দেশের বিদ্যুৎ খাতে বর্তমানে বকেয়া দাঁড়িয়েছে প্রায় ৪০ হাজার কোটি টাকা। উৎপাদনে প্রয়োজনীয় গ্যাস সরবরাহের সঙ্গে চাহিদার ফারাক দিন দিন বেড়ে চলেছে। এই ত্রুটি আরও জটিল হয়ে উঠেছে, কারণ বিদ্যুৎ খাতের আর্থিক লোকসান এখনও কমেনি।
এমন অবস্থার মধ্যেই ক্ষমতা গ্রহণ করেছে বিএনপি নেতৃত্বাধীন নতুন সরকার। চলমান সেচ মৌসুম ও রমজান মাসে বিদ্যুতের চাহিদা আরও বৃদ্ধি পাবে। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, বিদ্যুৎ খাতে বকেয়া সামলানো, আর্থিক স্থিতিশীলতা পুনঃপ্রতিষ্ঠা করা এবং গ্যাস সরবরাহ সংকট মোকাবেলা নতুন সরকারের জন্য বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়াবে।
গত আঠারো মাস ধরে ক্ষমতায় ছিল অন্তর্বর্তী সরকার। এই সময়ে বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ মন্ত্রণালয়ের দায়িত্বে ছিলেন উপদেষ্টা মুহাম্মদ ফাওজুল কবির খান। বিদ্যুৎ ও জ্বালানি খাতের সংস্কারের বিভিন্ন প্রতিশ্রুতি থাকা সত্ত্বেও, আর্থিক লোকসান হ্রাসে কার্যত কোনো প্রগতি ঘটানো সম্ভব হয়নি।
বিশেষ করে বিদ্যুতের ট্যারিফ সংশোধন, এলএনজি আমদানি এবং ক্যাপাসিটি চার্জ হ্রাস করতে পারেনি অন্তর্বর্তী সরকার। বরং এই সময়কালে একক ক্রেতা প্রতিষ্ঠান বাংলাদেশ বিদ্যুৎ উন্নয়ন বোর্ডের (বিপিডিবি) আর্থিক লোকসান আরও বৃদ্ধি পেয়েছে। বিদ্যুৎ খাতের এই চ্যালেঞ্জ নতুন সরকারের নীতি ও কার্যক্রমের বাস্তব পরীক্ষা হবে, যা দেশের অর্থনীতি ও জনগণের দৈনন্দিন জীবনের সঙ্গে সরাসরি যুক্ত। ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদে নির্বাচিত নতুন সরকার গতকাল প্রথম কর্মদিবসে ১৮০ দিনের অগ্রাধিকার নির্ধারণ করেছে। এ তালিকার একটি গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো বিদ্যুৎ ও জ্বালানি সরবরাহ স্বাভাবিক রাখা।
বাংলাদেশ সচিবালয়ে প্রথম মন্ত্রিসভা বৈঠক শেষে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী ও বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য সালাহউদ্দিন আহমদ সাংবাদিকদের বলেন, “প্রথামতো সরকারের প্রথম ১০০ দিনের অগ্রাধিকার নির্ধারণ করা হয়। আমরা এবার ১৮০ দিনের অগ্রাধিকার নির্ধারণ করেছি। বিস্তারিত পরে জানানো হবে। প্রাথমিকভাবে দ্রব্যমূল্য নিয়ন্ত্রণ, আইন-শৃঙ্খলা উন্নয়ন, সরবরাহ চেইন সচল রাখা এবং বিদ্যুৎ ও জ্বালানি খাতে কোনো সংকট না সৃষ্টি হওয়া—এগুলোই আমাদের অগ্রাধিকার।”
