গত দেড় দশকে দেশের ব্যাংকগুলো থেকে নেওয়া ঋণের বড় অংশ অনিয়ম ও দুর্নীতির কারণে খেলাপি হয়ে গেছে। এসব খেলাপি ঋণের একটি বড় অংশ বিদেশে পাচার হয়েছে।
অনেক বড় ঋণখেলাপি ইউরোপ, আমেরিকা, মালয়েশিয়া, দুবাই, কানাডা ও অস্ট্রেলিয়াসহ বিভিন্ন দেশে স্থায়ী বসতি গড়ে তুলেছেন। বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্য বলছে, মাত্র ৫ হাজার ৭৭৫ জন গ্রাহকের কাছেই রয়েছে প্রায় ৩ লাখ কোটি টাকার খেলাপি ঋণ।
ঋণখেলাপিদের মধ্যে সবচেয়ে এগিয়ে রয়েছে তৈরি পোশাক, বস্ত্র, চামড়া, জাহাজ নির্মাণ ও জাহাজ ভাঙার মতো উৎপাদনমুখী শিল্পের খাত। বাণিজ্যিক রাজধানী চট্টগ্রামের ব্যবসায়ীরাও খেলাপির তালিকায় শীর্ষে রয়েছেন। বিশ্লেষকরা মনে করেন, ব্যাংক খাত এবং সামগ্রিক অর্থনীতিতে স্থিতিশীলতা ফেরাতে এই খেলাপি ঋণ আদায় নতুন কেন্দ্রীয় ব্যাংকের গভর্নরের জন্য বড় চ্যালেঞ্জ হবে। গত বছরের জুনে দেশের ব্যাংক খাতের খেলাপি ঋণের পরিমাণ প্রথমবারের মতো ৬ লাখ কোটি টাকা ছাড়িয়েছে। এর পরের তিন মাসে তা আরও ৩২ হাজার কোটি টাকা বেড়ে গেছে।
বাংলাদেশ ব্যাংকের সম্প্রতি প্রকাশিত ‘ব্যাংকিং সেক্টর আপডেট’ প্রতিবেদনে দেখা গেছে, সংখ্যায় কম হলেও বড় ঋণগ্রহীতারাই খেলাপি ঋণের বড় অংশের দায়ী। অন্যদিকে, মধ্যম আকারের গ্রাহকদের খেলাপি ঋণও বিপুল। তুলনায় ছোট গ্রাহকদের সংখ্যায় অনেক হলেও তাদের খেলাপি ঋণের পরিমাণ কম।
বাংলাদেশ ব্যাংকের সম্প্রতি প্রকাশিত প্রতিবেদনের বিশ্লেষণ অনুযায়ী, ২০২৫ সালের সেপ্টেম্বরের শেষে ১ কোটি টাকার নিচে ঋণ নিয়ে খেলাপি হয়েছে ৪৪ লাখ ২৮ হাজার ১৩৬ ক্ষুদ্র ও প্রান্তিক গ্রাহক। এ শ্রেণীর গ্রাহকের কাছে থাকা খেলাপি ঋণের পরিমাণ ছিল ৬১ হাজার ৬৫১ কোটি টাকা।
ঋণগ্রহীতাদের মধ্যম ও বড় অংশও বিপুল খেলাপি ঋণের দায়ী। ১ থেকে ১০ কোটি টাকা পর্যন্ত ঋণ নেওয়া ৩০ হাজার ১০৪ গ্রাহকের খেলাপি ঋণ ১ লাখ ৩ হাজার ৪৫৩ কোটি টাকা। ১০ থেকে ২০ কোটি টাকার ঋণ নিয়েছেন ৬ হাজার ৫৯৬ গ্রাহক, যাদের খেলাপি ঋণ ৮৫ হাজার ৪০ কোটি টাকার বেশি। বড় ঋণগ্রাহকরা আরও বিস্তৃত খেলাপির দায় বহন করছেন। ২০ কোটি টাকার বেশি ঋণ নেওয়া ৫ হাজার ৭৭৫ গ্রাহকের কাছে রয়েছে ৩ লাখ ৪ হাজার ৭৮৪ কোটি টাকার খেলাপি ঋণ। এর মধ্যে:
- ২০–৩০ কোটি টাকার ঋণ নেওয়া ১ হাজার ৭৪০ গ্রাহকের খেলাপি ঋণ ৪৩ হাজার ৫১ কোটি টাকা,
