দেশে অবৈধ অর্থ উপার্জন থেকে শুরু করে অর্থ পাচারসহ নানা ধরনের অর্থনৈতিক অপরাধের মাত্রা বৃদ্ধি পাচ্ছে। বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন, এসব অপরাধ পুরোপুরি নির্মূল করতে ব্যর্থতার পেছনে অন্যতম কারণ হলো আর্থিক লেনদেনে অস্বচ্ছতা এবং জবাবদিহিতার অভাব।
বিশ্লেষকদের মতে, এই সংস্কৃতির মূল উৎস নগদ অর্থের ওপর অতিমাত্রায় নির্ভরশীল লেনদেন ব্যবস্থা। যদিও ডিজিটাল যুগে বিশ্বের অনেক দেশ ইতিমধ্যেই সম্পূর্ণ ডিজিটাল লেনদেন ব্যবস্থা চালু করেছে, বাংলাদেশে এখনও নগদ অর্থের ব্যবহার প্রাধান্য পাচ্ছে।
বাংলাদেশ ব্যাংকের সদ্য বিদায়ী গভর্নর সম্প্রতি এক ক্যাশলেস সোসাইটি সংক্রান্ত সম্মেলনে উল্লেখ করেছিলেন, দেশের মানুষ এখনো নগদ অর্থের ওপর অতিরিক্ত নির্ভরশীল। প্রতি বছর নগদ চাহিদা প্রায় ১০ শতাংশ হারে বৃদ্ধি পাচ্ছে। নগদ অর্থের এই চাহিদা মেটাতে সরকার বছরে প্রায় ২০ হাজার কোটি টাকা ব্যয় করছে—টাকা ছাপানো, সংগ্রহ করা এবং অব্যবহৃত নষ্ট হওয়া পর্যন্ত। এটি সংকটে থাকা অর্থনীতিতে অতিরিক্ত চাপ সৃষ্টি করছে।
এই পরিস্থিতি কাটিয়ে উঠতে সরকারকে ক্যাশলেস সোসাইটি গড়ে তোলার জন্য কার্যকর নীতি ও উদ্যোগ নেওয়া জরুরি। ডিজিটাল লেনদেন সম্প্রসারণের মাধ্যমে অর্থের স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতা বৃদ্ধি পাবে এবং অর্থনৈতিক অপরাধ কমানো সম্ভব হবে।
নবনির্বাচিত সরকার দায়িত্ব নেওয়ার মাত্র কয়েক মাসের মধ্যেই বিভিন্ন খাতে কর্মপরিকল্পনা প্রণয়নের কাজ শুরু করেছে। এর মধ্যে দেশের অর্থনীতি কোনো ব্যাতিক্রম নয়। তবে বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন, অর্থনীতিতে যে কোনো নীতি প্রণয়নের ক্ষেত্রে অতিরিক্ত সতর্কতা অবলম্বন জরুরি। কারণ দেশ এখন বহুমুখী সংকটে অবস্থান করছে। অপর্যাপ্ত রাজস্ব ও দুর্বল রাজস্ব ব্যবস্থাপনা, ক্রমবর্ধমান অনানুষ্ঠানিক অর্থনীতি, ঘুস-চাঁদাবাজি, অর্থ পাচার ও অবৈধ টাকার প্রবাহ—এসব সমস্যার তাৎক্ষণিক সমাধান সম্ভব নয়। তবে সময়ের সঙ্গে অর্থনীতির এই দুর্বলতা নিয়ন্ত্রণে রাখতে হলে সরকারকে কার্যকর পদক্ষেপ নিতে হবে। বিশ্লেষকদের মতে, এর মধ্যে একটি কার্যকর সমাধান হতে পারে ক্যাশলেস সোসাইটি গড়ে তোলা।
দেশে মোবাইল ফাইন্যান্সিয়াল সার্ভিসেস (এমএফএস), ইন্টারনেট ব্যাংকিং, কার্ডভিত্তিক লেনদেন এবং কিউআর কোড পেমেন্টের পরিসর ক্রমশ বাড়ছে। তবু বাস্তবতা হলো, জনগোষ্ঠী ও অর্থনীতির আকারের তুলনায় ডিজিটাল লেনদেনে অভ্যস্ত গ্রাহকের সংখ্যা খুবই সীমিত। অধিকাংশ লেনদেন এখনও নগদে সম্পন্ন হচ্ছে।
বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্য অনুযায়ী, চলতি বছরের জানুয়ারিতে কেন্দ্রীয় ব্যাংকের ইস্যুকৃত নোটের পরিমাণ ছিল ৩ লাখ ৩ হাজার ৭৪৩ কোটি টাকা। এর মধ্যে প্রায় ২ লাখ ৮৫ হাজার কোটি টাকা দেশের ব্যাংক খাতের বাইরে, অর্থাৎ নাগরিকদের হাতে। বিশ্লেষকরা বলছেন, ঘুস-দুর্নীতি ও কালো টাকার দৌরাত্ম্যের কারণে এই টাকা ‘ম্যাট্রেস মানি’ হিসেবে স্থবির অবস্থায় রয়েছে। অর্থাৎ উৎপাদনশীল খাতে বিনিয়োগের পরিবর্তে বিপুল অর্থ অব্যবহৃত অবস্থায় পড়ে আছে।
নগদনির্ভর লেনদেনের এই সংস্কৃতি শুধু অর্থনীতির গতি বাধাগ্রস্ত করছে না, বরং দেশের অর্থনৈতিক ব্যবস্থার বড় অংশকে আনুষ্ঠানিক ব্যবস্থার বাইরে রাখতে সাহায্য করছে। এর ফলে শ্যাডো ইকোনমি বিস্তার পাচ্ছে, কর ফাঁকি ও অন্যান্য আর্থিক অপরাধ প্রবণতা বেড়েই চলেছে। বিশেষজ্ঞরা মনে করেন, এই চ্যালেঞ্জ মোকাবেলায় ক্যাশলেস সোসাইটি গড়ে তোলা সহায়ক হতে পারে।
ক্যাশলেস সোসাইটির সবচেয়ে বড় সুবিধা হলো লেনদেনের স্বচ্ছতা। ডিজিটাল লেনদেনের প্রতিটি ধাপ রেকর্ডভিত্তিক হওয়ায় অর্থপ্রবাহ তদারকি করা সহজ হয়। এর ফলে ঘুষ বা অর্থ পাচারের সুযোগ সংকুচিত হয় এবং করযোগ্য ব্যক্তি শনাক্ত করা সহজ হয়। ফলশ্রুতিতে রাজস্ব আহরণ বৃদ্ধি পায় এবং অর্থনীতিতে সুশাসন প্রতিষ্ঠায় সহায়তা হয়।
পাশের দেশ ভারত এই ক্ষেত্রে অনুসরণীয় উদাহরণ হিসেবে গড়ে তুলেছে। সেখানে সরকার নীতি-সহায়তা, ইন্টারঅপারেবল পেমেন্ট অবকাঠামো এবং ডিজিটাল লেনদেনে প্রণোদনার মাধ্যমে সাধারণ মানুষকে নগদ থেকে ডিজিটাল লেনদেনে অভ্যস্ত করেছে। ক্ষুদ্র ব্যবসায়ী থেকে গ্রামীণ বাজার পর্যন্ত ডিজিটাল লেনদেনের প্রচলন নিশ্চিত করা সম্ভব হয়েছে। বাংলাদেশও সমন্বিত উদ্যোগের মাধ্যমে একই পথে অগ্রসর হতে পারে।
ক্যাশলেস সোসাইটি গড়ে তুলতে ডিজিটাল অবকাঠামোগত সংকটগুলো সমাধান করা জরুরি। দেশের ক্রেডিট কার্ড সেবার বড় অংশ মূলত রাজধানী ও বিভাগীয় শহরগুলোতে সীমাবদ্ধ। ফলে সারাদেশে কার্ডভিত্তিক সেবা সম্প্রসারণে প্রতিবন্ধকতা তৈরি হচ্ছে। পিওএস মেশিনের বিস্তারও কম, জেলা শহরের মার্কেট ও হোটেল-রেস্তোরাঁতে ডিজিটাল লেনদেনের সুযোগ সীমিত।
এছাড়া ব্যাংক, মোবাইল ফাইন্যান্সিয়াল সার্ভিস, ফিনটেক প্রতিষ্ঠান ও পেমেন্ট সার্ভিস অপারেটরের মধ্যে সীমিত আন্তঃসংযোগ ব্যবহারকারীদের জন্য জটিলতা তৈরি করছে। এজন্য একটি ইউনিফায়েড ডিজিটাল পেমেন্ট ইকোসিস্টেম গড়ে তোলা প্রয়োজন, যেখানে ইন্টারঅপারেবিলিটি নিশ্চিত থাকবে। তার পাশাপাশি, নিরবচ্ছিন্ন ইন্টারনেট সংযোগ, সাশ্রয়ী স্মার্ট ডিভাইস এবং স্থানীয় পর্যায়ে ডিজিটাল লেনদেন সাক্ষরতার বিস্তার ছাড়া ক্যাশলেস উদ্যোগ সফল হওয়ার সম্ভাবনা কম। তাই এই দিকগুলোতেও মনোযোগ দেওয়া সমানভাবে জরুরি।