এদিকে, সরকারের প্রথম কর্মদিবসে সচিবালয়ে দায়িত্ব নেন বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজ সম্পদমন্ত্রী ইকবাল হাসান মাহমুদ টুকু। মন্ত্রণালয়ে কর্মকর্তাদের সঙ্গে মতবিনিময় শেষে তিনি রমজান ও সেচ মৌসুমে বিদ্যুৎ সরবরাহ নিশ্চিত করতে অগ্রাধিকার দেওয়ার ঘোষণা দেন।
বাংলাদেশ ইনডিপেনডেন্ট পাওয়ার প্রডিউসার অ্যাসোসিয়েশন (বিপ্পা) তাদের বকেয়া অর্থের অন্তত ৬০ শতাংশ রমজানের আগে না পেলে পাওয়ার প্লান্ট পরিচালনা কঠিন হবে—এ বিষয়ে মন্ত্রীর মন্তব্য কী। এ প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, “বিপ্পা যদি এমনটা বলে থাকে, তবে তা নতুন সরকারকে ব্ল্যাকমেইলের চেষ্টা হিসেবে গণ্য হবে।” নতুন সরকার স্পষ্ট বার্তা দিয়েছেন, বিদ্যুৎ ও জ্বালানি খাতের স্থিতিশীলতা নিশ্চিত করা তাদের অগ্রাধিকার, এবং আর্থিক ও সরবরাহ জটিলতা মোকাবেলায় কোনো আপোস হবে না।
দেশের বিদ্যুৎ ও জ্বালানি খাতে অন্তর্বর্তী সরকারের আমলে কিছু দায় পরিশোধ হলেও এখনও বকেয়া দাঁড়িয়েছে প্রায় ৪০ হাজার কোটি টাকা। অন্তর্বর্তী সরকারের সময় বিদ্যুৎ ও জ্বালানি খাতে নানা সংস্কারের উদ্যোগ নিলো হলেও আর্থিক চাপ এবং লোকসান কমাতে তেমন কোনো সফলতা পাওয়া যায়নি। বিদ্যুৎ খাতের বড় লোকসানের প্রধান কারণ হলো অপ্রয়োজনীয় এবং নির্মাণাধীন প্রকল্প বাস্তবায়ন। এই প্রকল্পগুলো পরিচালনার কারণে অন্তর্বর্তী সরকার আর্থিক চাপ সামাল দিতে হিমশিম খেয়েছে। তাই বিএনপি সরকারও যদি এসব প্রকল্প দক্ষতার ভিত্তিতে মূল্যায়ন না করে, খাতের চাপ কমানো সম্ভব হবে না।
বিদ্যুৎ খাতকে টেকসই করতে সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ হলো ভর্তুকি কমিয়ে আর্থিক সচ্ছলতা ফিরিয়ে আনা। গত পাঁচ বছরে খাতে দেওয়া ভর্তুকির পরিমাণ ২ লাখ ৬ হাজার ৪৮২ কোটি টাকা। চলতি অর্থবছরে ২০২৫-২৬ সালে বিদ্যুৎ খাতের জন্য বরাদ্দ রাখা হয়েছে ৩৭ হাজার কোটি টাকা।
অন্তর্বর্তী সরকার কিছুটা ভর্তুকি কমালেও একক ক্রেতা প্রতিষ্ঠান বাংলাদেশ বিদ্যুৎ উন্নয়ন বোর্ডের (বিপিডিবি) নিট লোকসান ১৭ হাজার কোটি টাকা ছাড়িয়ে গেছে। ফলে ব্যয় সাশ্রয়ের পথ তৈরি হলেও বিপিডিবি প্রায় আর্থিকভাবে খাদের কিনারায় পৌঁছে গেছে। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, খাতকে টেকসই করতে বিএনপি সরকারকে কাঠামোগত সংস্কার আনার প্রয়োজন।
