস্তবায়নের স্বচ্ছতাও সমান জরুরি।”
বিশ্বব্যাংকের ঢাকা কার্যালয়ের সাবেক মুখ্য অর্থনীতিবিদ ড. জাহিদ হোসেন উল্লেখ করেন, নতুন সরকারকে বাজেট প্রণয়নে পুরনো ধারা ছাড়তে হবে। আগামী বাজেটে থাকতে হবে নির্বাচনী প্রতিশ্রুতি, ২০৩২ সালের মধ্যে ট্রিলিয়ন ডলার অর্থনীতির লক্ষ্য, ঋণ নির্ভরতা কমানো, রাজস্ব বৃদ্ধি এবং ঘাটতি নিয়ন্ত্রণের সুস্পষ্ট রূপরেখা।

