দেশি ও বিদেশি কোম্পানির কাছে বিপুল অংকের দেনা নিয়ে বাংলাদেশের নতুন সরকার বিদ্যুৎ খাতে এক বড় চ্যালেঞ্জের মুখোমুখি। রমজানের পর গ্রীষ্ম ও সেচ মৌসুমে চাহিদা অনুযায়ী বিদ্যুৎ সরবরাহের পরিকল্পনা থাকলেও তা বাস্তবায়ন করতে সমস্যা দেখা দিতে পারে বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে।
বর্তমানে দেশে বিদ্যুতের চাহিদা প্রায় ১৩ হাজার মেগাওয়াট। বিদ্যুৎ বিভাগের ধারণা, এ বছর গ্রীষ্মে চাহিদা ১৮ হাজার মেগাওয়াট পর্যন্ত বৃদ্ধি পেতে পারে। নবনিযুক্ত বিদ্যুৎ মন্ত্রী বলেছেন, চাহিদা পূরণের জন্য গ্যাস, কয়লা ও তেল ভিত্তিক বিদ্যুৎ কেন্দ্রগুলো চালু রাখতে হবে। বিদ্যুৎ ও জ্বালানি মন্ত্রী ইকবাল হাসান মাহমুদ বলেছেন, “পরিস্থিতি সামাল দিতে আমাদের ডিজাস্টার ম্যানেজমেন্ট করতে হবে। পরিকল্পনা আছে, তবে সবচেয়ে বড় সমস্যা হলো বিদ্যুৎ খাত মোটেই আর্থিকভাবে টেকসই নয়। অনেক বকেয়া, অনেক দেনা। জ্বালানি আমদানি করতে হবে। মোট কথা হলো ভেরি কমপ্লিকেটেড। এগুলো কাজ করে সমাধান করতে হবে।”
জ্বালানি বিশেষজ্ঞরা সতর্ক করেছেন যে পরিস্থিতি মোকাবিলায় সরকারের সব দিক বিবেচনা করা প্রয়োজন। বিশেষ করে, জ্বালানি আমদানি সরাসরি ডলারের মজুদে প্রভাব ফেলতে পারে। জ্বালানি বিশেষজ্ঞ ড. ইজাজ হোসেন বলেন, “সাধারণত গরম পড়লে প্রচুর লোডশেডিং দেখা যায়।”
বাংলাদেশে জানুয়ারি ২০২৬ পর্যন্ত সরকারি ও বেসরকারি মিলিয়ে ১৩৬টি বিদ্যুৎ কেন্দ্র রয়েছে। এর উৎপাদন ক্ষমতা ও আমদানি সক্ষমতা মিলিয়ে মোট স্থাপিত ক্ষমতা ২৮ হাজার ৯১৯ মেগাওয়াট। দেশে বিদ্যুতের গ্রাহক সংখ্যা ৪ কোটি ৯৪ লক্ষ। একদিনে সর্বোচ্চ বিদ্যুৎ উৎপাদন হয়েছে ২৩ জুলাই ২০২৫, ১৬ হাজার ৭৯৪ মেগাওয়াট।
বৃহৎ ঋণ বোঝা:
বিদ্যুৎ খাতে দেশি ও বিদেশি কোম্পানির কাছে বিপুল অংকের বকেয়া বাংলাদেশের নতুন সরকারকে নতুন চ্যালেঞ্জে ফেলছে। বিদ্যুৎ উন্নয়ন বোর্ডের (পিডিবি) তথ্য অনুযায়ী, এ বছরের ফেব্রুয়ারি পর্যন্ত বকেয়া দাঁড়িয়েছে ৪৫ হাজার কোটি টাকা। এর মধ্যে তেলভিত্তিক বিদ্যুৎ উৎপাদনের সঙ্গে যুক্ত বেসরকারি কোম্পানিগুলোর বকেয়া প্রায় ১৪ হাজার কোটি টাকা। কোম্পানিগুলো গত সাত-আট মাস ধরে বিদ্যুতের বিল পাননি।
পিডিবির চেয়ারম্যান মো: রেজাউল করীম জানান, “শুরুর পর থেকে বকেয়া ধারাবাহিকভাবে বেড়েছে। সরকারের থেকে যে ভর্তুকি আসে তা কমে যায়, ফলে বকেয়া জমে গেছে। কিছুটা মাইনাস হবে, কিছু টাকা পাবো সাবসিডি হিসেবে।”
অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের সময় বকেয়া তিন মাসের মধ্যে কমে গিয়েছিল। তবে ২০২৫ সালের জুলাইয়ের পর বেসরকারি কোম্পানিগুলো আর কোনো বিল পাননি। অনেক উদ্যোক্তা আশঙ্কা করছেন, এই পরিস্থিতি নতুন সরকারের জন্য জটিল হয়ে দাঁড়াতে পারে।
সাবেক বিদ্যুৎ ও জ্বালানি উপদেষ্টা মুহাম্মদ ফাওজুল কবির খান বলছেন, “অর্থ পরিশোধ পিডিবির আর্থিক সক্ষমতার উপর নির্ভর করে। রেভিনিউ সংকটের কারণে বিল পরিশোধ সম্ভব হয়নি। এখানে কোনো ইচ্ছাকৃত বকেয়া নেই। পিডিবি যখন টাকা পায়, তখনই দেনা পরিশোধ করে। তাদের উৎস হচ্ছে রেভিনিউ এবং অর্থবিভাগ থেকে ভর্তুকি।” তেলভিত্তিক বিদ্যুৎ কেন্দ্র দেশের মোট উৎপাদন ক্ষমতার ২৩ শতাংশ। এর মধ্যে ফার্নেস অয়েলে চালিত কেন্দ্রের সক্ষমতা ৫৬৩৭ মেগাওয়াট বা প্রায় ২০ শতাংশ। বেসরকারি কোম্পানিগুলো এই সক্ষমতার চার হাজার মেগাওয়াট পরিচালনা করে।

বেসরকারি কোম্পানিগুলোর সংগঠন বিপপা সতর্ক করেছেন, যদি সরকার দ্রুত বকেয়া পরিশোধ না করে, গরমে চাহিদা অনুযায়ী বিদ্যুৎ উৎপাদন কঠিন হয়ে পড়বে। এই কোম্পানিগুলো অধিকাংশ তেল নিজেই আমদানি করে এবং এলসি খোলার পর ৪০-৪৫ দিন সময় লাগে তেল দেশে আসতে। তাই বিলের বকেয়া চার-পাঁচ মাসের মধ্যে না মিটালে লোডশেডিং বাড়তে পারে।
বিপপা জানিয়েছে, এলসি খোলার সমস্যার কারণে তেলের নিট মজুদ কমেছে। জানুয়ারি মাসে যা এক লক্ষ মেট্রিক টনের বেশি ছিল, ফেব্রুয়ারির মাঝামাঝি তা কমে প্রায় ৮০ হাজার টনে দাঁড়িয়েছে। এদিকে পিডিবি বেসরকারি তেলভিত্তিক কেন্দ্রগুলোকে সময়মতো বিদ্যুৎ দিতে না পারায় চুক্তি অনুযায়ী লিকুইডিটি ড্যামেজ (এলডি) ধার্য করেছে। তবে বেসরকারি উৎপাদনকারীরা এলডির পরিমাণ ও প্রক্রিয়া নিয়ে আপত্তি তুলেছেন। পিডিবির চেয়ারম্যান বলেন, “আমাদের তাদের সঙ্গে কিছু ইস্যু আছে। সেগুলো সমাধান হলে আমরা চূড়ান্ত মন্তব্য করতে পারব।”
জ্বালানি সংকট:
বিদ্যুৎ উৎপাদন সক্ষমতা থাকলেও জ্বালানি সরবরাহ নিশ্চিত করাটাই এখন সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়িয়েছে। বাংলাদেশে মোট বিদ্যুৎ সক্ষমতার ৮৮ শতাংশ গ্যাস, কয়লা ও তেল ব্যবহার করে উৎপাদন হয়। এই জ্বালানির বড় অংশই আমদানি করে চাহিদা মেটাতে হয়। দেশীয় গ্যাস উৎপাদন কমে যাওয়ায় এলএনজি আমদানি অপরিহার্য। তেল ও কয়লাও প্রায় পুরোপুরি আমদানি করতে হয়।
