বৈশ্বিক বাণিজ্যে বাংলাদেশের অবস্থান শক্ত করতে নতুন উদ্যোগ নিয়েছে সরকার। শুল্ক ও অশুল্ক বাধা কমাতে বিশ্বের বিভিন্ন দেশের সঙ্গে সমন্বিত পদক্ষেপ নেওয়া হচ্ছে। একই সঙ্গে বড় বাজারগুলোতে কূটনৈতিক তৎপরতা বাড়ানোর নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।
প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের নির্দেশনায় বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ের নেতৃত্বে একটি সমন্বিত অ্যাকশন প্ল্যান তৈরির কাজ শুরু হয়েছে। বিদেশে থাকা বাংলাদেশি দূতাবাস ও মিশনগুলোকে আরও সক্রিয় করার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। লক্ষ্য একটাই—রপ্তানি বাড়ানো এবং নতুন বাজারে প্রবেশ সহজ করা।
অন্তর্বর্তী সরকার জাপানের সঙ্গে অর্থনৈতিক অংশীদারি চুক্তি সম্পাদনের মাধ্যমে যে উদ্যোগ শুরু করেছিল, নতুন সরকার সেটিকে আরও বিস্তৃত করতে চায়। বৈশ্বিক বাণিজ্যের প্রতিবন্ধকতা কমাতে বিভিন্ন দেশের সঙ্গে মুক্তবাণিজ্য চুক্তি (এফটিএ) ও অগ্রাধিকারমূলক বাণিজ্য চুক্তি (পিটিএ) এগিয়ে নেওয়ার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। বাণিজ্য মন্ত্রণালয় সূত্রে এসব তথ্য জানা গেছে।
সূত্র জানায়, অন্তর্বর্তী সরকারের সময়ে যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে হওয়া সর্বশেষ বাণিজ্য চুক্তিগুলোও নতুন করে পর্যালোচনা করা হবে। এ লক্ষ্যে দেশটির বাণিজ্য দপ্তর ইউএসটিআরের সঙ্গে ধারাবাহিক আলোচনা চালানো হবে। পাশাপাশি বিশ্ব বাণিজ্য সংস্থার পরবর্তী সম্মেলনেও বাংলাদেশের বাণিজ্য-সংক্রান্ত বিষয়গুলো তুলে ধরা হবে। লক্ষ্য থাকবে বৈশ্বিক বাণিজ্যে বাংলাদেশের যে বাধাগুলো রয়েছে, সেগুলোর কার্যকর সমাধান খোঁজা।
বাণিজ্য সচিব মাহবুবুর রহমান জানিয়েছেন, নতুন সরকার দায়িত্ব নেওয়ার পর অগ্রাধিকার ভিত্তিতে বৈশ্বিক বাণিজ্যের বাধা দূর করা এবং রপ্তানির নতুন বাজার অনুসন্ধানের কাজ শুরু হয়েছে। বিশেষ করে যুক্তরাজ্য, যুক্তরাষ্ট্র ও ইউরোপীয় ইউনিয়নের বাজারে বাংলাদেশি পণ্যের অবাধ প্রবেশ নিশ্চিত করতে উদ্যোগ নেওয়া হবে।
রপ্তানিনির্ভর অর্থনীতি হিসেবে বাংলাদেশ বৈশ্বিক পরিবর্তনের দিকে সতর্ক নজর রাখছে। তৈরি পোশাক, চামড়া ও তথ্যপ্রযুক্তি খাতে বাজার বহুমুখীকরণে জোর দেওয়া হচ্ছে। একই সঙ্গে বন্দর অবকাঠামো উন্নয়ন, শুল্ক কাঠামো সংস্কার এবং নতুন বাণিজ্য চুক্তির মাধ্যমে বাজার সম্প্রসারণের কৌশল নেওয়া হয়েছে।
