টানা দুই বছর পতনের পর অবশেষে স্বস্তির খবর এসেছে দেশের অর্থনীতিতে। ২০২৪–২৫ অর্থবছরে দেশের মানুষের মাথাপিছু আয় বেড়ে দাঁড়িয়েছে ২ হাজার ৭৬৯ মার্কিন ডলার। বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরো (বিবিএস) তাদের চূড়ান্ত হিসাবে এ তথ্য জানিয়েছে।
এর আগের অর্থবছর, অর্থাৎ ২০২৩–২৪ সালে মাথাপিছু আয় ছিল ২ হাজার ৭৩৮ ডলার। সেই হিসাবে এক বছরের ব্যবধানে গড় আয় বেড়েছে ৩১ ডলার।
টাকার অঙ্কে হিসাব করলে বর্তমানে দেশের মানুষের গড় মাথাপিছু আয় দাঁড়িয়েছে ৩ লাখ ৩৪ হাজার ৫৫১ টাকা।
অনেকেই মনে করেন মাথাপিছু আয় মানেই ব্যক্তিগত আয়। কিন্তু বাস্তবে বিষয়টি একটু ভিন্ন। দেশের ভেতরে উৎপাদিত মোট আয় এবং প্রবাসীদের পাঠানো রেমিট্যান্স—এই দুই মিলিয়ে যে মোট জাতীয় আয় হয়, সেটিকে দেশের মোট জনসংখ্যা দিয়ে ভাগ করলে যে গড় অঙ্ক পাওয়া যায়, সেটিই মাথাপিছু আয়।
অর্থাৎ এটি দেশের মানুষের গড় আর্থিক সক্ষমতার একটি সূচক, ব্যক্তিগত উপার্জনের সঠিক প্রতিফলন নয়।
গত কয়েক অর্থবছরের পরিসংখ্যান বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, ২০২১–২২ অর্থবছরে মাথাপিছু আয় ছিল এখন পর্যন্ত সর্বোচ্চ। এরপর দুই বছর টানা কমার পর চলতি অর্থবছরে আবার ঊর্ধ্বমুখী হয়েছে।
-
২০২১–২২ অর্থবছর: ২,৭৯৩ ডলার (এখন পর্যন্ত সর্বোচ্চ)
-
২০২২–২৩ অর্থবছর: ২,৭৪৯ ডলার
-
২০২৩–২৪ অর্থবছর: ২,৭৩৮ ডলার
-
২০২৪–২৫ অর্থবছর: ২,৭৬৯ ডলার
পরিসংখ্যান বলছে, ২০২২–২৩ এবং ২০২৩–২৪ অর্থবছরে আয় কমলেও ২০২৪–২৫ অর্থবছরে তা আবার বেড়েছে। যদিও ২০২১–২২ সালের সর্বোচ্চ অবস্থানে এখনো পৌঁছানো সম্ভব হয়নি।
তবে সব খবরই যে ইতিবাচক, তা নয়। একই সময়ে দেশের মোট দেশজ উৎপাদন (জিডিপি) প্রবৃদ্ধি কমেছে।
বিবিএসের চূড়ান্ত হিসাব অনুযায়ী, ২০২৪–২৫ অর্থবছরে জিডিপি প্রবৃদ্ধি হয়েছে ৩ দশমিক ৪৯ শতাংশ। সাময়িক হিসাবের তুলনায় এটি দশমিক ৪৮ শতাংশ পয়েন্ট কম।
এর আগে, ২০২৩–২৪ অর্থবছরে জিডিপি প্রবৃদ্ধি ছিল ৪ দশমিক ২২ শতাংশ।
অর্থাৎ মাথাপিছু আয় কিছুটা বাড়লেও সামগ্রিক অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির গতি মন্থর হয়েছে।
অর্থনীতিবিদদের মতে, মাথাপিছু আয় বাড়া নিঃসন্দেহে ইতিবাচক ইঙ্গিত। তবে জিডিপি প্রবৃদ্ধি কমে যাওয়া অর্থনীতির সামগ্রিক গতি শ্লথ হওয়ার লক্ষণ হতে পারে।
বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন, আগামী অর্থবছরে দেশের অর্থনীতির চিত্র অনেকটাই নির্ভর করবে—
-
বিনিয়োগের পরিমাণের ওপর
-
রপ্তানি আয়ের প্রবণতার ওপর
-
প্রবাসী আয়ের ধারাবাহিকতার ওপর
এই তিনটি খাত শক্তিশালী থাকলে অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি আবার গতি পেতে পারে। অন্যথায় আয় বাড়লেও কাঙ্ক্ষিত উন্নয়নগত অগ্রগতি বাধাগ্রস্ত হতে পারে।
সব মিলিয়ে বলা যায়, ২০২৪–২৫ অর্থবছরে মাথাপিছু আয় বাড়া একটি ইতিবাচক বার্তা দিলেও জিডিপি প্রবৃদ্ধির হ্রাস সতর্কবার্তা হিসেবে দেখা হচ্ছে। অর্থনীতির প্রকৃত শক্তি বোঝা যাবে তখনই, যখন আয় বৃদ্ধি ও প্রবৃদ্ধি—দুই সূচকই একই সঙ্গে শক্তিশালী অবস্থানে থাকবে।
এখন নজর আগামী অর্থবছরের দিকে—বিনিয়োগ, রপ্তানি ও রেমিট্যান্স কি অর্থনীতিকে নতুন গতি দেবে, নাকি মন্থরতা আরও দীর্ঘ হবে? সেই উত্তরই নির্ধারণ করবে দেশের আর্থিক ভবিষ্যৎ।