- ৩০–৪০ কোটি টাকার ঋণ নেওয়া ১ হাজার ৪৪ গ্রাহকের খেলাপি ঋণ ৩৬ হাজার ৩০৯ কোটি টাকা,
- ৪০–৫০ কোটি টাকার ঋণ নেওয়া ৭১৮ গ্রাহকের খেলাপি ঋণ ৩২ হাজার ৫২৬ কোটি টাকা,
- ৫০ কোটি টাকার বেশি ঋণ নেওয়া ২ হাজার ২৭৩ বড় গ্রাহকের খেলাপি ঋণ ১ লাখ ৯২ হাজার ৮৯৮ কোটি টাকা।
৫ কোটি টাকার বেশি ঋণগ্রাহকের গড় খেলাপি ঋণ প্রায় ৮৫ কোটি টাকা। তুলনায়, ১ কোটি টাকার নিচের গ্রাহকের গড় খেলাপি ঋণ মাত্র ১ লাখ ৩৯ হাজার টাকা। সংখ্যার দিক থেকে ৫০ কোটি টাকার ঋণ খেলাপি ২ হাজারের বেশি হলেও বাস্তবতা হলো এসব কোম্পানির মালিকানা দেশের অল্প কিছু ধনী ব্যবসায়ীর মধ্যে সীমিত। একাধিক কোম্পানি একই গ্রুপের মালিকানাধীন, অনেক বেনামি ও ভুঁইফোঁড় কোম্পানি রয়েছে। এ ধরনের কোম্পানির নামে নেওয়া ব্যাংক ঋণ ইতিমধ্যেই খেলাপি হয়েছে। বাংলাদেশ ব্যাংক ও বাণিজ্যিক ব্যাংকগুলোর কয়েকজন দায়িত্বশীল কর্মকর্তা এই তথ্য নিশ্চিত করেছেন।
জ্যেষ্ঠ ব্যাংকার ও বিশ্লেষক ফারুক মঈনউদ্দীন মন্তব্য করেছেন, “বেনামি কোম্পানির নামে দেওয়া ঋণকে খেলাপি ঋণ বলা ঠিক নয়। এগুলো স্রেফ লুটপাট। এই ঋণ আর কখনো আদায় সম্ভব নয়। বছরের পর বছর ব্যালান্স শিটে বয়ে বেড়ানো অর্থহীন। বরং এসব ঋণকে ব্যালান্স শিট থেকে বাদ দিয়ে ‘প্রোটেস্টেড বিল’-এ রূপান্তর করা উচিত। একই সঙ্গে প্রকৃত খেলাপি ঋণ আদায়ে সর্বাত্মক উদ্যোগ প্রয়োজন।”
ব্র্যাক ব্যাংক পিএলসির ভাইস চেয়ারম্যান ফারুক মঈনউদ্দীন বলেছেন, “বর্তমানে দেশের ব্যাংক খাতের খেলাপি ঋণের গড় হার ৩৬ শতাংশ। তবে দেশে এমন অনেক ব্যাংকও আছে, যাদের খেলাপি হার মাত্র ২–৩ শতাংশ। বিপর্যয়ের শিকার ব্যাংকগুলো গত কয়েক বছরে ব্যাংকিং সেবা দেয়নি, বরং লুটপাটকারীদের পকেট হিসেবে ব্যবহার হয়েছে। এই অবস্থায় ব্যাংক খাতে আমূল সংস্কার ও অপরাধীদের বিচারের আওতায় আনা প্রয়োজন। যদি ঋণখেলাপিরা অতীতের মতো রাষ্ট্রীয় পৃষ্ঠপোষকতা পায়, তাহলে খেলাপি ঋণ আদায় সম্ভব হবে না।”
বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্য বিশ্লেষণে দেখা যায়, দেশের ব্যাংক ঋণের বড় অংশ শিল্প ও ব্যবসা খাতে কেন্দ্রীভূত। একই সঙ্গে খেলাপি ঋণেরও সবচেয়ে বড় অংশ এই দুই খাতের। ২০২৫ সালের সেপ্টেম্বরের শেষে ব্যবসা ও বাণিজ্য খাত ব্যাংকের বিতরণকৃত ঋণের ৩৩ শতাংশ হলেও খেলাপি ঋণের ক্ষেত্রে শীর্ষে রয়েছে। এ খাতে খেলাপি ঋণের হার ৪৫.৬ শতাংশ। এককভাবে সবচেয়ে বড় ঋণগ্রহীতা খাত হলো শিল্প। মোট ঋণের ৪৪ শতাংশ এই খাতে বিতরণ হয়েছে এবং এখানে খেলাপি ঋণের হার ৩৭.৫ শতাংশ।
