ছাত্র–শ্রমিক–জনতার অভ্যুত্থানের মধ্যদিয়ে দেশের মানুষের বদলে যাওয়া ‘মনোজগতের’ সঙ্গে সংগতি রেখে বর্তমান প্রেক্ষাপটে বাংলাদেশের ভঙ্গুর অর্থনীতি ও উচ্চ মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণে ব্যাপক সংস্কার অপরিহার্য। এর জন্য ব্যাংকিং ও পুঁজিবাজার এবং আর্থিক খাতের সংস্কার ও স্বচ্ছতা আনয়ন, বিনিয়োগবান্ধব পরিবেশ ও শিল্পায়ন, মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণ ও বাজার ব্যবস্থা, খেলাপি ঋণ হ্রাস, দুর্নীতি ও অর্থ লোপাট রোধ এবং দক্ষ বাজার ব্যবস্থাপনার মাধ্যমে সরবরাহ ব্যবস্থা উন্নত করা অতীব জরুরি। এছাড়া রিজার্ভ বৃদ্ধি, দেশি-বিদেশি বিনিয়োগ আকর্ষণ এবং রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা নিশ্চিতে অগ্রণী ভূমিকা পালন করতে হবে।
পরিবর্তিত বৈশ্বিক বাস্তবতায় অর্থনীতি এখন আর কোনো স্থির কাঠামোর মধ্যে সীমাবদ্ধ নেই। প্রযুক্তি উদ্ভাবন, জ্বালানি সংকট, সরবরাহ শৃঙ্খলের পুনর্বিন্যাস, বৈশ্বিক বাণিজ্য পরিবর্তন এবং ভূ-রাজনৈতিক উত্তেজনা – সব মিলিয়ে বাংলাদেশসহ উন্নয়নশীল দেশগুলোর অর্থনৈতিক পরিবেশকে বহুমাত্রিক ও জটিল চ্যালেঞ্জের মুখে দাঁড় করিয়েছে।
রাজস্ব কাঠামোর সীমাবদ্ধতা, ব্যাংকিং খাতের দুর্বলতা, শিল্পায়নের একমুখী ধরন, দক্ষ মানবসম্পদের ঘাটতি এবং বিনিয়োগে আস্থার সংকট – এসব এখন বড় চ্যালেঞ্জ হিসেবে দেশের অর্থনীতির সামনে দাঁড়িয়েছে। আবার উচ্চ মূল্যস্ফীতি, বৈদেশিক মুদ্রার চাপ, ঋণের ভার, একমুখী রপ্তানি নির্ভরতা এবং অভ্যন্তরীণ কাঠামোগত দুর্বলতা – এসব সমস্যার সমাধান না হলে অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতা ও টেকসই প্রবৃদ্ধি নিশ্চিত করা সম্ভব নয়।
পরিকল্পনা কমিশনের সাধারণ অর্থনীতি বিভাগ (জিইডি) প্রকাশিত ইকোনমিক আপডেট অ্যান্ড আউটলুক (জানুয়ারি) অনুযায়ী, ২০২৬ সালের জন্য বাংলাদেশের অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির সম্ভাবনা প্রায় ৫ শতাংশ। তবে প্রবৃদ্ধির এই ধারা পুরোপুরি নিশ্চিত নয়। অবকাঠামো, ব্যাংকিং খাত, রাজস্ব সংগ্রহ এবং জ্বালানি সরবরাহের সীমাবদ্ধতা এখনও দেশের অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতার প্রধান চ্যালেঞ্জ হিসেবে রয়ে গেছে। অর্থাৎ সাম্প্রতিক প্রবৃদ্ধি স্বস্তির ইঙ্গিত দিলেও বাস্তব চ্যালেঞ্জগুলো রয়ে গেছে, যা শুধুমাত্র প্রবৃদ্ধির হার নয়; বরং কার্যকর নীতি, কাঠামোগত সংস্কার এবং স্বচ্ছ প্রশাসনিক ব্যবস্থার উপর নির্ভর করছে।
