অর্থ ও পরিকল্পনামন্ত্রী আমীর খসরু মাহমুদ চৌধুরী মন্তব্য করেছেন, “আগেভাগে কথা বলার কোনো প্রয়োজন নেই, আমরা কথা কম বলি, কাজ বেশি করি।”
মন্ত্রী হিসেবে দায়িত্ব নেওয়ার পর গতকাল রবিবার রাজধানীর আগারগাঁওয়ে পরিকল্পনা মন্ত্রণালয়ে প্রথম অফিসে যোগদান করেন তিনি। আসন্ন পরিকল্পনা নিয়ে সাংবাদিকদের প্রশ্নের জবাবে তিনি এ মন্তব্য করেন। মন্ত্রী বলেন, “আমি প্রথমে কর্মকর্তাদের সঙ্গে বসে সবকিছু জানি, তারপর কথা বলি। আপনাদের বস্তুনিষ্ঠ তথ্য সময়মতো দিতে চাই। আমি গণমাধ্যম বান্ধব, তবে সব তথ্য আগে রিভিউ করি। আমরা কাজে বিশ্বাসী, সবকিছু সময়মতো জানবেন।”
পরিকল্পনা মন্ত্রণালয় ও কমিশনের সচিবরা মন্ত্রীকে ফুল দিয়ে শুভেচ্ছা জানালে তিনি সতর্ক করে বলেন, “ফুল দেওয়ার সংস্কৃতি থেকে বের হয়ে আসুন। এখন কাজের সময়। ফুল দেওয়া অনেক হয়েছে, এখন মনোযোগী হয়ে কাজ করতে হবে।” এ সময় উপস্থিত ছিলেন জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের (এনবিআর) চেয়ারম্যান মো. আবদুর রহমান খান, পরিকল্পনা বিভাগের সচিব এস এম শাকিল আখতার এবং অন্যান্য কর্মকর্তারা।
নতুন অর্থমন্ত্রীর জন্য সাবেক উপদেষ্টার পরামর্শপত্র:
বিদায়ী অর্থ উপদেষ্টা সালেহউদ্দিন আহমেদ নতুন অর্থমন্ত্রীর জন্য ২৯ পৃষ্ঠার সুপারিশপত্র রেখে গেছেন। এতে আর্থিক খাত সংস্কার ও সরকারি ব্যয় ব্যবস্থাপনা নিয়ে বিস্তারিত দিকনির্দেশনা দেওয়া হয়েছে।
পরামর্শে বলা হয়েছে, বাংলাদেশ ব্যাংক মুদ্রানীতি প্রণয়ন ও বাণিজ্যিক ব্যাংক ও ফাইন্যান্স কোম্পানিগুলোর নিয়ন্ত্রণ-তদারকি একসঙ্গে করছে। এতে স্বার্থের সংঘাত সৃষ্টি হচ্ছে এবং প্রাতিষ্ঠানিক স্বচ্ছতা ও জবাবদিহি কমছে। তাই কেন্দ্রীয় ব্যাংকের কার্যক্রম থেকে ‘কেন্দ্রীয় ব্যাংকিং কার্যক্রম’ আলাদা করতে এবং বাণিজ্যিক ব্যাংক ও ফাইন্যান্স কোম্পানির তদারকির জন্য আলাদা সংস্থা গঠনের সুপারিশ করা হয়েছে।
বিশ্বের বিভিন্ন দেশের তুলনায় ব্যাংক তদারকিতে ভিন্নতা লক্ষ্য করা গেছে। যুক্তরাষ্ট্র, যুক্তরাজ্য, জাপান ইত্যাদি দেশে ব্যাংক তদারকির জন্য আলাদা দপ্তর রয়েছে, তবে ভারত ও ফিলিপাইনসহ কিছু দেশে উভয় কাজই কেন্দ্রীয় ব্যাংক করে।
পরামর্শে অর্থ বিভাগ, আর্থিক প্রতিষ্ঠান বিভাগ (এফআইডি), অর্থনৈতিক সম্পর্ক বিভাগ (ইআরডি) এবং অভ্যন্তরীণ সম্পদ বিভাগ (আইআরডি)-র করণীয় ও দায়িত্ব নিয়েও বিস্তারিত নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে। এছাড়া আলাদা ব্যাংক রেজোল্যুশন কর্তৃপক্ষ, আমানত সুরক্ষা করপোরেশন এবং ইসলামি ব্যাংকিংয়ের জন্য আলাদা আইন প্রণয়নসহ নানা সুপারিশ অন্তর্ভুক্ত রয়েছে। কেন্দ্রীয় ব্যাংকিং কার্যক্রমের মধ্যে প্রধান কাজ হিসেবে মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণ ও সরকারের অর্থনৈতিক নীতির সঙ্গে মিল রেখে মুদ্রানীতি প্রণয়নের গুরুত্ব উল্লেখ করা হয়েছে।
পরামর্শে বলা হয়েছে, নতুন সরকারের অগ্রাধিকার হওয়া উচিত সামষ্টিক স্থিতিশীলতা, রাজস্ব আদায় জোরদার, ব্যাংক খাত সংস্কার এবং উন্নয়ন সহায়তার কার্যকর ব্যবহার। রাজস্ব সংগ্রহ বৃদ্ধি, বাজারভিত্তিক বিনিময় হার অব্যাহত রাখা, উচ্চ অগ্রাধিকার উন্নয়ন প্রকল্পে মনোযোগ এবং বেশি সুদের ঋণ নেওয়া থেকে বিরত থাকা তাৎক্ষণিক কর্মসূচি হিসেবে রাখা হয়েছে।
আরও বলা হয়েছে, গত ১০ বছরে পুঞ্জীভূত মূল্যস্ফীতি ১১১ শতাংশ বেড়েছে। সরকারি কর্মচারীর জীবনযাত্রার মান রক্ষায় নতুন বেতন কাঠামোর বাস্তবায়ন জরুরি। রাজস্ব-মুদ্রানীতির সমন্বয়, সরকারি ঋণ ব্যবস্থাপনায় শৃঙ্খলা, ভর্তুকি যৌক্তিকীকরণ, অপচয় রোধ এবং সামাজিক নিরাপত্তা কর্মসূচিতে দক্ষতা বৃদ্ধিও প্রাথমিক কর্মসূচি হিসেবে সুপারিশ করা হয়েছে।
এছাড়া এনবিআর অংশ নিয়ে দেড় বছরে করা কর্মকাণ্ডের বিবরণও পরামর্শপত্রে তুলে ধরা হয়েছে। এতে বলা হয়েছে, দেশে ব্যাপক কর ফাঁকি ও কর অব্যাহতি প্রবণতা রয়েছে। আয়কর ও ভ্যাট ব্যবস্থার ডিজিটাইজেশন অপর্যাপ্ত এবং কর আদায় কার্যক্রমে স্বচ্ছতা ও জবাবদিহি কম। তাই পরীক্ষা-নিরীক্ষা ও বাস্তবায়নের মাধ্যমে কর সংস্কারের সুফল অর্জন সম্ভব।

