দেশের উৎপাদন খাতের গতি বোঝার নির্ভরযোগ্য সূচকগুলোর মধ্যে একটি হলো বিমানবন্দর কার্গো। কারখানার চাকা ঘুরলে কার্গো বক্সগুলো ভরে ওঠে, উৎপাদন কমে গেলে বিমানবন্দরের গুদামও শূন্য থাকে। বর্তমানে বাংলাদেশের বিমানবন্দরগুলো সেই নীরব সতর্কতার বার্তা পাঠাচ্ছে—জট নেই, কিন্তু চরম শিথিলতার সংকেত আছে।
গত বছরের এপ্রিলে ভারতীয় কর্তৃপক্ষ বাংলাদেশের রপ্তানিকারকদের জন্য তাদের বিমানবন্দর দিয়ে ট্রান্সশিপমেন্ট সুবিধা বাতিল করলে ব্যবসায়ীদের মধ্যে উদ্বেগ তৈরি হয়। পণ্য সময়মতো পাঠানো এবং খরচ নিয়ন্ত্রণ বড় চ্যালেঞ্জে পরিণত হয়।
অন্তর্বর্তী সরকার দ্রুত পদক্ষেপ নিলে ঢাকা বিমানবন্দরের চাপ কমাতে সিলেটের ওসমানী আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে কার্গো কার্যক্রম চালু করা হয়। একইসঙ্গে চট্টগ্রামের শাহ আমানত আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে কার্গো সেবার উন্নয়নের জন্য ৭০ কোটি টাকার প্রকল্পও হাতে নেওয়া হয়। কিন্তু প্রায় এক বছর পরও এই উদ্যোগগুলো কার্যত অলস অবস্থায় রয়েছে। বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইন্স জানাচ্ছে, ঢাকার হজরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে কার্গোর ব্যবহার ৩০–৪০ শতাংশ কমে গেছে।
ব্যবসায়ীরা বলছেন, অবকাঠামোয় সমস্যা নেই—মূল সমস্যাটি চাহিদার। রপ্তানি উন্নয়ন ব্যুরোর (ইপিবি) তথ্য অনুযায়ী, অর্থবছর ২০২৫-২৬–এর জুলাই থেকে জানুয়ারি পর্যন্ত রপ্তানি আয় হয়েছে ২৮.৪১ বিলিয়ন ডলার, যা আগের বছরের একই সময়ের তুলনায় ১.৯৩ শতাংশ কম। উৎপাদন মন্থর, রপ্তানি কম—এটি কেবল বিমানবন্দর নয়, দেশের অর্থনীতিকেই সতর্কবার্তা পাঠাচ্ছে।
আমদানি-রপ্তানি সংকুচিত:
বাংলাদেশের রপ্তানিকারকরা এখন কাঁচামাল কম আমদানি করছেন। এর ফলে উৎপাদিত পণ্যের চালানও কমে গেছে। নতুন অর্ডারগুলোতেও মন্থরতা দেখা দিয়েছে। কারখানাগুলো সম্প্রসারণের পরিকল্পনা স্থগিত রেখেছে এবং সতর্ক অবস্থায় পরিচালিত হচ্ছে। টানা ছয় মাস ধরে রপ্তানি হ্রাস পাচ্ছে। আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি ও ভঙ্গুর বিনিয়োগ পরিবেশ নিয়ে উদ্বেগের মধ্যে, অন্তর্বর্তী সরকারের ১৮ মাসের মেয়াদে ব্যবসায়ীরা ‘ওয়েট অ্যান্ড সি’ নীতি অবলম্বন করেছেন। এর প্রভাব আমদানিতেও পড়েছে।
ফ্রেইট ফরওয়ার্ডার নাসির আহমেদ বলেন, “পাঁচ-ছয় মাস ধরে কার্গোর চাহিদা দুর্বল। ঢাকা এয়ারপোর্টের কার্গো ভিলেজে আগুন লাগার সঙ্গে এর কোনো সম্পর্ক নেই। অপারেশন ব্যাহত হলে প্রভাব দেখা যেত। আসল সমস্যা চাহিদার ঘাটতি।” তিনি আরও জানান, থার্ড টার্মিনালের কার্গো ভিলেজ এখনও চালু হয়নি, তবে বিদ্যমান অবকাঠামোও পূর্ণ সক্ষমতায় ব্যবহৃত হচ্ছে না। কার্গোর চাহিদা কমে যাওয়ায় পরিবহনের ভাড়াও কমেছে। ইউরোপমুখী এয়ার ফ্রেইট এখন প্রতি কেজি ২.৫–৩ ডলার, যেখানে ২০২৪ সালের ২৯ জুলাই–৪ আগস্ট সপ্তাহে স্পট রেট ছিল প্রতি কেজি ৪.৮৭ ডলার।