বাংলাদেশের অর্থনীতিকে স্থিতিশীল ও টেকসই করতে এখন প্রয়োজন সমন্বিত ও কার্যকর পদক্ষেপ। ব্যাংকিং ও আর্থিক খাতের সংস্কার, খেলাপি ঋণ নিয়ন্ত্রণ, অর্থপাচার রোধ এবং সুশাসনের ভিত্তিতে কার্যকর প্রশাসন অপরিহার্য। মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণ, জ্বালানি ও অবকাঠামোর টেকসই সরবরাহ, শিল্পায়ন ও রপ্তানির বৈচিত্র্য এবং বিনিয়োগবান্ধব পরিবেশ নিশ্চিত করাও সমান গুরুত্বপূর্ণ। এই পদক্ষেপগুলো একত্রিতভাবে বাস্তবায়িত হলে দেশের অর্থনীতি স্থিতিশীল ও প্রতিযোগিতামূলক হয়ে উঠতে পারে।
“অর্থনীতি ঢেলে সাজাতে হবে” কেবল একটি শ্লোগান নয়; এটি সময়ের দাবির বহিঃপ্রকাশ।অর্থনীতি স্থিতিশীল ও টেকসই রাখতে নীতি-সংস্কারের ওপর রাজনৈতিক সদিচ্ছা অপরিহার্য। স্বচ্ছতা, জবাবদিহিতা, আইনের শাসন, প্রযুক্তিনির্ভর প্রশাসন, দুর্নীতি প্রতিরোধ এবং নাগরিক অধিকার প্রতিষ্ঠা—এসব সুশাসনের মূল স্তম্ভ। সুশাসন কেবল প্রশাসনিক কার্যকারিতা নয়, এটি সম্পদ ও জনশক্তির সঠিক ব্যবহার নিশ্চিত করে এবং উন্নয়নের ধারাকে ত্বরান্বিত করে। বিনিয়োগকারীর আস্থা, নাগরিকের আস্থা এবং আন্তর্জাতিক অংশীদারদের আস্থা—এই তিন স্তম্ভের ওপর দাঁড়িয়ে দেশের নতুন অর্থনৈতিক কাঠামো গড়ে ওঠে।
আন্তর্জাতিক পূর্বাভাসগুলোও এই চিত্রকে সমর্থন করে। আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিল (আইএমএফ) পূর্বাভাস দিয়েছে, সাম্প্রতিক অর্থনৈতিক ধীরগতির পর বাংলাদেশের জিডিপি (GDP) প্রবৃদ্ধি ২০২৬ অর্থবছরে প্রায় ৪.৭% হতে পারে। তবে কর রাজস্ব বৃদ্ধি ও ব্যাংকিং খাতের দুর্বলতা দূর করার নীতিমালা সফলভাবে বাস্তবায়িত হলে মধ্যমেয়াদে প্রবৃদ্ধি ধীরে ধীরে ৬% পর্যন্ত পৌঁছানোর সম্ভাবনা রয়েছে।
বিশ্বব্যাংকও অনুরূপ পূর্বাভাস দিয়েছে। তাদের মতে, ২০২৫–২৬ অর্থবছরে বাংলাদেশের জিডিপি প্রবৃদ্ধি প্রায় ৪.৮% এবং ২০২৬–২৭ অর্থবছরে এটি ৬.১%–৬.৩% পর্যন্ত বৃদ্ধি পেতে পারে।
বৈদেশিক মুদ্রার দিকেও পরিস্থিতি তুলনামূলকভাবে শক্তিশালী। ২৬ ফেব্রুয়ারি-২০২৬ তথ্য অনুযায়ী, বাংলাদেশের মোট (গ্রস) বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ প্রায় ৩৫ বিলিয়ন মার্কিন ডলারের বেশি (প্রায় ৩৫.৩১ বিলিয়ন মার্কিন ডলার) এবং আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিল আইএমএফ এর বিপিএম (BPM-6) পদ্ধতি অনুযায়ী ব্যবহারযোগ্য বা নিট রিজার্ভের পরিমাণ দাঁড়িয়েছে ৩০.১১ বিলিয়ন মার্কিন ডলার। রিজার্ভের এই দৃঢ় অবস্থানের পেছনে প্রধান কারণ হলো, প্রবাসি আয় ও রপ্তানি আয়ের ধারাবাহিক বৃদ্ধি।
