অন্তর্বর্তী সরকারের শেষ সময়ে যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে করা শুল্কচুক্তিকে “চরম বৈষম্যমূলক” বলে মন্তব্য করেছে Center for Policy Dialogue (সিপিডি)! সংস্থাটি মনে করছে, সরকারের উচিত এই চুক্তি থেকে সরে আসা।
গতকাল শনিবার রাজধানীর ধানমন্ডিতে সিপিডির কার্যালয়ে আয়োজিত এক মিডিয়া ব্রিফিংয়ে এ মন্তব্য করেন সংস্থাটির গবেষণা পরিচালক খন্দকার গোলাম মোয়াজ্জেম। ‘নতুন সরকারের অর্থনৈতিক ও সামাজিক খাতে নীতি ও প্রশাসনিক সিদ্ধান্ত: ১৮০ দিনও তারপর’ শীর্ষক ব্রিফিংয়ে তিনি বলেন, চুক্তির শর্ত দেখে তারা বিস্মিত ও হতবাক হয়েছেন।
তার ভাষ্য, শুল্কসংক্রান্ত আলোচনার শুরুতে সাধারণ মানুষকে ধারণা দেওয়া হয়েছিল কেবল পাল্টা শুল্কের হার ৩৫ শতাংশ থেকে ২০ শতাংশে নামিয়ে আনার বিষয়েই আলোচনা চলছে। বলা হয়েছিল, কিছু ক্রয়চুক্তি সম্পন্ন করলেই সমস্যার সমাধান হবে। কিন্তু শেষ পর্যন্ত যে চুক্তি হয়েছে, তা প্রত্যাশার সঙ্গে মিলেনি।
একটি অনির্বাচিত সরকার কীভাবে এমন চুক্তি করল এবং তার দায় কীভাবে একটি নির্বাচিত সরকারের ওপর বর্তায়, তা বোধগম্য নয় বলেও মন্তব্য করেন তিনি। এই চুক্তির জন্য অন্তর্বর্তী সরকারকে সমালোচনা করার যথেষ্ট কারণ আছে বলে তিনি উল্লেখ করেন।
ব্রিফিংয়ে নতুন গভর্নর নিয়োগের বিষয়েও প্রশ্ন তোলে সিপিডি। সংস্থাটির মতে, নিয়োগ প্রক্রিয়াটি দুর্বল ও অস্বচ্ছ ছিল। রাজনৈতিক বিবেচনায় নিয়োগ দিলেও এর চেয়ে ভালো বিকল্প সরকারের হাতে ছিল বলে তারা মনে করে। নবনিযুক্ত গভর্নরকে ঘিরে যে আলোচনা-সমালোচনা রয়েছে, তা এড়ানো যেত বলেও মন্তব্য করা হয়।
দেশের বর্তমান অর্থনৈতিক পরিস্থিতি নিয়ে খাতভিত্তিক পর্যালোচনা তুলে ধরে সিপিডি জানায়, সরকারি কাঠামোর প্রধান দুর্বলতা হলো সিদ্ধান্ত বাস্তবায়নে অদক্ষতা ও দক্ষতার ঘাটতি। নতুন সরকারকে এটি অগ্রাধিকার দিয়ে সমাধান করতে হবে।
ব্যবসা পরিবেশের ক্ষেত্রে স্বচ্ছতা ও জবাবদিহির অভাবকে বড় সমস্যা হিসেবে চিহ্নিত করা হয়। পাশাপাশি অবকাঠামো সীমাবদ্ধতা, মানবসম্পদের ঘাটতি, অর্থায়নের জটিলতা, দুর্নীতি ও অপ্রাতিষ্ঠানিক লেনদেন বিদেশি বিনিয়োগকারীদের আস্থায় প্রভাব ফেলছে।
বড় প্রকল্পে ধীরগতির পরামর্শ:
সিপিডি জানায়, বিএনপি তাদের নির্বাচনী ইশতেহারে দ্বিতীয় পদ্মা ও যমুনা সেতুসহ বড় অবকাঠামো প্রকল্পের কথা বলেছে। তবে বর্তমান আর্থিক বাস্তবতায় এমন প্রকল্প বাস্তবায়নের সক্ষমতা সরকারের নেই বলে মনে করে সংস্থাটি। তাই এ ক্ষেত্রে ধীরে চলার নীতি অনুসরণের পরামর্শ দেওয়া হয়।
ইশতেহারে জিডিপির তুলনায় রাজস্ব আহরণ ৭ শতাংশ থেকে বাড়িয়ে ১০ শতাংশে নেওয়ার প্রস্তাবকে যৌক্তিক বলা হয়েছে। তবে তা করতে হলে করব্যবস্থায় ন্যায্যতা ও স্বচ্ছতা নিশ্চিত করতে হবে বলে মত সিপিডির।
বিদ্যুৎ ও জ্বালানি খাত নিয়েও উদ্বেগ প্রকাশ করেন খন্দকার গোলাম মোয়াজ্জেম। তার মতে, দেশে চাহিদা প্রক্ষেপণ অতিমূল্যায়িত এবং গ্যাস সরবরাহে ঘাটতি রয়েছে। বিএনপির নির্বাচনী পরিকল্পনায় নতুন করে কয়লা উত্তোলনের ইঙ্গিত থাকলেও, এটি জ্বালানি রূপান্তরের পথে বাধা হয়ে দাঁড়াতে পারে বলে সতর্ক করেন তিনি। একই সঙ্গে গ্যাস সংকট সমাধানে এলএনজি আমদানিকে টেকসই সমাধান হিসেবে দেখেন না তিনি।
সরকারি কার্যক্রমে জবাবদিহি নিশ্চিত করতে সংসদের ভূমিকা বাড়ানোর ওপর গুরুত্বারোপ করে সিপিডি। খন্দকার গোলাম মোয়াজ্জেম বলেন, কার্যকর সরকার পরিচালনায় নির্বাহী বিভাগের পাশাপাশি সংসদকেও সমানভাবে সক্রিয় থাকতে হবে। বিশেষ করে আর্থিক–সংক্রান্ত সংসদীয় স্থায়ী কমিটিগুলো স্বাধীনভাবে কাজ করতে পারলে জবাবদিহি জোরদার হবে।
সংস্থাটি মনে করে, নতুন সরকারকে একদিকে ১৮০ দিনের তাৎক্ষণিক কর্মপরিকল্পনা, অন্যদিকে পরবর্তী পাঁচ বছরের দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা নিয়ে একযোগে কাজ করতে হবে। পাশাপাশি কেন্দ্রীয় উদ্যোগ যেন মন্ত্রণালয়ের গণ্ডি পেরিয়ে সিটি করপোরেশন, পৌরসভা, উপজেলা ও ইউনিয়ন পরিষদ পর্যায়েও কার্যকর হয়, সে বিষয়েও জোর দেওয়া হয়।