অর্থনীতিবিদদের মতে, বৈশ্বিক বাণিজ্যের সব বাধা পুরোপুরি দূর করা সম্ভব নয়। তবে সমন্বিত নীতি, আঞ্চলিক সহযোগিতা এবং প্রযুক্তিনির্ভর প্রক্রিয়া সহজীকরণ ঝুঁকি অনেকটাই কমাতে পারে। এখন দেখার বিষয়, এসব উদ্যোগ কত দ্রুত বাস্তব ফল দেয় এবং আন্তর্জাতিক বাজারে আস্থার পরিবেশ জোরদার করতে পারে।
সূত্রমতে, পোশাক রপ্তানিতে ভিয়েতনাম বাংলাদেশের বড় প্রতিযোগী। দেশটির ইউরোপীয় ইউনিয়নভুক্ত ২৭ দেশসহ যুক্তরাষ্ট্র, যুক্তরাজ্য, জাপান, ভারত, চিলি, চীন, সিঙ্গাপুর, ব্রুনাই, বেলারুশ, কাজাখস্তান ও কিরগিজস্তানসহ প্রায় ৪০টি দেশের সঙ্গে মুক্তবাণিজ্য চুক্তি রয়েছে। বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ের কর্মকর্তারা বলছেন, ইপিএ ও এফটিএ প্রায় একই ধরনের হলেও ইপিএ তুলনামূলকভাবে আরও বিস্তৃত ও উন্নয়নবান্ধব। স্বল্প সময়ের মধ্যে সম্ভাব্য অংশীদার দেশগুলোর সঙ্গে প্রয়োজনীয় চুক্তি সম্পাদনে নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।
এদিকে অর্থনৈতিক বাস্তবতা বিবেচনায় এলডিসি গ্র্যাজুয়েশন অন্তত তিন বছর পিছিয়ে দেওয়ার জন্য জাতিসংঘে আবেদন করেছে সরকার। স্বল্পোন্নত দেশের তালিকা থেকে বেরিয়ে যাওয়ার সম্ভাব্য চ্যালেঞ্জ মোকাবিলায় রপ্তানি বাজার সংরক্ষণ ও সম্প্রসারণকে অগ্রাধিকার দেওয়া হয়েছে। শুল্কমুক্ত প্রবেশাধিকার বজায় রাখতে বিভিন্ন দেশ ও ট্রেড ব্লকের সঙ্গে পিটিএ, এফটিএ ও অর্থনৈতিক অংশীদারি চুক্তি করার নীতি নেওয়া হয়েছে।
বাণিজ্য মন্ত্রণালয় অগ্রাধিকার ভিত্তিতে একাধিক দেশ ও ট্রেড ব্লকের সঙ্গে আঞ্চলিক বাণিজ্য চুক্তি নিয়ে আলোচনা চালাচ্ছে। পরিকল্পনা অনুযায়ী, চলতি বছরের নভেম্বরের মধ্যে দক্ষিণ কোরিয়া, সিঙ্গাপুর, মালয়েশিয়া ও সংযুক্ত আরব আমিরাতের সঙ্গে অন্তত চারটি মুক্তবাণিজ্য চুক্তি সম্পাদনের লক্ষ্য রয়েছে। পরবর্তী ধাপে যুক্তরাষ্ট্র, ইউরোপীয় ইউনিয়ন, কানাডা, চীন, ইন্দোনেশিয়া, নেপাল, শ্রীলঙ্কা, ব্রাজিল, থাইল্যান্ড, দক্ষিণ কোরিয়া, আর্জেন্টিনা, অস্ট্রেলিয়া ও সৌদি আরবের সঙ্গেও এফটিএ করার বিষয়টি বিবেচনায় রয়েছে।
সময়োপযোগী কূটনীতি ও কার্যকর বাণিজ্য নীতি বাস্তবায়ন করতে পারলে বৈশ্বিক বাজারে বাংলাদেশের অংশগ্রহণ আরও শক্ত ভিত্তি পাবে।