তবে বাস্তবতা হলো বাংলাদেশ বর্তমানে বৈদেশিক খাতের জটিল বাস্তবতার মুখোমুখি। বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভে ধারাবাহিক চাপ, ডলার সংকট এবং আমদানিতে নিয়ন্ত্রণমূলক কড়াকড়ি—এসব মিলিয়ে ব্যবসা ও বিনিয়োগের পরিবেশে অনিশ্চয়তা তৈরি করেছে। রেমিট্যান্স ও রপ্তানি আয়ে সাময়িক উন্নতি স্বস্তি দিলেও সামগ্রিক ভারসাম্য এখনও ভঙ্গুর। রাজনৈতিক অনিশ্চয়তা, উচ্চ মূল্যস্ফীতি, জ্বালানি আমদানির ব্যয় এবং ব্যাংকিং খাতের দুর্বলতা রিজার্ভ ব্যবস্থাপনাকে আরও চ্যালেঞ্জিং করে তুলেছে।
রিজার্ভ সংকটের মূল কারণ লেনদেনের ভারসাম্যের ঘাটতি। আমদানি ব্যয় দ্রুত বেড়ে গেলেও রপ্তানি ও রেমিট্যান্স প্রত্যাশিত গতিতে না বেড়ে ডলারের সরবরাহ-চাহিদার ফাঁক সৃষ্টি হয়েছে। ডলারের উচ্চমূল্য ও বিনিময় হারের অস্থিরতা বাজারে অনিশ্চয়তা বাড়িয়েছে, যা আমদানিকারক ও বিনিয়োগকারীদের সিদ্ধান্ত গ্রহণকে প্রভাবিত করছে।
আমদানিতে কড়াকড়ি স্বল্পমেয়াদে রিজার্ভ সুরক্ষায় সহায়ক হলেও দীর্ঘমেয়াদে শিল্প উৎপাদন, কর্মসংস্থান ও বিনিয়োগে নেতিবাচক প্রভাব ফেলে। নতুন বিনিয়োগ প্রকল্প স্থগিত হচ্ছে, উৎপাদন ব্যাহত হচ্ছে এবং ব্যবসায়িক আস্থায় ভাটা পড়ছে। অর্থনীতির গতিশীলতা ধরে রাখতে আমদানি নীতিতে ভারসাম্য নিশ্চিত করা অপরিহার্য।
অভ্যন্তরীণ কাঠামোগত দুর্বলতাও বৈদেশিক খাতের ঝুঁকি বাড়িয়েছে। উচ্চ খেলাপি ঋণ, আর্থিক খাতে সুশাসনের ঘাটতি এবং অর্থপাচারের অভিযোগ ডলার প্রবাহকে সীমিত করছে। উৎপাদন খাতের অস্থিরতা এবং জ্বালানি সরবরাহের অনিশ্চয়তা রপ্তানি সক্ষমতাকে সীমিত করছে। দেশীয় মুদ্রার অবমূল্যায়ন ও জ্বালানির দাম বৃদ্ধি মূল্যস্ফীতিকে তীব্র করেছে, যা ভোক্তা ব্যয় ও সামগ্রিক অর্থনীতিকে ক্ষতিগ্রস্ত করছে।
বাংলাদেশ ব্যাংক ইতিমধ্যেই বিনিময় হারকে বাজারঘনিষ্ঠ করার উদ্যোগ নিয়েছে। তবে কেবল বিনিময় হার সমন্বয় যথেষ্ট নয়। রিজার্ভ ব্যবস্থাপনায় স্বচ্ছতা, তথ্যভিত্তিক পূর্বাভাস এবং সুস্পষ্ট নীতি অপরিহার্য। রেমিট্যান্স প্রণোদনা কার্যকরভাবে ব্যবস্থাপনা করতে হবে এবং আমদানি অগ্রাধিকার নির্ধারণে স্বচ্ছ নীতি প্রণয়ন জরুরি। বৈদেশিক খাতের স্থিতিশীলতা ছাড়া অভ্যন্তরীণ প্রবৃদ্ধি টেকসই হতে পারে না।
