দেশের অবকাঠামো উন্নয়নের নামে বড় বড় প্রকল্পে অতিমূল্যায়ন, দুর্নীতি এবং দুর্বল শাসন ব্যবস্থা বাংলাদেশকে ধীরে ধীরে ঋণঝুঁকির ফাঁদে ঠেলে দিচ্ছে। অর্থনীতিবিদ ও গবেষকরা সতর্ক করেছেন, ঋণ নেওয়া নিজেই সমস্যা নয়; সমস্যা হচ্ছে ব্যয় নিয়ন্ত্রণহীনতা, অস্বচ্ছ চুক্তি এবং জবাবদিহির অভাব। এসব দীর্ঘ মেয়াদে অর্থনীতির ওপর মারাত্মক চাপ সৃষ্টি করতে পারে।
গতকাল রাজধানীর সিরডাপ মিলনায়তনে অনুষ্ঠিত ‘সরকারি ঋণ ও সুশাসন’ শীর্ষক গোলটেবিল বৈঠকে এই গবেষণার ফলাফল উপস্থাপন করা হয়। সভায় অংশগ্রহণকারীরা বলেন, দেশের বড় প্রকল্পগুলোতে যথাযথ তদারকি না থাকায় বাজেটের ২৩ থেকে ৪০ শতাংশ অংশ দুর্নীতির শিকার হচ্ছে।
গবেষণাটি পরিচালনা করেছে যুক্তরাজ্যের লন্ডন বিশ্ববিদ্যালয়ের অধীন একটি শিক্ষা ও গবেষণা প্রতিষ্ঠান। সহযোগিতা করেছে একটি আন্তর্জাতিক দাতব্য সংস্থা এবং দেশের গবেষণাপ্রতিষ্ঠান চেঞ্জ ইনিশিয়েটিভ। গবেষকরা উল্লেখ করেছেন, নীতিমালা এবং জবাবদিহির কাঠামো শক্ত না হলে দেশের ঋণ বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে অর্থনৈতিক চাপও বৃদ্ধি পাবে।
ঋণের উর্ধ্বগতি:
বাংলাদেশের বৈদেশিক ঋণ গত ১৬ বছরে প্রায় ৩৭৭ শতাংশ বৃদ্ধি পেয়েছে। ২০০৯ সালে দেশটির বৈদেশিক ঋণের পরিমাণ ছিল ২৩.৫ বিলিয়ন মার্কিন ডলার। ২০২৫ সালে তা বেড়ে দাঁড়িয়েছে প্রায় ১১২ বিলিয়ন ডলারে। একযোগে সুদ পরিশোধের চাপও দ্রুত বেড়েছে। বর্তমানে সরকারের মোট আয়ের এক-পঞ্চমাংশ শুধুমাত্র সুদ পরিশোধে ব্যয় হচ্ছে। ফলে উন্নয়ন ব্যয়ের জন্য হাতে থাকা অর্থ সীমিত হয়ে গেছে।
গবেষকরা ২০০৯ থেকে ২০২৫ সাল পর্যন্ত দেশের ৪২টি বড় প্রকল্প বিশ্লেষণ করেছেন। এদের মধ্যে পরিবহন, বিদ্যুৎ, বন্দর, বিমান চলাচল এবং শিল্পাঞ্চলসহ ২৯টি প্রকল্পে গড়ে ৭০.৩ শতাংশ ব্যয় বৃদ্ধি দেখা গেছে। অনেক ক্ষেত্রে প্রকল্পের মোট ব্যয়ের ২৩ থেকে ৪০ শতাংশ অর্থ দুর্নীতি, অদক্ষতা এবং যোগসাজশের কারণে হারিয়েছে।
গোলটেবিল আলোচনায় অংশ নেওয়া অর্থনীতিবিদ অধ্যাপক মুশতাক এইচ খান বলেন, “চুক্তির দামে সামান্য বাড়তি নির্ধারণও দীর্ঘ মেয়াদে বিশাল আর্থিক বোঝা তৈরি করে। কয়েক সেন্ট বেশি দামে বিদ্যুৎ কিনলেও ২০–২৫ বছরের মধ্যে তা বিলিয়ন ডলারের অতিরিক্ত দায়ে রূপ নেয়। সমস্যা শুধু ঋণের পরিমাণ নয়; প্রতিযোগিতাহীন চুক্তি, রাজনৈতিক প্রভাব এবং দুর্বল জবাবদিহি বড় ঝুঁকি।”
গবেষণায় অবকাঠামো প্রকল্পে দুই ধরনের ব্যর্থতার কথা বলা হয়েছে। প্রথমত, প্রকল্প সঠিকভাবে নির্মিত হলেও দাম অতিরিক্ত বেশি ধরা হয়। এতে আয় দিয়ে ব্যয় ওঠানো কঠিন হয়। দ্বিতীয়ত, দুর্বল পরিকল্পনা এবং ত্রুটিপূর্ণ নকশার কারণে অনেক প্রকল্প প্রত্যাশিত সুফল দিতে ব্যর্থ হয়। ফলে আয় কম থাকে, তবু ঋণের কিস্তি নিয়মিত দিতে হয়।
