সরকার শুল্ক কমিয়েছে, আমদানি বেড়েছে, নিয়ন্ত্রক সংস্থা দামও কমিয়েছে—সবকিছু মিলিয়ে মনে হওয়ার কথা ছিল এলপিজি বাজারে স্বস্তি ফিরবে। কিন্তু বাস্তব চিত্র সম্পূর্ণ ভিন্ন। ১২ কেজির একটি সিলিন্ডারের সরকারি নির্ধারিত দাম এখন ১ হাজার ৩৪১ টাকা। অথচ রাজধানী থেকে বিভাগীয় শহর—খুচরা বাজারে সেই একই সিলিন্ডার বিক্রি হচ্ছে ১ হাজার ৬০০ থেকে ১ হাজার ৮৫০ টাকায়।
অর্থাৎ প্রতি সিলিন্ডারে গ্রাহকদের গুনতে হচ্ছে বাড়তি ২৫০ থেকে ৫০০ টাকা পর্যন্ত। প্রশ্ন উঠছে—তাহলে শুল্ক কমানোর সুফল গেল কোথায়?
শুল্ক প্রত্যাহার, কিন্তু প্রভাব নেই
সরকার ১৬ ফেব্রুয়ারি দুটি পৃথক প্রজ্ঞাপনের মাধ্যমে এলপিজির স্থানীয় উৎপাদন ও ব্যবসায়ী পর্যায়ের ৭ দশমিক ৫ শতাংশ শুল্ক এবং আমদানি পর্যায়ের ২ শতাংশ আগাম কর ৩০ জুন পর্যন্ত প্রত্যাহার করে। জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ মন্ত্রণালয়ের সুপারিশ এবং অপারেটরদের আবেদনের ভিত্তিতে এই সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়।
এই ঘোষণার পর প্রত্যাশা ছিল বাজারে দাম কমবে। তারই ধারাবাহিকতায় গত মঙ্গলবার বাংলাদেশ এনার্জি রেগুলেটরি কমিশন (বিইআরসি) ১২ কেজির সিলিন্ডারের দাম ১৫ টাকা কমিয়ে ১ হাজার ৩৪১ টাকা নির্ধারণ করে। খুচরা পর্যায়ে প্রতি কেজির দাম ধরা হয় ১১১ টাকা ৭৯ পয়সা।
এর আগে ২ ফেব্রুয়ারি মূল্য সমন্বয়ের সময় ৫০ টাকা বাড়িয়ে দাম করা হয়েছিল ১ হাজার ৩৫৬ টাকা।
কিন্তু বাস্তবে ১৫ টাকার এই সমন্বয় বাজারে কোনো দৃশ্যমান প্রভাব ফেলেনি।
রাজধানীতে ১,৮৫০ টাকা পর্যন্ত
রাজধানীর মিরপুর, মোহাম্মদপুর, যাত্রাবাড়ী ও বাড্ডা এলাকায় খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, ১২ কেজির সিলিন্ডার বিক্রি হচ্ছে ১ হাজার ৬০০ থেকে ১ হাজার ৮৫০ টাকায়। অনেক খুচরা বিক্রেতা দাবি করছেন, তারা ডিলার পর্যায় থেকেই বেশি দামে কিনছেন।
মগবাজারের বাসিন্দা ইন্দ্রনীল সরকার বলেন, “সরকারি দাম শুনেছি ১ হাজার ৩৪১ টাকা। কিন্তু আমি কিনেছি ১ হাজার ৮০০ টাকায়।”
মোহাম্মদপুরের খুচরা বিক্রেতা শহিদুল জানান, “ডিলার বেশি দামে দিলে আমরা কম দামে বিক্রি করব কীভাবে?”
