বর্তমানে বাংলাদেশের মোট পরিবহন চাহিদার প্রায় ৮০ শতাংশই সড়কপথের ওপর নির্ভরশীল। এর ফলে সড়কের দ্রুত ক্ষয়, নিরাপত্তা ঝুঁকি এবং জমি অধিগ্রহণের জটিলতা বাড়ছে। এই চ্যালেঞ্জ মোকাবিলায় পরিকল্পনা কমিশন রেলওয়ে খাতকে অগ্রাধিকার দিয়ে একটি বহুমুখী (মাল্টি-মোডাল) পরিবহন রোডম্যাপ চূড়ান্ত করতে যাচ্ছে।
পরিকল্পনা কমিশনের সূত্র ও সংশ্লিষ্ট সারসংক্ষেপ অনুযায়ী, এই কৌশলের মূল লক্ষ্য হলো সড়কপথের ওপর চাপ কমানো এবং আঞ্চলিক সংযোগ জোরদার করা। ভৌত অবকাঠামো বিভাগের কর্মকর্তারা জানান, ছয় মাসের পরামর্শ প্রক্রিয়ার পর রোডম্যাপের সুপারিশগুলো চূড়ান্ত করা হয়েছে। এখন তা সরকারের উচ্চপর্যায়ের নীতিনির্ধারকদের কাছে উপস্থাপনের প্রস্তুতি চলছে।
টেকসই সড়ক অবকাঠামো নির্মাণ ও রক্ষণাবেক্ষণ, সড়ক পরিবহন আইন কঠোরভাবে প্রয়োগ এবং মানসম্মত গণপরিবহন চালু করলে যাত্রী পরিবহন অনেক বেশি নিরাপদ করা সম্ভব। সংশ্লিষ্ট সংস্থাগুলোর সঙ্গে আলোচনায় উঠে এসেছে, রেল ও নৌপথে যাত্রী ও পণ্য পরিবহনের সক্ষমতা বাড়ানো গেলে সড়কের ওপর চাপ উল্লেখযোগ্যভাবে কমবে। ভৌত অবকাঠামো বিভাগ মনে করছে, তিনটি খাতের মধ্যে সমন্বিত কার্যকর সহযোগিতা ছাড়া এই লক্ষ্য অর্জন সম্ভব নয়।
রেলের বৈদ্যুতিক ব্যবস্থা, কর্ড রেললাইন ও বন্দর সংযোগ উন্নয়ন:
পরিকল্পনা কমিশন প্রস্তাবিত বহুমুখী পরিবহন রোডম্যাপে ঢাকা-চট্টগ্রাম রুটে বিদ্যুৎচালিত ট্রেন চালুর পরিকল্পনা রাখছে। এছাড়া নারায়ণগঞ্জ-ঢাকা এবং ঢাকা-জয়দেবপুর রুটেও বিদ্যুৎচালিত ব্যবস্থার প্রস্তাব করা হয়েছে, যাতে আন্তঃনগর ও কমিউটার সেবা আধুনিক ও দ্রুত করা যায়।
রোডম্যাপে ঢাকা-লাকসাম/কুমিল্লা কর্ড লাইন উন্নয়ন, সব সমুদ্রবন্দরের সঙ্গে রেল সংযোগ জোরদার এবং মাতারবাড়ী গভীর সমুদ্রবন্দর ও বে টার্মিনাল প্রকল্প দ্রুত শেষ করার ওপরও গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে। বর্তমানে পণ্য পরিবহনে রেলের অংশীদারিত্ব ৫ শতাংশেরও কম। পরিকল্পনা কমিশন সেটি বাড়িয়ে অন্তত ২০ শতাংশে উন্নীত করার লক্ষ্য নির্ধারণ করেছে।
ভৌত অবকাঠামো বিভাগের প্রধান কবির আহমেদ টিবিএসকে জানান, “সড়ক, নৌ ও রেল ব্যবস্থার সমন্বয়ে যে বহুমুখী পরিবহন কাঠামো গড়ে তোলার কথা পরিকল্পনা কমিশন বলছে, তাতে সংশ্লিষ্ট সব সংস্থা সম্মতি দিয়েছে। এতে প্রতিটি মন্ত্রণালয় নিজ নিজ অবস্থান থেকে একই লক্ষ্য সামনে রেখে কাজ করতে পারবে।”
তিনটি অভ্যন্তরীণ নৌকেন্দ্রের প্রস্তাব:
পরিকল্পনা কমিশন নৌভিত্তিক পণ্য পরিবহন জোরদার করতে তিনটি বড় অভ্যন্তরীণ নৌকেন্দ্র গড়ে তোলার প্রস্তাব দিয়েছে। এর মধ্যে একটি হবে আশুগঞ্জ নদীবন্দর, যা হবিগঞ্জ ও নরসিংদীর সম্প্রসারিত শিল্পাঞ্চলকে সেবা দেবে। দ্বিতীয় কেন্দ্র হবে পানগাঁও ইনল্যান্ড কনটেইনার টার্মিনাল, যা ঢাকা-চট্টগ্রাম মহাসড়কের যানজট কমাতে সহায়ক হবে। তৃতীয় কেন্দ্র প্রস্তাব করা হয়েছে যশোরের নওয়াপাড়া নদীবন্দর এলাকায়।
কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, বাংলাদেশের ভৌগোলিক অবস্থান নৌপথে পণ্য পরিবহন বাড়ানোর জন্য বড় সম্ভাবনা তৈরি করেছে। তবে এর জন্য নির্দিষ্ট সময়সীমার মধ্যে ড্রেজিং, নদীশাসন ও তীর সংরক্ষণ নিশ্চিত করতে হবে। পাশাপাশি গুরুত্বপূর্ণ নদীবন্দরগুলোতে শুল্ক ও নজরদারি সেবা চালু এবং সড়ক ও রেলসংযোগ নির্বিঘ্ন রাখাও জরুরি।
চট্টগ্রাম বন্দরে কনটেইনারের পরিমাণ দ্রুত বাড়ছে। এই পরিস্থিতিতে ইনল্যান্ড কনটেইনার ডিপো (আইসিডি) দ্রুত নির্মাণ শেষ করার ওপর গুরুত্ব দিয়েছে পরিকল্পনা কমিশন। পদ্মা সেতুর সংযোগ ব্যবহার করে মোংলা বন্দর থেকে কনটেইনার পরিবহন সহজ করতে নিমতলি ও পাবনা-ঈশ্বরদী রুটে আইসিডি স্থাপনের সম্ভাব্যতা যাচাই করার প্রস্তাবও করা হয়েছে।
কমিশন ভবিষ্যতের চাহিদা, বন্দর সম্প্রসারণ এবং আসন্ন বে টার্মিনালকে মাথায় রেখে ঢাকা-চট্টগ্রাম-কক্সবাজার-মাতারবাড়ী রুটে কত শতাংশ কনটেইনার পরিবহন সড়ক থেকে রেলপথে নেওয়া সম্ভব, তা বিশদে মূল্যায়ন করার আহ্বান জানিয়েছে। পাশাপাশি ভারতের ঋণ সহায়তায় বাস্তবায়নাধীন রেল প্রকল্পগুলোর দ্রুত সিদ্ধান্ত নেওয়ার প্রয়োজনীয়তাও উল্লেখ করা হয়েছে।
সড়কের ওপর বাড়তি চাপ:
পরিকল্পনা কমিশনের কৌশলের সঙ্গে একমত পোষণ করে সড়ক ও জনপথ অধিদপ্তরের প্রধান প্রকৌশলী সৈয়দ মঈনুল হাসান বলেন, দেশের সড়ক নেটওয়ার্ক বর্তমানে তীব্র চাপের মধ্যে রয়েছে। তিনি জানান, “রেল ও নৌপথের মতো অন্যান্য যোগাযোগ মাধ্যমের শেয়ার নিশ্চিত করতে না পারায় সড়কপথের ওপর অতিরিক্ত চাপ পড়ছে।” তিনি সড়কের ওপর নির্ভরতা কমানোর কৌশলগত পদক্ষেপ নেওয়ার আহ্বান জানান।
বাংলাদেশ রেলওয়ের মহাপরিচালক মো. আফজাল হোসেন বলেন, যাত্রী ও পণ্য পরিবহনে রেলের অংশীদারিত্ব এখনও ৫ শতাংশের নিচে। তবে লোকোমোটিভ, কোচ ও ওয়াগন সংগ্রহের মাধ্যমে কনটেইনার ট্রেন পরিচালনা বাড়ানোর উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। পণ্য পরিবহন আরও কার্যকর করতে একটি পৃথক কনটেইনার কোম্পানি গঠনের কথাও তিনি উল্লেখ করেন।