বাংলাদেশ ব্যাংকের ফাইন্যান্সিয়াল স্ট্যাবিলিটি রিপোর্ট অনুযায়ী, ২০২৪ সালের ডিসেম্বরের শেষে দেশের খেলাপি ঋণের পরিমাণ ছিল ৩ লাখ ৪৬ হাজার ৫৪৭ কোটি টাকা। এর মধ্যে ১৪.০৪ শতাংশ তৈরি পোশাক খাতের, আর ১০.৫৪ শতাংশ বস্ত্র খাতের। গত এক বছরে খেলাপি ঋণের পরিমাণ প্রায় দ্বিগুণ বেড়ে যাওয়ায় তৈরি পোশাক ও বস্ত্র খাতের খেলাপিও বেড়েছে।
সাবেক প্রধান অর্থনীতিবিদ ও ইনস্টিটিউট ফর ইনক্লুসিভ ফাইন্যান্স অ্যান্ড ডেভেলপমেন্ট (আইএনএম)-এর নির্বাহী পরিচালক ড. মোস্তফা কে মুজেরী বলেন, “বিত্তবানদের মধ্যে খেলাপি ঋণের প্রবণতা বেশি দেখা যায়। তারা সক্ষম হলেও ক্ষমতার অপব্যবহারের মাধ্যমে ঋণ ফেরত না দেয়ার সংস্কৃতি তৈরি করেছে। যদিও কিছু গ্রাহক পরিস্থিতির শিকার, তবে বেশির ভাগ ইচ্ছাকৃত ঋণখেলাপি। তাই তাদের বিরুদ্ধে কঠোর পদক্ষেপ নেওয়ায় দ্বিধা থাকা উচিত নয়।”
তিনি আরও বলেন, “খেলাপি ঋণ আদায়ে রাজনৈতিক সদিচ্ছা থাকা জরুরি। বিত্তবানদের রাজনৈতিক সংযোগ রয়েছে। ক্ষমতার অপব্যবহার করে যারা খেলাপি ঋণের সংস্কৃতি তৈরি করেছে, তাদের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা নেওয়া প্রয়োজন। অর্থনীতি পুনরুদ্ধারে সরকারকে এগিয়ে আসতেই হবে, এবং সেটিই জনগণের প্রত্যাশা।”
বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্যানুসারে, ২০২৫ সালের সেপ্টেম্বরের শেষে দেশের ব্যাংক খাতের মোট খেলাপি ঋণ দাঁড়িয়েছে ৬ লাখ ৩২ হাজার ২৩৭ কোটি টাকায়। খেলাপি ঋণের হার ছিল ৩৬.৩ শতাংশ। বিশ্বের অন্যান্য দেশের কেন্দ্রীয় ব্যাংক ও খ্যাতিমান গবেষণা সংস্থাগুলোর তথ্য বিশ্লেষণে দেখা যায়, এই হার এখন গোটা বিশ্বে সবচেয়ে বেশি।
খেলাপি ঋণের ক্ষেত্রে ছোট গ্রাহকদের অবদান কম হলেও, ঋণ পাওয়ার ক্ষেত্রে তাদের সবচেয়ে বেশি দুর্ভোগ পোহাতে হয়। নানা ধরনের কাগজপত্র সরবরাহ থেকে শুরু করে নিয়ম-নীতির কঠোরতা মূলত ছোট ঋণগ্রহীতাদের ক্ষেত্রেই বেশি প্রযোজ্য। অন্যদিকে বড় ঋণের ক্ষেত্রে যাচাই-বাছাই কঠোর হওয়ার কথা থাকলেও তা প্রায়ই মানা হয়নি।
