অন্তর্বর্তী সরকারের সময় নিয়োগপ্রাপ্ত কেন্দ্রীয় ব্যাংকের গভর্নর ড. আহসান এইচ মনসুর সম্প্রতি বিতর্কিতভাবে পদত্যাগ করেছেন। তার বিদায়ের এই পরিস্থিতি সুশীল সমাজে সরকারের সমালোচনার জন্ম দিয়েছে। তবে সংশ্লিষ্টরা মনে করছেন, গভর্নর নিজেই তার বিদায়ের পথ সহজভাবে তৈরি করেছিলেন।
ব্যাংকার, ব্যবসায়ী, আমানতকারী এবং পুঁজিবাজারের বিনিয়োগকারীদের কাছে অজনপ্রিয় হয়ে উঠেছিলেন ড. আহসান। সরকার তার চুক্তির মেয়াদ বাতিল না করলেও নানামুখী চাপ এবং প্রতিরোধের মুখে তাকে পদত্যাগ করতে হয়। শেয়ারবিজের অনুসন্ধানে জানা গেছে, কেন্দ্রীয় ব্যাংকের ভেতরে ড. আহসান ‘সুপার পাওয়ারফুল’ অবস্থায় পৌঁছেছিলেন। তার হঠকারি ও একতরফা সিদ্ধান্তের কারণে ব্যাংকিং খাতসহ সমগ্র অর্থনৈতিক পরিবেশে নৈরাজ্য তৈরি হয়েছিল।
কেন্দ্রীয় ব্যাংকের কর্মকর্তাদের বরাত দিয়ে বলা হয়, তৎকালীন অর্থ উপদেষ্টা ড. সালেহউদ্দিন আহমেদ সাবেক গভর্নরকে ব্যাংক খাতের সংস্কারে পূর্ণ স্বাধীনতা দিয়েছিলেন। কিন্তু ক্ষমতা হাতে পাওয়ার পর তিনি অহংকারে ভুগতে থাকেন। ব্যাংকের উচ্চপদস্থ কর্মকর্তা থেকে শুরু করে সরকারি-বেসরকারি ব্যাংকের চেয়ারম্যান ও এমডিরা তার জিদ ও একতরফা আচরণের কারণে বিপর্যস্ত হয়ে পড়েন।
একাধিক ব্যাংক কর্মকর্তার বক্তব্য অনুযায়ী, আহসান শুধুমাত্র জেদের কারণে পাঁচটি ব্যাংক একীভূত করেছিলেন। বিশেষ করে পাঁচ ব্যাংকের কর্মকর্তাদের বেতন ২০ শতাংশ কমানো, শরিয়াহভিত্তিক ব্যাংক একীভূত করা এবং শেয়ার মূল্যের শূন্য ঘোষণা খাতের ক্ষুদ্র বিনিয়োগকারী ও আমানতকারীদের জন্য বড় ধরনের ঝুঁকি তৈরি করে।
কেন্দ্রীয় ব্যাংকের সূত্র জানায়, গভর্নরের স্বৈরাচারী ও অগণতান্ত্রিক আচরণ প্রতিষ্ঠানটির ভাবমূর্তিকে ক্ষতিগ্রস্ত করেছে। কোনো নিয়ম-নীতির তোয়াক্কা না করে নিজের মতো করে ব্যাংক খাত নিয়ন্ত্রণ করতেন তিনি। অনেক ব্যাংকারের মতে, ড. আহসান নিজেই তার এই বিতাড়নের জন্য দায়ী। শেষ পর্যন্ত গত বুধবার গভর্নর পদত্যাগ করেন। অনেক বিশ্লেষক মনে করছেন, যদি তার আচরণ ও সিদ্ধান্তগুলো সমন্বিত ও সংযত হতো, তবে এ ধরনের অপমানজনক বিদায় এড়িয়ে যাওয়া সম্ভব ছিল।
১২ ফেব্রুয়ারি ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন অনুষ্ঠিত হওয়ার পর গঠিত নতুন সরকারের মাত্র ৯ দিনের মাথায় বাংলাদেশ ব্যাংকের গভর্নর হিসেবে ড. আহসান এইচ মনসুরকে সরিয়ে নিয়োগ দেওয়া হয় মোস্তাকুর রহমানকে। অর্থ মন্ত্রণালয়ের আর্থিক প্রতিষ্ঠান বিভাগ থেকে প্রজ্ঞাপন জারি করে এই পদোন্নতি নিশ্চিত করা হয়।