বন্দর উন্নয়নের প্রস্তুতি:
নৌপরিবহন খাতের কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, দেশের সমুদ্রবন্দর আধুনিকীকরণ এবং বাণিজ্য সহজ করতে একাধিক প্রকল্প বাস্তবায়নাধীন রয়েছে। চট্টগ্রাম বন্দর কর্তৃপক্ষের প্রধান পরিকল্পনা কর্মকর্তা মাহবুব মোর্শেদ চৌধুরী বলেন, “সমুদ্রপথে বাণিজ্য প্রতিবছর প্রায় ১০ শতাংশ হারে বাড়ছে। ইতোমধ্যে আটটি রপ্তানি প্রক্রিয়াকরণ অঞ্চল চালু হয়েছে, এবং আরও কয়েকটি পরিকল্পনায় রয়েছে।”
তিনি আরও উল্লেখ করেন, নেপাল, ভুটান এবং ভারতের উত্তর-পূর্বাঞ্চলীয় রাজ্যগুলোর সম্ভাব্য ট্রানজিট কার্গো বিবেচনায় নিয়ে বন্দর সক্ষমতা বাড়ানো জরুরি। মোংলা বন্দর কর্তৃপক্ষের কর্মকর্তা জানান, দেশের প্রায় ৭০ শতাংশ আমদানি-রপ্তানি ঢাকাকেন্দ্রিক। পদ্মা সেতু চালুর পর ঢাকা-মোংলা দূরত্ব ঢাকা-চট্টগ্রাম রুটের তুলনায় প্রায় ১০০ কিলোমিটার কমে গেছে, যা মোংলা বন্দরের সক্ষমতা বাড়ানোর পক্ষে জোরালো যুক্তি হিসেবে কাজ করছে। কর্মকর্তারা বলেন, চট্টগ্রাম, মোংলা ও পায়রা—এই তিনটি বন্দরের পূর্ণ ব্যবহার নিশ্চিত করতে হবে, যাতে বাড়তি চাহিদা সামাল দেওয়া যায় এবং চাপ কমানো সম্ভব হয়।
কমিশনের বহুমুখী পরিবহন রোডম্যাপ ২০২৬ সালের নির্বাচনী ইশতেহারে বিএনপি যে পরিবহন অগ্রাধিকারের কথা উল্লেখ করেছিল, তার সঙ্গে সম্পূর্ণ সামঞ্জস্যপূর্ণ। ইশতেহারে বলা হয়েছে ডাবল লাইন ও উচ্চগতির রেল নেটওয়ার্ক, জাতীয় এক্সপ্রেসওয়ে গ্রিড, স্মার্ট ট্রাফিক ব্যবস্থা, আধুনিক নৌপথ এবং বন্দর উন্নয়ন।
গত ১৮ ফেব্রুয়ারি, প্রধানমন্ত্রী হিসেবে প্রথম টেলিভিশন ভাষণে তারেক রহমান বলেন, নগরকেন্দ্রিক চাপ কমাতে এবং রাজধানীর বাইরে অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ড ছড়িয়ে দিতে রেল নেটওয়ার্ক সংস্কার ও সম্প্রসারণ করা হবে। তিনি আরও জানান, সমন্বয় বাড়াতে রেল, সড়ক ও নৌ মন্ত্রণালয়ের দায়িত্ব পুনর্বিন্যাস করা হবে।
রোডম্যাপ প্রণয়নের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, চূড়ান্ত লক্ষ্য হলো বন্দর, রপ্তানি প্রক্রিয়াকরণ অঞ্চল, অর্থনৈতিক অঞ্চল, শিল্প ক্লাস্টার ও বিদ্যুৎকেন্দ্রগুলোর মধ্যে নিরবচ্ছিন্ন ও সমন্বিত বহুমুখী যোগাযোগব্যবস্থা গড়ে তোলা। এর মাধ্যমে পরিবহন ব্যয় কমানো, নিরাপত্তা বাড়ানো এবং টেকসই উন্নয়ন নিশ্চিত করা সম্ভব হবে।