ইন্টারন্যাশনাল এয়ার এক্সপ্রেস অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশের সভাপতি কবির আহমেদ বলেন, “ঢাকা থেকে প্রতিদিন ৫০০–৬০০ টন কার্গো রপ্তানি হচ্ছে। স্বাভাবিক সময়ে তা ৮০০–৯০০ টন হওয়া উচিত। অর্থাৎ প্রায় ৪০ শতাংশ কম। এখন যেসব চালান যাচ্ছে, সেগুলো মূলত আগের অর্ডারের। পোশাকের অর্ডার কমার প্রভাব প্রায় ছয় মাস পর স্পষ্ট দেখা যায়।” বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইনসও মন্দার কথা স্বীকার করেছে। সংস্থাটি শাহজালাল বিমানবন্দরের একমাত্র গ্রাউন্ড হ্যান্ডলার।
বিমান বাংলাদেশের কার্গো মহাব্যবস্থাপক এ বি এম নজমুল হুদা বলেন, “বর্তমানে প্রতিদিন ৬০০–৭০০ টন রপ্তানি কার্গো হ্যান্ডলিং হচ্ছে, স্বাভাবিক সময়ে যা ৭৫০–৮৫০ টন ছিল। দৈনিক আমদানিও প্রায় ৬০০ টন।” তিনি আংশিকভাবে মৌসুমি মন্দাকে দায়ী করে মার্চ–এপ্রিলে পুনরুদ্ধারের আশা প্রকাশ করেছেন।
পোশাক শিল্পের মন্থরতা বাণিজ্যে প্রভাব ফেলছে:
রপ্তানি উন্নয়ন ব্যুরোর (ইপিবি) তথ্যে দেখা গেছে, অর্থবছর ২০২৫-২৬–এর জুলাই–জানুয়ারি সময়ে রপ্তানি আয় হয়েছে ২৮.৪১ বিলিয়ন ডলার। এটি আগের বছরের একই সময়ের তুলনায় ১.৯৩ শতাংশ কম।
গত অর্থবছরে মোট রপ্তানির প্রায় ৮১ শতাংশ ছিল তৈরি পোশাক। চলতি অর্থবছরের জুলাই–জানুয়ারিতে এ খাতে রপ্তানি ২.৪৩ শতাংশ কমেছে। প্রকৌশল পণ্য, চামড়াজাত পণ্য, পাটপণ্য, হিমায়িত মাছ ও হোম টেক্সটাইলের মাঝারি প্রবৃদ্ধি হলেও সামগ্রিক রপ্তানি হ্রাসকে ঠেকাতে পারছে না। আকাশপথে রপ্তানির বড় অংশই পোশাক নির্ভর—ফলে এ খাতের মন্থরতা সরাসরি কার্গো আমদানি ও রপ্তানিতে প্রতিফলিত হয়েছে।
সিলেট: শুরুতে আশা, তারপর স্থবিরতা:
ভারতের ট্রান্সশিপমেন্ট সুবিধা বাতিলের পর, গত বছরের এপ্রিলের শেষ দিকে সিলেটের ওসমানী আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে জরুরি ভিত্তিতে কার্গো অপারেশন শুরু হয়। প্রথম ফ্লাইটে গ্যালিস্টিয়ার এভিয়েশনের মাধ্যমে ৬০ টন তৈরি পোশাক স্পেনে রপ্তানি করা হয়। পরবর্তী ছয় মাসে ৪১টি কার্গো ফ্লাইটে প্রায় ২,৩৫০ টন পোশাক পাঠানো হয়—সবই স্পেনগামী। কিন্তু নভেম্বরে হঠাৎ কার্যক্রম বন্ধ হয়ে যায় এবং তারপর থেকে আর কোনো কার্গো ফ্লাইট পরিচালিত হয়নি।
বিমানবন্দরের পরিচালক মো. হাফিজ আহমেদ জানান, “কার্গো ফ্লাইট স্থগিতের বিষয়টি মূলত অপারেটরদের ব্যবসায়িক সিদ্ধান্ত। সিলেট বিমানবন্দর আন্তর্জাতিক মান অনুযায়ী কার্গো হ্যান্ডলিংয়ে সক্ষম।” তবে তিনি সতর্ক করে বলেন, বিমানবন্দর প্রস্তুতি ও রপ্তানিকারকের প্রস্তুতির মধ্যে পার্থক্য থাকলে কার্যক্রমে প্রভাব পড়ে।
স্থানীয় ব্যবসায়ীরা মনে করছেন, সিলেট বিমানবন্দরের কার্গো কৌশল বাস্তবতার সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ হয়নি। সিলেট চেম্বার অব কমার্স অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রির সাবেক সিনিয়র সহসভাপতি ফালাহ উদ্দিন আলী আহমেদ বলেন, “বিমানবন্দর মূলত তৈরি পোশাক পরিবহনে ব্যবহার হয়েছে, অথচ এখানে প্রকৃত প্রতিযোগিতামূলক সুবিধা রয়েছে কৃষিপণ্যে। ফলমূল ও তাজা পণ্যের রপ্তানির জন্য স্যানিটারি ও ফাইটোস্যানিটারি (এসপিএস) সনদ প্রয়োজন, যা সিলেটে গড়ে তোলা হয়নি।”
