মধ্যপ্রাচ্যে ইসরায়েল-ইরান সংঘাত তীব্র আকার ধারণ করায় বৈশ্বিক জ্বালানি বাজারে অস্থিরতা বাড়ছে। এর সরাসরি প্রভাব পড়তে পারে আমদানিনির্ভর বাংলাদেশে। বিশেষ করে তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাস (এলএনজি) ও রান্নার গ্যাস (এলপিজি) আমদানি ব্যাহত হলে দেশে গ্যাস সংকট আরও গভীর হওয়ার আশঙ্কা করছেন সংশ্লিষ্টরা। এমন পরিস্থিতি তৈরি হলে বিদ্যুৎ উৎপাদন ও শিল্পকারখানার কার্যক্রম বড় ধরনের চাপে পড়তে পারে।
যদিও সরকার বলছে, দেশে পর্যাপ্ত জ্বালানি মজুত রয়েছে এবং তাৎক্ষণিক কোনো সংকটের আশঙ্কা নেই। তবে বাজার ও সরবরাহ পরিস্থিতি নিয়ে সংশয় কাটছে না।
বর্তমানে দেশে দৈনিক গ্যাস সরবরাহ ২৬০ থেকে ২৭০ কোটি ঘনফুট। এর মধ্যে প্রায় ৯৫ কোটি ঘনফুটই আমদানি করা এলএনজি। অর্থাৎ মোট সরবরাহের এক-তৃতীয়াংশের বেশি নির্ভর করছে বিদেশি জ্বালানির ওপর।
পেট্রোবাংলা সূত্রে জানা গেছে, বাংলাদেশ বছরে প্রায় ৬০ লাখ টন এলএনজি আমদানি করে ১১৫টি কার্গোর মাধ্যমে। এর মধ্যে দীর্ঘমেয়াদি চুক্তির আওতায় প্রায় ৪০ লাখ টন আসে কাতার থেকে। ওমান থেকেও উল্লেখযোগ্য পরিমাণ এলএনজি আসে দীর্ঘমেয়াদি চুক্তিতে। পাশাপাশি স্পট মার্কেট থেকেও এলএনজি কেনা হয়।
বর্তমানে মহেশখালীতে দুটি ভাসমান টার্মিনালের মাধ্যমে কার্গো থেকে এলএনজি জাতীয় গ্রিডে সরবরাহ করা হচ্ছে। মার্চে ১১টি কার্গো আসার কথা রয়েছে। এর মধ্যে ৯টি ইতোমধ্যে উচ্চ ঝুঁকিপূর্ণ হরমুজ প্রণালি এলাকা এড়িয়ে নিরাপদে অতিক্রম করেছে। ৩ মার্চ একটি কার্গো এবং এর দুদিন পর কাতার থেকে আরেকটি কার্গো পৌঁছানোর কথা রয়েছে। সমুদ্রে এখনও ২-৩টি কার্গো রয়েছে।
তবে সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা সতর্ক করে বলছেন, কোনো একটি কার্গো সরবরাহে ব্যাঘাত ঘটলেই দেশে গ্যাস সংকট তীব্র আকার নিতে পারে। কারণ ঢাকাসহ দেশের বিভিন্ন এলাকায় ইতোমধ্যে গ্যাসের স্বল্পচাপ বিরাজ করছে। অনেক জায়গায় দিনের বেশিরভাগ সময় চুলায় আগুন জ্বলছে না।
আরও বড় শঙ্কা হলো—সংকট দীর্ঘায়িত হলে এলএনজির আমদানি ব্যয় বাড়বে। গত বছর এলএনজি আমদানিতে প্রায় ৪৩ হাজার কোটি টাকা ব্যয় হয়েছে। দাম বাড়লে অর্থনীতির ওপর অতিরিক্ত চাপ তৈরি হবে।
দেশে বছরে প্রায় ১৮ লাখ টন এলপিজি আমদানি করে ৯টির মতো বেসরকারি কোম্পানি। আমদানি কমলেই বাজারে অস্থিরতা তৈরি হয়—এমনটাই জানিয়েছেন খাতসংশ্লিষ্টরা।
গত নভেম্বরে এলপিজি আমদানি ৪৪ শতাংশ কমে যায়। ডিসেম্বর ও জানুয়ারিতে তা বাড়েনি। ফলে জানুয়ারিতে তীব্র সংকট দেখা দেয়। ফেব্রুয়ারিতে সরকার আমদানি বাড়ানোর অনুমতি দিলে ২১ ফেব্রুয়ারি পর্যন্ত চট্টগ্রাম ও মোংলা বন্দর দিয়ে ৯১ হাজার টন এলপিজি আমদানি হয়, যা আগের মাসের তুলনায় প্রায় ৪৪ শতাংশ বেশি।