জ্বালানি বিশেষজ্ঞ ড. ইজাজ হোসেন বলেন, “এক মাসের মধ্যে মূল চ্যালেঞ্জ তৈরি হবে। আমরা যদি তেলভিত্তিক বিদ্যুৎ কেন্দ্র চালাই, এলএনজি ও কয়লা আমদানি করি, প্রশ্ন হলো—এটার জন্য প্রয়োজনীয় ডলার সরবরাহ করা হবে কি না।” তিনি আরও বলেন, “বিদ্যুৎ উৎপাদনে জীবাশ্ম জ্বালানি ব্যবহারের হার অনেক বেশি। সরকার সিদ্ধান্ত নেবে কি সব জ্বালানি আমদানি করা হবে নাকি ডলার সংরক্ষণ করার চেষ্টা করা হবে। এটা এখন সরকারের কৌশলের ওপর নির্ভর করছে।”
ড. হোসেনের হিসাব অনুযায়ী, সব জ্বালানি আমদানি করলে ১৩–১৫ বিলিয়ন ডলারের প্রয়োজন হবে। বিদ্যুৎ কেন্দ্রের ক্যাপাসিটি পেমেন্টসহ সব মিলিয়ে জ্বালানি খাতে প্রয়োজন হতে পারে ২৫ বিলিয়ন ডলার। “কিন্তু আমাদের এত টাকা নেই,” তিনি জানান। অর্থ সংস্থানের জন্য বিদেশি দাতা সংস্থার সহায়তা এবং সরাসরি বিনিয়োগের প্রয়োজন রয়েছে, যা তৎকালীন সময়ে সংকট মোকাবিলায় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করবে।
সমাধানের পথ:
জ্বালানি বিশেষজ্ঞ ড. ইজাজ হোসেনের মতে, বিদ্যুতের ভর্তুকি প্রায় চার বিলিয়ন ডলারের সমপরিমাণ। তিনি বলছেন, “গত বছরে কয়লার পাওয়ার প্ল্যান্টগুলো বার্ষিক ৫৫% লোড ফ্যাক্টরে চলেছে, অথচ এগুলো ৮৫% হারে চলা উচিত ছিল। মানে, আরও বেশি বিদ্যুৎ উৎপাদন করা যেত কয়লা দিয়ে। তবে কয়লা আমদানি করতে হবে—এটাই প্রধান চ্যালেঞ্জ।”
ড. হোসেন মনে করেন, তেলভিত্তিক কেন্দ্রগুলোর উৎপাদনের জন্য ভর্তুকির নির্দিষ্ট সীমা অর্থ মন্ত্রণালয় নির্ধারণ করতে পারে। তিনি বলেন, “আমার ধারণা ফাইন্যান্স মিনিস্ট্রি এবারও রেস্ট্রিকশন দেবে। এর ফলে ভর্তুকি অতিরিক্ত বেড়ে যাবে না। এখনও প্রতি কিলোওয়াট আওয়ার বিদ্যুৎবিতরণের জন্য আমরা সাড়ে চার টাকা ভর্তুকি পাচ্ছি।”
তিনি সতর্ক করেছেন, নতুন সরকারকে পরিস্থিতি অনুযায়ী বুঝে-শুনে সিদ্ধান্ত নিতে হবে। “গত বছরও প্রায় ৪৫ হাজার কোটি টাকা ভর্তুকি জমে গেছে। অন্তর্বর্তীকালীন সরকার পুরোপুরি আমদানি করেনি এবং শিল্পের এনার্জি চাহিদা মাথায় রাখেনি,” তিনি জানান। ভর্তুকির চক্র থেকে বের হওয়ার জন্য বহুমাত্রিক পদক্ষেপ নিতে হবে। এর মধ্যে বিদ্যুতের দাম সমন্বয়, তেলভিত্তিক কেন্দ্র কমানো এবং লোডশেডিং সমন্বয় করা গুরুত্বপূর্ণ।
