বিশ্বব্যাংকের অঙ্গ প্রতিষ্ঠান ইন্টারন্যাশনাল ডেভেলপমেন্ট অ্যাসোসিয়েশন (আইডিএ) এর ঋণ সহায়তায় জরুরি স্বাস্থ্যসেবা জোরদারে নতুন একটি প্রকল্প নিতে যাচ্ছে স্বাস্থ্যসেবা বিভাগ। প্রস্তাবিত প্রকল্পে পরামর্শক, সেমিনার, গবেষণা, প্রশিক্ষণ ও সার্ভে খাতে বড় অঙ্কের ব্যয় ধরা হয়েছে। পাশাপাশি গাড়ি ভাড়া খাতে ৪০ কোটি টাকা এবং ভ্রমণ খাতে ১২০ কোটি টাকা বরাদ্দের প্রস্তাব রয়েছে। এ ব্যয় নিয়ে প্রশ্ন তুলেছে পরিকল্পনা কমিশন-এর আর্থসামাজিক অবকাঠামো বিভাগ।
‘স্ট্রেনদেনিং হেলথ ইমার্জেন্সি প্রিভেনশন, প্রিপেয়ার্ডনেস, রেসপন্স অ্যান্ড রেজিলেন্স উইথ ওয়ান হেলথ অ্যাপ্রোচ’ শীর্ষক প্রকল্পের আওতায় এসব ব্যয় প্রস্তাব করা হয়েছে। প্রকল্পটির উন্নয়ন প্রকল্প প্রস্তাবনা নিয়ে প্রকল্প মূল্যায়ন কমিটির সভা হওয়ার কথা রয়েছে।
আইডিএ ঋণের শর্ত তুলনামূলক সহজ। সার্ভিস চার্জ প্রায় শূন্য দশমিক ৭৫ শতাংশ। সুদহার প্রায় ১ দশমিক ২৫ শতাংশ। সব মিলিয়ে মোট সুদের হার প্রায় ২ শতাংশ। উত্তোলন না করা অর্থের ওপর বছরে শূন্য দশমিক ৫০ শতাংশ কমিটমেন্ট ফি দিতে হয়। ঋণের গ্রেস পিরিয়ড পাঁচ বছর। পরিশোধের সময়সীমা ৩০ বছর। তবে সম্প্রতি বিশ্বব্যাংক সুদের হার ২ শতাংশ থেকে বাড়িয়ে ৫ শতাংশ করার প্রস্তাব দিয়েছে। এতে প্রকল্প ব্যয় ও ঋণ পরিশোধের চাপ বাড়তে পারে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা। প্রকল্পে বিশ্বব্যাংকের ঋণ প্রস্তাব ধরা হয়েছে প্রায় ২ হাজার ৭৪৫ কোটি টাকা।
পরিকল্পনা কমিশনের আর্থসামাজিক অবকাঠামো বিভাগের স্বাস্থ্য উইংয়ের যুগ্মপ্রধান মানস মিত্র বলেন, প্রকল্প প্রস্তাবনা সম্প্রতি কমিশনে এসেছে। এখনো মূল্যায়ন সভা হয়নি। সভার আগে একটি কর্মপত্র তৈরি করা হয়েছে। তিনি বলেন, গাড়ি ভাড়া বাবদ ৪০ কোটি টাকা এবং ভ্রমণ ব্যয়সহ সব খাত নিয়ে বিস্তারিত আলোচনা হবে। প্রকল্পটি এখন প্রাথমিক পর্যায়ে রয়েছে। সব ব্যয় খতিয়ে দেখা হবে।
গাড়ি ভাড়া ও ভ্রমণ খাতে বড় অঙ্কের ব্যয়ের সমালোচনা করেছেন বাংলাদেশ উন্নয়ন গবেষণা প্রতিষ্ঠান-এর সাবেক মহাপরিচালক ও বাংলাদেশ ব্যাংক-এর সাবেক প্রধান অর্থনীতিবিদ মুস্তফা কে মুজেরি। তিনি বলেন, দেশে অনেক প্রকল্পেই মূল কাজের চেয়ে আনুষঙ্গিক খাতে ব্যয় বেশি হয়। এটি নতুন কিছু নয়।