তবে বাস্তব চিত্র এখনো স্বস্তিদায়ক নয়। ২৪ ফেব্রুয়ারি বিইআরসি ১২ কেজি এলপিজির দাম ১৫ টাকা কমিয়ে এক হাজার ৩৪১ টাকা নির্ধারণ করলেও বাজারে বিক্রি হচ্ছে এক হাজার ৬০০ থেকে এক হাজার ৮৫০ টাকায়। প্রতি সিলিন্ডারে ৪০০-৫০০ টাকা বেশি গুনতে হচ্ছে গ্রাহকদের।
খাতসংশ্লিষ্টদের আশঙ্কা, মধ্যপ্রাচ্যের সংঘাত দীর্ঘায়িত হলে এলপিজি বাজার আবারও অস্থিতিশীল হয়ে উঠতে পারে।
রোববার সচিবালয়ে জ্বালানি পরিস্থিতি নিয়ে সরকারের উচ্চ পর্যায়ের বৈঠক অনুষ্ঠিত হয়। বৈঠকে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানকে সার্বিক পরিস্থিতি অবহিত করেন জ্বালানিমন্ত্রী ইকবাল হাসান মাহমুদ টুকু। উপস্থিত ছিলেন প্রধানমন্ত্রীর পররাষ্ট্র উপদেষ্টা হুমায়ুন কবির, জ্বালানি প্রতিমন্ত্রী অনিন্দ্য ইসলাম অমিতসহ ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারা।
সূত্র জানিয়েছে, প্রধানমন্ত্রী যে কোনো মূল্যে জ্বালানির নিরবচ্ছিন্ন সরবরাহ নিশ্চিত করার নির্দেশ দিয়েছেন।
বৈঠক শেষে হুমায়ুন কবির সাংবাদিকদের বলেন, “মধ্যপ্রাচ্যের সংকটে বাংলাদেশে জ্বালানি নিয়ে শঙ্কিত হওয়ার কিছু নেই।”
জ্বালানি সচিব মোহাম্মদ সাইফুল ইসলাম জানান, দেশে বর্তমানে ৩০ দিনের জ্বালানি মজুদ রয়েছে। সংঘাত শুরুর আগেই সর্বোচ্চ পরিমাণ এলএনজি আমদানির প্রক্রিয়া সম্পন্ন করা হয়েছিল। বিকল্প নৌপথ ব্যবহার করে অবশিষ্ট কার্গো পৌঁছাবে বলেও আশা প্রকাশ করেন তিনি।
বাংলাদেশ পেট্রোলিয়াম করপোরেশন (বিপিসি) জানিয়েছে, দেশে বছরে প্রায় ৭০ লাখ টন জ্বালানি তেলের চাহিদা রয়েছে। সংরক্ষণ সক্ষমতা ৩৬ দিনের হলেও বর্তমানে মজুত রয়েছে মাত্র ১৫ থেকে ৩০ দিনের জ্বালানি তেল।
বর্তমান মজুত অনুযায়ী:
-
ডিজেল: ১২ দিনের
-
পেট্রোল: ১৯ দিনের
-
অকটেন: ২৯ দিনের
-
জেট ফুয়েল: ১৫ দিনের
-
ফার্নেস অয়েল: ৯০ দিনের
সমুদ্রপথে আরও ১৫-২০ দিনের জ্বালানি তেল আসছে। রোববার ৩৫ হাজার টন ডিজেল নিয়ে ‘এমটি টরম এগনেস’ জাহাজ ভিড়ছে। আজ ও বুধবার আরও দুটি জাহাজে ৩০-৩২ হাজার টন ডিজেল আসার কথা রয়েছে। সৌদি আরব থেকেও অপরিশোধিত তেলবাহী জাহাজ রওনা হওয়ার কথা রয়েছে।
তবে বর্তমান সংঘাতের প্রেক্ষাপটে এসব চালান সময়মতো পৌঁছাবে কিনা, তা নিয়ে অনিশ্চয়তা থেকেই যাচ্ছে।
জ্বালানি বিশেষজ্ঞ ও ইনডিপেনডেন্ট ইউনিভার্সিটির উপাচার্য ড. এম তামিম বলেন, মধ্যপ্রাচ্যের যুদ্ধ বাংলাদেশের মতো আমদানিনির্ভর জ্বালানির দেশের জন্য অশনিসংকেত। বিশেষ করে তেল, এলএনজি ও এলপিজির দাম দ্রুত বেড়ে যাওয়ার ঝুঁকি রয়েছে।
এই মুহূর্তে সরকার আশ্বস্ত করলেও বৈশ্বিক পরিস্থিতি দ্রুত বদলে যেতে পারে। এলএনজি বা তেলবাহী কার্গোর সরবরাহে সামান্য বিঘ্ন ঘটলেও দেশের বিদ্যুৎ, শিল্প ও গৃহস্থালি খাতে বড় ধরনের প্রভাব পড়তে পারে।
মধ্যপ্রাচ্যের যুদ্ধ তাই শুধু দূরের ভূরাজনীতি নয়—এটি বাংলাদেশের রান্নাঘর, কারখানা ও বিদ্যুৎকেন্দ্রের সঙ্গে সরাসরি সম্পর্কিত একটি বাস্তবতা।