ড. আহসান ২০২৪ সালের ১৪ আগস্ট গভর্নরের দায়িত্ব গ্রহণ করেন। এরপর থেকেই তিনি ব্যাংক খাতে উল্লেখযোগ্য পরিবর্তন শুরু করেন। তার নীতির মধ্যে ছিল:
- এক্সিম, সোশ্যাল ইসলামী, ফার্স্ট সিকিউরিটি ইসলামী, গ্লোবাল ইসলামী ও ইউনিয়ন ব্যাংককে একীভূত করে সম্মিলিত ইসলামী ব্যাংক গঠন।
- ব্যাংকের খেলাপি ঋণের প্রকৃত চিত্র উদ্ঘাটন।
- ২ শতাংশ ডাউন পেমেন্টে খেলাপি ঋণ পুনঃতফসিলের সুযোগ।
- ব্যাংকের পর্ষদ পুনর্গঠন।
- দেশের শীর্ষ শিল্পগোষ্ঠীর দুর্নীতি অনুসন্ধানে ১১টি যৌথ তদন্ত কমিটি গঠন।
- মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণের নামে পলিসি রেট ১০ শতাংশ পর্যন্ত বাড়ানো।
তবে তার কঠোর নীতির কারণে বিনিয়োগকারীদের আস্থা তলানিতে নামে। বিভিন্ন সূত্রে জানা গেছে, ড. আহসান দায়িত্ব নেওয়ার পরই অর্থনীতি ও আর্থিক খাতের অনিয়ম ও দুর্নীতির বিরুদ্ধে শক্ত অবস্থান নেন। পুঁজিবাজার, ব্যাংক খাত ও প্রভাবশালী শিল্পগোষ্ঠীর ঋণ অনিয়ম, অর্থপাচার ও ক্ষমতার অপব্যবহারের অভিযোগ সামনে আনার মাধ্যমে তিনি শুদ্ধি অভিযান ঘোষণা করেন। তার সময়ে অন্তর্বর্তী সরকারের নির্দেশে শীর্ষ শিল্পগোষ্ঠী ও সাবেক প্রধানমন্ত্রীর পরিবারের সদস্যদের দুর্নীতি খতিয়ে দেখতে যৌথ তদন্ত কমিটি গঠিত হয়। আলোচনায় আসে হাজার কোটি টাকার ঋণ জালিয়াতি ও বিদেশে অর্থ সরানোর অভিযোগ।
কিন্তু দেড় বছরের বেশি সময় পার হওয়ার পরও সেই ঘোষণার বাস্তব প্রতিফলন দেখা যায়নি। কোনো শিল্পগোষ্ঠীর বিরুদ্ধে বড় অঙ্কের দুর্নীতি বা অর্থপাচারের অভিযোগ প্রমাণিত হয়নি। শুরুতে যে তৎপরতা ও প্রত্যাশা তৈরি হয়েছিল, তা দীর্ঘসূত্রতা ও বিলম্বে ধীরে ধীরে ম্লান হয়ে যায়। এর প্রভাব পড়ে বিনিয়োগ ও পুঁজিবাজারে। বড় শিল্পপ্রতিষ্ঠানগুলো সতর্ক অবস্থান নেন, নতুন বিনিয়োগের গতি কমে যায়। এর ফলে বাজারে দীর্ঘমেয়াদি অনিশ্চয়তা তৈরি হয় এবং বিনিয়োগকারীদের আস্থা কমে আসে।
সাবেক গভর্নর ড. আহসান এইচ মনসুরের নেতৃত্বে চারটি সংকটাপন্ন শরিয়াহভিত্তিক ব্যাংক এবং এক্সিম ব্যাংককে একীভূত করে গঠন করা হয়েছিল ‘সম্মিলিত ইসলামী ব্যাংক’। একীভূতকৃত ব্যাংকগুলো হলো: ফার্স্ট সিকিউরিটি ইসলামী, গ্লোবাল ইসলামী, ইউনিয়ন ব্যাংক, সোশ্যাল ইসলামী ও এক্সিম ব্যাংক। তবে এই পাঁচ ব্যাংকের মধ্যে সবচেয়ে স্থিতিশীল অবস্থানে এখনও এক্সিম ব্যাংক রয়েছে। কেন্দ্রীয় ব্যাংকের কাছে অতিরিক্ত সহায়তা চাইলেও তা দেওয়া হয়নি। পাঁচ ব্যাংক একীভূত ও শেয়ার মূল্যের শূন্য ঘোষণা করার কারণে ক্ষুদ্র বিনিয়োগকারী ও আমানতকারীদের বিপদ বেড়ে যায়।