ডিজিটাল লেনদেনকে উৎসাহিত করতে আর্থিক প্রণোদনা কার্যকর হতে পারে। ভ্যাট ছাড়, লেনদেন ফি হ্রাস, ক্যাশব্যাক বা কর সুবিধা ভোক্তা ও ব্যবসায়ী উভয়কেই নগদ ব্যবহার কমাতে উদ্বুদ্ধ করতে সক্ষম। একই সঙ্গে পিওএস মেশিন, স্মার্টফোন এবং ডিজিটাল পেমেন্ট অবকাঠামোর ওপর উচ্চ কর কমানো হলে সেবা দ্রুত সম্প্রসারিত করা সম্ভব।
তবে সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ হলো মানুষের আস্থা অর্জন। অনেক নাগরিক এখনও ব্যাংক অ্যাকাউন্টে বড় অংকের অর্থ রাখতে আগ্রহী নন। করভীতি, জটিল প্রক্রিয়া এবং নিরাপত্তা উদ্বেগ এ ক্ষেত্রে প্রধান বাধা। এই সমস্যা সমাধানে সহজে অ্যাকাউন্ট খোলা, দ্রুত সেবা, কম খরচে লেনদেন এবং কার্যকর গ্রাহক সুরক্ষা নিশ্চিত করতে হবে।
সাইবার নিরাপত্তাও বড় ইস্যু হিসেবে সামনে আসে। ব্যক্তিগত তথ্য সুরক্ষিত না থাকলে জনগণকে নগদবিহীন লেনদেনে অভ্যস্ত করা কঠিন। এজন্য শক্তিশালী সাইবার সিকিউরিটি কাঠামো, রিয়েল টাইম মনিটরিং এবং দ্রুত অভিযোগ নিষ্পত্তি ব্যবস্থা গড়ে তোলা জরুরি। পাশাপাশি জাতীয় পর্যায়ে ডিজিটাল লেনদেন সচেতনতা বৃদ্ধি কর্মসূচি চালু করা প্রয়োজন।
বাংলাদেশ ইতিমধ্যেই ডিজিটাল লেনদেনের দিকে অগ্রসর হচ্ছে। তবে এই প্রক্রিয়াকে দ্রুত ও সুসংহত করতে হলে প্রয়োজন নীতিগত অগ্রাধিকার, প্রণোদনা এবং সরকারি-বেসরকারি সমন্বিত উদ্যোগ। ক্যাশলেস সোসাইটি বাস্তবায়িত হলে দেশের অর্থনীতি আরও গতিশীল এবং স্বচ্ছ হবে বলে আশা করা যায়।
সবমিলিয়ে দেখা যায়, ক্যাশলেস সোসাইটি শুধু ডিজিটাল লেনদেনের দিকেই নয়, দেশের অর্থনীতিতে স্বচ্ছতা, সুশাসন এবং কার্যকর রাজস্ব আহরণেও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে। নগদনির্ভরতা কমানো, অবকাঠামোগত চ্যালেঞ্জ সমাধান, মানুষকে ডিজিটাল লেনদেনে আস্থা এবং আর্থিক প্রণোদনা—সব মিলিয়ে একটি শক্তিশালী, গতিশীল এবং নিরাপদ অর্থনৈতিক পরিবেশ গড়ে তোলা সম্ভব।
বিশ্লেষকরা মনে করছেন, সরকারি ও বেসরকারি সংস্থার সমন্বিত উদ্যোগ, প্রণোদনা এবং নীতিগত অগ্রাধিকার থাকলে বাংলাদেশ দ্রুত ক্যাশলেস সমাজের দিকে অগ্রসর হতে পারবে। এর ফলে শুধু অর্থনৈতিক অপরাধ কমবে না, বরং বিনিয়োগ বৃদ্ধি, উৎপাদনশীল খাতের সম্প্রসারণ এবং দেশের অর্থনীতি আরও গতিশীল ও টেকসই হবে। সুতরাং ক্যাশলেস সোসাইটি গড়ে তোলার প্রচেষ্টা দেশের ভবিষ্যত অর্থনীতির জন্য এক গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ হিসেবে বিবেচিত হতে পারে।