বিশেষজ্ঞরা সতর্ক করেছেন, এই অবস্থা চলতে থাকলে দেশের ঋণ চাপ আরও বাড়বে এবং অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতা ঝুঁকির মধ্যে পড়বে।
বিদ্যুৎ খাতের সংকট:
বাংলাদেশের বিদ্যুৎ খাত সবচেয়ে ঝুঁকিপূর্ণ সেক্টর হিসেবে চিহ্নিত হয়েছে। ২০২৫ সালে স্থির সক্ষমতা চার্জ প্রায় ৩৮ হাজার কোটি টাকায় পৌঁছাতে পারে বলে গবেষণায় প্রাক্কলন করা হয়েছে। অর্থাৎ বিদ্যুৎ ব্যবহার হোক বা না হোক, সরকারকে এই নির্দিষ্ট অঙ্ক পরিশোধ করতে হচ্ছে।
উচ্চমূল্যের চুক্তির কারণে সরকার বছরে প্রায় ৪.৯ বিলিয়ন ডলার ভর্তুকি দিতে বাধ্য, যাতে খুচরা বিদ্যুতের দাম সাধারণ মানুষ জন্য সহনীয় থাকে। ভর্তুকি বন্ধ হলে বিদ্যুতের দাম ৮৬ শতাংশ পর্যন্ত বাড়ার ঝুঁকি রয়েছে।
গবেষণা অনুযায়ী, ২০১১ থেকে ২০২৪ সালের মধ্যে বিদ্যুৎ উৎপাদকদের পরিশোধ ১১ গুণ এবং সক্ষমতা চার্জ ২০ গুণ বেড়েছে। অথচ উৎপাদন বৃদ্ধি মাত্র চার গুণ। অনেক কেন্দ্র জ্বালানি সংকটে অলস থাকলেও চুক্তির কারণে অর্থ পরিশোধ অব্যাহত রয়েছে।
অর্থনীতিবিদ অধ্যাপক মুশতাক এইচ খান বলেন, “এই ধরনের চুক্তি দেশের দীর্ঘমেয়াদি অর্থনৈতিক চাপ বাড়াচ্ছে। সামান্য অতিরিক্ত খরচও কয়েক দশকে বিশাল আর্থিক দায় তৈরি করে। সমস্যা শুধু ঋণ নয়; প্রতিযোগিতাহীন চুক্তি, রাজনৈতিক প্রভাব এবং দুর্বল জবাবদিহি বড় ঝুঁকি।” গবেষকরা সতর্ক করেছেন, বিদ্যুৎ খাতের এমন অবস্থার কারণে সরকারের হাতে উন্নয়ন ব্যয়ের জন্য পর্যাপ্ত অর্থ থাকছে না। একই সঙ্গে, দেশের ঋণ চাপ বাড়ার সম্ভাবনা আরও উঁচুতে চলে যাচ্ছে।
শ্রীলঙ্কার অভিজ্ঞতা :
বাংলাদেশ ধীরে ধীরে ঋণঝুঁকির দিকে এগোচ্ছে। ২০২২ সালে শ্রীলঙ্কার আর্থিক সংকট উদাহরণ হিসেবে তুলে ধরা হয়েছে। দেশটির প্রায় ৬৫ শতাংশ বৈদেশিক ঋণ অবকাঠামো খাতে ব্যয় হয়েছিল। অনেক প্রকল্প প্রত্যাশিত আয় দিতে ব্যর্থ হওয়ায় পর্যাপ্ত অর্থ না থাকায় ঋণ পরিশোধে চাপ বেড়ে যায়, এবং শেষ পর্যন্ত দেশটি গভীর সংকটে পড়েছিল।
বাংলাদেশেও একই ধরনের ঝুঁকি দেখা দিচ্ছে। ২০২৫ সালের জন্য দেশের প্রকৃত ঋণ-জিডিপি অনুপাত ৪২ শতাংশে পৌঁছেছে, যেখানে আগে ৩৩ শতাংশকে নিরাপদ ধরা হতো। বর্তমান প্রবণতা অব্যাহত থাকলে ২০৩০ সালের মধ্যে অনুপাত ৬৫–৭০ শতাংশে পৌঁছাতে পারে।