বাংলাদেশ ব্যাংকের কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, ২০২৪ ও ২০২৫ সালে এই ব্যাংকগুলো বড় অঙ্কের লোকসান করেছে। ফলে আমানতকারীরা ওই দুই বছরের জন্য তাদের আমানতের বিপরীতে কোনো মুনাফা পাবেন না। ব্যাংকগুলোতে ৭–৯ শতাংশ মুনাফার আমানত থাকলেও নতুন সিদ্ধান্তে দুই বছরের মুনাফা কমে যাবে এবং আমানতের স্থিতিও নাজুক হবে। সর্বশেষ তথ্য অনুযায়ী, পাঁচ ব্যাংকে প্রায় ৭৫ লাখ আমানতকারীর মোট ১ লাখ ৪২ হাজার কোটি টাকা জমা রয়েছে। এর বিপরীতে ব্যাংকগুলোর ঋণ ১ লাখ ৯৩ হাজার কোটি টাকা, যার বড় অংশ ইতোমধ্যেই খেলাপি।
বাংলাদেশ ব্যাংকের কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, সাবেক গভর্নরকে ঘিরে একাধিক গুরুতর অভিযোগ রয়েছে। বিশেষ করে পাঁচ ব্যাংকের কর্মকর্তাদের বেতন হঠাৎ কমানো এবং বিনিয়োগকারীর ক্ষোভ তার বিরুদ্ধে অসন্তোষ সৃষ্টি করেছিল। কেন্দ্রীয় ব্যাংকের কর্মকর্তারা গভর্নরকে চিঠি লিখেও অনিয়ম বন্ধের চেষ্টা করেছিলেন।
পুঁজিবাজারের বিনিয়োগকারী নজর আলী বলেন, “হাসিনা সরকারের সময়ে ব্যাংক খাত ধ্বংস হওয়ার দায় মূলত কেন্দ্রীয় ব্যাংকের ওপর পড়ে। কিন্তু গভর্নর একক সিদ্ধান্তে পাঁচ ব্যাংক একীভূত করে শেয়ার দর শূন্য ঘোষণা করলেন। কর্মকর্তাদের বেতন ২০ শতাংশ কমানো, এক্সিম ব্যাংককেও দুর্বল হিসেবে চিহ্নিত করা–সবই তার ব্যক্তিগত প্রতিহিংসার অংশ।”
একজন সাবেক ডেপুটি গভর্নর নাম প্রকাশ না করার শর্তে বলেন, “আহসান মনসুর ব্যাংকিং খতিয়ে দেখতে জানতেন না। ব্যাংক স্টেকহোল্ডারদের সম্মান দিতেন না। নিজেকে স্বৈরাচারী হিসেবে প্রতিষ্ঠা করার চেষ্টা করেছিলেন। এটি ভবিষ্যৎ গভর্নরদের জন্য শিক্ষণীয় ঘটনা।”
এদিকে বাজার সংশ্লিষ্টরা মনে করছেন, সাবেক গভর্নরের অপসারণ বিনিয়োগকারীদের জন্য ইতিবাচক বার্তা হিসেবে দেখা হচ্ছে। নতুন গভর্নরের সুদহার কমানোর ঘোষণাও বিনিয়োগকারীদের উৎসাহিত করেছে। নতুন সরকার ও গভর্নরের সময়ে ব্যাংক-বহির্ভূত আর্থিক প্রতিষ্ঠান (এনবিএফআই) বন্ধের সিদ্ধান্ত পুনর্বিবেচনা সহ আরও কিছু ইতিবাচক পদক্ষেপ আসার সম্ভাবনা আছে। এর প্রত্যাশায় শেয়ারবাজারে ইতোমধ্যেই বড় উত্থান দেখা গেছে।
মিডওয়ে সিকিউরিটিজ লিমিটেডের ব্যবস্থাপনা পরিচালক মো. আশেকুর রহমান বলেন, “সাবেক গভর্নরের সময়ে শেয়ারবাজারের জন্য কিছু নেতিবাচক সিদ্ধান্ত হয়েছিল। নতুন গভর্নরের সময় সেই সিদ্ধান্তগুলো পরিবর্তনের সম্ভাবনা তৈরি হয়েছে। সুদহার কমানোর ঘোষণা শেয়ারবাজারে ইতিবাচক প্রভাব ফেলবে। পাশাপাশি এনবিএফআই বন্ধের পুনর্বিবেচনা ও পুরোনো বিষয়গুলোর মূল্যায়ন বিনিয়োগকারীদের অংশগ্রহণ বাড়াচ্ছে।”

