বাংলাদেশ ব্যাংকের নবনিযুক্ত গভর্নর মো. মোস্তাকুর রহমান দায়িত্ব গ্রহণের প্রথম কার্যদিবসেই স্পষ্ট বার্তা দিলেন—“কথা কম, কাজ বেশি।” বৃহস্পতিবার (২৬ ফেব্রুয়ারি) তিনি ডেপুটি গভর্নর ও নির্বাহী পরিচালকদের সঙ্গে বৈঠকে বসে কেন্দ্রীয় ব্যাংকের ভবিষ্যৎ কর্মপন্থা ও অগ্রাধিকার নির্ধারণ করেন।
বৈঠকে তিনি বলেন, সামষ্টিক অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতাকে ভিত্তি করে এখন মূল লক্ষ্য হবে প্রবৃদ্ধি বাড়ানো এবং কর্মসংস্থান সৃষ্টি। বিশেষ করে রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পর বন্ধ হয়ে যাওয়া কলকারখানাগুলো পুনরায় চালু করতে বাংলাদেশ ব্যাংক নীতিগত ও আর্থিক সহায়তা দেবে।
সকাল ১০টা ৪০ মিনিটে একটি পুরোনো গাড়িতে করে বাংলাদেশ ব্যাংকের মূল ভবনে পৌঁছান নতুন গভর্নর। সাংবাদিকরা ঘিরে ধরলেও তিনি সংক্ষিপ্ত মন্তব্য করেন—“এসেছি, কাজ শুরু করি, তারপর কথা বলা যাবে।”
দায়িত্ব নিয়েই তিনি কর্মকর্তাদের সঙ্গে জরুরি বৈঠকে বসেন। সেখানে তিনি কেন্দ্রীয় ব্যাংকের রেগুলেটরি মর্যাদা রক্ষার ওপর জোর দেন। তাঁর বক্তব্য—কেন্দ্রীয় ব্যাংকের যেকোনো বক্তব্য সমাজে ইতিবাচক বা নেতিবাচক প্রভাব ফেলে, তাই অযথা মন্তব্য না করাই উত্তম। হারানো ঐতিহ্য ও ভাবমূর্তি পুনরুদ্ধারের প্রতিশ্রুতিও দেন তিনি।
বাংলাদেশ ব্যাংকের মুখপাত্র আরিফ হোসেন খান সাংবাদিকদের জানান, গভর্নর গত দেড় বছরে বন্ধ হয়ে যাওয়া শিল্পকারখানাগুলো পুনরায় চালু করতে নীতিগত সহায়তা, প্রণোদনা ও ব্যাংকিং খাতে সমন্বয় জোরদার করবেন।
ছাত্র-জনতার গণ-অভ্যুত্থানে আওয়ামী লীগ সরকারের পতনের পর অন্তর্বর্তী সরকার দায়িত্ব নেওয়ার পর থেকে প্রায় ৪০০ শিল্পকারখানা বন্ধ হয়েছে। এর মধ্যে অধিকাংশই গার্মেন্টস, টেক্সটাইল ও স্পিনিং মিল; অনেকগুলো শতভাগ রপ্তানিমুখী। এতে প্রায় দেড় লাখ শ্রমিক চাকরি হারিয়েছেন। প্রত্যেক শ্রমিকের ওপর গড়ে তিনজন নির্ভরশীল ধরলে ক্ষতিগ্রস্ত মানুষের সংখ্যা দাঁড়ায় সাড়ে চার লাখ।
গভর্নরের ভাষ্য অনুযায়ী, “ব্যক্তি দোষ করতে পারে, কিন্তু প্রতিষ্ঠান তো চালু রাখা যায়।” অর্থাৎ অনিয়ম বা ব্যক্তিগত ব্যর্থতার দায়ে শিল্প বন্ধ রাখা হবে না; বরং পুনরুজ্জীবনের পথ খোঁজা হবে।
বন্ধ শিল্পকারখানা পুনরায় চালু সহজ করতে গত রবিবার বাংলাদেশ ব্যাংক ঋণ পুনঃতফসিল নীতিতে শিথিলতা আনে। এখন মাত্র ২ শতাংশ ডাউন পেমেন্ট দিলেই ঋণ পুনঃতফসিল করা যাবে। এর অর্ধেক আবেদনের সময় এবং বাকি অর্ধেক ছয় মাসের মধ্যে পরিশোধের সুযোগ রয়েছে। প্রয়োজনে আরও তিন মাস সময় বাড়ানো যাবে।
কেন্দ্রীয় ব্যাংক বলছে, যারা এককালীন অর্থ জমা দিতে না পেরে ঋণ নবায়ন করতে পারছিলেন না, তারা এখন নিয়মিত হওয়ার সুযোগ পাবেন। প্রয়োজনে সুদ মওকুফের সিদ্ধান্তও সংশ্লিষ্ট ব্যাংকের পরিচালনা পর্ষদ নিতে পারবে।