বর্তমানে এসপিএস সনদ প্রদানের জন্য সরকার অনুমোদিত প্যাকিং হাউস মাত্র একটি, ঢাকার শ্যামপুরে। সিলেটে একই ধরনের স্থাপনা গড়ে তুলতে ৮–১০ কোটি টাকা ব্যয় হবে। ফলে সিলেটের কৃষিপণ্যের আকাশপথে রপ্তানি কার্যত স্থবির।
চট্টগ্রাম: ডেডলাইন নেই, প্রকল্প আটকে:
চট্টগ্রামের শাহ আমানত আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরের পরিস্থিতিও মন্থর। ভারতের ট্রান্সশিপমেন্ট সুবিধা বাতিলের পর, বেবিচক ৭০ কোটি টাকার উন্নয়ন প্রকল্প অনুমোদন করে। এতে দুটি এক্সপ্লোসিভ ডিটেকশন সিস্টেম (ইডিএস) স্ক্যানার, কোল্ড স্টোরেজ ও আধুনিক কার্গো শেড নির্মাণের পরিকল্পনা রয়েছে। কিন্তু প্রায় ১০ মাস পেরিয়ে গেলেও দৃশ্যমান অগ্রগতি সীমিত। শাহ আমানত বিমানবন্দরের মুখপাত্র ইব্রাহিম হোসেন বলেন, “কার্গো কার্যক্রম কবে শুরু হবে, তা এখনও নির্দিষ্ট নয়।”
কার্গো নেই, সক্ষমতা আছে—ঢাকা টার্মিনাল ৩
শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরের তৃতীয় টার্মিনাল কার্গো ভিলেজ এখনও চালু হয়নি। পুরোনো কার্গো ভিলেজে অগ্নিকাণ্ডের পর, বেবিচক কার্যক্রম নতুন টার্মিনাল–৩-এ স্থানান্তরের উদ্যোগ নেয়। তবে ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান বকেয়া বিল হিসেবে কয়েক হাজার কোটি টাকা দাবি করেছে। এই বিল নিষ্পত্তি ছাড়া টার্মিনাল হস্তান্তর হয়নি।
বিমানবন্দরের নির্বাহী পরিচালক রাগীব সামাদ বলেন, “কিছু বিষয় ডিসপিউট বোর্ডে রয়েছে। সমস্যাগুলো সমাধান হলে কার্গো ভিলেজ ব্যবহার করা যাবে।” চালু হলে তৃতীয় টার্মিনাল বছরের রপ্তানি কার্গো ধারণক্ষমতা ২ লাখ টন থেকে বাড়িয়ে ৫ লাখ ৪৬ হাজার টনে উন্নীত করবে। ৩৬ হাজার বর্গমিটার আয়তনের ডেডিকেটেড কার্গো জোন থাকবে। বেসামরিক বিমান পরিবহন ও পর্যটনমন্ত্রী আফরোজা খানম রিতা বলেন, “তৃতীয় টার্মিনাল চালু করাই আমাদের অগ্রাধিকার। এতে কার্গো অপারেশনও সহজ হবে। অন্যান্য বিমানবন্দরের উন্নয়নেও নজর দেওয়া হবে।”
সম্প্রসারিত অবকাঠামো থেকে আঞ্চলিক হাব গঠন:
এভিয়েশন বিশ্লেষক ও বিমানের সাবেক বোর্ড সদস্য কাজী ওয়াহিদুল আলম মনে করেন, তৃতীয় টার্মিনাল চালু হলে বাংলাদেশ আঞ্চলিক ট্রান্সশিপমেন্ট হাব হিসেবে নতুন অবস্থান নিতে পারে। তিনি বলেন, “তৃতীয় টার্মিনালের কার্গো ভিলেজ চালু হলে বার্ষিক হ্যান্ডলিং সক্ষমতা দ্বিগুণেরও বেশি হবে। অতিরিক্ত সক্ষমতা প্রতিবেশী দেশগুলোর জন্যও উন্মুক্ত করা যেতে পারে।”
কাজী ওয়াহিদের মতে, এমন পদক্ষেপ রাজস্ব আয় বাড়াবে এবং সম্প্রসারিত অবকাঠামোর কার্যকর ব্যবহার নিশ্চিত করবে। তবে বর্তমানে বাস্তবতা ভিন্ন। দেশের বিমানবন্দরগুলোতে অবকাঠামো সম্প্রসারণের কাজ চলছে, কিন্তু চাহিদা কম থাকার কারণে কার্গো বে-গুলো নীরব।
এই নীরবতা কোনো অব্যবস্থাপনার ইঙ্গিত নয়। বরং এটি দেশের বৃহত্তর অর্থনৈতিক মন্থরতার প্রতিফলন। এবং এমন পরিস্থিতিতে কেবল একটি নতুন টার্মিনালই সব সমস্যার সমাধান করতে পারবে না।

