দেশের অর্থনীতিতে নতুন করে সতর্কবার্তা দিচ্ছে বেসরকারি বিনিয়োগের সর্বশেষ চিত্র। গত এক দশকের মধ্যে এবারই জিডিপির অনুপাতে বেসরকারি বিনিয়োগ সর্বনিম্ন পর্যায়ে নেমেছে। টানা চার বছর ধরে কমতে থাকা এই প্রবণতা এখন প্রবৃদ্ধি ও কর্মসংস্থান—দুই ক্ষেত্রেই চাপ তৈরি করছে।
সরকারি পরিসংখ্যান অনুযায়ী, ২০২৪–২৫ অর্থবছরে জিডিপির মাত্র ২২ দশমিক শূন্য ৩ শতাংশ এসেছে বেসরকারি বিনিয়োগ থেকে। গত ১০ বছরের মধ্যে এত কম হার আর দেখা যায়নি। এর আগে ২০১৪–১৫ অর্থবছরের পর এমন নিম্নমুখী চিত্র ছিল না। চূড়ান্ত হিসাব প্রকাশ করেছে বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরো (বিবিএস)।
টানা চার বছরের নিম্নগতি:
২০২১–২২ অর্থবছরে জিডিপির অনুপাতে বেসরকারি বিনিয়োগ ছিল প্রায় সাড়ে ২৪ শতাংশ। সেখান থেকে ধারাবাহিকভাবে কমে এখন তা ২২ শতাংশে নেমে এসেছে। একই সময়ে সার্বিক বিনিয়োগ ৩২ শতাংশ থেকে সাড়ে ২৮ শতাংশে নেমেছে। কয়েক বছর ধরেই বেসরকারি বিনিয়োগ ২৩ থেকে ২৪ শতাংশের মধ্যে আটকে ছিল। বিশেষজ্ঞরা বারবার এই হার বাড়ানোর তাগিদ দিয়ে আসছিলেন।
২০২৪–২৫ অর্থবছরকে অর্থনীতির জন্য কঠিন বছর হিসেবেই দেখা হচ্ছে। ওই অর্থবছরে জিডিপি প্রবৃদ্ধি হয়েছে মাত্র ৩ দশমিক ৪৯ শতাংশ। যা করোনাভাইরাসের প্রথম বছর ২০১৯–২০ অর্থবছরের ৩ দশমিক ৪৫ শতাংশ প্রবৃদ্ধির কাছাকাছি। গত দুই দশকের মধ্যে এত কম প্রবৃদ্ধি আর হয়নি।
গত অর্থবছরজুড়ে রাজনৈতিক অস্থিরতা ছিল বড় বাস্তবতা। ২০২৪ সালের জুলাই ও আগস্টে গণ–আন্দোলনের সময় ব্লকেড ও কারফিউয়ের মতো কর্মসূচিতে অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ড প্রায় স্থবির হয়ে পড়ে। বিনিয়োগের অনুকূল পরিবেশ তৈরি হয়নি। এর প্রভাব পুরো অর্থবছরেই রয়ে গেছে। বেসরকারি খাতে বিনিয়োগের খরা আগের আওয়ামী লীগ সরকারের সময় থেকে চলছিল, অন্তর্বর্তী সরকারের সময়েও তা কাটেনি।
বেসরকারি গবেষণা প্রতিষ্ঠান সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগ (সিপিডি)-এর সম্মাননীয় ফেলো মোস্তাফিজুর রহমান এই পরিস্থিতিকে বলেছেন ‘চতুর্মুখী আক্রমণের ফল’। তাঁর মতে, এর সরাসরি প্রভাব পড়েছে কর্মসংস্থান ও জিডিপি প্রবৃদ্ধিতে। তিনি চারটি কারণ তুলে ধরেন।