বিদ্যুৎ খাত সবচেয়ে ঝুঁকিপূর্ণ হিসেবে চিহ্নিত হয়েছে। ২০২৫ সালে স্থির সক্ষমতা চার্জ প্রায় ৩৮ হাজার কোটি টাকায় পৌঁছাবে। অর্থাৎ বিদ্যুৎ ব্যবহার হোক বা না হোক, সরকারকে এই অর্থ পরিশোধ করতে হবে। উচ্চমূল্যের চুক্তির কারণে বছরে প্রায় ৪.৯ বিলিয়ন ডলার ভর্তুকি দিতে হচ্ছে, যাতে খুচরা বিদ্যুতের দাম সাধারণ মানুষ জন্য সহনীয় থাকে। ভর্তুকি বন্ধ হলে বিদ্যুতের দাম ৮৬ শতাংশ পর্যন্ত বেড়ে যাওয়ার ঝুঁকি রয়েছে।
গবেষকরা ২০০৯ থেকে ২০২৫ পর্যন্ত ৪২টি বড় প্রকল্প বিশ্লেষণ করেছেন। এর মধ্যে ২৯টি প্রকল্পে গড়ে ৭০.৩ শতাংশ ব্যয় বৃদ্ধি দেখা গেছে। অনেক ক্ষেত্রে প্রকল্পের মোট ব্যয়ের ২৩–৪০ শতাংশ অর্থ দুর্নীতি, অদক্ষতা এবং যোগসাজশের কারণে হারিয়েছে।
গোলটেবিল আলোচনায় অংশ নেওয়া অর্থনীতিবিদ অধ্যাপক মুশতাক এইচ খান বলেন, “চুক্তির দামে সামান্য বাড়তি নির্ধারণও দীর্ঘ মেয়াদে বিশাল আর্থিক বোঝা তৈরি করে। সমস্যা শুধু ঋণের পরিমাণ নয়; প্রতিযোগিতাহীন চুক্তি, রাজনৈতিক প্রভাব এবং দুর্বল জবাবদিহিই বড় ঝুঁকি।”
চেঞ্জ ইনিশিয়েটিভের জাকির হোসেন খান সতর্ক করেছেন, “যদি বৈদেশিক ঋণ ১০০ বিলিয়ন ডলার অতিক্রম করেও বিদ্যুৎ ও জ্বালানি খাতে বার্ষিক পাঁচ বিলিয়ন ডলার ভর্তুকি অব্যাহত থাকে, তবে বাংলাদেশ দ্রুতই আর্থিক দেউলিয়াত্বের দিকে ধাবিত হবে। এই খাতগুলো দুর্নীতির মাস্টারমাইন্ডদের দ্বারা হাইজ্যাক হয়েছে।”
ইউএনডিপির কান্ট্রি ইকোনমিক অ্যাডভাইজার ওয়াইস পারে বলেন, “ক্রমবর্ধমান ঋণ অবকাঠামো এবং সামাজিক সুরক্ষার চাহিদা প্রতিফলিত করে। ঝুঁকি হলো অর্থায়ন থেকে নীতিকে বিচ্ছিন্ন করা। ঋণ যেন প্রকৃত, টেকসই উন্নয়নে রূপান্তরিত হয় তা নিশ্চিত করতে সমন্বিত পরিকল্পনা এবং শক্তিশালী প্রাতিষ্ঠানিক সক্ষমতা প্রয়োজন।”
এফসিডিওর গভর্ন্যান্স অ্যাডভাইজার এমা উইন্ড বলেন, “বাংলাদেশ এলডিসি উত্তরণের কাছাকাছি পৌঁছেছে। বিদ্যুৎ খাতের সংস্কার এখন আর কোনো বিকল্প নয়। শক্তিশালী প্রোকিউরমেন্ট প্রক্রিয়া এবং দাতাদের দক্ষতা ব্যবহার করে আমরা আর্থিকভাবে স্থিতিশীল, জ্বালানি-সুরক্ষিত ভবিষ্যৎ নিশ্চিত করতে পারি।”
বিপিডিবির পরিচালক জাহাঙ্গীর আলম মোল্লা যোগ করেন, “বিশেষ আইন বাতিল এবং প্রতিযোগিতামূলক দরপত্র প্রবর্তনের ফলে সৌরবিদ্যুতের শুল্ক কমিয়ে ৫–৮ সেন্টে নামানো সম্ভব হয়েছে। জমির লভ্যতা এবং জ্বালানি বহুমুখীকরণ অগ্রাধিকার দিয়ে আমরা সাশ্রয়ী, টেকসই জ্বালানি ভবিষ্যতের দিকে এগোচ্ছি।”
নবায়নযোগ্য জ্বালানি সংগঠন বিএসআরইএ প্রেসিডেন্ট মোস্তফা আল মাহমুদ বলেন, “যেখানে সৌরবিদ্যুতের দাম পাঁচ সেন্টের নিচে, সেখানে আমাদের বিলিয়ন বিলিয়ন ডলার নষ্ট করা বন্ধ করতে হবে। গ্রিডসংলগ্ন জমির মাধ্যমে নবায়নযোগ্য জ্বালানি সম্প্রসারণ এখন অপরিহার্য, এটি বাংলাদেশের বেঁচে থাকার জন্য কৌশলগত বাধ্যবাধকতা।”