অন্তর্বর্তী সরকার ক্ষমতা গ্রহণের পর আদানি ও বড় সক্ষমতার বিদ্যুৎ কেন্দ্রগুলোর ক্রয়চুক্তি পর্যালোচনার জন্য জাতীয় কমিটি গঠন করে। কমিটি আদানির চুক্তিতে বড় ধরনের দুর্নীতির কথা জানিয়েছে। পাশাপাশি তারা পরামর্শ দিয়েছে, প্রয়োজন হলে আন্তর্জাতিক আদালতে মামলা করা যেতে পারে। যদিও প্রত্যাশা ছিল, অন্তর্বর্তী সরকার চুক্তি বাতিল করে রাজনৈতিক সরকারের জন্য বিষয়টি পরিষ্কার রাখবে, শেষ পর্যন্ত তারা প্রতিবেদনের মাধ্যমে বিষয়টি রাজনৈতিক সরকারের জন্য রেখে দিয়েছে।
আওয়ামী লীগ আমলে পরিকল্পনার অভাব এবং অতিরিক্ত সক্ষমতা তৈরি করার কারণে প্রায় দেড় লাখ কোটি টাকার ক্যাপাসিটি চার্জ পরিশোধ করতে হয়েছে। এছাড়া বেসরকারি ও সরকারি উত্সের অপ্রয়োজনীয় বিদ্যুৎ সক্ষমতার ব্যবহার নিয়েও বড় চ্যালেঞ্জ রয়েছে। এ সমস্যা সমাধান না হলে খাতের আর্থিক লোকসান কমানো সম্ভব হবে না।
বিদ্যুৎ খাতের মতো গ্যাস খাতেও বিপুল ভর্তুকি দিয়ে এসেছে সরকার। প্রতি বছর প্রায় ৬ হাজার কোটি টাকা এলএনজি আমদানি ও সরবরাহে ভর্তুকি দিতে হচ্ছে। গত পাঁচ বছরে এই খাতে দেওয়া ভর্তুকির পরিমাণ দাঁড়িয়েছে ৩৩ হাজার ২৬৮ কোটি টাকা। ২০২১-২২ থেকে ২০২৫-২৬ অর্থবছরের মধ্যে বরাদ্দকৃত এ অর্থ চলতি বছরের ফেব্রুয়ারি পর্যন্ত প্রায় ৪ হাজার কোটি টাকা ছাড় করা হয়েছে, জানায় পেট্রোবাংলা।
দেশে স্থানীয় গ্যাসের উৎপাদন ক্রমান্বয়ে কমায় ঘাটতি মেটাতে উচ্চমূল্যে ব্যয়বহুল এলএনজি আমদানি শুরু হয়েছিল আগের সরকারের সময়। অন্তর্বর্তী সরকার স্থানীয় উত্তোলন বাড়ানোর নানা পদক্ষেপ নিলেও তেমন সুফল হয়নি। বরং অতীতের তুলনায় এলএনজি আমদানির পরিমাণ বাড়িয়ে ঘাটতি সামাল দেয়ার চেষ্টা করা হয়েছে।
বিদ্যুৎ সরবরাহ স্থিতিশীল রাখতে এবং শিল্প, সারসহ আবাসিক ক্ষেত্রে নিরবচ্ছিন্ন গ্যাস সরবরাহ নিশ্চিত করতে আগের সরকার ব্যর্থতা দেখিয়েছে। অন্তর্বর্তী সরকারের সময়ও পরিস্থিতিতে বিশেষ উন্নতি হয়নি। বিশেষজ্ঞরা আশা করেছিলেন, খাতের সংস্কারে দক্ষ ব্যবস্থাপনার মাধ্যমে গ্যাস সরবরাহ বাড়ানো হবে। তবে দেখা গেছে, অন্তর্বর্তী সরকার মূলত এলএনজি আমদানি ও কিছু কূপ সংস্কারের মাধ্যমে সীমিত সমাধান দিয়েছে। এ ছাড়া সাগরে তেল-গ্যাস অনুসন্ধান সম্পর্কিত দরপত্রে বড় কোনো পদক্ষেপ নেওয়া হয়নি। বিগত সরকারের সময় নেওয়া ৫০ কূপ খনন ও ২০২৮ সালের মধ্যে ১০০ কূপ খননের পরিকল্পনা শুধু প্রকাশ করেই বিদায় নিয়েছে অন্তর্বর্তী সরকার।
বর্তমানে দেশের গ্যাস চাহিদা ৩ হাজার ৮০০ মিলিয়ন ঘনফুট, যেখানে এলএনজি আমদানি ও স্থানীয় উৎপাদনের মাধ্যমে সরবরাহ হচ্ছে মাত্র ২ হাজার ৬০০ মিলিয়ন ঘনফুটের কিছু বেশি। নিয়মিত রেশনিংয়ের কারণে শিল্প, বিদ্যুৎ এবং আবাসিক খাত ভুক্তভোগী হচ্ছে। বিশেষ করে রমজান, সেচ ও গ্রীষ্ম মৌসুমে পরিস্থিতি আরও সংকটময় হয়। জ্বালানি বিশেষজ্ঞরা মনে করেন, চলতি রমজান ও সেচ মৌসুমে এই চাপ সামলানো নতুন সরকারের বড় চ্যালেঞ্জ হবে।