প্রথমত, অন্তর্বর্তী সরকার কত দিন থাকবে এবং গণতান্ত্রিক উত্তরণ সঠিকভাবে হবে কি না—এ নিয়ে দেশি–বিদেশি বিনিয়োগকারীদের মধ্যে অনিশ্চয়তা ছিল। ফলে নতুন বিনিয়োগে আগ্রহ কমে।
দ্বিতীয়ত, দীর্ঘ সময় ধরে সংকোচনমূলক মুদ্রানীতি এবং উচ্চ পলিসি রেট। এতে মূল্যস্ফীতি কিছুটা নিয়ন্ত্রণে এলেও বেসরকারি খাত চাঙা হয়নি।
তৃতীয়ত, ব্যবসায়িক খরচ কমানো, চাঁদাবাজি নিয়ন্ত্রণসহ প্রাতিষ্ঠানিক সংস্কারে দৃশ্যমান অগ্রগতি হয়নি।
চতুর্থত, বৈশ্বিক বাণিজ্যে অনিশ্চয়তা। ট্রাম্পের পাল্টা শুল্কসহ নানা কারণে বিশ্ববাজারে অস্থিরতা রয়েছে।
২০২৪–২৫ অর্থবছরে চলতি মূল্যে জিডিপির আকার দাঁড়িয়েছে ৫৫ লাখ ১৫ হাজার ২৬ কোটি টাকা। মোট বিনিয়োগ হয়েছে ১৫ লাখ ৭৪ হাজার ৪৯ কোটি টাকা। এর মধ্যে বেসরকারি বিনিয়োগ ১২ লাখ ১৪ হাজার ৮৭২ কোটি টাকা। অর্থাৎ জিডিপির ২২ দশমিক শূন্য ৩ শতাংশ। বিনিয়োগের হিসাবও চলতি মূল্যেই করা হয়। উল্লেখ্য, ২০১৩–১৪ অর্থবছরেও জিডিপির অনুপাতে বেসরকারি বিনিয়োগ ২২ দশমিক শূন্য ৩ শতাংশ ছিল। এরপর দীর্ঘ সময় এমন নিম্ন হার দেখা যায়নি।
২০২৪–২৫ অর্থবছরে নতুন বিদেশি বিনিয়োগ এসেছে ৫৫ কোটি ডলার। গত পাঁচ বছরের মধ্যে এটিই সর্বনিম্ন। স্থানীয় উদ্যোক্তারাও দেড় বছর ধরে রাজনৈতিক অস্থিরতার মধ্যে ছিলেন। তাঁরা ধীরগতির নীতি নিয়েছেন। নির্বাচিত নতুন সরকারের সময় পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণ করে বিনিয়োগের সিদ্ধান্ত নিতে চান বলে সংশ্লিষ্টদের মত। এ ছাড়া গ্যাস ও বিদ্যুতের সংকট, উচ্চ কর কাঠামো এবং ১৩ থেকে ১৪ শতাংশ সুদের হারও বিনিয়োগ নিরুৎসাহিত করেছে বলে ধারণা করা হচ্ছে।
একটি বছরে দেশের ভেতরে উৎপাদিত পণ্য ও সেবার মোট মূল্য সংযোজনই জিডিপি। কৃষি, শিল্প ও সেবা—এই তিন খাত মিলিয়ে তা নির্ধারিত হয়। একই সঙ্গে একটি বছরে কত বিনিয়োগ হলো, সেটিও জিডিপির হিসাবে ধরা হয়। কারণ বিনিয়োগের মাধ্যমেই ভবিষ্যৎ উৎপাদন ও সেবা সম্প্রসারণের ভিত্তি তৈরি হয়।
বিনিয়োগে এই দীর্ঘস্থায়ী স্থবিরতা তাই শুধু একটি পরিসংখ্যান নয়। এটি অর্থনীতির গতি, কর্মসংস্থান এবং প্রবৃদ্ধির সম্ভাবনার ওপর সরাসরি প্রভাব ফেলছে। সামনে বিনিয়োগবান্ধব পরিবেশ কত দ্রুত তৈরি করা যায়, এখন সেটিই বড় প্রশ্ন।