কেন্দ্রীয় ব্যাংকের মুখপাত্র ও নির্বাহী পরিচালক আরিফ হোসেন খান বলেছেন, “অতীতে ব্যাংকগুলো খেলাপি ঋণ ‘কার্পেটের নিচে’ চাপা রাখত। কিন্তু গত এক বছরে এসব ঋণ বেরিয়ে এসেছে। কেন্দ্রীয় ব্যাংকের চেষ্টা ছিল ব্যাংকগুলোর প্রকৃত চিত্র উদ্ঘাটন করা। বড় ঋণখেলাপিদের কাছ থেকে টাকা আদায়ে রাষ্ট্রীয় সহযোগিতা প্রয়োজন।” তিনি আরও বলেন, “দেশের প্রকৃত উদ্যোক্তা ও ব্যবসায়ীরা সবসময় ঋণ ফেরত দেন। বিশেষ করে সিএমএসএমই খাতের উদ্যোক্তারা এই ক্ষেত্রে এগিয়ে থাকেন।”
বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্য বিশ্লেষণে দেখা গেছে, মোট খেলাপি ঋণের প্রায় অর্ধেকই উৎপাদনমুখী শিল্প খাতে। এই খাতের বহু প্রতিষ্ঠান ঋণ পরিশোধে ব্যর্থ হয়ে রুগ্ণ হয়ে পড়েছে। এর প্রভাব পড়ছে কর্মসংস্থান, ব্যাংক খাতের স্থিতিশীলতা ও সামগ্রিক অর্থনীতিতে। গত দেড় দশকে সহজ শর্তে ব্যাংক ঋণ নিয়ে পরিশোধ না করে বিদেশে পালিয়ে যাওয়ার নজিরও রয়েছে। এর মধ্যে উল্লেখযোগ্য সংখ্যক চট্টগ্রামভিত্তিক ব্যবসায়ী। চট্টগ্রামের ব্যবসায়ীদের কাছে খেলাপি ঋণের পরিমাণ ৫০ হাজার কোটি টাকারও বেশি। গত এক দশকে ব্যাংক ঋণ পরিশোধ না করে লাপাত্তা হয়েছেন অর্ধশতাধিক ব্যবসায়ী।
চট্টগ্রামভিত্তিক কেডিএস গ্রুপের ব্যবস্থাপনা পরিচালক সেলিম রহমান বলেন, “মূল প্রশ্ন হলো, ঋণ খেলাপি কেন হয়েছে? সঠিক কারণ সামনে আনা জরুরি। কোনো ক্ষেত্রে ব্যবসায়ী লোকসানের কারণে ঋণ পরিশোধ করতে পারছেন না, তবে তিনি দেশে আছেন এবং তার ব্যবসার লোকসানের বিষয়টি দৃশ্যমান। পরিস্থিতির শিকার না হলে তিনি নিশ্চয়ই ভালো ব্যবসা করতেন।
ব্যবসা ভালো চলার সময় ব্যাংক মুনাফা ঠিকঠাক বুঝে নিয়েছে, বিপদের সময় ঋণগ্রহীতার পাশে দাঁড়ানোও উচিত। আরেকটি বিষয় হলো, কিছু ক্ষেত্রে অর্থ দেশ থেকে বাইরে চলে গেছে। সেটি কীভাবে ফেরত আনা হবে, সেটাও বড় প্রশ্ন। যেসব প্রতিষ্ঠানের প্রকৃতপক্ষে ব্যবসায় লোকসান হয়েছে, সেই বিষয়ে তথ্য ব্যাংকের কাছে আছে। সঠিক নজরদারি ও মনোযোগ দিলে অনেক সমস্যার সমাধান সম্ভব।”
তিনি আরও বলেন, “বেশির ভাগ খেলাপি ঋণ আদায় না হওয়ার পেছনে ব্যাংকের পর্যাপ্ত ও ধারাবাহিক ফলোআপের ঘাটতি রয়েছে। পাশাপাশি পারস্পরিক যোগসাজশের অভিযোগও রয়েছে। এখনো যদি ব্যাংকগুলো ঋণ আদায়ে কঠোর হয়, তাহলে উল্লেখযোগ্য পরিমাণ অর্থ আদায় সম্ভব। যেসব ব্যাংক শুধু জমিজমি বা স্থাবর সম্পত্তি দেখে ঋণ দেয়, তা বিপজ্জনক। ঋণ বিতরণে খাতির সংস্কৃতিই আজ ব্যাংক খাতকে এই পরিস্থিতিতে নিয়ে এসেছে। ঋণ দেয়ার কথা ব্যবসাকে, জমিকে নয়।”