জ্বালানি বিশেষজ্ঞ ও ইনডিপেনডেন্ট ইউনিভার্সিটির উপাচার্য অধ্যাপক ম. তামিম বলেন, “নতুন সরকারের সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ হলো প্রাথমিক জ্বালানি সরবরাহ নিশ্চিত করা। বিশেষত গ্যাস, তেল, এলপিজি ও কয়লার সরবরাহ ধরে রাখতে হবে। এটি করতে পারলে রমজান ও গ্রীষ্ম মৌসুমে বিদ্যুৎ উৎপাদনের সমস্যা মোকাবেলা করা সম্ভব হবে।”
রমজানে বিদ্যুতের চাহিদা অন্য সময়ের তুলনায় অনেক বেশি হয়। বর্তমানে দৈনিক চাহিদা প্রায় সাড়ে ১২ হাজার মেগাওয়াট (সন্ধ্যায় পিক আওয়ার)। আগামী কয়েক দিনের মধ্যে চাহিদা আরও চার হাজার মেগাওয়াট বাড়তে পারে। ফলে বিদ্যুতের চাহিদা সাড়ে ১৬ হাজার মেগাওয়াটে পৌঁছাবে।
বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ মন্ত্রণালয়ের কর্মকর্তাদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, বিদ্যুৎ সরবরাহ স্বাভাবিক রাখতে এবং লোডশেডিং কমাতে আগের অন্তর্বর্তী সরকারের সিদ্ধান্ত অনুযায়ী এলএনজি আমদানির কাজ চলছে। পাশাপাশি কয়লাভিত্তিক বিদ্যুৎ কেন্দ্রগুলো সার্বক্ষণিক চালুর বিষয়ে বৈঠক হয়েছে বিদ্যুৎ বিভাগের। দেশে গ্যাসের সংকট দীর্ঘদিনের। স্থানীয় উৎপাদন না বাড়ায় এলএনজি আমদানির ওপর নির্ভরতা বেড়েছে। এই পরিস্থিতি থেকে আগের সরকার ও অন্তর্বর্তী সরকার বের হতে পারেনি। বরং ভর্তুকি ও এলএনজি আমদানি বৃদ্ধি করে চাপ সামাল দিতে হয়েছে।
বিদ্যুৎ সরবরাহে অর্ধেকের বেশি আসে বেসরকারি কেন্দ্র থেকে। এই কেন্দ্রের বড় একটি অংশ ফার্নেস অয়েলচালিত। এগুলোর বিপিডিবির কাছে বকেয়া ১৪ হাজার কোটি টাকা জমেছে। এর মধ্যে ৬০ শতাংশ অর্থ পরিশোধ না হলে চলতি রমজান ও গ্রীষ্মে লোডশেডিংয়ের বড় ঝুঁকি রয়েছে বলে আইপিপি উদ্যোক্তারা সতর্ক করেছেন।
বেসরকারি বিদ্যুৎ কেন্দ্র মালিকদের সংগঠন বাংলাদেশ ইনডিপেনডেন্ট পাওয়ার প্রডিউসারস অ্যাসোসিয়েশন (বিআইপিপিএ)-এর সভাপতি ডেভিড হাসনাত বলেন, “রমজানে বিদ্যুতের চাহিদা বাড়বে এবং গরম শুরু হবে। বেসরকারি কেন্দ্রগুলো বিদ্যুতের বড় অংশ সরবরাহ করে। কিন্তু চলার জন্য বিপিডিবিতে বিপুল পরিমাণ বকেয়া পড়েছে। অর্থ পরিশোধ না হলে জ্বালানি আমদানি করা সম্ভব হবে না এবং বিপিডিবি বিদ্যুৎ সরবরাহ করলেও চাহিদা মেটানো কঠিন হবে। ফলে নতুন সরকারের জন্য বিদ্যুৎ ও জ্বালানি খাতের ওপর চাপ বাড়বে।”