তিনি আরও বলেন, অতীতেও এমন প্রকল্প দেখা গেছে যেখানে পরামর্শক, সেমিনার ও অন্যান্য খাতে ব্যয় থাকলেও মূল কার্যক্রমে গুরুত্ব কম ছিল। এতে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরাই সুবিধা পান। প্রকল্পটি যেহেতু পরিকল্পনা কমিশনে রয়েছে, তাই সরকারের উচিত কঠোর নজরদারি করা। অযৌক্তিক ব্যয় অনুমোদন দেওয়া ঠিক হবে না। সব ব্যয় যৌক্তিক হতে হবে।
মুজেরি বলেন, একই ধরনের ভুল বারবার হলেও দায় নির্ধারণ বা শাস্তির নজির খুব কম। প্রকল্পের অর্থ সঠিকভাবে জনগণের কল্যাণে ব্যয় নিশ্চিত না হলে উন্নয়ন কার্যক্রম প্রশ্নের মুখে পড়বে।
প্রকল্পের মূল কার্যক্রম:
প্রকল্প বাস্তবায়িত হলে সংক্রামক রোগের আগাম সতর্কতা ও নজরদারি জোরদার হবে। অগ্রাধিকারভিত্তিক স্বাস্থ্য হুমকি প্রতিরোধে সহায়তা করবে। জরুরি অবস্থায় দ্রুত প্রতিক্রিয়া সক্ষমতা বাড়াবে। আঞ্চলিক সহযোগিতা শক্তিশালী হবে। কার্যকর প্রকল্প ব্যবস্থাপনা ও জ্ঞান ব্যবস্থাপনা নিশ্চিত করা যাবে। তিনটি মন্ত্রণালয়কে দ্রুত তহবিল বরাদ্দের মাধ্যমে তাৎক্ষণিক সাড়া দেওয়ার সুযোগ তৈরি হবে।
প্রকল্পের উদ্দেশ্য:
একটি সহনশীল স্বাস্থ্যব্যবস্থা গড়ে তোলা। মহামারি প্রতিরোধে প্রস্তুতি বাড়ানো। জাতীয় পর্যায়ে প্রতিক্রিয়া সক্ষমতা উন্নত করা।
মোট ব্যয়:
প্রস্তাবিত মোট ব্যয় ২ হাজার ৯২৯ কোটি টাকা। অনুমোদনের পর চার বছরে প্রকল্পটি বাস্তবায়ন হবে। এর মধ্যে বিশ্বব্যাংকের ঋণ ২ হাজার ৭৪৫ কোটি টাকা। প্রকল্পটি সারা দেশে বাস্তবায়িত হবে।
কোন খাতে কত ব্যয়:
পরিকল্পনা কমিশন সূত্রে জানা যায়, পরামর্শক খাতে ব্যয় ধরা হয়েছে ৩২২ কোটি ৪৯ লাখ টাকা। এটি মোট ব্যয়ের ১১ শতাংশ। স্থানীয় ও আন্তর্জাতিক প্রশিক্ষণে ৩৯৭ কোটি ৫ লাখ টাকা, যা ১৩ শতাংশ। সেমিনার ও কর্মশালায় ১২৭ কোটি ৬৯ লাখ টাকা, যা ৪ দশমিক ২ শতাংশ। এছাড়া ৩০৯ কোটি টাকা অন্যান্য অবকাঠামো খাতে রাখা হয়েছে। তবে এসব ব্যয়ে ওয়ান হেলথ অ্যাপ্রোচের দৃশ্যমান উপকার কী হবে তা স্পষ্ট নয়। এ বিষয়ে ব্যাখ্যা চেয়েছে কমিশন।
সংশ্লিষ্ট সূত্র জানায়, প্রকল্প ব্যবস্থাপনা ইউনিটে ৮০ কোটি ৮৬ লাখ টাকা পরামর্শক খাতে রাখা হয়েছে। প্রশিক্ষণে ৪৫ কোটি ৭০ লাখ টাকা। সেমিনারে ১০ কোটি ৯৮ লাখ টাকা। গবেষণায় ২ কোটি টাকা। সার্ভেতে ২ কোটি টাকা। কিন্তু এসব ব্যয় ওয়ান হেলথ অ্যাপ্রোচ বাস্তবায়নে কীভাবে সহায়ক হবে তা স্পষ্ট করা হয়নি।
স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের প্রকল্প বাস্তবায়ন ইউনিটে পরামর্শক খাতে ১৩৪ কোটি টাকা রাখা হয়েছে। প্রশিক্ষণে ১৬৩ কোটি ৫৬ লাখ টাকা। সেমিনারে ১০২ কোটি ৪০ লাখ টাকা। গবেষণায় ২৭ কোটি টাকা। সার্ভেতে ১২ দশমিক ৬৭ কোটি টাকা। এসব ব্যয়ের যৌক্তিকতা নিয়েও ব্যাখ্যা চাওয়া হয়েছে।