বিভাগীয় শহরেও একই অবস্থা
শুধু রাজধানী নয়, চট্টগ্রাম, রাজশাহী, খুলনা, বরিশাল ও সিলেটেও প্রায় একই চিত্র। চট্টগ্রামের চকবাজার, বহদ্দারহাট ও আগ্রাবাদ এলাকায় ১২ কেজির সিলিন্ডার বিক্রি হচ্ছে ১ হাজার ৬০০ থেকে ১ হাজার ৬৫০ টাকায়।
রাজশাহীতে দাম ১ হাজার ৬০০ টাকা, খুলনায়ও প্রায় একই। বরিশাল ও সিলেটে পরিবহন খরচের অজুহাতে আরও বেশি দাম নেওয়া হচ্ছে বলে অভিযোগ রয়েছে। উপজেলা ও মফস্বল এলাকায় অনেক জায়গায় নির্ধারিত দামের চেয়ে ৩০০ থেকে ৫০০ টাকা বেশি নেওয়া হচ্ছে।
৩৫ কেজির সিলিন্ডার বিক্রি হচ্ছে ৫ হাজার থেকে ৫ হাজার ২০০ টাকায়।
আমদানি বেড়েছে, কিন্তু বাজারে প্রভাব নেই
চট্টগ্রাম ও মোংলা বন্দর সূত্রে জানা গেছে, ফেব্রুয়ারির ২১ তারিখ পর্যন্ত দুই বন্দর দিয়ে ৯১ হাজার টন এলপিজি আমদানি হয়েছে—যা আগের মাসের একই সময়ের তুলনায় প্রায় ৪৪ শতাংশ বেশি। সীতাকুণ্ডের বেসরকারি জেটি দিয়ে প্রতি মাসে আরও প্রায় ২২ হাজার টন আমদানি হয়।
দেশে ২৮টি কোম্পানি এলপিজি ব্যবসা করলেও ২৩টির আমদানির অনুমোদন রয়েছে। চলতি অর্থবছরে সক্রিয় রয়েছে ১৬টি কোম্পানি। এর মধ্যে মাত্র ৯টি কোম্পানি মোট আমদানির ৯২ শতাংশ সরবরাহ করেছে। বেক্সিমকোসহ অন্তত চারটি কোম্পানির আমদানি বন্ধ রয়েছে।
গত নভেম্বরে আমদানি ৪৪ শতাংশ কমে যায়। ডিসেম্বর ও জানুয়ারিতেও পরিস্থিতি স্বাভাবিক হয়নি। জানুয়ারিতে তিতাসের গ্যাস সংকটের কারণে এলপিজির চাহিদা বেড়ে যায় এবং বাজারে সংকট তৈরি হয়। পরে অন্তর্বর্তী সরকার আমদানি বাড়ানোর অনুমতি দেয়।
মেঘনা গ্রুপ অব ইন্ডাস্ট্রিজের একাধিক জাহাজে প্রায় ৫৭ হাজার টন এলপিজি এখন চট্টগ্রামের পথে রয়েছে। ইউনাইটেড আইগ্যাস, যমুনা স্পেকটেক ও ওমেরা পেট্রোলিয়ামসহ অন্যান্য কোম্পানিও আমদানি বাড়িয়েছে।
তদারকির ঘাটতি?
বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন, সমস্যা কেবল সরবরাহের নয়, বরং বাজার তদারকির। বিইআরসি কাগজে দাম নির্ধারণ করলেও মাঠপর্যায়ে তা কার্যকর করার মতো পর্যাপ্ত জনবল তাদের নেই।
ক্যাবের কেন্দ্রীয় সহসভাপতি এস এম নাজের হোসাইন বলেন, “শুধু কাগুজে মূল্য সমন্বয়ে বাজার নিয়ন্ত্রণ সম্ভব নয়। উৎপাদন থেকে খুচরা পর্যন্ত প্রতিটি স্তরে সমন্বিত তদারকি দরকার।”
বিইআরসির চেয়ারম্যান জালাল আহমেদ স্বীকার করেছেন, মাঠপর্যায়ে সরাসরি বাজার নিয়ন্ত্রণের মতো জনবল কমিশনের নেই। তবে আইনশৃঙ্খলা বাহিনী ও ভোক্তা অধিকার সংস্থা অভিযান চালাচ্ছে বলে তিনি জানান।
শুল্ক কমেছে, আমদানি বেড়েছে, কিন্তু ভোক্তার কষ্ট কমেনি। সরকারি দামের সঙ্গে বাস্তব বাজারদরের বিশাল ফারাকই এখন সবচেয়ে বড় প্রশ্ন। যদি এই ব্যবধান কমানো না যায়, তাহলে শুল্ক ছাড়ের সুফল কাগজেই সীমাবদ্ধ থাকবে।
এলপিজি এখন কেবল একটি জ্বালানি নয়—এটি সাধারণ পরিবারের দৈনন্দিন জীবনের অপরিহার্য অংশ। তাই কাগজে নয়, বাজারে স্বস্তি ফিরলেই কেবল সরকারের পদক্ষেপ সফল বলা যাবে।
আপনি চাইলে আমি এটিকে আরও অনুসন্ধানধর্মী বা আরও তীক্ষ্ণ বিশ্লেষণভিত্তিক ফিচার আকারেও সাজিয়ে দিতে পারি।