বিদ্যুৎ ও জ্বালানি মন্ত্রী ইকবাল হাসান মাহমুদ জানিয়েছেন, সরকার আপাতত পরিস্থিতি সামাল দিতে চেষ্টা করবে। তিনি বলেন, “প্রথম লক্ষ্য হলো রোজা ও সেচের সময় মানুষের কষ্ট কমানো। কয়লা, এলপিজি, এলএনজি আমদানি করতে হবে। পাশাপাশি জমে থাকা বকেয়া এবং অর্থসংস্থানের চ্যালেঞ্জও মোকাবিলা করতে হবে। এটি বড় ফিন্যান্সিয়াল চ্যালেঞ্জ।”
গরমে বিদ্যুৎ চাহিদা পূরণ এবং তেলভিত্তিক বিদ্যুৎ কেন্দ্রের বকেয়া পরিশোধ নিয়ে বিদ্যুৎ ও জ্বালানি মন্ত্রী ইকবাল হাসান মাহমুদ জানিয়েছেন, তিনি বিষয়টি অর্থ মন্ত্রণালয়ের সঙ্গে সমন্বয় করবেন। তিনি বলেন, “তেলভিত্তিক কেন্দ্রগুলো স্ট্যান্ডবাই থাকবে। জরুরি প্রয়োজন হলে চালানো হবে। যেসব কেন্দ্রের বকেয়া আছে, সেগুলোকে কিছুটা দিয়ে চালু রাখা হবে। তারপর দীর্ঘমেয়াদী পরিকল্পনা করা হবে। সর্বোচ্চ চাহিদা প্রায় ১৮ হাজার মেগাওয়াট হতে পারে। এর জন্য ব্যবস্থা নেওয়া হচ্ছে। গ্যাসের ঘাটতি পূরণ করাও পরিকল্পনার মধ্যে রয়েছে।”
ক্যাবের জ্বালানি উপদেষ্টা ড. এম শামসুল আলম বিদ্যুৎ খাতের অনিয়ম ও দুর্নীতিকেই বর্তমান পরিস্থিতির মূল কারণ হিসেবে দেখেন। তিনি বলেন, “দুর্নীতি দূর করলে সব ঠিকভাবে চলবে। সৎভাবে তৈরি আইপিপিগুলো এবং যারা বিদ্যুৎ সরবরাহ করছে, তারা সময়মতো যথাযথ বিল পাবেন। অসৎভাবে তৈরি কেন্দ্রই সংকট তৈরি করেছে। তাদেরকে দায়ভার বহন করতে হবে।”
ড. শামসুল আলম মনে করেন, সমস্যার মূল উৎস হলো তেলভিত্তিক কেন্দ্র। তিনি বলেন, “প্রথমত, তেলভিত্তিক কেন্দ্র চালানোর প্রয়োজন নেই। কয়লার সক্ষমতা সাত হাজার মেগাওয়াটের বেশি, কিন্তু ইউজ ফ্যাক্টর মাত্র ৪৫%। তরল জ্বালানি কেন্দ্র বন্ধ করলে ২৮–৩০ হাজার কোটি টাকা সাশ্রয় হবে। তা দিয়ে কয়লা আমদানি করলে সহজে চাহিদা অনুযায়ী বিদ্যুৎ উৎপাদন করা সম্ভব।”
তবে তেলভিত্তিক কেন্দ্র সম্পূর্ণ বন্ধ করে চাহিদা পূরণ সম্ভব কিনা, এ বিষয়ে জ্বালানি বিশেষজ্ঞ ড. ইজাজ হোসেন বলেন, “এটা আপাতত সম্ভব নয়। কয়লা সম্পূর্ণ আমদানি করলেও কিছুটা তেলের প্রয়োজন হবে। ডিমান্ড বেড়ে গেলে, পিক টাইমে তেলভিত্তিক বিদ্যুৎ অপরিহার্য। লোডশেডিং কমানোর পাশাপাশি শিল্প খাতেও গ্যাস দিতে হবে। তা না হলে পাওয়ার সাপ্লাই ব্যালান্স করা যাবে না।”
মধ্যবিত্ত ও বৃহত্তর চাহিদা সামাল দিতে বিদ্যুৎ ও জ্বালানিমন্ত্রী বলেন, “অতীতের অনিয়ম ও বকেয়া সামলে কীভাবে বিদ্যুৎ পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণ করা যায়, সেটি দেখতে হবে। আমাদের এখন ‘ডিজাস্টার ম্যানেজমেন্ট’ প্রয়োগ করতে হবে।