বাংলাদেশের ব্যাংকিং ও আর্থিক খাত গভীর আস্থাসংকটে নিমজ্জিত। খেলাপি ঋণ বৃদ্ধি, তারল্য সংকট, ঋণ জালিয়াতি ও অর্থপাচারের অভিযোগ—সব মিলিয়ে খাতটি দীর্ঘদিনের দুর্বল শাসন ও নীতিগত শিথিলতার মুখোমুখি। ঋণ পুনঃতফসিল ও বিশেষ ছাড়ের সংস্কৃতি প্রকৃত আর্থিক ঝুঁকিকে আড়াল করেছে, যার ফলে ব্যাংকগুলোর আর্থিক স্বাস্থ্য ভঙ্গুর হয়ে পড়েছে।
সদ্য দায়িত্ব নেওয়া জনগণের ভোটে নির্বাচিত নতুন সরকার ও নিয়ন্ত্রক সংস্থা আর্থিক খাতকে স্থিতিশীল করতে সংস্কারের উদ্যোগ নিয়েছে। নীতিগত পুনর্বিন্যাস, ঝুঁকিভিত্তিক তদারকি জোরদার এবং আইন সংশোধনের আলোচনা ইতিবাচক সংকেত। তবে উদ্যোগ ঘোষণাই যথেষ্ট নয়; কার্যকর বাস্তবায়নই আসল পরীক্ষার ক্ষেত্র।
খেলাপি ঋণ সমস্যার মূলেই রয়েছে সুশাসনের ঘাটতি। আন্তর্জাতিক মানদণ্ড অনুযায়ী ঝুঁকি মূল্যায়ন, সম্পদের শ্রেণিবিন্যাস এবং স্বচ্ছ আর্থিক প্রতিবেদন নিশ্চিত না হলে প্রকৃত পরিস্থিতি বোঝা যাবে না। তাই ঝুঁকিভিত্তিক তদারকি শক্তিশালী করা এবং সমস্যাগ্রস্ত ঋণ দ্রুত নিষ্পত্তির ব্যবস্থা জরুরি।
তারল্য সংকট মোকাবেলায় দুর্বল ব্যাংকগুলোকে পুনর্গঠন, একীভূতকরণ বা পুনঃমূলধনীকরণের মাধ্যমে আমানতকারীদের স্বার্থ সুরক্ষা করতে হবে। ডিজিটাল ব্যাংকিং সম্প্রসারণের সঙ্গে সাইবার নিরাপত্তা ও প্রযুক্তিগত সক্ষমতা বৃদ্ধি আস্থার অংশ। আস্থা পুনর্গঠন কেবল প্রযুক্তিগত নয়—এটি গভীর শাসন সংস্কারের ওপর নির্ভর।
রাজস্ব কাঠামোতে কম কর-জিডিপি অনুপাতের একটি ফাঁদ। বাংলাদেশের কর-জিডিপি অনুপাত বর্তমানে প্রায় ৭–৮ শতাংশ, যা এশিয়ার মধ্যে অন্যতম ন্যূনতম। বৈশ্বিক গড় অনুপাত ১৬ শতাংশের বেশি, আর মধ্যম আয়ের দেশগুলোর অনুপাত সাধারণত ১২–১৮ শতাংশের মধ্যে। এই বাস্তবতায় দেশের রাজস্ব সক্ষমতা উন্নয়ন চাহিদার তুলনায় অপ্রতুল।
অর্থনীতি স্থিতিশীল ও টেকসই রাখতে নীতি-সংস্কারের ওপর রাজনৈতিক সদিচ্ছা অপরিহার্য। স্বচ্ছতা, জবাবদিহিতা, আইনের শাসন, দুর্নীতি প্রতিরোধ এবং নাগরিক অধিকার প্রতিষ্ঠা—এসব সুশাসনের মূল স্তম্ভ। সুশাসন কেবল প্রশাসনিক কার্যকারিতা নয়, এটি সম্পদ ও জনশক্তির সঠিক ব্যবহার নিশ্চিত করে এবং উন্নয়নের ধারাকে ত্বরান্বিত করে। বিনিয়োগকারীর আস্থা, নাগরিকের আস্থা এবং আন্তর্জাতিক অংশীদারদের আস্থা—এই তিন স্তম্ভের ওপর দাঁড়িয়ে দেশের নতুন অর্থনৈতিক কাঠামো গড়ে ওঠে।
অর্থনীতি পুনর্গঠনের জন্য প্রয়োজন সামষ্টিক স্থিতিশীলতা, কাঠামোগত সংস্কার এবং স্বচ্ছ প্রশাসনিক ব্যবস্থা। এর মধ্যে অন্তর্ভুক্ত ব্যাংকিং খাতে সুশাসন প্রতিষ্ঠা করা, কর ব্যবস্থার আধুনিকায়ন ও রাজস্ব আহরণ বাড়ানো, মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণ করা, বিনিয়োগবান্ধব পরিবেশ তৈরি করা, নতুন কর্মসংস্থান সৃষ্টি এবং দুর্নীতি প্রতিরোধ। এসব উদ্যোগ বাস্তবায়ন করলে অর্থনীতি ন্যায়সংগত, শক্তিশালী ও টেকসই প্রবৃদ্ধির পথে এগোতে পারবে।