তবে অভিযোগ রয়েছে, অনেক তফসিলি ব্যাংক এখনো পুনঃতফসিলের আবেদন ঝুলিয়ে রাখছে। বিশেষ করে ইসলামি ব্যাংকগুলোর একীভূতকরণ ও বিশেষ নিরীক্ষার অজুহাতে আবেদন অনুমোদন বিলম্বিত হচ্ছে।
গভর্নর উচ্চ সুদহারের বিষয়টিও পর্যালোচনা করার কথা বলেছেন। বিনিয়োগ বাড়াতে সুদহার যৌক্তিক পর্যায়ে রাখা প্রয়োজন বলে তিনি মনে করেন। একই সঙ্গে মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণ, পণ্যমূল্য স্থিতিশীল রাখা এবং ব্যাংকিং খাতে নিয়মভিত্তিক ব্যবস্থাপনা জোরদার করার ওপর গুরুত্ব দিয়েছেন।
সম্প্রতি কেন্দ্রীয় ব্যাংকে বদলি-প্রত্যাহার, বিক্ষোভ ও উপদেষ্টার গাড়িতে হামলার ঘটনায় প্রতিষ্ঠানের ভাবমূর্তি ক্ষুণ্ন হয়েছে কি না—এ প্রশ্নে মুখপাত্র জানান, সুশাসন প্রতিষ্ঠা গভর্নরের অগ্রাধিকার তালিকায় রয়েছে। ভবিষ্যতে শৃঙ্খলাভঙ্গ সহ্য করা হবে না এবং ‘মব সৃষ্টির’ চেষ্টা করলে ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
বেলা আড়াইটায় নতুন গভর্নর অর্থ মন্ত্রণালয়ে গিয়ে অর্থমন্ত্রী আমীর খসরু মাহমুদ চৌধুরীর সঙ্গে বৈঠক করেন। বৈঠকের বিস্তারিত জানানো হয়নি, তবে অর্থনীতি পুনরুজ্জীবনে সমন্বিত উদ্যোগের কথা বলা হয়েছে।
প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান আগেই বন্ধ পাটকল, চিনিকল ও অন্যান্য শিল্পপ্রতিষ্ঠান পুনরায় চালুর নির্দেশ দিয়েছেন। এটি বিএনপির একটি গুরুত্বপূর্ণ নির্বাচনি প্রতিশ্রুতিও।
২০২৪ সাল শেষে শিল্প মন্ত্রণালয়ের অধীন ৩৯৭টি শিল্পপ্রতিষ্ঠান বন্ধ ছিল।
-
বিসিকের অধীন ৩৮২টি
-
বিসিআইসির অধীন ৫টি
-
বাংলাদেশ চিনি ও খাদ্য শিল্প করপোরেশনের অধীন ৬টি
-
বিএসইসি’র অধীন ৪টি
বিজিএমইএর তথ্য অনুযায়ী, ২০২৫ সালের নভেম্বর পর্যন্ত ৩৫৩টি গার্মেন্ট কারখানা বন্ধ রয়েছে। এতে ১ লাখ ১৯ হাজার ৮৪২ জন শ্রমিক কর্মহীন হয়েছেন। শুধু সাভারে ২১৪ ও গাজীপুরে ৭২টি কারখানা বন্ধ। বেক্সিমকো গ্রুপের ১৩টি পোশাক কারখানা স্থায়ীভাবে বন্ধ হওয়ায় পরিস্থিতি আরও জটিল হয়েছে।
দেশে বেকারত্ব ইতোমধ্যে ২৭ লাখ ছাড়িয়েছে, যুব বেকারত্ব ২৮ শতাংশের বেশি।
গভর্নর মোস্তাকুর রহমানের প্রথম দিনের বার্তা স্পষ্ট—স্থিতিশীলতার ওপর দাঁড়িয়ে প্রবৃদ্ধি, কর্মসংস্থান ও বিনিয়োগ বাড়াতে হবে। বন্ধ কারখানা চালু, ঋণ পুনঃতফসিলে শিথিলতা, সুদহার পর্যালোচনা এবং সুশাসন প্রতিষ্ঠা—এই চারটি স্তম্ভেই তিনি এগোতে চান।
এখন দেখার বিষয়, ঘোষিত উদ্যোগগুলো বাস্তবে কত দ্রুত কার্যকর হয়। যদি ব্যাংকিং সহযোগিতা বাস্তবায়িত হয় এবং শিল্প পুনরুজ্জীবন শুরু হয়, তাহলে অর্থনীতিতে নতুন গতি আসতে পারে—এমন প্রত্যাশাই শিল্পমালিক, শ্রমিক ও সাধারণ মানুষের।