আরও একটি অংশে ৫৪ কোটি ৭১ লাখ টাকা পরামর্শক খাতে ধরা হয়েছে। প্রশিক্ষণে ১৩২ কোটি ৪৬ লাখ টাকা। সেমিনারে ৯ কোটি ৬৮ লাখ টাকা। সার্ভেতে ৭৩ কোটি ৬৪ লাখ টাকা। এসব ব্যয়ের যৌক্তিকতা খুঁজে পায়নি কমিশন। তাই বিস্তারিত ব্যাখ্যা চাওয়া হয়েছে।
বন অধিদপ্তরের অংশে ৫২ কোটি ৯১ লাখ টাকা পরামর্শক ব্যয় প্রস্তাব করা হয়েছে। স্থানীয় ও আন্তর্জাতিক প্রশিক্ষণে ৫৫ কোটি ৭৮ লাখ টাকা। পিএইচডি কর্মসূচিতে ৩ কোটি ৬৬ লাখ টাকা। স্নাতকোত্তর ডিপ্লোমায় আড়াই কোটি টাকা। কর্মশালায় ৪ কোটি ৬৩ লাখ টাকা। সার্ভেতে ৪ কোটি ৬৮ লাখ টাকা। এসব ব্যয়ের যৌক্তিকতা নিয়েও প্রশ্ন রয়েছে।
ক্রস বর্ডার নজরদারি প্রতিরোধে ৪৬ কোটি ৩৬ লাখ টাকা প্রস্তাব করা হয়েছে। তবে এর আওতায় কী কার্যক্রম হবে তা স্পষ্ট নয়। এছাড়া ওষুধ ও টিকা খাতে ১২৩ কোটি ৫২ লাখ টাকা, অন্যান্য অবকাঠামো খাতে ১২৮ কোটি ৮৬ লাখ টাকা এবং ল্যাবরেটরি সরঞ্জামে ২৬০ কোটি টাকা প্রস্তাব করা হয়েছে।
স্বাস্থ্য অধিদপ্তর জানিয়েছে, প্রকল্পের কার্যক্রম দেশের বিভিন্ন ভৌগোলিক এলাকায় বাস্তবায়িত হবে। এর প্রভাব দেশজুড়ে পড়বে। প্রতিবেশী দেশেও এর ইতিবাচক প্রভাব পড়তে পারে। মানব, প্রাণী ও পরিবেশ—এই তিন খাতে জরুরি ল্যাবরেটরি সক্ষমতা বাড়ানো হবে। আধুনিকায়ন করা হবে। একটি কার্যকর ল্যাবরেটরি নেটওয়ার্ক গড়ে তোলা হবে। তবে প্রকল্পের সমীক্ষা কোন সংস্থা করেছে তা স্পষ্ট নয়। সমীক্ষায় পরিসংখ্যানভিত্তিক বা তুলনামূলক বিশ্লেষণ থাকা প্রয়োজন বলে মত দিয়েছে কমিশন। একই ধরনের প্রকল্প অন্য দেশে হয়েছে কি না সে তথ্যও চাওয়া হয়েছে।
বন বিভাগ:
বন্যপ্রাণী থেকে ছড়ানো রোগ নিয়ন্ত্রণে সক্ষমতা বাড়ানো হবে। সহনশীল বন্যপ্রাণী স্বাস্থ্য ও নজরদারি ব্যবস্থা গড়ে তোলা হবে। মহামারি প্রতিরোধ, প্রস্তুতি ও সাড়া দেওয়ার সক্ষমতা জোরদার করা হবে।
প্রাণিসম্পদ অধিদপ্তর:
প্রাণিস্বাস্থ্য খাতে সহনশীল ব্যবস্থা গড়ে তোলা হবে। মহামারি প্রতিরোধ, প্রস্তুতি ও সাড়া দেওয়ার সক্ষমতা বাড়ানো হবে। জাতীয় ল্যাবরেটরি নেটওয়ার্ক উন্নয়ন করা হবে। খাদ্যনিরাপত্তা নিশ্চিত করা হবে। অ্যান্টিমাইক্রোবিয়াল প্রতিরোধ নিয়ন্ত্রণ জোরদার করা হবে। নজরদারি ও আগাম সতর্কতা ব্যবস্থা শক্তিশালী করা হবে। আঞ্চলিক সহযোগিতা বাড়ানো হবে।