চলতি ২০২৫- ২৬ অর্থবছরের মোট রাজস্ব আয়ের লক্ষ্যমাত্রা ৫ লাখ ৬৪ হাজার কোটি টাকা থেকে ২৪ হাজার কোটি টাকা বাড়িয়ে সংশোধিত লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়েছে ৫ লাখ ৮৮ হাজার কোটি টাকা। এর মধ্যে জাতীয় রাজস্ব বোর্ড (এনবিআর) থেকে আহরিত হবে ৫ লাখ ৩ হাজার কোটি টাকা, কর-বহির্ভূত রাজস্ব থেকে আসবে ৬৫ হাজার কোটি টাকা এবং এনবিআর-বহির্ভূত অন্যান্য উৎস থেকে সংগ্রহ করা হবে ২০ হাজার কোটি টাকা। তবে কাঠামোগত দুর্বলতা কাটিয়ে বাস্তবে কতটা অর্জন সম্ভব হবে, তাই বড় চ্যালেঞ্জ।
বৈশ্বিক বাজার দ্রুত প্রযুক্তিনির্ভর ও উচ্চমূল্য সংযোজন খাতে রূপ নিচ্ছে। বাংলাদেশ এখনো তৈরি পোশাকের ওপর অত্যধিক নির্ভরশীল, যা ঝুঁকিপূর্ণ। রপ্তানি বৈচিত্র্য আনতে চামড়া, পাদুকা, প্লাস্টিক, হালকা প্রকৌশল, ইলেকট্রনিক্স এবং ফার্মাসিউটিক্যালস খাতে সম্প্রসারণ কার্যকর হতে পারে। নতুন বাজারে প্রবেশ, প্রযুক্তিনির্ভর উৎপাদন, শ্রমিক দক্ষতা বৃদ্ধির মাধ্যমে বৈশ্বিক প্রতিযোগিতায় টিকে থাকা সম্ভব। চতুর্থ শিল্প বিপ্লবের প্রযুক্তি ব্যবহার না করলে নিম্নমূল্যের প্রতিযোগিতায় নির্ভর করে থাকা ছাড়া উন্নয়ন সম্ভব হবে না। একই সঙ্গে নীতিগত ধারাবাহিকতা, অবকাঠামোগত সহায়তা, লজিস্টিক দক্ষতা, বিদ্যুৎ ও জ্বালানি সরবরাহ এবং সহজ ব্যবসা পরিবেশ নিশ্চিত করা জরুরি।
জুলাই অভ্যুত্থানের মধ্যদিয়ে দেশের মানুষের বদলে যাওয়া ‘মনোজগতের’ সঙ্গে সংগতি রেখে অর্থনৈতিক পদক্ষেপ নেওয়ার কথা বলেছেন নবগঠিত সরকারের অর্থমন্ত্রী আমীর খসরু মাহমুদ চৌধুরী। তিনি বলেছেন, “দেশের অর্থনীতিতে লেভেল প্লেইং ফিল্ড থাকতে হবে, দেশের প্রতিটি মানুষের অর্থনীতিতে অংশগ্রহণের সুযোগ তৈরি করতে হবে এবং অর্থনীতির সুফল যেন তাদের কাছে যায়”। তাঁর ভাষ্য, “৫ অগাস্টের পরবর্তী সময়ে জনগণের মনোজগতে ব্যপক পরিবর্তন হয়েছে। এই পরিবর্তনের সঙ্গে সামাঞ্জস্যপূর্ণ অর্থনৈতিক কার্যক্রম গ্রহণ করতে হবে”।
তাঁর মতে-“প্রাথমিকভাবে আমাদের রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানগুলোতে, যেখানে খারাপ অবস্থা রয়েছে, সেগুলোর উন্নয়ন করতে হবে। আমাদের গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হচ্ছে ইনস্টিটিউশনগুলোকে ‘রিকাভার’ করা। ইনস্টিটিউশনগুলোর মধ্যে পেশাদারিত্ব আনতে হবে; স্বচ্ছতা আনতে হবে, ইফিশিয়েন্সি আনতে হবে”। অর্থমন্ত্রী মনে করেন, দেশের সব জনগণের অংশগ্রহণ থাকবে— এমন অর্থনীতি গড়ে তুলতে হবে।
