স্বল্পোন্নত দেশ বা এলডিসি থেকে উত্তরণ তিন বছর পিছিয়ে দিতে বাংলাদেশের করা আবেদন গ্রহণ করেছে জাতিসংঘ। তবে এটি কেবল পর্যালোচনার জন্য গ্রহণ করা হয়েছে। এখনই উত্তরণ স্থগিতের অনুমোদন দেওয়া হয়নি।
আবেদনটি খতিয়ে দেখবে জাতিসংঘের কমিটি ফর ডেভেলপমেন্ট পলিসি (সিডিপি)। গত ২৩ ফেব্রুয়ারি নিউইয়র্কে কমিটির পাঁচ দিনব্যাপী বৈঠক শুরু হয়েছে। সিডিপির সদস্য ও এনহ্যান্সড মনিটরিং মেকানিজম উপকমিটির প্রধান দেবপ্রিয় ভট্টাচার্য বিষয়টি নিশ্চিত করেছেন।
তিনি জানান, বাংলাদেশ সরকারের চিঠি পাওয়ার বিষয়টি স্বীকার করেছে সিডিপি। তবে আবেদন গ্রহণ মানেই অনুমোদন নয়। প্রথমে সরকারের দেওয়া যুক্তিগুলো যাচাই করা হবে। এরপর সুপারিশ পাঠানো হবে জাতিসংঘের অর্থনৈতিক ও সামাজিক পরিষদ (ইকোসক)-এ। সেখান থেকে বিষয়টি যাবে জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদ-এ চূড়ান্ত সিদ্ধান্তের জন্য।
দেবপ্রিয় ভট্টাচার্য বলেন, সিডিপির সিদ্ধান্ত জানতে কয়েক সপ্তাহ সময় লাগতে পারে। তারপর ধাপে ধাপে ইকোসক ও সাধারণ পরিষদে বিষয়টি উপস্থাপন হবে। তিনি আরও জানান, বাংলাদেশ কোনো অপ্রত্যাশিত ও নিয়ন্ত্রণের বাইরে থাকা সংকটে পড়েছে কি না, সেটিও যাচাই করা হবে।
চলতি সপ্তাহে এনহ্যান্সড মনিটরিং মেকানিজম উপকমিটির বৈঠকে এলডিসি থেকে ইতিমধ্যে বেরিয়ে যাওয়া এবং উত্তরণের অপেক্ষায় থাকা দেশগুলোর পরিস্থিতি পর্যালোচনা হবে। বর্তমানে বাংলাদেশ, নেপাল ও লাওস উত্তরণের অপেক্ষায় রয়েছে। দেবপ্রিয় ভট্টাচার্য ঢাকা ছাড়ার আগে জানান, এক সেশনে এই তিন দেশের অগ্রগতি ও প্রস্তুতি মূল্যায়ন করা হবে। চলতি বছরের শেষে তারা কতটা প্রস্তুত, সেটিও দেখা হবে। বর্তমান সূচি অনুযায়ী, আগামী ২৪ নভেম্বর বাংলাদেশের এলডিসি থেকে উত্তরণের কথা রয়েছে। তৃতীয় ও চূড়ান্ত পর্যালোচনা প্রক্রিয়া এখন চলছে।
নতুন সরকার দায়িত্ব নেওয়ার পরদিনই উত্তরণ ২০২৯ সালের ২৪ নভেম্বর পর্যন্ত পিছিয়ে দেওয়ার আবেদন করে। ১৮ ফেব্রুয়ারি সিডিপির চেয়ারম্যান হোসে আন্তোনিও ওকাম্পোর কাছে অর্থনৈতিক সম্পর্ক বিভাগের সচিব মো. শাহরিয়ার কাদের ছিদ্দিকীর স্বাক্ষরিত চিঠি পাঠানো হয়। চিঠিতে বলা হয়, মাথাপিছু জাতীয় আয়, মানবসম্পদ সূচক ও অর্থনৈতিক ও পরিবেশগত ঝুঁকি সূচক—এই তিন শর্ত পূরণ অব্যাহত আছে। তবে পাঁচ বছরের প্রস্তুতিমূলক সময় বৈশ্বিক ও অভ্যন্তরীণ ধাক্কায় মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে।
সরকার কোভিড মহামারীর দীর্ঘ প্রভাব, রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধ, মধ্যপ্রাচ্যের উত্তেজনা, বৈশ্বিক আর্থিক কড়াকড়ি ও আন্তর্জাতিক বাণিজ্যের ধীর পুনরুদ্ধারের কথা উল্লেখ করেছে। অভ্যন্তরীণ কারণ হিসেবে আর্থিক খাতের অনিয়ম, ২০২৪ সালের জুলাই গণঅভ্যুত্থানে সরকার পরিবর্তন এবং বাস্তুচ্যুত মিয়ানমার নাগরিকদের আশ্রয় দেওয়ার চাপের কথা বলা হয়েছে।
চিঠিতে উল্লেখ করা হয়, এসব অভিঘাতে সামষ্টিক অর্থনৈতিক অস্থিরতা বেড়েছে। জিডিপি প্রবৃদ্ধি কমেছে। মূল্যস্ফীতি বেড়েছে। সরকারি ও বেসরকারি বিনিয়োগ হ্রাস পেয়েছে। বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভে চাপ তৈরি হয়েছে। মূলধনী যন্ত্রপাতি ও কাঁচামাল আমদানি কমেছে। ফলে নতুন কর্মসংস্থান সৃষ্টির গতি কমেছে।
সরকার বলেছে, এসব কারণে নীতিগত মনোযোগ স্বল্পমেয়াদি স্থিতিশীলতা ও সংকট ব্যবস্থাপনায় সরতে হয়েছে। এতে উত্তরণ প্রস্তুতির সময়টি প্রত্যাশামতো কাজে লাগানো যায়নি। উত্তরণ-পরবর্তী বাণিজ্য ঝুঁকির কথাও চিঠিতে উল্লেখ রয়েছে। এর মধ্যে ইউরোপীয় ইউনিয়নে তৈরি পোশাক রপ্তানিতে অগ্রাধিকার সুবিধা হারানোর আশঙ্কা এবং যুক্তরাষ্ট্রের সম্ভাব্য পাল্টা শুল্কারোপের ঝুঁকি রয়েছে।
বাংলাদেশ ইএমএম কাঠামোর অধীনে সংকট মোকাবিলা বিধান ব্যবহার করে তিন বছরের সময় বাড়ানোর আবেদন করেছে। লক্ষ্য অর্থনীতিকে স্থিতিশীল করা এবং স্মুথ ট্রানজিশন কৌশলের অগ্রাধিকার কাজ শেষ করা।
কর্মকর্তারা জানান, ফেব্রুয়ারির বৈঠকের দুই সপ্তাহের মধ্যে প্রাথমিক মূল্যায়ন প্রতিবেদন তৈরি হতে পারে। পরে সিডিপির পর্যবেক্ষণ ও সুপারিশ জানা যাবে। সব প্রক্রিয়া শেষে সাধারণ পরিষদের অনুমোদন সাপেক্ষে আগামী সেপ্টেম্বরের মধ্যে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত আসতে পারে।