তিনি বলেন “সব পর্যায়ের, সব শ্রেণিপেশার মানুষকে অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডে যুক্ত করতে পারলে দেশের সামগ্রিক অর্থনীতিতে পরিবর্তন আনা সম্ভব হবে”। তিনি আরো বলেন, পৃষ্ঠপোষকতার অর্থনীতিকে গণতান্ত্রিক অর্থনীতিতে পরিণত করতে হবে। “এটা সফলভাবে করতে হলে আমাদের ডিরেগুলেশন করতে হবে। লিবারলাইজেশন করতে হবে। আমরা শুধু ম্যানুফেকচারিং নির্ভর অর্থনীতিতে না থেকে এটাকে ছড়িয়ে দিতে হবে। খেলাধুলা, সংস্কৃতিসহ বিভিন্ন শ্রেণিপেশাকে সম্পৃক্ত করতে হবে”।
অর্থমন্ত্রী আমীর খসরু উদাহরণ দিয়ে বলেন, “বরিশালের সাধারণ একটি শীতল পাটির দাম ৬০০ বা ৭০০ টাকা। শীতল পাটির কারিগরদের যদি কারুপ্রশিক্ষণ, ঋণ, অনলাইন মার্কেটিং— এসব সুযোগ তৈরি করে দেওয়া যায়, তাহলে তারা বিভিন্ন ডিজাইনের পাটি ও নানা রকমের সামগ্রি তৈরি করতে পারবেন এবং এটার বিশাল মার্কেট তৈরি হবে”।
বাংলাদেশের অর্থনীতি এখন একটি গুরুত্বপূর্ণ মোড়ের মুখে দাঁড়িয়েছে—যেখানে চলমান প্রবৃদ্ধি কেবল প্রেরণার মতো, কিন্তু স্থিতিশীল ও টেকসই উন্নয়ন নিশ্চিত করতে প্রয়োজন গভীর কাঠামোগত সংস্কার। বৈদেশিক খাতের অস্থিরতা, ব্যাংকিং খাতের আস্থাহীনতা, রাজস্ব সংগ্রহের সীমাবদ্ধতা, একমুখী শিল্পায়ন এবং মূল্যস্ফীতির চাপ—এসব চ্যালেঞ্জ কেবল নীতি পরিবর্তন বা স্বল্পমেয়াদী উদ্যোগের মাধ্যমে সমাধান সম্ভব নয়।
ভবিষ্যতের অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতা ও প্রতিযোগিতার জন্য প্রয়োজন সমন্বিত সংস্কার—যেখানে ব্যাংকিং ও আর্থিক খাতের শক্তিশালী তদারকি, সুশাসন, স্বচ্ছ রাজস্ব ব্যবস্থাপনা, বৈচিত্র্যমূলক শিল্পায়ন এবং বিনিয়োগবান্ধব পরিবেশ একসঙ্গে বাস্তবায়িত হবে। প্রযুক্তিনির্ভর, দক্ষতাভিত্তিক ও মানুষকেন্দ্রিক নীতিমালা গ্রহণ করলেই বাংলাদেশের অর্থনীতি বৈশ্বিক প্রতিযোগিতায় টিকে থাকতে পারবে এবং অভ্যন্তরীণ স্থিতিশীলতাকে দৃঢ় ভিত্তির ওপর দাঁড় করাতে সক্ষম হবে।
সংক্ষেপে, “অর্থনীতি ঢেলে সাজাতে হবে” কেবল একটি শ্লোগান নয়; এটি সময়ের আহ্বান। স্বচ্ছতা, সুশাসন, নীতিগত ধারাবাহিকতা এবং প্রযুক্তিনির্ভর প্রশাসনকে কেন্দ্র করে গড়ে ওঠা অর্থনৈতিক কাঠামোই হবে বাংলাদেশকে ২০২৬ ও পরবর্তী দশকে টেকসই উন্নয়ন এবং সমৃদ্ধির পথে এগিয়ে নিয়ে যাওয়ার মূল চাবিকাঠি।

